হয়রানি থেকে বাঁচতে তারা গাড়ি কিনতে বাধ্য হয়

গুলজার হোসেন উজ্জল

হয়রানি থেকে বাঁচতে তারা গাড়ি কিনতে বাধ্য হয়

একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে সরকারের উচিত সবার আগে সেবাখাতের কর্মচারীদের বিনা সুদে গাড়ির ঋণ ও বিনা শুল্কে গাড়ি কেনার সুযোগ প্রদান করা।

প্রতিটা হাসপাতালে দশটি বড় যাত্রীবাহী বাস থাকলে প্রায় সমস্ত কর্মচারীকে সার্ভিস দেওয়া সম্ভব। ব্যাংক বা এরকম জরুরি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান চাইলেই তাদের কর্মচারীদের জন্য স্টাফ বাসের ব্যবস্থা করতে পারে। 

শুধু দরকার এই মাইন্ড সেটিংটা যে আমাদের এমপ্লয়ীদের আমরা কমফোর্ট দেবো। প্রয়োজনে কর্মচারীরা ট্রান্সপোর্ট বাবদ মাসে একটা টাকা অফিসে জমা দেবে। 

প্রতিটা প্রতিষ্ঠান তাদের শ কোটি টাকা বিনিয়োগের সাথে এটিকেও বিনিয়োগ হিসেবে ভাবলেই চলে। শুধু লকডাউন না অন্যান্য সময়েও এই সার্ভিস কর্মকর্তা কর্মচারীদের যাতায়াতকে সহজ করবে। ঢাকা শহরে আজকাল মধ্যবিত্তরাও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছে। আসলে বাধ্য হচ্ছে। আগে এই বাড়তি বোঝাটা ছিল না। এখন পথের হয়রানি থেকে বাঁচতে তারা গাড়ি কিনতে বাধ্য হয়।  

প্রতিষ্ঠানগুলো স্টাফ বাস এনশিউর করলে ব্যক্তিগত গাড়ির ঝামেলা থেকে অনেকেই রক্ষা পাবে। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের হয়রানি থেকেও মুক্তিলাভ হবে। রাস্তার জ্যামও অনেকখানি কমে যাবে।

news24bd.tv নাজিম

পরবর্তী খবর

ইভ্যালী-পঞ্জি স্কীমস: কই এর তেলে তিমি ভাজা!

ডা. আমিনুল ইসলাম

ইভ্যালী-পঞ্জি স্কীমস: কই এর তেলে তিমি ভাজা!

ইভ্যালীর রাসেল দম্পতি যা করেছে ঠিক ১০০ বছর আগে সেটি প্রথম করে দেখিয়েছিল Charles Ponzi নামের এক প্রতারক।

১৯২০ সালে নিউ-ইংল্যান্ডে ৯০ দিনের মধ্যে ফোরটি পার্সেন্ট রিটার্নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসা শুরু করে Ponzi যখন পারিপার্শ্বিক সুদের হার ছিল 5% মাত্র। 

তারপর পঞ্জির বিরাট বিত্ত-বৈভব, জেলখাটাসহ আরও অনেক ইতিহাস। সেদিকে যাচ্ছি না। Ponzi র মতো করে যে প্রতারণা ব্যবসা মডেল দাঁড় করানো হয় তাকে বলে Ponzi scheme। ইভেলি ভিন্ন চেহারায় প্রায় হুবহু সেই পঞ্জি স্কিম প্রতারনাটা নকল করেছে।

সোজা বাংলায় পঞ্জি স্কীমস একটা পিরামিড আকৃতির ফন্দি যার মূল মন্ত্র হলো Robbing Peter to pay Paul অর্থাৎ পিটারের টা চুরি করে পল কে pay করা। প্রতারক প্রমোটররা যদি প্রথমদিকের বিনিয়োগকারীদের বিরাট লাভ দিয়ে চমক সৃষ্টি করে তাতে আকৃষ্ট পরের দিকের ইনভেস্টরদের টাকা মেরে দেয় তবে তা পঞ্জি স্ক্যাম এর আওতায় পড়ে। তাদের কোন টেকসই বিজনেস মডেল থাকে না, নিজেদের কোনো বৈধ বা যুক্তিসঙ্গত প্রফিটও থাকে না। তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে নতুন নতুন বিনিয়োগকারীদের প্রবাহমান টাকার উপর। সেই টাকার প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে পুরো চিটিং process টাই কলাপ্স হয়ে যায় কারণ তাদের নিজেদের কিছু থাকে না।

প্রতারক প্রোমোটারদের ধূর্ততা ও কৌশলের উপর পঞ্জি স্কীম ভিন্ন ভিন্ন ধারা ও চেহারার হতে পারে। তবে প্রত্যেকেরই মূল মোক্ষ শুরুর দিকের বিনিয়োগকারীদের একটা বড় অংকের লাভ দিয়ে কৌশল ও ছলচাতুরি করে পরের বিনিয়োগকারীদের বিরাট অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া। লাভ দেখে বিরাট জনগোষ্ঠী বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসে। যদি ছলা-কলা করে পরবর্তী বিনিয়োগকারীদের প্রতি অঙ্গীকার রক্ষা না করে তখন তার প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস পুঞ্জিভূত হতে থাকে। 

