জরাথুস্ত্রবাদ: এক প্রচীন ধর্মের আখ্যান
জরাথুস্ত্রবাদ: এক প্রচীন ধর্মের আখ্যান

জরাথুস্ত্রবাদ: এক প্রচীন ধর্মের আখ্যান

Other

জরাথুস্ত্রবাদ একটি অতিপ্রাচীন ইরানীয় একেশ্বরবাদী ধর্ম। পারস্য থেকে আগত বলে ভারতীয় উপমহাদেশে এটি পারসিক, পারসী বা পার্সি  ধর্ম নামেও পরিচিত। এ ধর্মের অনুসারীদের পারসিক, পারসী বা পার্সি বলা হয়। এদের আরেকটি নাম হলো Magian যার আরবি মাজুস।

আল-কোরআনের সুরা হজের ১৭ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত মাজুস বলতে এদের বোঝানো হয়েছে বলে মনে করা হয়।

জরাথুস্ত্রীয় বা পারসিক ধর্মের প্রবর্তক জরাথুস্ত্র। তার নাম অনুসারেই বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় এই ধর্মের নাম হয়েছে ‘জরোয়াস্ট্রিয়ানিজ্ম’ বা জরথুস্ত্রবাদ। এ ধর্মে ঈশ্বরকে অহুর মজদা বা আহুরা মাজদা (‘সর্বজ্ঞানস্বামী’) নামে ডাকা হয়। ধর্মগ্রন্থের নাম আবেস্তা বা জেন্দাবেস্তা।
 
জরাথুস্ত্রবাদের জনক জরাথুস্ত্র নামের গ্রিক উচ্চারণ জরোয়েস্টার। প্রথাগত মত অনুসারে তাঁর জন্ম ৬২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বর্তমান ইরানে এবং মৃত্যু ৫৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। যদিও তাঁর জন্ম-মৃত্যুর কাল নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। কিছু সূত্র বলছে, আলেকজান্ডারের পার্সিপোলিস জয়ের ২৫৮ বছর আগে তিনি বেঁচে ছিলেন। সে হিসেবে তাঁর মৃত্যুসাল ৮২ খ্রিস্টাব্দ।  

এমনও জানা যায়, ৪০ বছর বয়সে অনুগত শিষ্য ভিশতাস্পকে ৫৮৮ খ্রিস্টপূর্বে ধর্মান্তরিত করেন। সে সূত্র মোতাবেক তার জন্মসাল ৫৪৮ খ্রিস্টাব্দ। কেউ আবার আরো পিছিয়ে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জরাথুস্ত্রের সময় বলে দাবি করেছেন। এনসাইক্লোপিডিয়া অব রিলিজিয়ন বলছে-

‘জরাথুস্ত্রবাদের শেকড় পূর্ব ইরানের গ্রাম্য সংস্কৃতিতে প্রোথিত। ধর্মটি খ্রিস্টের জন্মের ১০০০ বছর আগে উৎপত্তি লাভ করে এবং পারসিক সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ’ (খণ্ড- ১৫, পৃষ্ঠা- ৫৮০)

পারসিক ধর্মের অনুসারীরাদের অগ্নি-উপাসক বলা হয়ে থাকে। আগুনের পবিত্রতাকে ঈশ্বরের পবিত্রতার সাথে তুলনীয় মনে করেন পারসিক জরাথুস্ত্রীয়রা। এদের ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে ঋগ্বেদের অনেক মিল আছে। তাই এদের উভয়ের উৎপত্তি একই উৎস থেকে বলে মনে করা হয়।

বর্তমানে পৃথিবীতে জরাথুস্ত্রীয়দের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মতান্তরে দুই লাখ। ভারত, আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, ইরানসহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশে এদের বসবাস। তবে ধর্মটির অনুসারীদের অর্ধেকই বর্তমানে ভারতে বসবাস করছে। এসব পারসীদের ৯০ শতাংশ থাকেন মুম্বইয়ে। বাকি ১০ শতাংশ ছড়িয়ে রয়েছেন সারা ভারতে।  

কলকাতায় পারসিক জনসংখ্যা প্রায় চারশো। ২০১৫ সালে ইরাকের কুর্দি মুসলিম নৃগোষ্ঠীর ১ লাখ মানুষ নতুন করে জরাথুস্ত্রীয় ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন বলে জানা যায়। অনুসারীরা সংখ্যায় কম হলেও এ ধর্মের চিন্তা বহু পণ্ডিতকে প্রভাবিত করেছে। জরাথুস্ত্র মানুষকে পারস্পরিক ভালবাস, ক্ষমা ও শান্তিতে থাকতে শিখিয়েছেন। আধুনিক কালের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক ফ্রেডেরিখ নীৎশেকে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখেছেন ‌‘দাজ স্পোক জরাথুস্ত্র'।   

জানা যায়, খ্রিস্টীয় ৯ম শতকে জরাথুস্ত্রীয় ধর্মালম্বীরা তৎকালীন পারস্য (বর্তমান ইরান) থেকে ভারতে চলে আসেন। ভারতে এসে এরা প্রথম পা রাখেন বর্তমান গুজরাটের সঞ্জান এলাকায়। এদের এই আগমন সম্পর্কে একটি চমৎকার কিংবদন্তি বা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে।

কিংবদন্তি অনুযায়ী পারসীদের আগমনের পর সঞ্জানের শাসক একটি কানায় কানায় পূর্ণ দুধের পাত্র পারসীদের কাছে পাঠিয়ে বোঝাতে চান যে তাঁর রাজ্যে আর কাউকে ঠাঁই দেয়ার জায়গা নেই। পারসীরা  ওই পাত্রে চিনি ঢেলে দেখিয়ে দেন পাত্র উপচে পড়ছে না। অর্থাৎ তারা বোঝানোর চেষ্টা করেন চিনি যেমন দুধে মিশে যায় তেমনি তারাও ওখানকার মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকবেন। শাসক এতে সন্তুষ্ট হয়ে পার্সিদের আশ্রয় দেন।

আরও পড়ুন


বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলেন আমির খান

সিলেটে দ্বিতীয় বিয়ে করায় বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করল দুই ছেলে

অদ্ভূত শারীরিক জটিলতা, আছে দুটি জরায়ু এবং দুটি বিশেষ অঙ্গ

ঠাকুরগাঁওয়ে সাড়ে ১২শ কেজি ওজনের ‘বিগ বস’ দেখতে মানুষের ভিড়


এককালের হাখমানেশী, পার্থীয় এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যগুলোর রাষ্ট্রধর্ম ছিল জরাথুস্ত্রবাদ। পারসীদের প্রধানত 'অগ্নি-উপাসক' হিসেবে মনে করা হলেও জরাথুস্ত্রীয়দের অগ্নি উপাসনার ধারণাটি মূলত জরাথু্স্ত্রবাদ-বিরোধী বিতর্ক থেকে উৎপত্তি লাভ করে।  

প্রকৃতপক্ষে আগুনকে পারসিক ধর্মে শুদ্ধতার প্রতিনিধি এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এমনকি তাদের অগ্নি-মন্দিরেও (পারসিক পরিভাষায় সরল অর্থে অগ্নিনিলয় বা আগুনের ঘর) এই একই ধারণা পোষণ করা হয়।  

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মেয়ে পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার স্বামী ফিরোজ গান্ধী ওরফে ফিরোজ খান গান্ধী এবং পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদ-ই-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একমাত্র মেয়ে দিনার স্বামী নেভিল ওয়াদিয়া দু’জনেই ছিলেন পার্সি।

news24bd.tv এসএম

;