মাতৃগর্ভে মানব ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক বর্জ্যের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব

ড. মো. আওলাদ হোসেন

মাতৃগর্ভে মানব ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক বর্জ্যের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব

গত পঞ্চাশের দশকের দিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে, মায়ের গর্ভের ভ্রূণ সকল প্রকার প্রতিকূল পরিবেশমুক্ত থাকে। অর্থাৎ বাইরের পরিবেশ ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু চিকিৎসা ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের নিয়মিত গবেষণার ফলশ্রুতিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, দূষিত পরিবেশ, বর্ধনশীল ভ্রূণের বর্ধনকে খুব সহজেই ব্যাহত করতে পারে। ফলে এক বা একাধিক বংশানুক্রম পর্যন্ত প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম হতে পারে, বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম হতে পারে।

কারণ গর্ভবতী মা যেসব খাদ্য আহার বা পানীয় পান করেন তার সবকিছুই গর্ভের সন্তান পরোক্ষভাবে গ্রহণ করে থাকে। গর্ভবতী মায়ের রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত পুষ্টি থেকেই গর্ভের সন্তান পুষ্টি গ্রহণ করে। গর্ভবতী মা শ্বাস-প্রশ্বাসে যে বাতাস গ্রহণ করে সেই বাতাস যদি দূষিত হয়ে থাকে তবে সেই দূষণ রক্তের সাথে ভ্রূণেও চলে যায়। অর্থাৎ গর্ভবতী মা দূষিত পরিবেশে বসবাস করলে গর্ভের ভ্রূণও ঐ দূষণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পরিবেশের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের যে অবাঞ্ছিত পরিবর্তন জীবের জীবনধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাকেই দূষণ বলে। ক্ষতিকর পদার্থ পরিবেশে যোগ করলে তাকে দূষণ বা পরিবেশ দূষণ বলে। পরিবেশ দূষণ বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। Pollution is the introduction of contaminants into the natural environment that cause adverse change. Pollution can take the form of chemical substances or energy, such as noise, heat, or light. Pollutants, the components of pollution, can be either foreign substances/energies or naturally occurring contaminants.

ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। প্রিয় এই শহরে আমরা প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে অবচেতন মনে অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে ফেলে দিচ্ছি। প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রের অধিকাংশই প্লাস্টিকের তৈরি। পৃথিবীতে প্রতি বছর ৪৫ কোটি টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে যোগ হচ্ছে। এসব অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্যের শতকরা ১০ ভাগ পুড়িয়ে ধ্বংস করা হলেও বাকি ৯০ শতাংশের বেশি বিশ্ব পরিবেশকে নানাভাবে বিপন্ন করে তুলেছে।

২০২১ সালের পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত একটি পোর্টালে বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন লিখেছেন-, ‘প্লাস্টিক হচ্ছে কৃত্রিমভাবে তৈরি পলিমার, যা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি বা প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে রাসায়নিক উপায়ে তৈরি করা হয়। পরিবেশে যোগ হওয়া অপচনশীল নানা রকম প্লাস্টিক বর্জ্যের সঙ্গে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এবং পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের মিথষ্ক্রিয়ার (Interaction) ফলে মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিকের কণা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ (বিসফেনল-এ, ফথেলেটস, বিসফেনোন, অর্গানোটিনস, পার- এবং পলি ফ্লোরোঅ্যালকাইল পদার্থ এবং ব্রোমিনেটেড ফেইম রিটারডেন্টস উল্লেখযোগ্য) নিঃসরিত হয়ে পরিবেশ দূষিত করে।

পরিবেশে অপচনশীল প্লাস্টিকজাতীয় দ্রব্য, উপজাত, কণিকা বা প্লাস্টিকের দ্রব্য নিঃসরিত অণুর সংযোজন যা মাটি, পানি, বায়ুমণ্ডল, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও মানব স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে,  পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলছে। এসব মাইক্রো ও ন্যানো কণা এবং নিঃসৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মানুষ ও অন্যান্য জীবের হরমোনাল সিস্টেম নষ্ট করে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

ফলে প্লাস্টিক দূষণ মানুষ ও অন্যান্য জীবের প্রজননক্ষমতা নষ্ট করে, ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়া ব্যাহত করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি করে। এছাড়া এসব প্লাস্টিক ন্যানো কণা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মানুষ ও অন্যান্য জীবের কোষাভ্যন্তরে অবস্থিত ডিএনএ ও আরএনএ অণুর মধ্যে পরিবর্তন করে ক্যান্সার বা স্নায়ুতন্ত্র বিকল করতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানোর ফলে অদৃশ্য মাইক্রো প্লাস্টিকের কণা ভয়ংকরভাবে বায়ুদূষণ ঘটায়, যা নিঃশ্বাস ও প্রশ্বাসের সঙ্গে আমাদের ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে‘।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করলে শুধুমাত্র নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো তা নয়, আমাদের মধ্যে বসবাসরত গর্ভবতী নারীদের গর্ভের সন্তানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী সন্তানও জন্ম নিতে পারে।