দুঃখজনকভাবে অনেকে ধরা খেলেও চুপ থাকে এজন্য যে কোম্পানির ক্ষতি হলে তার টাকা ফেরত পাবার বাকি আশাটুকুও আর থাকবে না। এর ফলে আরও বেশি দিন প্রতারক প্রমোটররা তার ধূর্ততা চালিয়ে যেতে পারে। লোকজন তাকে বোকা ও লোভী ভাববে এ জন্য অনেকে ফুঁসে উঠতে বিলম্ব করে। কেউ কেউ লজ্জায় একেবারেই চেপে যায়। অনেকেই বিনিয়োগ ফিরে পাবার ক্ষুদ্রতম আশার উপর ভিত্তি করে বরং প্রতারকের জন্য শুভকামনা বজায় রেখে প্রতারকের পক্ষে নেয় যাতে কোম্পানি টাকা শোধ করার সক্ষমতা অর্জন করে। এ-সবই পঞ্জি স্ক্যাম এর বৈশিষ্ট্যাবলী (Universal criteria) আপনি যখন কোথাও টাকা খাটাবেন তখন যে ব্যাপারগুলি মাথায় রাখবেন তার একটা ছোট বর্ণনা দিচ্ছি। 

আরও পড়ুন:


অবশেষে ব্রিটেনের লাল তালিকা থেকে বাদ পড়ছে বাংলাদেশ

বেড়াতে গিয়ে অতিরিক্ত মদ পানে দুই ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু

ছাত্রকে যৌন হয়রানি ২৭ বছরের তরুণীর, ২০ বছরের কারাদণ্ড

ইভ্যালির সঙ্গে আর সম্পর্ক নেই তাহসানের


১. অস্বাভাবিক মাত্রার লাভ, ছাড় বা রিটার্নের ঘোষণা পঞ্জি স্ক্যাম এর সবচেয়ে সুস্পষ্ট লক্ষণ।

চেহারা যাই হোক অন্য যে কোন ব্যবসার তুলনায় তারা আপনাকে বেশি লাভ বা ছাড় দিবে- এব্যাপারটা থাকবেই। "অতি লাভ বিপদজনক" কোথাও বিনিয়োগের আগে সেটা আপনাকে মন্ত্র হিসাবে মেনে নিতে হবে। সুষ্ঠু বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শত্রু আপনার লোভ। প্রতারকদের পক্ষে আপনাকে ঠকানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্রও আপনার লোভ। (শেয়ার মার্কেট দ্রষ্টব্য)

২. আপনার মনের গভীরে প্রোথিত লোভকে উস্কে দেওয়ার দারুন টেকনিক হলো লাভের গ্যারান্টি দেয়া। শতভাগ লাভ হবেই একেবারেই ফুল গ্যারান্টি, নো রিস্ক, এমন অঙ্গীকার যারা করবে খুব সম্ভবত তারা ফ্রড।

৩. পতনের আগ পর্যন্ত কোন ব্যবসা যদি স্বাভাবিক বেগ বা সময়ে সময়ে মন্থরতার পরিবর্তে ত্বরণের উপর থাকে তথা খুব দ্রুত বর্ধনশীল হয়, পরের দিন পরের সপ্তাহ আগের দিন আগের সপ্তাহকে ছাড়িয়ে যেতেই থাকে তবে ধরে নিবেন ঘাপলা ইজ দেয়ার। সবাইকে হুমড়ি খেয়ে পড়ানোর এটা একটা ট্র্যাপ।

বাজার পরিস্থিতি, নিজেদের সক্ষমতা যাই হোক তারা যদি আপনাকে লাভের অফার দিতেই থাকে, দৌড় দিন- একেবারে পেছনের দিকে মুখ ফিরিয়ে।

৪. পাচ মিনিট চিন্তা করে আপনি যদি তাদের বিজনেসটা কিভাবে বা কোন মডেলের উপর চলছে বা চলবে তার কূল-কিনারা করতে না পারেন- একে গুডবাই বলুন। বিজনেস মডেলটা বুঝতে যদি বেগ পেতে হয় লাভের টাকাটা কোথায় জেনারেট হচ্ছে সেটা যদি আপনার কাছে পরিস্কার না হয় আপনি ভুলেও তার কাছে ঘেষবেন না।

৫. প্রতারক প্রমোটররা নানাবিধ জটিল মোহনীয় চাতুর্যপূর্ণ শব্দ ও বাক্য দ্বারা আপনাকে আবিষ্ট করতে নটরিয়াসলি চতুর। যেমন offshore investment program, Future Amazon, From loss to global brand, high yield investment, তারুন্যের ঝুঁকি- এসব বাক্যবাণে তারা আপনাকে মোহাবিষ্ট করে ফেলবে। তারা অন্যসব বড় ব্যবসা কিভাবে দাঁড়িয়েছে তার উদাহরণ দেবে মিথ্যা তথ্য সমেত। যাদুবিদ্যার মতো আড়ালে বড় কিছু হচ্ছে এমন একটা ইলুশান ও কনফিউশনে সবাইকে মজিয়ে রাখবে আসলে কিন্তু ভেতরে কিছুই হচ্ছে না। শুধু কই এর তেলে কই ভাজা হচ্ছে। এই smoke & mirror পঞ্জি প্রতারকদের অন্যতম টেকনিক। এ জন্য ওয়ারেন বাফেট বলেছিলেন, never invest in a business you can not understand (যে ব্যবসাটা তুমি বুঝতে পারছো না সেখানে বিনিয়োগ করিও না)।

