সদ্যবিদায়ী দু'জন সম্মানিত সহকর্মীর
সদ্যবিদায়ী দু'জন সম্মানিত সহকর্মীর

সদ্যবিদায়ী দু'জন সম্মানিত সহকর্মীর

Other

নোয়াখালী বিচারবিভাগ থেকে আমার দু'জন সম্মানিত সহকর্মী গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছেন। একজন নোয়াখালী চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সম্মানিত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উৎপল চৌধুরী স্যার। অপরজন নোয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ল্যাণ্ড সার্ভে ট্রাইবুনালের সম্মানিত বিচারক জনাব মো. নোমান মঈন উদ্দীন স্যার। সম্মানিত সিজেএম স্যার বদলি হয়ে ২য় কোর্ট অব সেটেলমেন্টের সদস্য হিসেবে পদায়িত হয়েছেন।

অপরদিকে মো. নোমান মঈন উদ্দীন স্যার হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন।

দু'জনের জন্যই এ ঘটনা আনন্দদায়ক। সিজেএম স্যার আমারই মত পরিবার থেকে দূরে এতদিন কাজ করেছেন। সপ্তাহান্তে ঢাকার বাস ধরা আর শনিবার রাত জেগে বাসে করে এসে রোববার অফিস করার কষ্ট থেকে তিনি বেঁচে গেছেন। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান নিয়ে সকালের নাস্তা ও রাতের ভাত খাওয়ার যে আনন্দ তিনি কাল থেকে উপভোগ করবেন তা ভেবে ভালো লাগছে ভীষণ। স্যারের জন্য শুভকামনাও বটে। এ লেখা যখন লিখতে শুরু করেছি তখন স্যার ঢাকার পথে। পেছনে ফেলে গেছেন নোয়াখালীর বহু স্মৃতি। আমার মত এক অভাজনকেও স্মৃতিকাতর করে গেছেন তিনি।

স্যারকে নিয়ে লিখতে গেলে কয়েকটি ঘটনা স্মরণ করা আবশ্যক।

১. নোয়াখালীর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের উদ্বোধন করা হয় দশই অক্টোবর, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে। ঐ অনুষ্ঠানে আমার দায়িত্ব ছিল মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় ও সচিব স্যার যখন নামফলক উন্মোচন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন তখন তাদের সাথে হেঁটে হেঁটে মাইক্রোফোন নিয়ে উপস্থাপকের কাজ চালাবো। মূল অনুষ্ঠানের সম্মানিত উপস্থাপকদের সাথে আমার মাইক্রোফোনে যোগাযোগ থাকবে। যেহেতু মূল মঞ্চ ও নামফলকের জায়গা আলাদা তাই উভয়স্থানের মাইক্রোফোন সংযোগ নিয়ে আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম। আগেরদিন রাতে মাইক্রোফোন ও সাউন্ডবক্স ঠিক করার লোক আসলে আমি তাদের নিয়ে ট্রায়াল দিই। এসব করতে করতে রাত দেড়টা বেজে যায়। অতরাতে কাজ শেষে বাসায় যাওয়ার সময় দেখি স্যার আমাকে বলছেন, চলো আমার সাথে ভাত খাবা। আমি বললাম, স্যার আমি একবার রাত দশটায় খেয়েছি তো! তিনি আমাকে তবু জোর করে নিয়ে এলেন। দু'জন মিলে স্যারের একজনের খাবার একসাথে বসে খেলাম। স্যার, এরপর আপনার সাথে বসে অনেকদিন খেয়েছি কিন্তু সে রাতের স্মৃতি ভুলি কী করে! 

২. স্যার আমার মত এক সাধারণ মানুষের লেখা পড়তেন। ভীষণ অনুপ্রেরণা দিতেন। আমার গল্পগ্রন্থ  ও বিচারকদের নিয়ে লেখা বই "কিংবদন্তি বিচারকদের যাপিত জীবন" পড়ে ভালোবাসাসহ মত জানিয়েছেন। তিন চারদিন আগেও আমার উপন্যাস কবে বের হবে জানতে চেয়েছেন। বহু বিচারক আছেন যারা বিচারকাজ ছাড়া অন্য কোন কাজে উৎসাহ দেন না। সিজেএম জনাব উৎপল চৌধুরী স্যার জীবন ও জীবিকাকে আলাদা করতে পারতেন। যা আমাদের পেশায় বিরলতমই বটে।

