অর্থনীতির চাহিদা-সরবরাহ তত্ত্বের কিছু ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

অর্থনীতির চাহিদা-সরবরাহ তত্ত্বের কিছু ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত

২০১১ সালে Louis Vuitton ব্র্যান্ডের মহিলাদের হাতব্যাগের বিজ্ঞাপনে হলিউডের বিখ্যাত চিত্রতারকা এঞ্জেলিনা জলির একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই বিজ্ঞাপনটি নিয়ে প্রগতিশীল গণমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। ছবিটিতে তাঁকে ওই ব্র্যান্ডের একটি ব্যাগ কাঁধে ক্যামবোডিয়ার পাণ্ডববর্জিত একটি জলাভূমিতে একলা নৌকায় বসে থাকতে দেখা যায়। ফ্যাশন জগতে আবেদন সৃষ্টির উদ্দ্যেশে তৈরি ওই বিজ্ঞাপনকে একটি গরীব দেশের দারিদ্র্যকে উপহাস করার সামিল বলে অভিযোগ করা হয়।

বিলাতের The Guardin পত্রিকা একটি প্রতিবেদনের  শিরোনাম দিয়েছিলো: What’s Angelina Jolie doing in a swamp with a £7,000 bag? (১৪ জুন ২০১১) অবশ্য, এঞ্জেলিনা জলির নিজের মতে ক্যামবোডিয়ার ওই ভ্রমণ ছিল তাঁর জীবনের একটি বড় অভিজ্ঞতা যা তাঁর জীবনবোধকে বদলে দিয়েছিল। এমনকি ওই বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া তাঁর অর্থের অর্ধেক তিনি চ্যারিটিতে দান করেছিলেন বলে শোনা যায়।

মূল্যবান ব্র্যান্ডের পণ্যের চাহিদা:

দেখা গেছে কিছু কিছু অতি দামী ব্র্যান্ডের পণ্যের দাম এতো বেশী রাখা হয় বলেই ওই সব পণ্যের চাহিদা তৈরী হয়, যা অর্থনীতির চাহিদা তত্বের (দাম বাড়লে চাহিদা কমে) ঠিক উল্টো। সুইজারল্যাণ্ডের Patek Phillippe ব্র্যান্ডের সব চেয়ে কম দামের হাতঘড়ির দামও সাড়ে বারো হাজার মার্কিন ডলার, কিন্তু সে তুলনায় একশ’ ডলারের একটি জাপানী Citizen বা Casio ব্র্যান্ডের ঘড়ি তেমন কোন খারাপ সময় দেবে না। সমাজের বিত্তবানদের নিজেদেরকে আলাদা শ্রেণী হিসাবে জাহির করার প্রবণতা থেকেই এ ধরনের অতি দামী ব্র্যান্ডের পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়। একই কারণেই Louis Vuitton ব্র্যান্ডের মহিলাদের একটি হাতব্যাগের দাম প্রায় এক হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে; আর তার থেকেও নামীদামী Hermes হাতব্যাগের দাম দশ হাজার থেকে এক শ’ হাজার ডলারের বেশী হতে পারে, যদিও অনেক কম দামের একটি সাধারণ ব্যাগের তুলনায় এদের গুণগত মানে এমন কোন বেশী পার্থক্য আছে বলা যায় না।

অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অর্থনীতি

আভিজাত ক্লাবের সদস্য পদের মূল্য নির্ধারণ:

দেখা যায় যে কলিকাতার ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ক্লাব "ক্যালকাটা ক্লাব" বা ঢাকার "ঢাকা ক্লাব"-এর সদস্য পদ পেতে হলে এককালীন ও নিয়মিত যে ফী দিতে হয় তা ঐসব ক্লাবের সদস্য হিসাবে পাওয়া সুযোগ-সুবিধার তুলনায় অনেক বেশী। তবে ক্লাবের পরিচালকরা ইচ্ছা করলে তার থেকে অনেক বেশী ফী নির্ধারণ করলেও সদস্য পদ পেতে আগ্রহী মানুষের অভাব হবে না; অর্থাৎ, বাজার দামের থেকে কম মূল্য তাঁরা ইচ্ছা করেই নির্ধারণ করছেন। কেন?

এধরনের ক্লাবে মোটা দাগে দুই শ্রেনীর সদস্য থাকেন: এক, সমাজের নামীদামী প্রভাবশালী ব্যক্তি, যথেস্ট সচ্ছল হলেও যাঁদের সহায়-সম্পত্তি অফুরন্ত নয়। দুই, খুবই বিত্তশালী হলেও সামাজিক মর্যাদায় পিছিয়ে আছেন, যাঁরা সামাজিক কৌলিন্য অর্জন এবং প্রথম শ্রেনীর ব্যাক্তিদের সঙ্গে সখ্যতা অর্জনের একটা উপায় হিসাবে সদস্য পদ লাভের জন্য অনেক বেশী ব্যয় করতে সক্ষম ও আগ্রহী।  কিন্তু অতো বেশী ফী নির্ধারণ করলে প্রথম শ্রেনীর সদস্যদের আনুপাতিক সংখ্যা ক্রমে কমে যাবে, যার ফলে ক্লাবটির সদস্য পদের সামাজিক মর্যাদাও কমতে থাকবে। পরিনামে দ্বিতীয় শ্রেনীর সদস্যরাও অত বেশী খরচ করে সদস্য পদ পেতে বা ধরে রাখতে আর আগ্রহী থাকবেন না।