৬. এই পঞ্জি স্ক্যাম এর টিকে থাকার প্রাণভোমরা হলো নতুন নতুন বিনিয়োগকারী। এজন্য তাদেরকে আকৃষ্ট করতে প্রয়োজন হয় নতুন নতুন ধামাকা অফার। নতুন বিনিয়োগকারী না আসলে এই প্রতারকরা পুরাতন বিনিয়োগকারীদের দায় শোধ করতে পারে না। অবশ্য দায় শোধ করাটা প্রতারকদের উদ্দেশ্যও নয়। একেবারে প্রথম পর্বের বিনিয়োগকারীদের লাভালাভের উদাহরণকে পুঁজি করে পরবর্তীদের যত বেশি সম্ভব বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করে যত বেশি সম্ভব টাকা মেরে দেয়া যায়- এটাই পঞ্জি মডেল বিজনেস। যদি এক পর্যায়ে আপনাকে নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজে দেয়ার শর্ত দেয়া হয় বা নতুন বিনিয়োগকারী জুটিয়ে দিতে পারলে পুরষ্কার দেয়া হবে বলা হয় বা আপনাকে পুনরায় বিনিয়োগ করলে আগের চেয়ে বেশি লাভ দেওয়া হবে এমন অফার দেয়া হয়- আপনি জাস্ট অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নের চেয়েও বেশি গতিতে দৌড় দিবেন।

৭. প্রতারক প্রমোটাররা যদি কোন কৃত্রিম urgency  তৈরি করে, Once in a life time, আর মাত্র দু'দিন, রাত বারোটায় সুযোগ শেষ- এরকম তড়িঘড়ি আবহ তৈরি করে তবে ধরে নিবেন এটি সুস্থ প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। একে বিবেচনা করুন red flag হিসাবে।

৮. পঞ্জি স্কীমস প্রতারকরা মূল পদগুলিতে তাদের ক্লোজ সার্কেল ও পরিবারের সদস্যদেরকে রাখে। দেখা যাবে ঘুরেফিরে নিজেরা নিজেরাই। এতে তারা নির্ভয় থাকে এবং ভাগাভাগিটা নিজেদের মধ্যেই হয়। শিয়াল কখনো নিজের ঢেড়ায় শিকার করেনা, চোর কখনো নিজের ঘরে চুরি করে না- এ হলো তাদের নিরাপত্তা কৌশল।

৯. তাদের আরেকটা পাওয়ারফুল সাইকোলজিক ট্যাকটিক হল সমাজের গণ্যমান্য, সেলিব্রিটি, নামকরা লোক ও লেখকদের সাথে এসোসিয়েশন বা জোটবদ্ধতা দেখানো। এতে করে তাদের গ্রহণযোগ্যতা, ক্রেডিবিলিটি বাড়ে, স্বল্পবুদ্ধির লোকদেরকে সহজেই সেলিব্রেটির ইমেজের ফাঁদে ফেলানো যায়। পঞ্জি মডেল স্কিমে বাংলাদেশের বাইরেও দেখা গেছে কোন গণ্যমান্য ব্যক্তি যদি বাহিরে ভালো ভেতরে অসৎ হন তবে তার ইমেজ fraud দের ফেভারে কাজে লাগাতে দেন। বিনিময়ে fraud দের কাছ থেকে আর্থিক ভাবে লাভবান হন। একে বলে win-win সিচুয়েশন, ধরা খাবে শুধু পাবলিক। যেমন ইভ্যালির পক্ষে কথা বলা তাহসান, এহসান গ্রুপের পক্ষে ওয়াজ করা হেলিকপ্টার হুজুর ইত্যাদি।

১০. একশত বছর পিছিয়ে থাকার কারণে পঞ্জি যে কাজটা করতে পারে নাই বা পঞ্জি স্কীমস বাংলাদেশের বাইরে যে ব্যাপারটা চোখে পড়ে নাই অথচ ইভেলি করে দেখিয়েছে তা হল হাজার হাজার ফেইক ফেসবুক আইডি খুলে "আমি লাভবান" প্রচার করে অন্যদের আকৃষ্ট করা ও কোন প্রতিবাদকারীর উপর অনলাইনে দলেবলে হামলে পড়া। একজন ক্ষতিগ্রস্থের কমেন্ট এর বিপরীতে যদি দশজন ফেইক ফেসবুক ইউটিউব আইডি "কই আমিতো লাভবান হলাম" প্রচার করে তাহলে মূল সত্যটা চাপা পড়তে বাধ্য। এ কাজটা ইভেলি মারাত্মক সফলতার সাথে করেছে। আমি বিশ্বের যতগুলি পঞ্জি স্ক্যাম এর উপর টুকটাক পড়েছি তার কোথাও এই টেকনিকটা চোখে পড়ে নাই। এটা পঞ্জি স্কীমে নতুন সংযোজন।

১১. পঞ্জি স্কীমে বাংলাদেশ আরেকটা নতুন ব্যাপার সংযোজন করতে পেরেছে তা হল মাওলানার ওয়াজ এর মাধ্যমে মুনাফিকির ভয় দেখিয়ে বিনিয়োগ বাড়বাড়ন্ত করা। দেশ বলদে ভর্তি বলেই শুধুমাত্র বাংলাদেশের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে পঞ্জি স্কীমে এই ইউনিক ব্যাপারটি সংযোজন করা।

আসলে হঠাৎ বড়লোক, বিরাট লাভবান করে দেওয়ার যে হাতছানি সেটা সবসময়ই প্রতারকদের হাত। আমাদেরকে সত্যিকারের কিছু পেতে হলে মাথা ও শ্রম খাটিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তবেই তা পাবার আশা করতে হবে। তা না হলে কিছুদিন পরপর ডেসটিনি, শেয়ার মার্কেট, যুবক, ইউনিপে, ইঅরেঞ্জ, এহসান গ্রুপ, ইভ্যালি এসব প্রতারক চক্র নানা নামে, নানা চেহারায়, নানা বেশে এসে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে যাবে।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

NEWS24.TV / কামরুল

পরবর্তী খবর

বিয়ের সঙ্গে অর্গানাইজ হওয়ার সম্পর্ক কী?

আনোয়ার সাদী

বিয়ের সঙ্গে অর্গানাইজ হওয়ার সম্পর্ক কী?