১৯৯০-এ ইরাকে উপসাগরীয় যুদ্ধকালীন আমেরিকা ও ইরাক উভয়েই রাসায়নিক অস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল। পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা গেছে, রেডিয়েশন ও রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় যুদ্ধকালীন সময়ে ইরাকে বসবাসকারী গর্ভবতী অনেক নারী প্রতিবন্ধী সন্তান প্রসব করেছিলেন।

১৯৬০-৬৬ সালে জাপান ও ইংল্যান্ডের মাদকসেবীরা ‘থালিডোমাইড’ নামক ঘুমের ঔষধের প্রতি আসক্ত ছিল। পরিসংখ্যানে জানা গেছে ঐ সময়ে উভয় দেশেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘Phocomelia’’ নামক প্রতিবন্ধী শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। বিজ্ঞানী Horton & Newburt গর্ভবতী ইঁদুরের উপর গবেষণা করে একই তথ্য পেয়েছেন।

জাপানের Nagoya University-তে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকালে Environmental Medicine Department এর গবেষণাগারে আমার গবেষণাকর্মে গর্ভবতী ইঁদুরের Embryo Development এর বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ডোজ এ X-Radiation বিচ্ছুরিত করার ফলে ঐ গর্ভবতী ইঁদুরগুলো প্রতিবন্ধী (Hydrocephalus) বাচ্চা প্রসব করেছিল। ইঁদুরের গর্ভের প্রতিবন্ধী বাচ্চাগুলোর বর্ধন প্রক্রিয়ার পর্যায়গুলো (Developmental Stages) গবেষণা করে এই উপসংহারে উপনীত হয়েছিলাম যে, বর্ধন প্রক্রিয়ার যে পর্যায়ে Radiation বিচ্ছুরিত করা হয়, সেসময়ে কোষ বিভাজন বন্ধ হয়ে যায়, ফলে বর্ধন প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়। পুনরায় কোষবিভাজন শুরু হলেও বর্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কারণে Neural Tube (মাতৃগর্ভে শিশু সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়) ক্ষতিগ্রস্ত হয়, Neural Tube এর ঐ স্থানের নির্দিষ্ট অঙ্গটি বর্ধনে ব্যাঘাত ঘটে, শিশুর অঙ্গহানি হয়, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়। প্রতিবন্ধী শিশুও জন্ম হতে পারে। 

আমাদের সমাজে আমরা প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক বা পলিথিনের পাত্রে রান্না করা গরম বা ঠাণ্ডা খাবার ও পানীয় গ্রহণ করছি। এমনও দেখা গেছে গরম চা বা কফি গ্রহণেও প্লাস্টিক পাত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সকল প্লাস্টিক পদার্থ থেকে নিঃসরিত রাসায়নিক মাইক্রো বা ন্যানো পদার্থগুলো খাবারের সাথে মিশে যায়, যা আমরা গ্রহণ করছি। এসব খাবার থেকে অস্বাস্থ্যকর রাসায়নিক মাইক্রো বা ন্যানো পদার্থ মিশ্রিত পুষ্টি উপাদানগুলো রক্তের সাথে মিশে। গর্ভবতী মায়ের গর্ভে ধারণ করা ভ্রূণও মায়ের শরীরে প্রবাহিত রক্ত থেকে, রক্তে মিশে থাকা প্লাস্টিক পদার্থ থেকে নিঃসরিত রাসায়নিক মাইক্রো বা ন্যানো পদার্থ মিশ্রিত পুষ্টি গ্রহণ করছে।

আরও পড়ুন


আগের প্রেমিকার ঘরেও ছেলে আছে যশের, জানুন নুসরাত-যশের অজানা কাহিনী

জনসম্মুখে থাপ্পড় খেয়ে যা বললেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ

নতুন প্রজাতির ৯৮ ফুট দীর্ঘ ডাইনোসরের সন্ধান অস্ট্রেলিয়ায়

নুসরাতের অন্তঃসত্ত্বার বিষয়ে এবার মুখ খুললেন প্রেমিক যশ


Teratology experts-গন বলেছেন, গর্ভবতী মা যদি মাদকাসক্ত হয়, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করে, রক্তশূন্যতা ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে, ভুল ঔষধ বা কেমিক্যাল সেবন করে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণ এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করে, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত  হয়, তবে মায়ের শরীর থেকে প্রবাহিত দূষিত রক্তের মাধ্যমেই গর্ভের বর্ধনশীল শিশুর প্রতিটি কোষ প্রতিকূল পরিবেশের সংস্পর্শে আসে, ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। একই প্রক্রিয়ায় গর্ভবতী মায়ের রক্ত থেকে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য নিঃসরিত রাসায়নিক মাইক্রো বা ন্যানো পদার্থগুলো ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়া ব্যাহত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাব্যতাকে এড়িয়ে চলতে প্লাস্টিকদূষণ থেকে দূরে থাকা খুবই জরুরি।

