সিআরবিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও আমার তিনটি প্রস্তাব

কাজী শরীফ

সিআরবিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও আমার তিনটি প্রস্তাব

কাজী শরীফ

আমরা সবাই চাই আমাদের দেশে উন্নতমানের হাসপাতাল হোক। আমরা চাই এদেশের মানুষ দেশেই সর্বোচ্চ চিকিৎসা সুবিধা পাবে। আমরা চাই সবচেয়ে কম খরচে এদেশের দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে যাবে। যদি চিকিৎসারত অবস্থায় মারাও যায় রোগীর স্বজন বলবে আল্লাহ নিয়ে গেছে। ডাক্তাররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। চিকিৎসা উন্নতমানের হয়েছে। হায়াত শেষ কিছু করার ছিল না।

এদেশের সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা কত টাকা বেতন পান আমরা সবাই জানি। আমিও সরকারি চাকুরি করি আমি অন্তত জানি। এদেশে সরকারি চাকুরি করে অসৎ না হলে কিংবা আয়ের অন্য উৎস না থাকলে বিলাসী জীবনযাপন কর অসম্ভব। সেখানে ডাক্তারদের স্ত্রী সন্তানরা আয়েসী জীবনযাপন করছে দেখলে আমার ভীষণ ভালো লাগে। আপনি ভাবতে পারেন শুধু স্ত্রী সন্তান কেন স্বয়ং ডাক্তার সাহেব আয়েশী জীবনযাপন করলে আপনার আপত্তি কী? 

আমার আপত্তি নেই। আপত্তি না থাকলেও সঙ্গতকারণে ডাক্তার সাহেব আয়েস কর‍তে পারেন না। সরকারি হাসপাতালে ডিউটি করে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখার পর তার সে সুযোগ থাকে না। ডাক্তারদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখার বিপক্ষে অনেকে অনেক কথা বললেও আমি এর পক্ষে। কারণ আমি চাই এ মেধাবী মানুষগুলো দিনে হাসপাতালে সেবা দেয়ার পর চেম্বারে কিছু রোগী দেখলেও মানুষ উপকৃতই হয়। মানুষের যেখানে উপকার হয় সেখানে ভিন্নমত থাকা অনুচিত।

এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে কেন আরও হাসপাতাল দরকার। হাসপাতাল এজন্যই দরকার সরকারি হাসপাতালগুলো আর চাপ নিতে পারছে না। বারান্দায় পর্যন্ত রোগী থাকে। উন্নতমানের বেসরকারি হাসপাতাল হলে বেশি আয়ের মানুষ সেখানে চিকিৎসা নিলে সরকারি হাসপাতালে চাপ কিছুটা কমবে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে দরিদ্র রোগীদের জন্য তুলনামূলক কম ফি নিতে পারে! আপনার আমার তাতে লাভই হবে। ক্ষতির কোন কারণ নেই।

আপনি বলতে পারেন সবই যদি ইতিবাচক কথা বলি তাহলে এ লেখার উদ্দেশ্য কী? আমার এ লেখার উদ্দেশ্য হলো চট্টগ্রামের সিআরবিতে প্রস্তাবিত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে। আমি এ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পক্ষে। তবে সিআরবিতে নয়।

আমার প্রস্তাব তিনটা।

১। চট্টগ্রামে বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়ার একটাই জায়গা অবশিষ্ট আছে। ওটায় কোন স্থাপনা হওয়া অনুচিত। হাসপাতাল এর আশেপাশে হলেও পরিবেশ আগের মত থাকবে না। 

২। রেলওয়ের যে বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি এখন সিআরবিতে আছে ওটার আরও অবকাঠামো বাড়ানো উচিত। ডাক্তার নিয়মিত থাকলে, আধুনিক চিকিৎসা উপকরণ থাকলে আমার ধারণা এ তিনতলা হাসপাতালটিও জেনারেল হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কিছু চাপ কমাতে পারে।

৩। আমি মনেকরি এ হাসপাতালটি ভাটিয়ারির আশেপাশে হওয়া উচিত। সীতাকুণ্ড, মিরসরাইয়ের মানুষ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত সেবার জন্য যাওয়া অনেক ঝক্কির। ওদিকে হলে অন্তত এক ঘন্টা সময় বাঁচবে।

প্রস্তাবিত হাসপাতালের আরও অনেক বিষয়ে কথা বলা যেত। আমি বলব না। আমার ধারণা সুধী সমাজ বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়েছেন। নীতিনির্ধারকরা বিষয়টা অনুধাবন করবেন।

আরও একটি উন্নত হাসপাতাল চট্টগ্রামে হবে তবে সিআরবির অক্সিজেনের বিনিময়ে নয়! 