অর্গানাইজ শব্দের অর্থ সংগঠিত হওয়া। সেজদা যখন আমাকে বললেন অর্গানাইজ হ, তখন আমি জীবনের সঙ্গে এর অর্থ মেলাতে পারি নাই। সেটা অনেক দিন আগের কথা। অনেক দিন মানে বিয়ের আগের কথা। তিনি বলছিলেন, বিয়েটা করতে হবে, তোকে এখন অর্গানাইজ হতে হবে। বিয়ের সঙ্গে অর্গানাইজ হওয়ার সম্পর্ক কী তা অনেক ভেবে বের করতে না পেরে, আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, অর্গানাইজ কীভাবে হওয়া যায়? 

তিনি বললেন, নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে হবে। বিয়ের পর সংসারের জন্য ওভেন, ফ্রিজ এসব লাগবে। এগুলো ধীরে ধীরে গুছিয়ে নে। আমি পরদিন বিকেলে মার্কেটে গিয়ে ক্রেডিট কার্ডে ফ্রিজ, ওভেন কিনে ফেললাম। মানে অর্গানাইজ হয়ে গেলাম। সেজদা প্রবাসী হওয়ায় আমার বিয়েতে থাকতে পারলেন না, তবে সেই ঘটনা থেকে একটা শিক্ষা সব সময় নিজের সঙ্গে নিয়ে চলছি। সেটা হলো, শব্দের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক মিলিয়ে দেখা। 

যাহোক, এখন সময়টা অন্যরকম। সবাই সবকিছু চট করে বুঝে নেয়। ঠিকঠাক অর্থটা ধরা গেলো কী না তা পরীক্ষা করা হয়তো অনেকের হয়ে উঠে না। ফলে, অনেক কাজ শেষ হয় না। সাফল্যও আসে না কারো কারো। 

ফোকাস বা ঠিক বিষয়টি বুঝে সে অনুযায়ী কাজ করার কৌশল রপ্ত করাই আমার আজকের লেখার বিষয়। এই বিষয়টি ক্লাসে সারাংশ শেখানোর নামে আমাদের মাথায় ছোটবেলায় দিয়ে দেওয়া হয়। একটা প্যারাগ্রাফ পড়ে মুল কথাটি দুয়েকলাইনে বলতে পারার নাম সারাংশ। জীবনের সারাংশ বোঝার চেয়ে কারো কথার সারাংশ বুঝতে পারা কম কথা নয়।


আমির খানের পিকে ছবির শেষ দৃশ্যে যখন এলিয়েনরা আবারো পৃথিবীতে আসে, তখন তাদের গবেষণার বিষয় থাকে, মানুষের এক কথার আরেক অর্থ করার প্রবণতা। এই যেমন, কেউ যদি বলে তিনি  চিকেন পছন্দ করেন তার মানে হলো, তিনি মুরগি খেতে চান, নিজের কাছে সাজিয়ে রাখতে চান না। কারো বউ যদি বলে, ঠিক আছে বাসায় আসেন কথা হবে। তার মানে সামনে ভয়াবহ বিপদ ইত্যাদি। আমি এমন একাধিক অর্থবহন করে এমন বাক্য বা শব্দমালা নিয়ে কথা বলছি না। বলছি, স্পষ্ট একটা বর্ণনা পড়ে কেউ যেনো তার সঠিক অর্থটা বুঝতে পারে তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। 

যাহোক, বুঝতে পারার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমার কাজ নয়। আমি বলতে চাই, কেউ যদি কিছু বুঝতে চায় তাহলে তাকে কারো কথা মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে, কারো লেখা মনযোগ দিয়ে পড়তে হবে। ধরা যাক, বৃষ্টি কীভাবে হয়, কারণ ও উপায় বিশ্লেষন করে কেউ একটা আর্টিকেল লিখলো বা ফেইসবুকে পোস্ট দিলো। তা পড়ে কেউ যদি কমেন্ট করে, তুমি ইদানিং বৃষ্টি নিয়ে অনেক ভাবছো, আগে এরকম ছিলে না, তাহলে ধরে নিতে হবে, পাঠক নিতান্ত অবহেলায় লেখাটি পড়েছেন, কিংবা একবারেই পড়েন নাই। 

লং স্টোরি শর্ট করি, যে প্রশ্নের জবাব শব্দ দিয়ে দেওয়া যায় তা বাক্য দিয়ে দেওয়া মানে ঘটনা বুঝতে না পারা। যে প্রশ্নের জবাব বাক্য দিয়ে দেওয়া যায় তা প্যারাগ্রাফ দিয়ে দেওয়া মানে প্রশ্ন ঠিক মতো বুঝতে না পারা। যে প্রশ্নের জবাব প্যারাগ্রাফ দিয়ে দেওয়া যায়, তার জবাব রচনা দিয়ে দেওয়া মানে, প্রশ্ন বুঝতে না পারা। 

আরও পড়ুন


আশ্রয়ণ প্রকল্প: এটা তো দুর্নীতির জন্য হয়নি, এটা কারা করলো?

