সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৪৫-৫০, দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তি
সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৪৫-৫০, দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তি

সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৪৫-৫০, দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তি

অনলাইন ডেস্ক

সূরা ইয়াসিন পবিত্র কুরআনের মর্যাদাপূর্ণ একটি সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ। এই সূরার প্রথমে বর্ণিত দুই মুকাত্তায়াত হরফের নামে এটির নামকরণ করা হয়েছে। এই সূরায় রয়েছে ৮৩টি আয়াত।

আজ এই সূরার ৪৫ থেকে ৫০ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে।

এই সূরার ৪৫ ও ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّقُوا مَا بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَمَا خَلْفَكُمْ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (45) وَمَا تَأْتِيهِمْ مِنْ آَيَةٍ مِنْ آَيَاتِ رَبِّهِمْ إِلَّا كَانُوا عَنْهَا مُعْرِضِينَ (46)

“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমাদের সামনে যা কিছু আছে ও পেছনে যা কিছু আছে তাকে ভয় করো, (তাতে) হয়ত তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করতে পারবে, (তখন তারা তা অগ্রাহ্য করে)। ” (৩৬:৪৫)

“তাদের পালনকর্তার নির্দেশাবলীর মধ্যে থেকে এমন কোনো নির্দেশ তাদের কাছে আসেনি যা থেকে তারা মুখে ফিরিয়ে নেয়নি। ” (৩৬:৪৬)

গত কয়েকটি আসরে সৃষ্টিজগতে মহান আল্লাহর বিশালত্ব ও অসীম ক্ষমতার কিছু নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ঐশী নির্দশন থেকে শিক্ষা লাভের পরিবর্তে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এ ধরনের মানুষকে যখন বলা হয়, যেকোনো কাজ করার সময় দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তির কথা স্মরণে রেখো তখন তারা সে কথার তোয়াক্কা না করে নিজেদের পাপ কাজ চালিয়ে যায়। অথচ তারা যদি পাপকাজ পরিত্যাগ করে আল্লাহর দিকে ফিরে যায় তাহলে মহান আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করবেন এবং তাদের অতীতের গোনাহ মাফ করে দেবেন।   

এই দুই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. আল্লাহকে চেনার জন্য সৃষ্টিজগতে অসংখ্য নিদর্শন থাকলেও খুব কম মানুষই তা উপলব্ধি করে।

২. আল্লাহর ক্ষমা লাভের পথ সব সময়ই উন্মুক্ত থাকে। তবে অনেক মানুষ নিজেই নিজের জন্য সে পথ বন্ধ করে রাখে।

সূরা ইয়াসিনের ৪৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ أَنْفِقُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ قَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آَمَنُوا أَنُطْعِمُ مَنْ لَوْ يَشَاءُ اللَّهُ أَطْعَمَهُ إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (47)

“এবং যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাদেরকে যে রিজিক দিয়েছেন, তা থেকে দান কর, তখন কাফেররা মুমিনদেরকে বলে: ইচ্ছা করলেই আল্লাহ যাকে খাওয়াতে পারতেন, আমরা কি তাকে খাওয়াব? তোমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত রয়েছ। ” (৩৬:৪৭)

এই আয়াতে কাফেরদের একটি ভ্রান্ত যুক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: মুমিনদের প্রতি মহান আল্লাহর অন্যতম নির্দেশ হচ্ছে অভাবী লোকদের সাহায্য করা। যেকোনো জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন লোক এই দান করাকে উত্তম কাজ বলে স্বীকৃতি দেবে। অথচ কিছু অথর্ব কাফের আল্লাহ তায়ালার এই নির্দেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা বলে: আল্লাহ কেন গরীব লোকদের খাদ্য ও পোশাক দিতে বলেন? কেন তিনি নিজেই এ কাজ করেন না? তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ নিজেই চান না এসব মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকুক।

কাফেরদের এই বক্তব্য যে ভ্রান্ত তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। কারণ, আমাদের যা কিছু আছে এবং যা কিছু দান করি তার সবই তো আল্লাহর দেয়া রিজিক। নিজে থেকে তো আমরা প্রত্যেকেই নিঃস্ব ও অসহায়। আমাদের সুস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে জ্ঞান-বুদ্ধি-মেধা এবং ধন-সম্পদ সবই তো আল্লাহর দান। যে আল্লাহ আমাদেরকে এত নিয়ামত দান করেছেন তিনিই আবার অভাবী লোকদের প্রয়োজন পূরণের জন্য ধনী ব্যক্তিদের নির্দেশ দিয়েছেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আমরা যদি উপলব্ধি করি আমাদের যা কিছু আছে তার মালিক আমরা নই বরং এগুলো আল্লাহর দান তবে দরিদ্র লোকদের সাহায্য করা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