এ প্রত্যাশায়- কাজী শরীফ 

লেখাটি কাজী শরীফ (সহকারী জজ ,নোয়াখালী)-এর ফেসবুক থেকে নেওয়া। (মত-ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv নাজিম

পরবর্তী খবর

ঢাকায় এতো যে ‘ড্রাই ক্লিনার্স’ সেগুলোর কাপড় ধোওয়া হয় কোথায়?

আলী রীয়াজ

ঢাকায় এতো যে ‘ড্রাই ক্লিনার্স’ সেগুলোর কাপড় ধোওয়া হয় কোথায়?

“ঢাকায় এতো যে ‘ড্রাই ক্লিনার্স’ সেগুলোর কাপড় ধোওয়া হয় কোথায়?” পাড়া-মহল্লার একেবারে গলি ঘুপচির মধ্যে যে সব লন্ড্রি সেগুলোর সাইনবোর্ডেও লেখা থাকে ‘ড্রাই ক্লিনার্স’, এগুলো তো ড্রাই ক্লিনার্স হবার কারণ নেই, একমাত্র ‘লীফা’ ছাড়া আর কারোই ড্রাই ক্লিনিংয়ের ব্যবস্থা নেই। তা হলে কাপড় ধোয় কোথায়? 

সেটা ১৯৮২ সালের কথা, আমি তখন সংবাদের ডেস্কে কাজ করি কিন্তু মাঝে মাঝে ফিচার লিখি, শেষ পাতায় ছাপা হয়। সেই সময়ে একদিন আমাদের ফটোগ্রাফার লুৎফুর রহমান বীনু'র সঙ্গে আড্ডায় এই রকমই কথা হল। বীনু বলে উঠলো – ‘রীয়াজ ভাই, চলেন এইগুলো খোঁজাখুঁজি করি।’ মহল্লার ছোট একটি লন্ড্রিতে কাপড় দিয়ে সেটাকে অনুসরণ করলাম, ছবি তুললো বীনু কখন কাপড় ধোয়ার জন্যে নেয়, কারা নেয় – শেষ পর্যন্ত কামরাঙ্গির চড়ের খালের পাশে কাপড়-ধোয়া আর শুকানো পর্যন্ত যাওয়া গেলো। সেই নিয়ে ফিচার ছাপা হলো। 

আরেকবার আমার মাথায় প্রশ্ন আসলো – ঢাকায় সকালে সবচেয়ে আগে কারা কাজে যোগ দেন। ঢাকা তখনো এতটা ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি। শীতকালের কাকডাকা কয়েকটি ভোর বীনুর মটর সাইকেলের পেছনে কাটলো আমার। ছবি তোলা হল, ফিচার লেখা হলো, ছাপা হল। কিন্তু তারচেয়ে বেশি যা হল তা হল বীনুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। বীনুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা লাগতো না, সারাক্ষণ যার মুখে হাসি লেগে থাকে সেই বীনু যে কোনও কাউকেই সহজে আপন করে নেয়। তারপরে এক পর্যায়ে আমি রিপোর্টিংয়ে এলাম, এক সাথে এ্যাসাইনমেন্ট থাকলে বীনুর সঙ্গেই যাই। আমি সংবাদ ছাড়লাম, কিন্তু বীনুর সঙ্গে দেখা হয় রাজপথে – মিছিলের ছবি তুলতে এসে বীনু ‘কেমন আছেন?’ বলতে ভোলে না। মিছিলের সামনে থাকলে বীনু সামনে অনেকটা পথ ঘুরে এসে জানিয়ে দিয়ে যায় কোথায় পুলিশের প্রস্তুতি কি। প্রেস ক্লাবে দেখা হলে বলে, ‘চা তো খাবেনই, আর কি খাবেন?’ তারপরে আমাদের পথ ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলে গেছে।

আরও পড়ুন


ঝিনাইদহে আজও ৪ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৭৩

গায়ে আগুন দিয়ে হত্যা, যুবলীগ নেতা এখনও অধরা

খুলনার চার হাসপাতালে আরও ১১ জনের মৃত্যু

ভিয়েনা সংলাপকে বিপদগ্রস্ত করছে ইরান দাবি ফ্রান্সের


১৯৯৫ সালে বিবিসি সূত্রে সাংবাদিকতায় ফেরার কারণে ঢাকার সাংবাদিক মহলে আমার যোগাযোগ তৈরি হলো, ঢাকায় নিয়মিত যাওয়া হতো, বীনু আমাকে দেখলেই এমন ভাবে কথা বলে উঠতেন যেন তাঁর সঙ্গে গতকালই কথা হয়েছে। গত কয়েক বছরে মাঝে মাঝে কথা হয়েছে, বীনু আমেরিকা এলে কথা হয়েছে, দেশে থাকলেও। আজ যখন শুনলাম বীনু নেই তখন আবারো মনে হল আসলেই জীবন খুব ছোট। এখন প্রতিদিনই কেবল মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়। বড় দুঃসময়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের মৃত্যুর খবর পাই, অপঘাতে মৃত্যুর খবর পাই, অকস্মাৎ পরিচিত জনের জীবনাবসানের খবর পাই। আহা! জীবন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

কবি যদি জানতেন তাহলে কি শৈবালকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন?