আগের স্ত্রীকে তালাক না দিয়েই মাহিকে বিয়ে করেছে রাকিব

আমরা কখনো জানতামও না যে এই সম্পদ আমাদেরই ছিলো

নাশকতার মামলায় নওগাঁর পৌর মেয়র সনিসহ বিএনপির ৩ নেতা কারাগারে


 

 একটা ঘটনা বলে লেখা শেষ করি। এক সময় ঢাকায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ছিলেন আনোয়ার চৌধুরী। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত বলে বাংলায় কথা বলতে পারতেন। তিনি পরে সম্ভবত ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম আই সিক্স এর পরিচালক হয়েছিলেন। একবার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে অন্য সাংবাদিকদের মতো তাঁর সঙ্গে আমারও দেখা হয়েছিলো। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, কেউ যদি কোনো বিষয় এক পৃষ্ঠায় লিখে শেষ করতে না পারেন, তাহলে জনাব আনোয়ার চৌধুরী ধরে নেন, লেখক বিষয়টি ঠিকঠাক বুঝতে পারেন নি। 

সো, ভাই ও বোনলোক আগে বুঝেন সামনের লোকটি কী জানতে চায়, তারপর আপনার জ্ঞানের সাগরটি উপস্থাপন করুন। আজ এখানেই শেষ। সঙ্গেই থাকুন।

লেখাটি নিউজ টোয়েন্টিফোর টিভির সিনিয়র নিউজ এডিটর, আনোয়ার সাদী-এর ফেসবুক থেকে নেওয়া। 

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

সত্যিই কি আমরা আমাদের সন্তানকে ভালবাসি?

ড. নাজনীন আহমেদ

সত্যিই কি আমরা আমাদের সন্তানকে ভালবাসি?

আমরা প্রায়ই বলি, সন্তানকে আমরা সবচেয়ে ভালোবাসি। কেউ কেউ জীবনের সর্বস্ব দিয়ে সুন্দর একটা ফ্ল্যাট কিনে বলি সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য করছি। কিন্তু সত্যিই কি আমরা আমাদের সন্তানকে ভালবাসি? যদি তাই বাসতাম তাহলে সবচেয়ে প্রথম আমরা যা করতাম তা হল, খাল-বিল, নদী- জলাশয়, আকাশ-বাতাস অর্থাৎ প্রকৃতির সম্পদ ও শক্তি নিজেরা ধ্বংস না করে সন্তান যেন তার জীবনে এই প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্ন স্বাস্থ্যকর সম্পদের ব্যবহারের সুযোগ পায়, সেই চেষ্টা করতাম।

আমাদের জীবদ্দশায় এগুলো ধ্বংস করে ওদের জন্য বিভীষিকাময় এক ভবিষ্যৎ রেখে যেতাম না ।

সন্তানকে ভালবাসলে প্রতিদিন হাড়ি-পাতিল-কাপড় ধোয়া, গোসল করা ইত্যাদির সময় পানির ব্যবহারে যাতে অপচয় না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক হতাম;  অহেতুক বিদ্যুতের ব্যবহার করতাম না; সামান্য গরমে এসি না চালিয়ে ভাবতাম আমার সন্তানের জন্য পরিবেশকে এরূপ দূষণ করা থেকে বিরত থাকলাম। 

সন্তানকে যদি সত্যিই ভালোবাসি তাহলে আসুন, পরিবেশের কথা ভাবি, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার কথা ভাবি। যারা ধনী আছেন তারা আগামী ১৪ পুরুষের জন্য অর্থ সঞ্চিত না রেখে ধরিত্রীকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য গবেষণায় দান করলে সত্যিকার অর্থেই পরবর্তী প্রজন্ম ভালো থাকবে। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের দায়িত্ব আছে । গৃহ থেকেই শুরু হোক সেই পদক্ষেপগুলো।

লেখক-  ইউএনডিপি বাংলাদেশের ইকোনমিস্ট ড. নাজনীন আহমেদ।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

পড়ার ঘাটতি কী সত্যিই কটিয়ে ওঠা যায়?

আনোয়ার সাদী

পড়ার ঘাটতি কী সত্যিই কটিয়ে ওঠা যায়?

কোনো এক বৃষ্টিমুখর দিনে রুকন ক্লাসমেট থেকে বড় ভাই হয়ে গিয়েছিলো। অটো প্রমোশন নিয়ে সে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে যায়। আমরা একই ক্লাসের অন্যরা ফাইভ থেকে সিক্সে ভর্তি হই। জীবনের নিয়মে জীবিকার দরকার ও হিসাব-নিকাশ হয়তো সে আমাদের আগে বুঝে যায়, তাই অতো বছরের পর বছর না পড়ে, সে আয় করতে শেখে কোনো এক কোম্পানিতে, আমরা থেকে যাই পড়ার জগতে।

পড়ার জগতের একটা ধারাবহিকতা আছে। প্রথম শ্রেণির পড়ার ওপর ভর করে আমরা দ্বিতীয় শ্রেণিতে যাই। ফলে, প্রথম শ্রেণির সব পড়া আয়ত্বে না এলে দাঁড়ানো হয় টলমল পায়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান যাকে সারা জীবনের ক্ষতি মনে করেন।

তিনি মনে করেন, একটা ক্লাস না পড়লে, মানে সে ক্লাসের পড়া ঠিক মতো আয়ত্বে না এলে পরের ক্লাসের পড়ারও ভিত্তি থাকে না। রোকনের সে সমস্যা হয়েছিলো কী না, আমি জানি না। এতো বছর পর এখন আর তা জানার কোনো সুযোগ নাই। তবে করোনায় দীর্ঘ ১৮ মাস স্কুল বন্ধ থাকায় অনেকের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহরের বড় বড় স্কুলগুলোতে অবশ্য সিলেবাস এগিয়েছে ঠিকঠাক মতো। তবে, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একই গতিতে পড়া এগিয়ে নিতে পারেনি বলেই আমরা জানি। ফলে, এখন ক্লাস খোলার পর শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে দেওয়া যাবে তা একটা বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে। আসলেই কী পড়ার ঘাটতি পুষিয়ে দেওয়া যায়?
অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া, ক্লাসের সময় বাড়িয়ে দেওয়াকে সাধারণত ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু আমাদের সিলেবাস এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীকে প্রতিদিনই কিছু না কিছু পড়তে হয়। ভালো ফলাফলের রহস্যও লুকিয়ে আছে প্রতিদিন পড়ার ভেতরেই।