২. ঈমানদার ব্যক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য দান করা। কাজেই যে ব্যক্তি দান করে না বুঝতে হবে তার ওপর কুফর ভর করেছে।  

সূরা ইয়াসিনের ৪৮ থেকে ৫০ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَيَقُولُونَ مَتَى هَذَا الْوَعْدُ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (48) مَا يَنْظُرُونَ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً تَأْخُذُهُمْ وَهُمْ يَخِصِّمُونَ (49) فَلَا يَسْتَطِيعُونَ تَوْصِيَةً وَلَا إِلَى أَهْلِهِمْ يَرْجِعُونَ (50)

“এবং কাফেররা বলে, তোমরা সত্যবাদী হলে বলো এই ওয়াদা (অর্থাৎ কিয়ামতের ওয়াদা) কবে পূর্ণ হবে?” (৩৬:৪৮)

“তারা কেবল একটা ভয়াবহ (ঐশী) শব্দের অপেক্ষা করছে, যা তাদেরকে আঘাত করবে (পার্থিব বিষয়াদি নিয়ে) তাদের মধ্যে পারস্পরিক বাকবিতণ্ডা চলার সময়। ” (৩৬:৪৯)

“তখন তারা অসিয়ত করতেও সক্ষম হবে না এবং তাদের পরিবার-পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে পারবে না। ” (৩৬:৫০)

আগের আয়াতে দান সম্পর্কে যেসব কাফেরের ভ্রান্ত যুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এই তিন আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: তারা কিয়ামত দিবসকেও ঠাট্টার পাত্র বানিয়ে নিয়েছে। কাফেররা মুমিনদেরকে বলে: কিয়ামত কবে হবে তা যখন তোমরা জানো না তখন কেন শুধু শুধু তাকে ভয় পাও এবং পাপকাজ থেকে বিরত থাকো? যদি সত্যি সত্যিই কেয়ামত বলে কিছু থাকে তাহলে আমাদেরকে তার দিনক্ষণটি জানিয়ে দাও তাহলে আমরাও তা দেখতে পারব।

পবিত্র কুরআন এই অনর্থক অজুহাত খাড়া করার প্রচেষ্টার জবাবে বলছে: কিয়ামত কবে হবে সে সম্পর্কে ধারণা না থাকার অর্থ এই নয় যে, তা আদৌ সংঘটিত হবে না। উদাহরণস্বরূপ, ভূমিকম্প-প্রবণ এলাকার মানুষ জানে না কবে ভূমিকম্প হবে। কিন্তু যেহেতু যেকোনো সময় ভূমিকম্প আসতে পারে তাই তারা প্রতি মুহূর্তে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত থাকে।

কিয়ামত সংঘটিত হবে মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার ভিত্তিতে যেখানে মানুষের কোনো হাত থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা যখনই ইচ্ছা করবেন তখনই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে কোনো মানুষ রক্ষা পাবে না। এতটা অকস্মাৎ সেই মহাপ্রলয় ঘটবে যে, কেউ তার পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার বা পরিবারের জন্য কোনো অসিয়ত করে যাওয়ার সুযোগ পাবে না।

আরও পড়ুন


যেসব কারণে গণপরিবহন বন্ধের কথা বলছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা

সারা দেশে বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস

‘শাটডাউনে’ কঠোর থেকে কঠোরতর বিধিনিষেধ

রেলওয়েতে ভারতীয় অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা


এই তিন আয়াত থেকে আমরা শিখতে পারি:

১. কিয়ামত অস্বীকারকারীরা এই মহাপ্রলয় রোধ করতে পারবে না। এ কারণে তারা বিভিন্ন ভ্রান্ত প্রশ্ন উত্থাপন করে কিয়ামতের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।

২. কিয়ামত কখন হবে তার সময় আল্লাহ তায়ালা মানুষকে না জানালেও এটা বলেছেন যে, মানুষ যখন পার্থিব বিষয়াদি নিয়ে পরস্পরের মধ্যে দৈনন্দিন বাকবিতণ্ডা ও কথা কাটাকাটিতে লিপ্ত থাকবে তখন কিয়ামত সংঘটিত হবে।

৩. কিয়ামত এসে গেলে পার্থিব জীবনের সব সম্পর্ক ও পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। কিয়ামতের দিন বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী বা ছেলে-মেয়েকে ছাড়াই প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিগত কৃতকর্ম অনুযায়ী পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে।

news24bd.tv এসএম