জাতীয় পদক-পুরস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি:

সব দেশেই সামাজের নানা ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসাবে কিছু অগ্রগন্য ব্যক্তিবর্গকে বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের উপাধি ও পদক দিয়ে ভূষিত করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে টাকার অঙ্কে ঐসব পদক ও সন্মানীর মুল্য যা, অনেক আগ্রহী পদক প্রার্থীরা তার থেকে অনেক বেশী দাম দিয়ে সেগুলো কিনতে চাইতেন। তবে সামাজিক অবদানের একটা মাপকাঠির বিচারেই পদকগুলো দেওয়া হয়, আর সেজন্যই এগুলো মর্যাদার দিক থেকে মূল্যবান।

আরও পড়ুন


সাতক্ষীরা মেডিকেলে আরও ৯ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ৬৪

আর্জেন্টিনা-কলম্বিয়ার শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকার (ভিডিও)

‘পরমাণু সমঝোতা সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন হবে না’

‘সিলিকন ফুয়েল প্লেট’ তৈরির কাজে হাত দিয়েছে ইরান


তবে যে কোন সরকারের পদক প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ দুটি বিবেচনা মাথায় রাখে: এক, সত্যিকার উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করে পদকগুলোর মর্যাদা ধরে রাখা; দুই, ক্ষমতাশীন সরকারের প্রতি সমর্থন বা আনুগত্যের জন্য পুরস্কৃত করা। এ দুটি বিবেচনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ নয়।  দ্বিতীয় বিবেচনা অতিরিক্ত প্রাধান্য পেলে পদকগুলোর মর্যাদাও কমতে থাকে এবং এক সময় দেখা যেতে পারে যে পদকগুলোর এত অবমূল্যায়ন ঘটেছে যে সরকারের অনুগ্রহভাজনদেরও এগুলো পাওয়ার আগ্রহ কমে গেছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশেই সেরকমটা হতে দেখা যায়, কারণ ব্যক্তিখাতের  উদ্যোক্তারা আর্থিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে যে রকম পারদর্শী, সরকারের  প্রশাসনযন্ত্র  রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবের বিষয়ে সেরকম পারদর্শিতা সাধারণত দেখাতে পারে না। ফলে এসব পদক-পুরস্কার প্রদানের পেছনে সরকারের যে দুটি উদ্দেশ্য থাকে তার কোনটিই হয়তো শেষ পর্যন্ত আর তেমন পূরণ হয় না।

এই শেষোক্ত উদাহরণটি অর্থনীতির public choice তত্ত্বের আওতায় পড়ে, যে তত্ত্বের সূচনা করেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জেমস বুকানান (James Buchanan)। এই তত্ত্ব আনুসারে অর্থনীতির আচরণ যেমন ব্যক্তিস্বার্থ ও মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও তেমনি জনস্বার্থে নয় বরং রাজনীতিক ও আমলাদের ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থেই গৃহীত হতে পারে।

(বাংলায় অর্থনীতির যে বইটি লিখছি: "অর্থনীতি কেনো পড়ি; উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষিত"; সেখান থেকে উদ্ধৃত।)

লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

শেখ কামাল: বহুমাত্রিক প্রতিভাবান সংগঠক

আব্দুর রহমান

শেখ কামাল: বহুমাত্রিক প্রতিভাবান সংগঠক

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ছিলেন এক বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী অনন্য সংগঠক। দেশ ও সমাজভাবনায় শেখ কামাল মাত্র ২৬ বছরের জীবনে বাঙালির সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রের এক বিরল প্রতিভাবান সংগঠক ও উদ্যোক্তা হিসেবে অসামান্য উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। একইসাথে রাজনীতিতেও ছিলেন সমান তৎপর। ৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। 

খুব ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড ঝোঁক। ঢাকার শাহীন স্কুলে পড়াকালীন স্কুলের খেলাধুলার প্রত্যেকটি আয়োজনে তিনি ছিলেন অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মধ্যে ক্রিকেটের প্রতি টানটা ছিল সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘদেহী কার্যকর ফাস্ট বোলার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু একইসাথে বাঙালি এবং মুজিবপুত্র হবার কারণে অবিভক্ত পাকিস্তানের জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটে নিদারুণভাবে উপেক্ষিত থেকেছেন। তরুণ বয়সে আজাদ বয়েজ ক্লাবের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন এবং ওই ক্লাবের হয়েই দীর্ঘদিন প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন। ঢাকার আজাদ বয়েজ ক্লাব তখন প্রতিভাবান তরুণ ক্রিকেটারদের লালনক্ষেত্র।