আচ্ছা, আপনাদের ক্লাসে রুল এক হতো কার? সাধারণত কোন শিক্ষকের ছেলে বা মেয়ে ক্লাসে প্রথম হতো, এটা আমাদের সময়ের হিসাব। আমরা অনেক চেষ্টা করে কোনো কোনো ক্লাসে শিক্ষকদের ছেলে মেয়েদেরকে পড়ায় হারিয়ে প্রথম হয়ে যেতাম। তখন আমাদের মনে হতো, স্যারের ছেলে-মেয়েকে ইচ্ছে করে প্রথম বানানো হয়। অনেক অভিমান হতো আমাদের। পরে জেনেছি, বিষয়টা আসলে এরকম কিছু না। স্যারদের বাসায় ছেলে-মেয়েরা প্রতিদিন নিয়ম করে পড়তে বসে। স্যারের কাছে পড়তে আসা ব্যাচের সঙ্গেও তাদের ছেলে মেয়েরা বসে যায়। ফলে, পড়ার জগতে তাদের একটা ভালো অবস্থান থাকে। মফস্বল থেকে আসা শিক্ষকদের ছেলে-মেয়েদের ক্যারিয়ার গ্রাফ বিবেচনা করলে এই তথ্যের সত্যতা মিলবে।

এখন পড়ার ধারাবাহিকতা যদি না থাকে তাহলে সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়, কঠিন। এখন এর দায়িত্ব নিতে হবে অভিভাবকদের। তাদেরকে প্রতিদিন অন্তত সন্তানের সঙ্গে বই নিয়ে বসতে হবে। ব্যস্ততার এই যুগে এটি অনেকের জন্যই কঠিন। আমরা অভিভাবকরা সন্তানদের সব পড়ার দায়িত্ব শিক্ষকদের ওপর ছেড়ে দিয়ে আরামে নিজের জীবন গড়তে থাকি। এটা ঠিক নয়।

আরও পড়ুন: 


রাসেলের বাসায় র‌্যাবের অভিযান চলছে

স্ত্রী হত্যার অভিযোগ, স্বামী-শ্বশুর পলাতক

চীনে ১০ কি.মি. গভীরতার শক্তিশালী ভূমিকম্পের হানা

দুবলার চর থেকে খুলনা কাঁকড়া পরিবহনে বাধা নেই: হাইকোর্ট


নটরডেম কলেজের ছাত্ররা পড়াটা বোঝে বেশি। এমন একটা কথা আমদের সময়ে চালু ছিলো। বলা হতো, তারা ভর্তি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি টিকে যায়। এর কারণ হিসেবে বন্ধুরা বলতো, সেখানে পুরো বই পড়ানো হয়, পৃষ্ঠা বাই পৃষ্ঠা। আমিও একই কথা বলতে চাই, সাজেশন করে না পড়িয়ে, পুরো বই পড়ানো জীবনের জন্য কাজের হবে।

আপনার নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, যারা টিউশনি করে, তারা পড়ায় ভালো হয়। ঘুরিয়ে বললে, অনেক কীর্তিমানই -- ছাত্র জীবনে টিউশনি করতেন বলে দাবি করেন। এটা কীভাবে মেধা বিকাশে সহযোগিতা করে তা ভাবা দরকার। পড়াতে গিয়ে নিচের ক্লাসের পড়া রিভাইজ হয়ে যায় টিউটরের। ফলে, তার নিজের ভিত্তি শক্ত হয়।

যাহোক, মহামারী কোনো স্বাভাবিক সময় নয়। এই সময়ে বেঁচে ও সুস্থ্য থাকাকেই সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। পুরো জীবনের তুলনায় ১৮ মাস খুব একটা বড় সময় নয়। তবে এই সময়ে কারো পড়ার ঘাটতি হয়ে থাকলেও তা দূর করার জন্য সচেতন হওয়ার দরকার আছে। এই কথাটি অভিভাবকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই এই আর্টিকেল লিখলাম। সবাই ভালো থাকবেন।

আনোয়ার সাদী, সিনিয়র নিউজ এডিটর, নিউজটোয়েন্টিফোর।

(মত-ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv তৌহিদ

পরবর্তী খবর

গুরুত্বপূর্ণ পদ জনপ্রিয় হওয়ার একটি উপায়

মেজর (অব.) রেজা উল করিম

গুরুত্বপূর্ণ পদ জনপ্রিয় হওয়ার একটি উপায়

গত ১০ বছরে ফেসবুক ব্যবহারের কল্যাণে একটা বিষয় পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি-- তা হল, সম্পর্ক গড়ার অন্যতম মাধ্যম কর্ম নয় প্রশংসা। এছাড়াও জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম মাধ্যম ক্ষমতা বা কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকা। বিনয়ের সঙ্গে বলছি, স্যোশাল মিডিয়ায় প্রচলিত এই নীতি আমি অনুসরণ করতে পছন্দ করি না। 

অনেক ঊর্ধ্বতন প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, তাদের কেউ কেউ কখনো খুব ভালো পজিশনে থাকেন আবার কখনো পদচ্যুত হন অথবা বদলি হয়ে অন্যত্র চলে চান। এদের অনেকেই আবারও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন, মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে। 

তারা কি কখনো খেয়াল করেছেন, তারা যখন গুরুত্বপূর্ণ পদ ছেড়ে অন্যত্র বদলি হন পদচ্যুত হন তখন কতজন মানুষ তাদের খোঁজ খবর নেন? ওই প্রভাবশালীরা ফেইসবুকে একটি পোস্ট দিলে প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়। প্রশংসা পাওয়ার সময় তারা কী ভাবেন, মৌমাছিগুলো কোথায় ছিল ? হঠাৎ করে কেন এতো ভালোবাসা ?