এজন্য প্রতিদিনের বাজারে এবং কেনাকাটায় আমরা পাতলা পলিথিনের পরিবর্তে বারবার ব্যবহারযোগ্য কাপড়, পাট কিংবা শক্ত প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করে, একবার ব্যবহার করা (one time use) পাতলা পলিথিনকে বিদায় জানাতে পারি। দুধ ও পানীয়জাত দ্রব্যকে প্লাস্টিক মোড়কে বাজারজাত করা বন্ধ করে কাঁচের বোতল ব্যবহার বাধ্যতামূলক প্রয়োজন। প্লাস্টিক পাত্রে গরম-ঠাণ্ডা সব রকম খাবার বা পানীয় গ্রহণ, প্লাস্টিকের গ্লাস/কাপে গরম চা-কফি গ্রহণ পরিহার করি।

সিটি করপোরেশনসমূহ প্রতিটি বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সময় উন্নত বিশ্বে প্রচলিত পদ্ধতিতে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করতে পারে। আলাদাভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিটি ঘর থেকে সংগ্রহ করতে পারলে তা পুনর্চক্রায়ণ (recycle use) করে নতুন পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। এসকল ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্লাস্টিকের দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করে পরিবেশকে প্লাস্টিক দূষনমুক্ত রাখতে হবে।

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর

জীবন আর মৃত্যু খুব কাছাকাছি থাকে

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

জীবন আর মৃত্যু খুব কাছাকাছি থাকে

জীবন আর মৃত্যু খুব কাছাকাছি বাস করে। যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকে ততক্ষণ জীবনের অস্তিত্ব থাকে। দেহ থেকে প্রাণটা বেরিয়ে গেলেই  সব শেষ......সব ইতিহাস। একটা প্রাণবন্ত মানুষ তখন লাশ হয়ে যায়। মানুষটা আর মানুষের কাছে মানুষ থাকে না। মানুষের কাছে লাশ হয়ে যায়। যে মানুষদের কাছে মানুষটা লাশ হয়ে যায়, সে মানুষেরাও একদিন লাশ হবে। কখন, কিভাবে কেউ তা জানেনা।

খুব অদ্ভুত এ পৃথিবীর নিয়ম। একটা মা তার গর্ভে তিলে তিলে বয়ে বেড়ায় তার আদরের সন্তানকে। ঘড়ির কাটাটা যেন খুব অলস হয়ে যায় তখন। কিছুতেই যেন সময় সময়ের মতো গতিময় হয়ে উঠে না বরং সময় ক্রমাগত ঘাত-প্রতিঘাতের ঠাডা লড়াইয়ে ম্রিয়মান হয়ে যায়। জীবনের দর্শনটাই বুঝি এমন। আনন্দ মানুষকে সহজে ধরা দেয় না, অথচ বেদনা মানুষকে প্রতিদিন পাগলের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়। তারপর সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে একদিন আসে সেই মহাবিস্মরণের দিন। মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে নতুন একটি জীবন। খুব নিষ্পাপ, খুব মায়াবী। জীবন থেকে জীবন সৃষ্টির যাত্রা সারা পৃথিবীকে চিৎকার করে জানিয়ে দেয় "যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে, তার মুখে খবর পেলুমঃ, সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার, জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।" 

একদিন এভাবেই মানুষ পৃথিবীতে আসার ছাড়পত্র পায়। পৃথিবীর আলোকিত মুখ দেখে চমকিত হয়। অথচ মানুষ জানেনা কখন তাকে থেমে যেতে হবে। কারণ মানুষের জীবনটা যে খুব অনিশ্চিত। একটা তেলাপোকার পারমাণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়া থেকে বাঁচার মতো প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে, মানুষের তাও নেই। একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ঘটিয়ে জ্বলে উঠবার মতো শক্তি আছে, মানুষের তাও নেই। মানুষ মৃত্যুর কাছে খুব অসহায়।

স্টিভ জবস বলেছেন, ‘মৃত্যুই আমাদের সবার গন্তব্য। কেউ কখনো এটা থেকে পালাতে পারেনি। এবং সেটাই হওয়া উচিত। কারণ মৃত্যুই সম্ভবত জীবনের অন্যতম বড়ো আবিষ্কার। এটা জীবনে পরিবর্তনের এজেন্ট। এটা পুরোনোকে ঝেড়ে নতুনের জন্য জায়গা করে দেয়।’ কথাটির প্রতিফলন ঘটেছে স্টিভ জবসের জীবনে। প্রচুর ধনসম্পদ রেখে গেলেও ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। এই বিপুল সম্পদ তার ক্যানসারকে নির্মূল করতে পারেনি। মৃত্যুর কাছে সম্পদ মূল্যহীন। সম্পদ দিয়ে মৃত্যুকে কখনো কেনা যায় না।