৩. বাঙ্গালি জাতি সাধারণত অন্যের প্রশংসা করে না। সামনাসামনি প্রশংসা করলেও পেছনে করে গীবত। স্যার সে জায়গায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আমার সহকর্মী নবনীতা গুহ দিদি সর্বশেষ জুডিসিয়াল কনফারেন্সে পিতার মৃত্যুজনিত কারণে উপস্থিত থাকতে না পারলেও স্যার সবার সামনে পরিসংখ্যান ধরে দিদির কাজের যে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তাতে স্যারকে আমার অত্যন্ত ব্যতিক্রমী মানুষ বলেই মনে হয়েছে।

৪. স্যারের সারল্য। তিনি প্রত্যেক সহকর্মীকে সরলভাবে স্নেহ করতেন। আমি সহকারী জজ আর স্যার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। স্যারের সরাসরি অধীনে আমি কাজ না করলেও তার সারল্য আমাকে প্রবলভাবে মুগ্ধ করেছে।  

স্যারকে নিয়ে যাই লিখব তাতেই মনে হবে কম লিখছি। এ মুহুর্তে যেগুলো মনে পড়ল তাই লিখলাম।  

পদোন্নতিজনিত কারণে হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে যোগদান করতে গতকালই বিদায় নিলেন জনাব মো .নোমান মঈন উদ্দীন স্যার।

তাকে নিয়ে লিখতে গেলেও কিছু ঘটনা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।  

১. এ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার অফিস শেষে চাটগাঁয় যেতে আমি জোনাকি পরিবহনে উঠি। সীতাকুণ্ডে নামাজের বিরতি দিলে নামাজ পড়ে বাসে ওঠার আগে দেখি স্যার মসজিদের কবরস্থানের পাশে একটু দাঁড়ালেন। আমাকে বললেন, শরীফ জীবন নিয়ে বেশি ভাববা না। আর কারো প্রতি কখনো জুলুম করবা না। আমি চেষ্টা করি না করতে। কারণ এই যে কবরে যারা শুয়ে আছে তারাও একসময় তোমার, আমার মত হাঁটতো। এখন কবরে। একদিন আমরাও থাকব না। আমাদের না থাকার কথা স্মরণ করবা। দেখবা জীবনে কোন চাওয়া পাওয়াই তোমাকে বেশি স্পর্শ করতে পারবে না।

২. স্যার আমার উপস্থাপনা খুব পছন্দ করতেন। উনি আমার উপস্থাপনাকে একজন কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানের ব্যাটিংয়ের সাথে তুলনা করেছিলেন। এত অসম তুলনা করেছেন যে সে ব্যাটসম্যানের নাম বলাও আমার জন্য ভয়ের। আমি এটা আমার প্রতি স্যারের স্নেহ হিসেবেই ধরে নিলাম।

৩. স্যার আমাদের কাজ করতে খুব উৎসাহ দিতেন। প্রায়ই বলতেন "তোমার প্রশংসা শুনলাম। " আসলে এটা তিনি ইচ্ছে করে আমাদের পর্যায়ের প্রায় সব সহকর্মীকে বলতেন। তিনি উৎসাহ দিয়ে আমাদের সেরাটা বের করে আনতে চাইতেন।

৪. স্যার আমার লেখালেখি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন আমি যেন ইসলাম নিয়ে লিখি। আমি বলেছিলাম " স্যার প্রচুর পড়তে হবে। পড়ে লিখব ইনশাআল্লাহ। " পরে ইসলাম নিয়ে দুটো লেখা আমি লিখেছিলাম। আমি এখনো পড়ছি। ইনশাআল্লাহ ইসলাম নিয়ে বড় কিছু লিখতে পারলে তার পেছনের কৃতিত্ব নোমান স্যারেরই।

আমি নোয়াখালী থেকে আমার যেসব সহকর্মী চলে গেছেন তাদের প্রায় প্রত্যেককে নিয়েই লিখেছি। তারা যেদিন চলে যান আমি সেদিনই লিখি। কারণ আমি চাই না কেউ ভাবুক আমি তাদের কাছ থেকে সুবিধা নিতে লিখছি। আমি কেমন মানুষ এটা যারা আমাকে চেনেন তারা জানেন। আমি জানি এ সমাজ স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। আমার সহকর্মীদের শ্রদ্ধা জানাতে আমার এ উদ্যোগ।

দু'জন অসাধারণ ভালো মানুষের জন্য শ্রদ্ধা। আল্লাহ তাদের আগামীর পথ সুগম করে দিক। তাঁদের সাথে বারবার চাকুরি করার সুযোগ যেন পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ করে দেন।  

কাজী শরীফ 
সহকারী জজ, নোয়াখালী।

আরও পড়ুন:


টানা ১০ জয়ের পর ড্র করল ব্রাজিল

রোনালদোদের বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম

মগবাজারে বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শনে যাবে তদন্ত কমিটি

মগবাজারে বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৪ ভবন, তিন বাস


news24bd.tv / কামরুল 

;