শান্তা আনোয়ার

কবি যদি জানতেন তাহলে কি শৈবালকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন?

ছোটবেলায় যখন আমি জেনেছি কীভাবে গাছ আমাদের জন্য অক্সিজেন তৈরি করে। তখন আমি বাতাসে সেই অক্সিজেন খুঁজতাম। গাছের পাতায় হাত দিয়ে দেখতাম আমাদের নিঃশ্বাসের মতো গাছের শ্বাস দিয়ে অক্সিজেন বের হচ্ছে কিনা? আমার মনের চোখে, আমি দেখতাম এক অরণ্য প্লাবিত করা বৃষ্টিপাত থেকে গাছের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চলছে। আর সেই নিঃশ্বাস প্রশ্বাস থেকে সমুদ্রের পানির মতো অক্সিজেনের বিশাল ঢেউ উঠছে।

অথচ, বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট আমাজন বিশ্বের ছয় শতাংশ অক্সিজেন উৎপাদন করে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে বাকী অক্সিজেন কোথায় থেকে আসে?

অবাক বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীর বেশিরভাগ অক্সিজেন গাছ থেকে আসে না। ৫০-৮০% অক্সিজেন আসে মূলত সমুদ্র শৈবাল থেকে।

যেহেতু পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ জলভূমি, তাই এটি যুক্তিসঙ্গত যে সূর্য জমির চেয়ে পানিতে বেশি কিরণ ছড়ায়। সমুদ্রের উপরের ২০০ মিটার বা প্রায় ৬৫০ ফুটকে বলে এপিপিলেজিক অঞ্চল।‌ ‘এপি’ যার অর্থ ‘উপরের’, এবং পেলেজিক, যার অর্থ ‘সমুদ্রের পৃষ্ঠ’। সমুদ্রের এই শীর্ষ অঞ্চলটি বেশিরভাগ সূর্যের আলোকে শোষণ করে- এবং  ওই অঞ্চলে থাকা শৈবাল, এককোষী উদ্ভিদকে সালোক সংশ্লেষণে সাহায্য করে।

সমুদ্রের এই শেত্তলাগুলো প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন উৎপাদন করে, কারণ সমুদ্রের অনেক অংশ জুড়ে এর প্রচুর পরিমাণে এই শৈবাল ছড়িয়ে থাকে। সমুদ্র শৈবাল অবশ্য সমুদ্রের প্রাণীর এক বিরাট অংশের জীবনের প্রাথমিক খাদ্য উৎস হিসেবেও কাজ করে।

অবশ্য এই শৈবাল সমুহের একটা স্টার অক্সিজেন উৎপাদক আছে প্রকলোরোক্কাস নামে এককোষী শৈবাল, যা বিশ্বের প্রায় ২০% অক্সিজেন তৈরি করে। তার মানে আমাজন রেইন ফরেস্টের উৎপাদিত এক্সিজেনের তিন গুণ অক্সিজেন প্রকলোরোক্কাস একাই তৈরি করে। 

তবে একটা কথা বলে রাখা ভালো সমুদ্র শৈবালের উত্পাদিত এই অক্সিজেনের উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি আমাদের বায়ুমণ্ডলে যায় না, তবে মহাসাগরের পানিতে শোষিত হয়ে থাকে। এই পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন থেকেই মাছেরা নিঃশ্বাস নেয়।

শৈবাল দীঘিকে নাকি এক ফোটা শিশির দেওয়ার জন্য মাথা উচু করে গর্ব করে বলেছিলো, লিখে রাখতে। আহারে আমাদের কবিকুল। এই শৈবালের দয়ায় যে তার নিঃশ্বাসের ৮০% ভাগ অক্সিজেন আসতো সেটা যদি আমাদের কবি সেই সময়ে জানতেন তাহলে কি তিনি সেই শৈবালকে এতো তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন? 