খেলাধুলার পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা তাঁর প্রতিভা ও মননের এক বিশাল দিককে উন্মোচিত করে। অভিনয়, সংগীত চর্চা, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতাসহ সকল ক্ষেত্রে তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। শাহীন স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র হিসেবে হলের বাস্কেটবল টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন শেখ কামাল। বাস্কেটবলে তাঁর অসামান্য দক্ষতার কারণে তাঁর সময়ে বাস্কেটবলে সলিমুল্লাহ হল শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছিল। 

৬৯ সালে পাকিস্তান সামরিক জান্তা সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে তার প্রতিবাদের ভাষা তথা অস্ত্র হয়ে ওঠে রবীন্দ্র সংগীত। সেসময় বিভিন্ন আন্দোলন পরিস্থিতিতে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে অহিংস পন্থায় প্রতিবাদের উদাহরণ সৃষ্টি করেন শেখ কামাল। সেসময় তিনি রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীদের সংগঠিত করেন এবং রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি শিল্পী জাহিদুর রহিমকে দিয়ে বিভিন্ন সভা ও জমায়েতে গাওয়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কর্মপরিধির বিস্তার ঘটে এবং অনেক ব্যাপকতা পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে একজন ভালো অভিনেতা হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি গড়ে ওঠে। নাট্য সংগঠন ঢাকা থিয়েটারের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর অভিনীত নাটক নিয়ে ভারত সফরও করেছেন। কোলকাতার মঞ্চে মুনীর চৌধুরীর বিখ্যাত নাটক কবর মঞ্চায়ন করেন। অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বাংলা একাডেমি মঞ্চেও। সেতার বাজাতে খুব পছন্দ করতেন তিনি। ছায়ানটের সেতার বাদন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন শেখ কামাল। ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদের কাছে নিজ বাড়িতে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিতেন। খেলাধুলার প্রতি অমোঘ আকর্ষণ ও খেলাধুলার প্রসারের লক্ষ্যে দেশের অন্যতম শক্তিশালী ও জনপ্রিয় ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তাঁর বড় বোন বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ধানমণ্ডি এলাকায় কোনো ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল না। সে (শেখ কামাল) উদ্যোগ নেয় এবং ওই অঞ্চলের সবাইকে নিয়ে আবাহনী গড়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের পরে ও এই আবাহনীকে শক্তিশালী করে।’ 

আবাহনী ক্রীড়াচক্র বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী বিপ্লবের জন্ম দেয়। প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় ক্লাব মোহামেডানকে পেছনে ফেলে আবাহনীকে তিনি গৌরবের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ক্রমান্বয়ে সারাদেশে আবাহনীর শাখা গঠনে তৎপর হন। তরুণ সমাজের চিত্তের প্রফুল্লতা নিশ্চিত করা ও বিপথে ধাবিত না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলদ্ধি করেছেন সবসময়। এবং মাত্র ২৬ বছরের নাতিদীর্ঘ জীবনে তাঁকে সে অনুযায়ী নানমুখি উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। বন্ধু শিল্পী ও সহকর্মীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী’। বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের সাথে মেশার ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে কেউ কোনদিন কোনদিন অহমিকার প্রকাশ দেখেননি। বন্ধুবৎসল শেখ কামাল জীবনযাপনে ছিলেন খুবই সাধারণ। দেশের স্থপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হওয়া সত্তে¡ও কোনরূপ ক্ষমতার অপব্যবহার তিনি করেননি।  

ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বরের তিনতলায় শেখ কামালের বসবাসের ঘরটিতে থাকত নানারকম বাদ্যযন্ত্রের বাদ্যযন্ত্রের সমাহার। যে মানুষটির দিন শুরু হতো সংগীত, পিয়ানো ও সেতার বাদনের মধ্য দিয়ে, তারপর ফুটবল, ক্রিকেটের পর্ব শেষ করে সন্ধ্যায় ব্যস্ত হতেন নাটকের মঞ্চে অথবা মহড়ায় তিনি রুচি ও মানসিকতায় কেমন মানুষ ছিলেন তা অনুমান করতে কারো কষ্ট হবার কথা না।  

পারিবারিক পরিবেশ থেকেই এ সবকিছুর পাশাপাশি রাজনীতির পাঠও গ্রহণ করেছিলেন শেখ কামাল। বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধারাবাহিক আপসহীন সংগ্রামের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করার ফলে বাঙালি জাতীয়বাদের চেতনায় তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামীলীগের জন্মের বছরেই শেখ কামালেরও জন্ম। আওয়ামীলীগের পথচলার যে ধারাবাহিকতা, বঙ্গবন্ধুর জীবন পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়, তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই শেখ কামালের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ শিরোনামের স্মৃতিকথায় এক জায়গায় লিখেছেন- “কামাল তখন অল্প কথা বলতে শিখেছে। কিন্তু আব্বাকে ও কখনো দেখেনি, চেনেও না। আমি যখন বারবার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি, আব্বা আব্বা বলে ডাকছি, ও অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। গোপালগঞ্জ থানায় একটা বড় পুকুর আছে, যার পাশে বড় খোলা মাঠ। ওই মাঠে আমরা দুই ভাইবোন খেলা করতাম ও ফড়িং ধরার জন্য ছুটে বেড়াতাম। আর মাঝে মাঝেই আব্বার কাছে ছুটে আসতাম।

