অমানবিক দণ্ডের হেতু ও করণীয়
অমানবিক দণ্ডের হেতু ও করণীয়

অমানবিক দণ্ডের হেতু ও করণীয়

Other

গণমাধ্যমের বদৌলতে প্রায়ই জানতে পারি রাস্তাঘাটে নিয়ম বহির্ভূত আচরণ করলে অমানবিক ও বিধিবহির্ভূত শাস্তি দেয়া হয়। যেমন- লম্বা চুল রাখলে চুল কেটে দেওয়া হয়, পার্কে বসে প্রেম করলে কান ধরানো হয়, রাস্তায় মাস্ক না পরলে কিংবা লকডাউনে বের হলে নিলডাউন করে বসিয়ে রাখা হয় বা কান ধরে উঠবস করানো হয়।

আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী জনাব নজরুল ইসলাম ভাইয়া এর আইনগত দিক নিয়ে গতকাল লিখেছেন।

তিনি বলেছেন, এ ধরনের শাস্তি আইন বহির্ভূত।

আমি এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার পেছনের মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টা করেছি। আমাদের মধ্যে যারা সমাজের চোখে ক্ষমতাধর পদে আছেন তাদের একাংশ সে ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চান। কীভাবে তা দেখানো যাবে তার উপায় বের করতে সবসময় উদগ্রীব থাকেন। কেউ কেউ সে ক্ষমতা প্রদর্শন করতে আর কেউ কেউ ছোটবেলায় শিক্ষক বা পরিবারের কাছ থেকে যে শাস্তি পেয়েছেন তাতে মানসিকভাবে ক্রমাগত প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠায় ও সে মানসিকতা লালন করায় এ কাজ করে থাকেন।

আপনি বলতে পারেন কার উপর আসলে তিনি এ প্রতিশোধ নেন। তিনি আসলে নিজের জীবনের বঞ্চনা, একসময় না পাওয়ার হাহাকার নিয়ে বীতশ্রদ্ধ হতে হতে এমন হয়ে ওঠেন বলেই আমার ধারণা।

তাই আমি মনেকরি প্রত্যেক দণ্ডপ্রদানকারী ব্যক্তিকে কাউন্সেলিং করা উচিত। কেন দণ্ড দেব, এর উদ্দেশ্য আদতে কী, কীভাবে দিতে হবে, কখন দেব এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়া আবশ্যক। তাকে বোঝাতে হবে এদেশের সাধারণ মানুষের শ্রমে, ঘামে বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা হয়েছে। এ সাধারণ মানুষকে শাস্তির নামে অবমাননাকর আচরণের মুখোমুখি হতে হলে আদতে বাংলাদেশই কষ্ট পায়।

বঙ্গবন্ধু সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কী বলেছেন, কীভাবে তিনি তাঁদের মর্যাদা দিয়েছেন সে আলোকে প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুর কিছু ভাষণও ট্রেনিংয়ে পাঠ্যভুক্ত করা যেতে পারে।

যে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মানবিক ছিলেন সে দেশের মেধাবী কর্মচারীরা অমানবিক হতে পারেন না।

আমাদের সমস্যার শেকড়ে যাওয়া উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে যাকে কানে ধরে উঠবস করাচ্ছি, যাকে নিলডাউন করে রাখছি, যার চুল কেটে দিচ্ছি তিনি হতে পারতেন আমার বাবা, আমার সন্তান। একই অপরাধে আমার বাবাকে বা সন্তানকে যে শাস্তি দিতে পারব না সে শাস্তি অন্য একজন মানুষকে দিই কী করে!

এ প্রসঙ্গে রবি ঠাকুর বলেছেন -
দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।
যার তরে প্রাণ কোন ব্যথা নাহি পায় তার দণ্ডদান
প্রবলের অত্যাচার।
যে দণ্ডবেদনা পুত্রেরে পার না দিতে সে কারে দিও না;
যে তোমার পুত্র নহে তারো পিতা আছে,
মহা-অপরাধী হবে তুমি তার কাছে।

কাজী শরীফ, ৫ই জুলাই, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