একই ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার, ব্লগার, সেলিব্রেটি ও লেখক কিরজেইডা রডরিগুয়েজ। তার জীবনের ব্যাপ্তি ছিল আরো কম। মাত্র ৪০ বছর। ক্যানসার তার শরীরেও বাসা বাঁধে। মৃত্যুকে খুব কাছাকাছি দেখছিলেন। গভীর অনুভূতি থেকে জন্ম নিয়েছিল জীবনবোধ। মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া একটি নোটে তিনি উল্লেখ করেন। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ডের গাড়িটি আমার গ্যারেজে পড়ে আছে। কিন্তু আমাকে বসে থাকতে হয় হুইল চেয়ারে। সব রকমের ডিজাইনের কাপড়, জুতা, দামি জিনিসে আমার গৃহ ভরপুর। কিন্তু আমার শরীর ঢাকা থাকে হাসপাতালের দেওয়া সামান্য একটা চাদরে। ব্যাংকভর্তি আমার টাকা। কিন্তু সেই টাকা এখন আর আমার কোনো কাজে লাগে না। প্রাসাদের মতো আমার গৃহ, কিন্তু আমি শুয়ে আছি হাসপাতালের টুইন সাইজের একটা বিছানায়। এক ফাইভস্টার হোটেল থেকে আরেক ফাইভস্টার হোটেলে আমি ঘুরে বেড়াতাম। কিন্তু এখন আমার সময় কাটে হাসপাতালের এক পরীক্ষাগার থেকে আরেক পরীক্ষাগারে। শত শত মানুষকে আমি অটোগ্রাফ দিয়েছি, আর আজ ডাক্তারের লেখা প্রেসক্রিপশনটাই আমার অটোগ্রাফ। আমার চুলের সাজের জন্য সাত জন বিউটিশিয়ান ছিল, আজ আমার মাথায় কোনো চুলই নেই। ব্যক্তিগত জেটে আমি যেখানে খুশি সেখানেই উড়ে যেতে পারতাম। কিন্তু হাসপাতালের বারান্দায় যেতেও এখন আমার দুজন মানুষের সাহায্য নিতে হয়। পৃথিবীব্যাপী ভরপুর নানা খাবার থাকলেও দিনে দুটি পিল আর রাতে কয়েক ফোঁটা স্যালাইন আমার খাবার। এই গৃহ, এই গাড়ি, এই জেট, এই আসবাবপত্র, এত এত ব্যাংক একাউন্ট, এত সুনাম আর এত খ্যাতিÍএগুলোর কোনো কিছুই আমার আর কোনো কাজে আসছে না। এগুলোর কোনো কিছুই আমাকে একটু আরাম দিতে পারছে না। শুধু দিতে পারছে প্রিয় কিছু মানুষের মুখ আর তাদের স্পর্শ।

সমরেশ মজুমদার লিখেছেন, মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে; অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়। বাস্তবিকই জীবন নিয়ে গর্বের কিছু নেই। পৃথিবীতে মানুষ একাই আসে, একাই চলে যায়। ধন-সম্পদ, অর্থ, অহমিকা, ক্ষমতা সবকিছু পড়ে থাকে। একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডারের নিজের দৃষ্টিভঙ্গির দর্শনে তার প্রকাশ ঘটেছে। মৃত্যুশয্যায় আলেকজান্ডার। তার প্রিয় সেনাপতিকে কাছে ডাকলেন এবং তার মৃত্যুর পর তিনটি ইচ্ছা পূরণ করার কথা বললেন। আলেকজান্ডার তাদের অলৌকিক দর্শনতত্ত্ব থেকে বললেন, ‘আমি আমার জীবনের বিনিময়ে তিনটি বিষয় শিখেছি, সেগুলো পৃথিবীর মানুষকে জানাতে চাই। প্রথমত, আমার শবদেহ চিকিত্সকেরা বহন করবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন পৃথিবীর কোনো চিকিত্সকের পক্ষে মৃত্যুকে রোধ করা সম্ভব নয়।’ দ্বিতীয় ইচ্ছার বিষয়ে আলেকজান্ডার বলেন, ‘আমার শবদেহ যে পথ দিয়ে বহন করে সমাধিক্ষেত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই পথের চারপাশে আমার অর্জিত ধন-সম্পদ ও অর্থ ছড়িয়ে দেবে। যাতে মানুষ বুঝতে পারে আমি আমার পুরো জীবন ধন-সম্পদের পেছনে ব্যয় করলেও মৃত্যুর পর তার কিছুই সঙ্গে করে নিতে পারছি না।’ তৃতীয়ত, ‘কফিনের বাইরে হাত বের করে রাখবে। কারণ আমি পৃথিবীকে বোঝাতে চাই, আমি পৃথিবীতে শূন্য হাতে এসেছিলাম; আবার যাওয়ার সময় শূন্য হাতেই ফিরে যাচ্ছি।’