অনেক ফুল, পাতা কুড়িয়ে এনে থানার বারান্দায় কামালকে নিয়ে খেলতে বসেছি। ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি?’ কামালের সেই কথা আজ যখন মনে পড়ে, আমি তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।” বঙ্গবন্ধুর পুত্র-কন্যাদেরকে এমনই সংগ্রামমুখর পথ পাড়ি দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার সুদীর্ঘ সংগ্রামের পথে বাঙালির উপর যত আঘাত এসেছে, প্রত্যক্ষভাবে ওই পরিবারটিতে তা স্পর্শ করে গেছে। পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জেল-জুলুমের যে সংগ্রামমুখর জীবন, তা প্রত্যক্ষ করেই বেড়ে ওঠা শেখ কামালের জীবনের দীক্ষাও ছিল সবসময় মানুষ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে নানাভাবে ভূমিকা রাখার।

আরও পড়ুন


বিচার চাওয়ার অধিকার পর্যন্ত জিয়াউর রহমান কেড়ে নিয়েছিলেন: কাদের

বরিশাল শেবাচিমে অক্সিজেনের দাবীতে বাসদের বিক্ষোভ

টিকা নিন নইলে বেতন বন্ধ: অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়

হেলেনা জাহাঙ্গীরের আরও ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর


ছাত্রলীগের কর্মী ও সংগঠক হিসেবে তিনি ৬ দফা, ১১ দফা আন্দোলন এবং ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে বীরোচিত অংশগ্রহণ ছিল তাঁর। অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী শেখ কামাল সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীতে কমিশন্ড লাভ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে ষড়যন্ত্রকারীদের পৈশাচিক হামলায় নিহত হবার সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষার্থী ছিলেন। এর মাত্র এক মাস আগে ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু খেতাবপ্রাপ্ত দেশসেরা অ্যাথলেট সুলতানা খুকুকে তিনি পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। 

১৫ আগস্ট ভোররাতে বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধুসহ সপরিবারে নিহত না হলে বাংলাদেশ পেত বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী এই সংগঠক ও নেতাকে। তার মেধা ও রুচির প্রয়োগ ঘটিয়ে তরুণ প্রজন্মকে যে সুন্দর ও সম্ভাবনার পথ তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, সেই পথটি যেন আমরা খুঁজে নিতে পারি। ৭৩তম জন্মদিনে শেখ কামালের প্রতি আমার অকৃত্রিম প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।

লেখক: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

হেলেনা জাহাঙ্গীরও রাজনীতিবিদ না, মৌ-পিয়াসাও মডেল কিংবা অভিনেত্রী না

আশরাফুল আলম খোকন

হেলেনা জাহাঙ্গীরও রাজনীতিবিদ না, মৌ-পিয়াসাও মডেল কিংবা অভিনেত্রী না

সব পেশারই কিছু ধর্ম আছে, সম্মান আছে। সমাজের সবচেয়ে নিচু শ্রেণীর মানুষের কোনো পেশার কথা যদি বলেন তারাও তাদের জগতে একটা সম্মান নিয়ে চলে।

এখন কোন পেশাকে আপনি ছোট করে দেখেবেন? কোন কাজকে আপনি ছোট করে দেখবেন? কোনো কাজ কিংবা পেশাকেই ছোট করে দেখার বা অসম্মান করে দেখার অবকাশ নেই।

আপনি যদি সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ হয়ে ভাবেন ঝাড়ুদার একটা ছোট পেশা। একবার ভাবুনতো আপনার শহর কিংবা ঘর একমাস ধরে কেউ পরিষ্কার করে না। তখন আপনার সাহেবগিরি কোথায় যাবে? আপনি যে ড্রাইভারকে ছোট করে দেখেন তার দক্ষতার উপরও আপনার নিজের জীবন মরণ নির্ভর করে।

যেহেতু প্রতিটি পেশারই কিছু না কিছু সম্মান আছে, সমাজে গুরুত্ব আছে তাই এইসব পেশার উপর এক শ্রেনীর মানুষ ভর করে স্বার্থ হাসিল করে। সেই শ্রেণীর পেশাজীবির নাম প্রতারক বা জালিয়াত বা বাটপার। সুতরাং তাদেরকে প্রতারক বা জালিয়াতই বলা উচিত। যেই পেশার উপর ভর করে সেই পেশার খেতাব দিয়ে সেই পেশাকে অসম্মান করা উচিত না।

