আর কতো নেবে, জীবনের ট্রেন?
আর কতো নেবে, জীবনের ট্রেন?

আর কতো নেবে, জীবনের ট্রেন?

Other

এও সম্ভব!! প্রায় ২৬ বছর পর একই স্বপ্ন দেখা দিল ঘুমের ঘোরে!! স্বপ্ন কি করে বলি, আসলে দুঃস্বপ্ন।

হ্যাঁ, হৃহান'কে ঘুম পাড়ানোর সুবাদে আজ একটু আর্লিই ঘুম চলে আসছিল। প্রচন্ড পিপাসা নিয়ে ঘুম ভেঙ্গে দেখি- রাত ২:০৫। এতো বছর আগের দুঃস্বপ্ন আমার শৈশবের পুরোটা স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়ে গেলো নতুন করে, ঘুম আর কই আসে! অগত্যা ফেবুর নীল আলোয় সময় পার করা ছাড়া উপায়! 

১৯৯৫ সাল, ক্লাশ ফাইভের বৃত্তির রেজাল্ট বেরুবে, আমি বার বার বাড়ির বাইরে বের হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি কখন আব্বা আসবেন রেজাল্ট নিয়ে।

কয়েকবার এরকম ঘুরেফিরে বাড়ির ভেতর আসার পর   

হঠাৎ অপরিচিত কিছু কণ্ঠ শুনি বাড়ির বাইরে, আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি কিছু বড় বড় যন্ত্রপাতি সমেত অফিসের লোকজন। তারা কি যেন মাপামাপির কাজে ব্যস্ত!

বিরাট কৌতূহল হলো আমার, মা তো তাদের সামনে যাবেন না, আমি আর সুমনা আপা উঁকি দিয়ে বার বার দেখার চেষ্টা করছি ঘটনাটা কী! হঠাৎ চোখে পড়লো আব্বা ফিরতেছেন, হাতে কিসের ব্যাগ।

ভোঁ দৌঁড়ে আমি আব্বার বোগলতলে। খুব পাতলা ছিলাম বলে আব্বার বোগলতলে বেশ জায়গা হতো আমার। মা, তোমার রেজাল্ট আনতে এতো দেরি হয়ে গেলো আজ, বৃত্তি তো পাও নাই! চুপসে গেলাম, মাথা নিচু করে ফিরছি আব্বার সাথে।

বাড়ির সামনে এতো যন্ত্রপাতি, লোকজন, আব্বা তাদের সাথে কথা বললে বুঝতে পারলাম রেললাইন হবে আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে। সেই কাজেই রেলওয়ে থেকে মাপামাপির কাজে তারা আসছেন।  

আব্বার মন খারাপ হলো বুঝতে বাকি রইলো না, এতো বড় পুরনো বাড়ি, এতো গাছ, এগুলির কী আর ক্ষতিপূরণ সম্ভব। তারপরও মুখে হাসি এনে বললেন, আপনারা মিষ্টি মুখ করে যাবেন, আমার ছোট মেয়েটা বৃত্তি পেয়েছে, সেই মিষ্টি! এইবার আমার হাসি দেখে কে ব্যাগটা দেখে অবশ্য সন্দেহ হচ্ছিল মিষ্টির ব্যাগই হবে হয়তো!

আজকের দুঃস্বপ্নের শুরুটা বলি এবার। রেললাইন হবার কথা শুনে সারাটা বেলা সবাই শুধু বলাবলি করে- আহা রে, এই বাড়িটা চলে গেলে কী হবে। এই যে এতো গাছ, সব তো শেষ, গ্রামটাই তো শেষ।

সেদিন থেকে আমিও শুধু ভাবতাম আর হিসাব কষতাম যে কতটুকু যাচ্ছে রেললাইনে আর কতটুকু থাকছে। বড়দের আলাপ থেকে বুঝতে পারি, ৭৭ শতাংশের বাড়ি, ১৪ শতাংশ থাকলেও থাকতে পারে বা তারও কম!  আব্বা শুধু বলতো- বাড়ি তো না, রেললাইন যাইবো বুকের উপর দিয়া.....

সত্যি সত্যি একদিন বিশাল বিশাল বুলডোজার, চেইনশো মেশিন দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেলো আমাদের সবুজে ঘেরা বিশুদ্ধ গ্রাম। সাথে আমাদের বাড়ি ভর্তি আষাঢ়ে, কাঁচামিঠা, ফজলি আম, লিচু, পেয়ারা, বরই আরও নাম না জানা আর হাজারও গাছ!!


আরও পড়ুন:

কুষ্টিয়ায় করোনায় মৃত হিন্দু ব্যক্তির লাশ সৎকার করলেন মুসলিমরা

১২ দিনের মাথায় অন্যের হয়ে জেল খাটা সেই নারীর মৃত্যু

ঈদে এক কোটির বেশি পরিবার পাবে ১০ কেজি করে চাল

করোনায় এতো মৃত্যু এর আগে দেখেনি বাংলাদেশ


সেই চেইনশো মেশিনের তাণ্ডব আমার ছোট্টমনে এতোটাই প্রভাব ফেলেছিল যে, আমি প্রায় রাতেই স্বপ্নে দেখতাম- একটি বড় গাছের মাথা থেকে কিভাবে টেনেটেনে ছিন্ন করা হচ্ছে তার ডালপালা, আর কী এক কষ্টে আমার ভেতরটা শূন্য হয়ে আসছে,উফ্ফ!!

আমার মায়ার জায়গা, আপন জায়গার এ পরিণতি কী যে দুঃসহ ঠেকতো। চোখ বন্ধ করলেই আমি এখনও ঘুরে বেড়াই আগের বাড়ির আনাচে-কানাচে, গাছগুলি ছু্ঁয়ে দিয়ে আসি কল্পনায়।

যদিও এখন বাড়ি নাম এলেই সবাই বলে বাপের বাড়ি, বাচ্চারা বলে নানুবাড়ি অথচ আমার কাছে আমার শিকড়, একটুকরো নিজস্বতা। এখন নিজের বাড়িতে মেহমান হয়ে যাই, আহারে জীবন!!

কিন্তু এতো বছর পর আজ সেই দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি! কেন? দ্বিতীয় রেললাইন নাকি হবে শুনেছিলাম, সেই ভাবনাই কি অবচেতন মনে নাড়া দিয়েছে?

সভ্যতা আর কত নেবে তুমি!!

আল্লাহ সহায় হোন..

লেখক: বিচারক ও শৌখিন চারুশিল্পী।

news24bd.tv / নকিব