বিশ্বখ্যাত পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের ১৫০ বছর বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছিল। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্য তিনি অনেকগুলো আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। কোনো মানুষের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময় তিনি দস্তানা ব্যবহার করতেন।

আরও পড়ুন


খিলগাঁয়ে ড্রেনে পড়ে এক কিশোর নিখোঁজ, উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস

সেই রাতের পরীমণির আরও একটি ভিডিও ভাইরাল

ঢাকার ৭১ শতাংশ মানুষের শরীরে করোনার অ্যান্টিবডি: আইসিডিডিআরবি

সাতক্ষীতায় আজ সর্বোচ্চ মৃত্যু, শনাক্তের হার ৪৭ শতাংশ


জীবাণু থেকে বাঁচার জন্য মুখে মাস্ক লাগানো থাকত। তার সারা শরীর প্রতিদিন পরীক্ষা করা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য ১২ জন চিকিৎসক সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত ছিলেন। খাদ্যে কোনো ধরনের বিষক্রিয়া বা জীবাণু আছে কি না, তা নিয়মিতভাবে শনাক্ত করার জন্য ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যবস্থা ছিল। ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ রাখতে ১২ জন বিশেষজ্ঞ ও ফিজিওথেরাপিস্ট নিযুক্ত ছিলেন। অক্সিজেনের অভাবে যাতে মৃত্যু না ঘটে, সে কারণে অক্সিজেনযুক্ত বিছানায় ঘুমাতেন। কিডনি, ফুসফুস, চোখ, লিভার, হৃদপিণ্ডসহ শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়ে পড়লে সেগুলো যাতে দ্রুত মাইকেলের দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়, সেজন্য সার্বক্ষণিকভাবে অর্গান ডোনার বা অঙ্গদাতা রাখা হয়েছিল।

কিন্তু এত সব সুরক্ষার ব্যবস্থা করেও মাইকেল জ্যাকসনের দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার স্বপ্ন সফল হয়নি। ২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। মৃত্যুকে হার মানানোর চেষ্টা তার থমকে গেল। মৃত্যুর কাছে জীবন হার মানল। তার বাসায় কর্মরত ১২ জন চিকিত্সকের কোনো প্রচেষ্টাই সফল হলো না। লস অ্যাঞ্জেলেস, ক্যালিফর্নিয়ার বিশ্বখ্যাত চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা তার জীবনকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারল না।

জীবন আছে বলেই মৃত্যু আছে। মানুষ জীবনের চাকচিক্যকে দেখে মৃত্যুকে ভুলে যায়। সব নেতিবাচকতার আবর্তে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। মানুষকে জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য খুঁজে পেতে হলে ভাবতে হবে একদিন তাকেও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই পৃথিবী ছেড়ে যাবার আগে পৃথিবীকে গড়ার মতো অভূতপূর্ব শক্তি মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। তবেই পৃথিবী আঁধার ছেড়ে আলোকিত হয়ে উঠবে।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

পরিণত বয়স বা কোন অসুস্থতাই আমাদের মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত করে না

আলী রীয়াজ

পরিণত বয়স বা কোন অসুস্থতাই আমাদের মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত করে না

বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের পথিকৃৎ ও মহীরুহ মহিউদ্দিন আহমেদ আর নেই – এই সংবাদ আমার কাছে অবিশ্বাস্য বলেই মনে হয়। মহিউদ্দিন ভাই দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন; কিন্তু অপরিমেয় জীবনী শক্তি দিয়ে তিনি তা মোকাবেলা করেছেন। পরিণত বয়স বা অসুস্থতা আমাদেরকে কোনও মৃত্যুর জন্যেই প্রস্তুত করে না।

যাঁদের ছায়া দীর্ঘ, যাঁদের কাজ একটি ক্ষেত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে তাঁদের জীবনাবসানের সংবাদ আমাদেরকে কেবল বেদনাহতই করেনা, আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁদের কাজ কী করে অন্যদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। যাঁদের কাজ অন্যদের সৃজনশীলতা এবং গবেষণাকে বদলে দিয়েছে তাঁদের অনুপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁরা কতটা প্রয়োজনীয় ছিলেন।