আরও পড়ুন

সুন্দরী ২০-২৫ জন রমণীকে নিয়ে জমজমাট আসর বসাতো পিয়াসা

ভয়াবহ দাবানল থেকে বাঁচাতে সমুদ্র সৈকতে নেয়া হচ্ছে গবাদিপশুদের

ফ্লোরিডায় অদ্ভুতদর্শন ‘সেসিলিয়ান’-এর খোঁজ

১৬ই আগস্ট ভারতে ‘খেলা হবে’ দিবস


সর্বশেষ উদাহরণ: হেলেনা জাহাঙ্গীর কখনোই রাজনীতিবিদ কিংবা নেত্রী না। পিয়াসা কিংবা মৌ আক্তারও কোনো প্রকারের মডেল কিংবা অভিনেত্রী না। তারা এইসব পেশাকে অপব্যবহার করার চেষ্টা করেছে মাত্র। তাদেরকে নেত্রী,অভিনেত্রী কিংবা মডেল বললে ওই পেশাকেই অপমান করা হয়, ওই পেশার সম্মানিত মানুষগুলোকে অপমান করা হয়।

তবে হ্যা, কোনো প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী যদি প্রতারণা কিংবা জালিয়াতি করে তখন আপনি ওই পেশার নাম ধরে তাকে প্রতারক বা জালিয়াত বলতে পারেন।

news24bd.tv/ নকিব

পরবর্তী খবর

অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তাওবা

জাকির হোসেন

অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তাওবা

হালাল উপার্জনের উপর নির্ভর করা এবং হারাম উপার্জন বর্জন করা মুসলিমের জন্য অন্যতম ফরয ইবাদত। শুধু তাই নয়, এর উপর নির্ভর করে তার অন্যান্য ফরয ও নফল ইবাদত আল্লাহর নিকট কবুল হওয়া বা না হওয়া। হারাম উপার্জনের দ্বরা আপনি বাড়ি-গাড়ি, জায়গা-জমি, ব্যাংক ব্যালেন্স করে ফেলেছেন। এখন আপনার হুঁশ হয়েছে পরকালের আযাবকে ভয় করে আপনি তাওবা করে সকল হারাম বর্জন করে পরিশুদ্ধ হতে চান। মহান আল্লাহর পথে ফিরে আসতে চান। নিশ্চয়ই মহান রব তাওবা কবুলকারী। বান্দা অপরাধ করে অনুতপ্ত হয়ে বিশুদ্ধ নিয়তে, এই অপরাধ আর হবে না এই দৃঢ় সংকল্প করে তাওবা করলে নিশ্চয়ই মহান রব তা কবুল করবেন। কিন্তু অনেকেই মনে করেন তাওবার মাধ্যমে তার অবৈধ উপায়ে সম্পদও হালাল বা বৈধ হয়ে গিয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

আপনি আল্লাহ তা’য়ালা ও রাসূল (সা.) এর নির্দেশ অমান্য করে অবৈধ পন্থায় আয়-রোজগার করেছেন। আপনার এই অবৈধ কাজের জন্য তাওবা কবুল হতে পারে, এর দ্বারা অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ কখনই হালাল হবে না। এটি যদি ইসলামে অনুমোদিত হতো তাহলে  অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন মহামারি আকার ধারণ করতো। তখন সবাই মনে করতো আগে রোজগার করে ফেলি পরে তাওবা করে বেশি বেশি ইবাদত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবো। এমন ধারণা চরম ভ্রান্তির। কারণ ঐ অবৈধ সম্পদের হকদার অন্য কেউ। যেমন রাষ্ট্রের সম্পত্তি আত্মসাৎ করলে তার হকদার রাষ্ট্রের জনগণ। আর ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নিলে এই অর্থের হকদার ঠিকাদার ও তার পরিবারের সদস্যরা। ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার কারণে সে কাজের মানে ফাঁকি দিয়েছে এবং আপনি তা দেখেও কোন ব্যবস্থা নেন নি। এই অপরাধের জন্য তাওবা কবুল হতে পারে, ঘুষ হালাল হবে না। অবৈধ উপার্জনের অন্যতম পদ্ধতি ঘুষ। 

অনেকে মনে করেন হারাম পথে উপার্জন করে সেখান থেকে কিছু সদকা করে দিলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু ব্যাপারটা এরকম নয়। ইবনু আব্বাস (রা) কে প্রশ্ন করা হয়, ‘একব্যক্তি একটি প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিল। তখন সে যুলুম করে ও অবৈধভাবে ধনসম্পদ উপার্জন করে। পরে সে তাওবা করে এবং সেই সম্পদ দিয়ে হজ্জ করে, দান করে এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে।’ তখন ইবন আব্বাস বলেন, ‘হারাম বা পাপ কখনো পাপমোচন করে না। বরং হালাল টাকা থেকে ব্যয় করলে পাপ মোচন হয়।’

ইবনু উমার (রা.) কে বসরার এক গভর্ণর প্রশ্ন করেন, আমরা যে এত জনহিতকর কাজ করি এর জন্য কি কোনো সাওয়াব পাব না? তিনি উত্তরে বলেন, আপনি কি জানেন না যে, কোনো পাপ কখনো কোনো পাপমোচন করতে পারে না?’

আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুষ গ্রহীতা ও ঘুষদাতা উভয়কে লানত করেছেন। (তিরমিযি ) বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি, কোনো পাপ দিয়ে অন্য পাপ মোচন করা যায় না। রাসূলুল্লাহ (সা.)বলেন ‘যে ব্যক্তি অবৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করে এরপর তা দান করবে, সে এই দানের জন্য কোনো সাওয়াব পাবে না এবং তার পাপ তাকে ভোগ করতে হবে।’ (ইবনু হিব্বান) অন্য হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন, ‘বৈধ জীবিকার ইবাদত ছাড়া কোনো প্রকার ইবাদত আল্লাহর নিকট উঠানো হয় না।’(বুখারী) রাসূল (সা.) আরো বলেন ‘ওযু-গোসল ছাড়া কোনো নামায কবুল হয় না, আর অবৈধ সম্পদের কোনো দান কবুল হয় না।’ (বুখারী)

হারাম ভক্ষণ করে ইবাদত করলে তা কবুল হয়না। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা পবিত্রতা ছাড়া কোনো সালাত কবুল করেন না এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের সদকা গ্রহণ করেন না।’ (নাসায়ি)

রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘হে মানুষেরা, নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র (বৈধ) ছাড়া কোনো কিছুই কবুল করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনগণকে সেই নির্দেশ দিয়েছেন যে নির্দেশ তিনি নবী ও রাসূলগণকে দিয়েছেন … এরপর তিনি একজন মানুষের কথা উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি (হজ্ব, উমরা ইত্যাদি পালনের জন্য, আল্লাহর পথে) দীর্ঘ সফরে রত থাকে, ধূলি ধূসরিত দেহ ও এলোমেলো চুল, তার হাত দু’টি আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে দোয়া করতে থাকে, হে প্রভু! হে প্রভু ! কিন্তু তার খাদ্য হারাম, তার পোশাক হারাম, তার পানীয় হারাম এবং হারাম উপার্জনের জীবিকাতেই তার রক্তমাংস গড়ে উঠেছে। তার দোয়া কিভাবে কবুল হবে!’ (মুসলিম)

আরও পড়ুন


নাটোরে ধর্ষণ মামলার আসামি ও এক মানবপাচারকারী গ্রেপ্তার

সেনবাগে বিকাশ প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে শিক্ষার্থীদের টাকা

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাইগারদের সম্ভাব্য একাদশ

অভিনব কায়দায় গরুর মাধ্যমে ইয়াবা নিয়ে আসতো মডেল পিয়াসা


মহান রব বলেছেন,“হে রাসূলগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকর্ম কর। তোমরা যা কর সে বিষয়ে আমি অবহিত।”(সুরা মুমিন ৫১)

হারাম ও হালাল সম্পদ মিশ্রিত হয়ে গেলে তা অনুমান করে আলাদা করতে হবে। হারাম উপার্জনের থেকে তাওবা করে বিশুদ্ধ হতে হলে হারাম সম্পদ যে কোন প্রকারে তার মালিক কিংবা তার উত্তরাধিকারীকে ফেরত দিতে হবে। লজ্জা লাগলে তাদের ব্যাংক একাউন্টে জমা দেয়া যেতে পারে। মালিক চেনা না গেলে তার পক্ষ থেকে দান করে দিতে হবে কিংবা অন্য কোন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে হবে। তাওবা করার পর হারাম সম্পদের বাড়ি-গাড়ি, জায়গা-জমি, ব্যাংক ব্যলেন্সের সুবিধা গ্রহণ করতে থাকলে আপনার অবস্থা ঐ ব্যক্তির ন্যায় যিনি কাদা মাখা শরীর ধূয়ে সাফ-সুতরো হয়ে আবার পরক্ষণেই কাদা ঘাঁটতে শুরু করলেন।

মনে রাখবেন, তাওবা করে অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ বিলিয়ে দেয়া যত কঠিন জাহান্নামের আগুন তার চেয়ে আরও অনেক অনেক বেশি ভয়ংকর।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতীয় সহযোগিতা

হাসান ইবনে হামিদ

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতীয় সহযোগিতা

শ্রমনির্ভর থেকে জ্ঞাননির্ভর জাতিতে পরিণত হবার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পৃথিবীতে যে বিশাল জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে, বাংলাদেশ তার অংশীদার হতে চায়। নতুন ধরনের এই অর্থনীতিতে প্রবেশের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সরকার সারা দেশে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। ই-গভার্ন্যান্স পদ্ধতি চালু, স্কুল-কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং আইটি পার্ক গড়ে তোলাসহ সরকারের নানামুখী কর্মযজ্ঞ দেশব্যাপী চলমান। নানা ধাপে এই ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের কার্যক্রম সরকার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি জেলায় আইটি পার্ক গড়ে তোলার ঘোষণা ইতোমধ্যে সরকার দিয়েছে।

বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলায় আইটি পার্ক নির্মাণাধীন। বর্তমানে সাতটি হাইটেক পার্ক বিনিয়োগের উপযুক্ত অবস্থায় আছে। এগুলো হচ্ছে কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, ঢাকায় জনতা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, সিলেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্ক, চট্টগ্রামে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, নাটোরে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার, রাজশাহীতে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। দেশের বিভিন্ন পার্কে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

এই হাইটেক পার্কগুলো সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে। এদিকে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ আইটি সেক্টরের উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় হাইটেক পার্ক স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে। তার মানে বৃহৎ জনগোষ্ঠী যে এই হাইটেক পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের আওতায় আসবে তা পরিস্কার। 

ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ভারত এবার হাইটেক পার্ক নির্মাণে বাংলাদেশকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে দেশের ১২টি জেলায় হাই-টেক পার্ক স্থাপন প্রকল্পে ভারত সরকার অর্থায়ন করছে। সম্প্রতি আইসিটি প্রতিমন্ত্রী ভারতের সাথে এক ভার্চুয়াল আলোচনাসভায় এসব তথ্য দিয়েছেন। গত ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ‘বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সার্ভিস এন্ড এমপ্লয়মেন্ট ট্রেনিং সেন্টার (বিডিসেট)’ নামক একটি প্রকল্প স্থাপনে ভারতীয় অনুদানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই সমঝোতার আওতায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও আইসিটি শিল্পের বিকাশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ২৫ কোটি টাকা ভারতীয় অনুদান দেয়া হবে। এই প্রকল্পে মোট ৬১.০২৫৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে যার বাকী অংশ (৩৬.০২৫৯ কোটি টাকা) বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হবে। এখান থেকে আগামী দুই বছরে প্রায় আড়াই হাজার প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে। ইন্টারনেট অব থিংস, মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এক্সটেনডেড রিয়ালিটি এবং অন্যান্য উচ্চতর বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এ ছাড়াও ৩০ জনকে ৬ মাসের জন্য ভারতে আইসিটির উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করা হবে।

বাংলাদেশের বেকারত্ব নিরসনে ভারত সরকার যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ ও প্রশংসা পাবার দাবি রাখে। কেননা হাইটেক পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপ দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের তালিকায় নিয়ে যেতে চাইছে বাংলাদেশ সরকার। আর সেই পথে আমাদের বন্ধুর ন্যায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের জন্মবন্ধু ভারত। হাইটেক পার্ক শুধু যে স্কিলড কর্মীদের চাকুরীর নিশ্চয়তা দেবে তা কিন্তু না বরং প্রতিটি জেলায় এই পার্ককে কেন্দ্র করে যে কর্মযজ্ঞ শুরু হবে তাতে লাখো মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কালিয়াকৈরের হাইটেক পার্কের কথা, যেখানে প্রশাসনিক ভবন, হাসপাতাল, কাস্টম হাউস, স্কুল-কলেজ, ব্যাংক, শপিং মল, আবাসিক এলাকা, শিল্প এলাকা, কনভেনশন সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে কালিয়াকৈর পার্কের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে একটি রেলস্টেশন স্থাপন ও শাটল ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। তার মানে এই পুরো অঞ্চলে লাখো মানুষকে ব্যবসার সুযোগও তৈরি করে দিচ্ছে এই হাইটেক পার্ক। বেকারত্ব নিরসনে বন্ধু দেশ ভারত আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে যা দুই দেশের আদি বন্ধুত্বের এক উদাহরণ। 

আইসিটি খাতে ভারত সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও পারস্পরিক সম্পর্ক আগের যেকোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক উন্নত। আইসিটি খাতে ভারতীয় কোম্পানি বিশ্ব বাজারে জায়গা করে নিলেও বাংলাদেশ থেকে আইটি খাতের দশ লাখের বেশি দক্ষ জনবল নিয়ে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান তৈরী করতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে আইসিটি খাতে ৫ বিলিয়ন ডলারের উপর রপ্তানি আয় করার আশা করছে বাংলাদেশ। এই খাতে বাংলাদেশ ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলে তা উভয় দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আইসিটি খাতে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সম্প্রাসারণে ভারতীয় হাইকমিশন, বাংলাদেশ সরকার এবং দু’দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়িক সংগঠন যদি একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারে তবে দক্ষিণ এশিয়াতেই আইসিটি খাতে এক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

সে লক্ষ্যেই এবারের ২৭ জুলাইয়ের ভার্চুয়াল সম্মেলনে ই-কমার্স, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আইটির ব্যবহার, সাইবার নিরাপত্তা, রোবটিক অটোমেশন প্রক্রিয়া,পর্যটন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমাত্রা ও ব্লকচেইনের ব্যবহার, বড় তথ্য বিশ্লেষণ, সংযুক্ত ও ভার্চুয়াল বাস্তবতা, অ্যানিমেটেড ছবি নির্মাণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ নির্মাণসহ প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য ক্ষেত্রে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা কিভাবে পারস্পরিক ব্যাবসা বৃদ্ধি করে পরস্পর লাভবান হতে পারেন সে বিষয়ে আলোচনা করেন উভয় দেশের আইসিটি খাতের ব্যবসায়ীরা। এভাবে দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে গেলে আইসিটি খাতে উত্তরোত্তর সফলতা দ্রুতই আসবে। 