বড় কোনো পোস্ট বা ছবি নয়, শুধু "হ্যালো" কথাটি লিখলেও- 
অনেক প্রশংসাবাণী ঝরতে থাকে, যেমন- 
—-‘হলো' বলার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, 
—আপনার অসাধারণ হ্যালোর মধ্যে মধু আছে, 
——আপনাকে স্বাগতম, 
—-আপনি অনেক বড় হৃদয়ের তাই আমাদেরকে হ্যালো বলেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। 
আবার ধরুন, একটা ছবি পোস্ট করা হয়েছে এবং হয়তো তার পাশে তারই স্ত্রী বসে আছে তখন দেখবেন - প্রশংসা করতে যেয়ে অনেকেই বলবে - 

—'বাহ আপনাদেরকে নায়ক নায়িকার মত লাগছে' (এতদিন কিন্তু মনে হয়নি কারণ তিনি এতদিন এই পদে ছিলেন না), 
—আপনাদেরকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে, 
—সেরকম মানিয়েছে, 
—সুন্দর জুটি,
—এমন স্বর্গীয় জুটি কখনো দেখিনি, 
—অদ্ভুত সুন্দর জুটি, 
—বেহেস্ত থেকে জনাব হুর এবং হুর পরী নেমে এসেছেন, 
—খোদার আশীর্বাদপ্রাপ্ত জুটি ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু দুইদিন পরে ওই জায়গা থেকে বদলি হয়ে যখন অন্যত্র যাবেন তখন কিন্তু খোঁজ নেওয়া দূরের কথা তিনি ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলে কেউ ফিরে দেখারও সময় পাবে না, একটি ফোন কলও করবে না, খুঁজে বেড়াবেও না। 

যেমন ধরুন, কোন একজন সাবেক সিনিয়র সচিব (যোগাযোগ, জ্বালানি, স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) তিনি যখন যোগাযোগ থেকে পরিকল্পনা (IMED) মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত হলেন তখন অনেক মানুষ তার সাথে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি যখন যোগাযোগ সচিব তার সাথে সুসম্পর্ক থাকা অবস্থায় দেখা করিনি তবে সেখান থেকে তিনি যখন একটু দুর্বল জায়গায় চলে গেলেন, ভাবলাম তার একটু খোঁজ নেই, হয়তো তিনি কিছুটা হলেও মানসিকভাবে আহত হতে পারেন। খুব ছোট মানুষ হলেও তাকে সাহস করে বলেছিলাম-' ইনশাল্লাহ আপনি আপনার নিজ যোগ্যতায় পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হবেন'। তারপরে অবশ্য তিনি বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে বেশি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ছিলেন।

আমার মনে হয় তখন তার কাছে আমিই সবচেয়ে কম গিয়েছি। আর যারা অতীতে তাঁর খোঁজ নেয়নি তাঁরাই সবচেয়ে বেশি গিয়েছিল।
 
আবার যখন একবার গুঞ্জন ছড়ালো তিনি কোন এক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হবেন তখন অনেক মানুষ তার বাসার সামনে ভিড় জমানো শুরু করলেন। আমি একদিন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে তার গেটের সামনে গিয়ে দেখি অনেক ভিড়, তা দেখে পরে ফিরে চলে আসি। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তিনি চেয়ারম্যান হলেন না তখন আমি আবার গিয়েছিলাম এবং দেখি সে মানুষগুলো কেউ নেই।
 
আরেকটি ঘটনা বলি, কোন একজন প্রভাবশালী জেনারেল, তার নাম বললে আপনারা সবাই চিনবেন, যার কথা মোটামুটি সবাই বলতো যে তিনি হয়তো পরবর্তী সেনাপ্রধান হবেন। আমার সাথে তার সুসম্পর্ক থাকার কারণে তার সাথে অনেক কথা হতো। এমন হয়েছে যে, তিনি একদিন আক্ষেপ করে বলছিলেন- 'দেখো আমি কিছুই জানি না অথচ মানুষ আমাকে অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছে'! তখন আমি তাকে বললাম-'স্যার এরা আজ ঝড়ে বক মারছে-যদি লেগে যায় থিওরির প্রয়োগ, এবং আপনি যদি সেনাপ্রধান না হন তখন দেখবেন এরা কেউ আপনার খোঁজ নিবে না। কিছুদিন আগে অনেকটা মজা করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম- 'স্যার ওই মানুষগুলো কি আপনাকে এখন ফোন করে?'
তিনি উত্তর দিলেন- 'করবে কেন?  আমিতো তা হতে পারিনি। '

আমার অতি প্রিয় একজন অফিসার (মৃত) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ যিনি RAB- এর গোয়েন্দা শাখার প্রধান ছিলেন। তাকে আমি এতোটাই ভালোবাসি যার মৃত্যুর পরও প্রতিটা মুহূর্তে তাকে মনে করি এবং তিনি হচ্ছেন একমাত্র অফিসার যার মৃত্যুর পরে আমি তার জন্য নফল নামাজ আদায় করেছি। তার মৃত্যুর পরে সাতদিন পর্যন্ত আকাশের দিকে চেয়ে নিরবে কেঁদেছি। তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় যারা তাকে প্রশংসায় ভাসাতো বা যারা সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করত তাদের কাউকে দেখিনি কর্নেল আজাদকে নিয়ে একবারের জন্যও স্মৃতিচারণ করতে। 

আমি আরো তিনজন ব্যক্তির কথা এখানে উদাহরণ সহকারে বলি- এক সময় RAB-এর লিগাল মিডিয়া উয়িং এর ডাইরেক্টর Mufti Mahmud Khan ছিলেন এবং গোয়েন্দা শাখার ডারেকটার কর্নেল Mahabub Alam এবং তারপরে সরোয়ার বিন কাসিম ছিলেন এরা তিনজনই অতি চমৎকার অফিসার। আমার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অসম্ভব ভালো ছিল এবং এখনো আছে।
 
কিন্তু তারা যখন উক্ত পদে বহাল ছিলেন তাদের প্রতি মানুষের প্রশংসা দেখে মাঝে মাঝে ভাবতাম আমি কি বোধহয় প্রশংসা না করে অপরাধ করছি!
 