মহিউদ্দিন আহমেদকে প্রচলিত পরিচয়ে আমরা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই বর্ণনা করবো। কিন্তু তাঁর পরিচয় আমার কাছে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন গবেষণার ক্ষেত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার একজন নিবেদিত মানুষ  হিসেবে। বাংলাদেশে বাংলাদেশ বিষয়ে যে সব কাজ হচ্ছে তার সঙ্গে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেয়া, একই সঙ্গে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশ বিষয়ে যে সব গবেষণা হচ্ছে তাঁকে বাংলাদেশের পাঠকের হাতে তুলে দেয়া – এটাই তিনি করেছেন সারা জীবন ধরে। এক বাক্যে যত সহজে তা লেখা যায় সেই কাজ করা যে কতটা কঠিন সেটা কেবল তাঁর কাজের প্রভাব থেকেই উপলব্ধি করা সম্ভব।

অন্তরালের মানুষ ছিলেন তিনি। কিন্ত তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প এবং মানসম্পন্ন প্রকাশনার ইতিহাস রচনা করা যাবেনা। সাংবাদিকতা দিয়ে তাঁর জীবনের সূচনা হয়েছিলো। স্থায়ীভাবে একাডেমিক জগতে প্রবেশের ডাক এসেছিলো তাঁর, যখন তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি-তে ভর্তির সুযোগ পান, কিন্তু অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির (ওইউপি) প্রকাশনা ও সম্পাদনা তাঁকে বেশি আকর্ষণ করেছিলো, সেটা ১৯৬৯ সাল।

আরও পড়ুন


‘পরমাণু নিয়ে ভিয়েনা সংলাপ সবাইকে সন্তুষ্ট করবে’

কষ্টার্জিত জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা

করোনায় বিশ্বে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মৃত্যু

পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রীর বিদায়


এক সময় সাংবাদিকতার পাশাপাশি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতাও করেছিলেন। মহিউদ্দিন ভাই ১৯৯৭/৮ সালে লন্ডনে আমাকে তাঁর জীবনের এই পর্বের কথা বললে আমার স্বতস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিলো যে – ভাগ্যিস আপনি পিএইচডি না করে ওইউপি’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে উজ্জ্বল মুখে বলেছিলেন – ‘আমিও তাই ভাবি’। তারপরে আরও কথা হয়েছিলো। কি করে ১৯৭৫ সালে ইউপিএল প্রতিষ্ঠা পেলো সেই সব গল্প।

বাংলাদেশে গবেষণা-ভিত্তিক ইংরেজি বইয়ের প্রকাশনার যে ধারা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন তা কি অন্য আর কারও হাতে তৈরী হতে পারতো? যে সময়ে তিনি প্রকাশনার জগতের জন্যে নিজেকে নিবেদন করলেন, যেভাবে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন তা কেবল ধৈর্য্য, নিষ্ঠা আর ভালোবাসা দিয়েই সম্ভব। যে দেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনা, যেখানে প্রতিষ্ঠানের অকাল মৃত্যুই ভবিতব্য বলে বিবেচিত সেখানে মহিউদ্দিন ভাই তৈরি করেছেন এমন প্রতিষ্ঠান যা নিয়ে বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে। বাংলাদেশ সময় সোমবার দিবাগত রাতে মহিউদ্দিন আহমেদ ৭৭ বছর বয়সে ঢাকায় পরলোক গমন করেন। তাঁর আপনজনদের প্রতি আমার সমবেদনা।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

ইমরান খান কি রোবট, প্রশ্ন তসলিমার

তসলিমা নাসরিন

ইমরান খান কি রোবট, প্রশ্ন তসলিমার

পাকিস্তানে বেড়ে চলা ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনার জন্য নারীদের পোশাককেই দায়ী করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন তিনি। এরপরই তার এই মন্তব্য ঘিরে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। এদিকে এ ব্যাপারে সমালোচনা করতে একটুও ছাড়েনটি ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তিনি এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে পাক প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদ জানান।

তার স্ট্যাটাসটি নিউজ টোয়েন্টিফোরের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

‘ইমরান খান বলেছেন, অল্প কাপড় যে মেয়েরা পরে, তাদের দেখে পুরুষলোক, যদি তারা রোবট না হয়, উত্তেজিত হবেই।

কিন্তু ইমরান খান তো বেশি কাপড় যে মেয়ে পরে, নিকাব সহ বোরখা যে মেয়ে পরে, সেই বুশরা বিবিকে দেখে এমন উত্তেজিত হয়েছিলেন যে বিয়ে পর্যন্ত করে ফেলেছেন।

মেয়েরা ছোট পোশাক পরলে যারা উত্তেজিত হয়, ইমরান খান বলছেন, তারা পুরুষ, তারা রোবট নয়। তাহলে তো মেয়েরা বড় পোশাক পরলে যারা উত্তেজিত হয়, তারা রোবট, তারা পুরুষ নয়।

ইমরান খান কি তবে রোবট?