হাইটেক পার্ক ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। এটা সত্যি যে, এতদিনে কমপক্ষে লাখ খানেক কর্মসংস্থান করার কথা ছিল। সেদিক থেকে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে যেহেতু চাহিদা বেশি সেগুলোতে অগ্রাধিকার দেয়ার এখন সময়। লক্ষ্যের দিকে এগোতে হলে ফোকাস থাকতে হবে। দ্রুত ট্রেন যোগাযোগ প্রয়োজন হবে। ইন্ড্রাস্টি, একাডেমি ও সরকারের টাস্কফোর্স গঠন করে কাজ করতে হবে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর প্রথম হাইটেক বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছিলো। যেহেতু হাইটেক পার্কের বিষয়টি শিল্পখাত ভিত্তিক তাই শিল্প ও প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

এটা করতে সময় লাগে। তাই দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে এই হাইটেক পার্ক নির্মাণ করছে সরকার যেখানে লাখ লাখ বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাশে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত। আমাদের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আগামী দিনগুলোতেও বাংলাদেশের হাই-টেক পার্কগুলোতে বিনিয়োগসহ আইসিটি খাতে সহযোগিতা আরও প্রসারিত করবে ভারত। ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব অমর হোক।

 (মত-ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

লেখক : হাসান ইবনে হামিদ, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

আমার বন্ধু ভাগ্য অনেক ভালো

পীর হাবিবুর রহমান

আমার বন্ধু ভাগ্য অনেক ভালো

পীর হাবিবুর রহমান

বন্ধু মানে ডাকলেই ছুটে যাওয়া, ডাকলেই ছুটে আসা। করোনার দেড় বছরে আমার বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ নেই। আড্ডা নেই। একা বন্ধুবিহীন জীবন। ছোটবেলা থেকেই আমি দূড়ন্ত আমুদে প্রানবন্ত আড্ডাবাজ বন্ধু পাগল। বন্ধু ভাগ্য আমার অনেক ভালো।

পাড়া থেকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। বন্ধুত্ব মানেই আত্নার গভীরে বহন করা টান। বিশ্বাসের প্রবল শক্তি। দলবেধে ছুটে চলা। জীবনের সব কিছুই ভাগাভাগি করা। চায়ের আসর থেকে সব। তুমুল তর্ক ঝগড়া গলাগলি সব। বিপদে আপদে দৌড়ে আসা যাওয়া নি:স্বার্থ এক সম্পর্ক।

বন্ধুবিহীন জীবন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষ ছাড়া কারও হয়না। শৈশব কৈশোরের খেলার মাঠ, তারুন্যের মিছিল, কবিতা পাঠের আসর, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, ছাত্র মিছিল জীবনের বড় একটা অংশজুড়েই বন্ধু। বন্ধুত্ব এমনিতেই হয়না, অন্তর থেকে জন্ম নেয় এবং গভীর আবেগে তা লালিত হয়।

আমার অসুখেও কত বন্ধু দেখতে আসতে চাইলে মন ভরে গেছে তবু আসতে দেইনি করোনার ভয়ে। এ কষ্ট আমার। তারা সবাই দোয়া করছে। নিজ শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, স্কুল কলেজ, দেশ বিদেশ কত পথ কত বন্ধুর সাথে ঘুরেছি হেটেছি। কত বৃষ্টিতে ভিজেছি, জোছনায় ভেসেছি। কত জায়গায় কত আড্ডা। কত রাত দিন আড্ডায় কত হাসি কত আনন্দ। আড্ডায় কেবল সেন্স অব হিউমার নয়, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা, তর্কযুদ্ধ। এ জীবনের পরম পাওয়া। 

সুনামগন্জের প্রকৃতি পরিবার মাটি ও মানুষ পাঠ দিয়েছিলো নির্লোভ সাদামাটা জীবনের। সরলতা আবেগ বিশ্বাস জন্মগত পেয়েছিলাম। এর চড়া মূল্য দিলেও নিজেকে বদলাইনি, এ আমার শত্রু আমারই শক্তি।

পেশাগত জীবনে কত বন্ধু ছড়িয়েছে কতখানে, কত দেশে। তবু যোগাযোগ শেষ হয়নি। হৃদয়ে লালন করে রেখেছি। কত বন্ধু অকালে চলে গেছে, মনে পড়ে তাদের খুব। মন খারাপ করে। আল্লাহ তাদের বেহেসত দিন।

জীবিত সকল বন্ধু আনন্দময় দীর্ঘ জীবন লাভ করুক। বন্ধুরা ভালো থাকিস। বন্ধুত্বের কখনো মৃত্যু হয়না।

(মত-ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

news24bd.tv রিমু 

পরবর্তী খবর