আসলে আমি মনে করি- যদি প্রশংসা করতে হয় তবে সব সময় করব শুধু এখন করবো কেন? কিন্তু দেখেন সেই মানুষগুলোই জায়গা ছেড়ে যখন অন্যত্র চলে গেলেন তখন হয়তো আমার মত অতি অল্প সংখ্যক মানুষ আছেন যারা এখনও নিঃস্বার্থভাবে তাদের খোঁজ নেয়। কিন্তু তাদের সেই সময় কিন্তু প্রশংসা করিনি তবে এখন খোঁজ নেই আর তাছাড়া যারা প্রশংসায় ভাসিয়ে দিতেন তারা কেউ কিন্তু খোঁজ নেয় না।

তবে একটু ব্যতিক্রমও আছে, যেমন- কেউ যদি বর্তমানের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বা পদ পজিশন পেয়ে থাকেন তাহলে কিন্তু উল্টোটাও হতে পারে! আবার কেউ যদি পদ/রাজনীতি থেকে অবসরে যান বা দল থেকে বহিষ্কার হন তাহলে তার নাম মুছে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। 

তাই বলছি, প্রকৃত বন্ধুদেরকে চেনার চেষ্টা করুন। আর যদি চাটুকারদের প্রশংসায় গা ভাসিয়ে দেন একসময় আফসোস করবেন এবং মনোরোগে আক্রান্ত হবেন, নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হবে, হিসাব মেলাতে পারবেন না- আপনার জীবন টাই ক্ষণস্থায়ী, আপনার চেয়ার, পদ,পজিশন তার চেয়েও বেশি ক্ষণস্থায়ী। জীবনের শুরু থেকে অদ্যাবধি সকল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যেসব সৈনিক/কর্মচারী/কর্মকর্তা আমার অধীনে চাকরিরত ছিল বা এখনও যারা আছে তারা জানে আমি কি তাদের পাশে বেশি ছিলাম নাকি সিনিয়রদের বেশি তোষামোদ করার চেষ্টা করতাম। আর তাই তার সুফল এখন ভোগ করছি-বিপদ আপদে অনেক মানুষকেই পাই!

সবাই যা করে আমি তা করবো না- কারণ ছোটবেলা থেকেই আমি স্রোতের বিপরীত দিকে চলতে অভ্যস্ত। আমার মনে আছে ছোটবেলায় যখন আমার সমবয়সী খেলার সাথীদের নিয়ে আড়িয়াল খাঁ নদী তে ঝাঁপ দিতাম তখন অধিকাংশ ছেলেই একটি কলা গাছ নিয়ে স্রোতের অনুকূলে ভাসতে চাইতো আর আমি স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কেটে দেখতে চাইতাম-আমার সাঁতারের জোর বেশি নাকি নদীর স্রোতের শক্তি বেশি? কে কাকে পরাজিত করতে পারে? কখনো নদীর স্রোত কে উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যেতাম আবার কখনো পেছনে চলে যেতাম, তখন একটু রেস্ট নিয়ে আবার চেষ্টা করতাম। এই দক্ষতাটা তখন খুব কাজে লেগেছিল যখন অ্যাডভান্স কমান্ডো কোর্স করতে গিয়েছিলাম। এখনো মনে পড়ে যখন অ্যাডভান্সড কমান্ডো কোর্সের ( ACC-17) সময় 1000 মিটার সুইমিং করি তখন পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন জিয়া স্যার (তৎকালীন মেজর বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার), তার মন মত performance দেখানো অনেক কঠিন কাজ ছিল, তিনি সহজে কাউকে very good বা খুব ভালো হয়েছে বলতেন না কিন্তু সেদিন তার মুখে সেই অমুল্য শব্দ দুটি শুনে ছিলাম। শৈশবের সেই দক্ষতার কারণে খুব সহজেই সেই প্রশিক্ষন পর্বটা শেষ করতে পেরেছিলাম। 

যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ পদ জনপ্রিয়  হওয়ার প্লাটফর্ম হয় তখনই সেখান থেকে ভালো ফল আশা করা যায় না কারন জনপ্রিয়তার আড়ালে তেলবাজরা সরব হয়ে কাজের গৌরব নষ্ট করে । মানুষকে অনুপ্রেরনা দেয়ার জন্য প্রশংসা করুন; চাটুকারিতা বা তেলবাজির জন্য নয়। কারন প্রথমটা কাউকে উপরে উঠতে সহায়তা করবে আর দিতীয়টা তাকে নিচে নামাতে বা ধ্বংস করতে সহায়তা করবে।

মেজর (অব.) রেজাউল করিম, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

(মত-ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

আরও পড়ুন


লন্ডনের বিলাসবহুল হোটেলে মরিয়ম নওয়াজের ছেলের বিয়ে

বারবার রিমান্ডে পরীমণি: ক্ষমা চাইলেন দুই বিচারক

বছর না ঘুরতেই অন্তঃসত্ত্বা কাজল!

বাণিজ্য মেলা হবে এবার নতুন স্থানে, ১ জানুয়ারি থেকে শুরু


NEWS24.TV / কামরুল

পরবর্তী খবর