এই প্রশ্নটি মজার। 

কিন্তু পুরো ব্যপারটা মজার নয়। ইমরান খান, একদার প্লেবয়, ধর্ষণ আর যৌন হেনস্থার জন্য ধর্ষক বা হেনস্থাকারী পুরুষদের দোষ না দিয়ে আবারও  মেয়েদের পোশাককে দোষ দিচ্ছেন।

এই ভুল কি তিনি জেনে বুঝে করছেন? নাকি তিনি মানুষটাই শুরু থেকে নারীবিদ্বেষী!

news24bd.tv / তৌহিদ

পরবর্তী খবর

বাবা, সমষ্টি ও মি. হাইড বটিকা

মিল্লাত হোসেন

বাবা, সমষ্টি ও মি. হাইড বটিকা

ব্যক্তি বাবারা যদি এতো ভালোই হবেন, সমষ্টির এতো দুঃখ কেনে?

১৮৮৬ সালে প্রকাশিত স্কটিশ লেখক রবার্ট লুই স্টিভেনসনের প্রবাদবাক্যে পরিণত হওয়া "স্ট্রেঞ্জ কেস অব ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড" নামের উপন্যাসের মূল চরিত্র ডাক্তার হেনরি জেকিল এমন একটি ঔষধ আবিষ্কার করেন যা সেবন করলে মানুষ তার স্বভাবের বিপরীত রূপ ধারণ করতে পারতেন। এভাবে ড. জেকিল দিনমানে থাকতেন দয়া, মায়া ও মানবিকতায় উদ্ভাসিত একজন আদর্শ মানুষ। সেই তিনিই আবার রাতে ওই ওষুধটি সেবন করে হয়ে উঠতেন ভীষণ খারাপ মানুষ। হেন অপকর্ম 'নেই তিনি করতে পারেন না। আরেকটি ঔষধ সেবনের মাধ্যমে আবার তিনি স্বাভাবিক ড. জেকিলে রূপান্তরিত হতে পারতেন। এভাবে নিজের মধ্যে এক দ্বৈতসত্তাকে ধারণ করতে থাকেন। এই অশুভ সত্তাটির নাম দিলেন তিনি 'মি. হাইড'।

নিজের সন্তানকে পৃথিবীর সব বাবাই ভালবাসেন, এটা বিরল কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বলেই দেয়া যায়। পুত্র-কন্যার কাছেও "পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা"ই হন তারা। আজ বাবা দিবসে সামাজিক ও সংবাদ মাধ্যমের সাথে সাথে ঘরোয়া জীবনেও বাবার প্রতি সন্তানদের আবেগ-ভালবাসার প্রকাশ উথলে উঠতে দেখা যাবে।

আমাদের বাবারা বা আমরা নিজেরাও যারা বাবা, তারা নিজ নিজ সন্তানের জন্য যে কোনো কিছু করতে একপায়ে খাড়া সবসময়। ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতকুরের জন্য যে কোনো আত্মত্যাগেই প্রস্তুত থাকেন সব বাবাই। মৃত্যুমুখে থাকা পুত্র হুমায়ুনের জন্য সম্রাট বাবুরের "পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরণের পরাজয়" এর গল্প তো কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে।

ঠিক আছে, মানুষের ইতিহাসে এর অপরিসীম মূল্য আছে বটে, তবে অনেকখানি তলিয়ে দেখলে নেতি'র দিকটাও উঠে আসবে। যুদ্ধজয় বা রাজ্য পরিচালনার দোহাই দিয়ে কিংবা নিছক খামখেয়ালিতে কতো লক্ষ সন্তানকে পিতৃ-মাতৃহারা করেছিলেন, জীবনকে উল্টে দিয়েছিলেন কতো কোটি সন্তানের- সেই হিসেব ইতিহাসে নেই। "আব্বু, তুমি কান্না কত্তেছো যে" আখ্যান রচয়িতাও তো কাজ শেষে হাত-মুখ ধুয়ে ভাত খেয়ে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়েছেন নিশ্চিতভাবে।

সন্তানকে কী খাওয়াবেন, কোন স্কুলে পড়াবেন, আদব-কায়দা শেখাবেন, তাকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অহর্নিশ উদ্বিগ্ন পিতৃশ্রেষ্ঠরা অন্যের সন্তানদের প্রতি কেমন আচরণ করেন, কতোটা ভাবেন- সেটাই বিবেচ্য।

শিশুধর্ষক, নকল N95 মাস্ক গছানো, খাবারে ভেজাল দেয়া, পরের হক মেরে খাওয়া, সুপারি কিলার, নারী পাচারকারী, মাদকের কারবারি, যুদ্ধবাজ সেনাপতি-রাজা-বাদশা, দাসব্যবসায়ী, দুইনম্বরী পয়সা কামানো লোকগুলোও সন্তানদের ভালবাসেন, অকৃপণভাবে। আমাদের মাঝে এই বাবারাও আছেন বা চারপাশে কিলবিল করছেন। সংখ্যায় লক্ষ-কোটি হবেন।


আরও পড়ুনঃ

 

ভাল থাকুক বিশ্বের সকল বাবা, যেভাবে দিবসটির শুরু

বিএনপি থেকে শফি আহমেদ চৌধুরীকে বহিষ্কার

ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট রায়িসিকে অভিনন্দন জানাল হামাস

বিশেষ ট্রেন চালু, মাত্র এক ঘণ্টাতেই ঢাকা-গাজীপুর

 


বাস্তবে, বেশিরভাগ বাবাই কিন্তু ড. জেকিল এন্ড মি. হাইড। কাউকে কখনো বুক দেখান তো, কাউকে কখনো পিঠ! নিয়মিত সেবন করেন 'মি. হাইড' বটিকা!

আপনি যদি ভাল বাবা হন তবে অন্যের সন্তানদের প্রতিও ন্যায্য আচরণ করুন। আর ভাল সন্তান হতে চাইলে নিজের বাবাকেও বলুন, আপনার ভালোর জন্য তিনি যেনো অন্যের সন্তানদের অমঙ্গল না করেন।

এই নিক্তিতে যে বাবা উৎরে যেতে পারেন, তাঁকেই লাখো সেলাম।

(মিল্লাত হোসেন, বিচারক)

news24bd.tv / নকিব

পরবর্তী খবর

একশোটা ব্যঙ্গচিত্র যা পারতো না একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তা পেরেছে

আলী রীয়াজ

একশোটা ব্যঙ্গচিত্র যা পারতো না একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তা পেরেছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্তৃপক্ষ আইনি পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েই এই কথা জানানো হয়েছে। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে একটি কার্টুন প্রকাশিত হবার পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা হেয় প্রতিপন্ন না হয় সেজন্য’ এই সিদ্ধান্ত। এই খবর পাঠ করেই আমার স্মরণ হল যে, আর কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী। একশো বছরের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোথায়  গিয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিজ্ঞপ্তি হচ্ছে তার একটি উদাহরণ।

যে বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার উপাচার্য সামান্য ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ সহ্য করতে পারে না, সেই প্রতিষ্ঠান কী করে শেখাবে সহিষ্ণুতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার? একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যদি স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকারকেই না সহ্য করতে পারে তবে বিশ্ববিদ্যালয় শেখাবে কি? একটি বিশ্ববিদ্যালয়, আসলে যে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান – এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও, কেবল ক্লাশরুমের চার দেয়ালের মধ্যে শেখায় না। সবচেয়ে বড় কথা, নাগরিকের করের অর্থে চলা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নাগরিকরা কিছু বললে তার জন্যে ‘আইনি’ ব্যবস্থার হুমকি তো পাকিস্তানী আমলে ষাটের দশকেও শোনা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের কি কিছুই অর্জন নেই? অবশ্যই আছে। কিন্ত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত বলে দিচ্ছে যে, কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী।

কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভাবমূর্তি’ নিয়ে উদ্বিগ্ন, যেন ‘ভাবমূর্তি’ একটা বায়বীয় বিষয়। ভাবমুর্তি তৈরি হয় আচরণ দিয়ে, কর্মকাণ্ড দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হলগুলোতে কথিত ‘গণরুমে’ শিক্ষার্থীরা অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিকভাবে জীবনযাপন করে, তাঁদের ওপরে নির্যাতনের ঘটনার কথা জানা যায়, তাঁদের বাধ্য করা হয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের হয়ে কাজ করতে, এই রকমভাবে প্রাণ সংহার হয় শিক্ষার্থীর - এইসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি কোথায় যায় তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ নেই।

উদ্বেগ নেই এই নিয়েও যে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় বরাদ্দ খুব সামান্য – মোট ব্যয়ের ৫ শতাংশের মতো। আর সেই বরাদ্দ করা অর্থও ব্যয় করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সক্ষম হয় না। ২০১৯-২০ সালে বরাদ্দ করা ৪০ কোটি টাকার মধ্যে ২৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিলো। অথচ ২০১৯-২০২০ সালে বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় কমানো হয়েছিলো। এগুলোই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি তৈরি করে। 

ভাবমূর্তির ভাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হচ্ছে স্বাধীনভাবে জ্ঞান উৎপাদন, জ্ঞান বিতরণ,  জ্ঞান চর্চা  এবং সকলের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা – শিক্ষকের, শিক্ষার্থীর; স্বাধীনভাবে প্রশাসন পরিচালনা করা। এইগুলো নিয়ে ভাবলে ভাবমূর্তি নিজেই গড়ে উঠবে, তার জন্যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে না। আর অন্যভাবে বললে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একশোটা ব্যঙ্গচিত্র যা করতে পারতো না একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি সেটাই পেরেছে।

লেখক : অধ্যাপক, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv তৌহিদ

পরবর্তী খবর