খেয়াল করে দেখবেন আমাদের সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে ক্ষুদ্র জিনিসকে তুচ্ছ করার এক অদ্ভুত প্রবণতা আছে।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

 

আরও পড়ুন:


এটাই ব্রুস লী আর কুং ফুর দর্শন

ডিএমপির ৯ পুলিশ কর্মকর্তার পদায়ন 

ফুলবাড়িয়ায় হাতকড়াসহ পালানো আসামি সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর গ্রেপ্তার

পিরোজপুরে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে গণধর্ষণ, গ্রেপ্তার ২

 news24bd.tv তৌহিদ

পরবর্তী খবর

মানহানি মামলা লইয়া দেশে এক প্রকার নৈরাজ্য চলিতেছে

মোঃ আল-ইমরান খান

মানহানি মামলা লইয়া দেশে এক প্রকার নৈরাজ্য চলিতেছে

মোঃ আল-ইমরান খান সিনিয়র সহকারী জজ, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস

মানহানি মামলা লইয়া দেশে এক প্রকার নৈরাজ্য চলিতেছে

মানহানি বিষয়ক মামলায় নৈরাজ্য এবং কতিপয় আইনগত বিশ্লেষণঃ প্রসঙ্গ অভিনেতা-অভিনেত্রী বা লেখক-প্রকাশকদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা
মানহানি মামলা লইয়া আমাদের দেশে এক প্রকার নৈরাজ্য (anarchy) চলিতেছে। কখনো কখনো এমন সকল বিষয় লইয়া মামলা হইতেছে যাহার উপর আদৌ কোন মামলা হইতে বা চলিতে পারে না; আবার কখনো এমন সকল ব্যক্তি দ্বারা মামলা দায়ের হইতেছে যাহাদের সহিত মামলার বিষয়বস্তুর দূরবর্তী কোন সম্পর্ক নাই।

অভিজ্ঞতা বলিতেছে, বেশিরভাগ মানহানির মামলায় আসামীকে বাদী কিংবা বাদীকে আসামী আদৌ চিনে না বা জানে না। আসামী হয়ত বড় কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেইখানে বাদী হয়ত ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক পদ প্রত্যাশী অতি উৎসাহী নেতা বা কর্মী। আবার এমনো ঘটনা দেখা গিয়াছে যে, আসামী কোন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র বা নাট্য ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, লেখক বা প্রকাশক যেইখানে বাদী হয়ত কোন উঠতি বয়সী পেশাজীবি।
 
যেইখানে আসামী বাদীকে চিনেই না বা তাহাদের মধ্যাকার কোন পূর্ব শত্রুতা নাই সেইখানে অপরিচিত ব্যক্তি কর্তৃক উক্ত মানিহানি মামলা দায়েরের মাহাত্ম্য কি?  লুকোচুরি না করিয়া সোজা সাপটা ভাষায় বলিতে গেলে এর পেছনে দুইটি কারণ থাকিতে পারেঃ এক, প্রতিষ্ঠিত কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করিয়া মিডিয়া ফোকাস পাইয়া নিজেকে জাহির করিবার মানসিকতা; এবং দুই, উক্ত মানহানি মামলার প্রকৃতির বিষয়ে সম্যক জ্ঞান না থাকা।
 
মানহানির মামলা এমন ব্যক্তি কর্তৃক দায়ের হওয়া উচিৎ যিনি বা যাহারা আসামীর কথন-বচন বা প্রকাশিত চিহ্নের দ্বারা পারিবারিক-সামাজিক বা অন্যভাবে সম্মানহানির শিকার হইয়াছেন। কিন্তু নাটক বা সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী-পরিচালক-প্রযোজক বা কোন পুস্তক বা পত্রিকার লেখক বা প্রকাশকের বিরুদ্ধে অনেকক্ষেত্রে মানহানির মামলা হইয়া থাকে। উক্ত সকল মামলা সমূহের স্বরুপ কি হওয়া উচিৎ উক্ত বিষয়াদি অদ্যকার এই লেখার প্রেক্ষাপট হইবে।

বর্ণিত মানহানি মামলা লইয়া আমাদের দেশে নৈরাজ্য চলিতেছে তাহার স্বরুপ তুলিয়া ধরিবার মানসে মোটা দাগে আমি দুইটি প্রশ্নকে অবর্তন করিয়া বর্তমান এই লেখাটি সম্পন্ন করিবার প্রয়াস করিবোঃ
 
প্রথম প্রশ্নঃ আগন্তুক বাদীদের কি আদৌ উক্তরুপ মামলা দায়েরের অধিকার রহিয়াছে কিনা?
 
পূর্বেই বলিয়াছি, মানহানি মামলা দায়ের করিতে হয় সেই ব্যক্তি দ্বারা  আসামীর কথন-লিখন বা বচনে প্রকৃত অর্থেই যাহার সম্মানহানি ঘটিয়াছে। সুতরাং,  প্রাথমিক সূত্র এই যে, সরাসরি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি দ্বারাই মানহানির মামলা দায়ের করিতে হইবে। তবে, এই নিয়মের কিছু ব্যক্তিক্রমও রহিয়াছে। যেমনঃ মানহানিকর উক্তি যদি মৃত ব্যক্তির নামে করা হয় যাহার দ্বারা ঐ মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকের সম্মানহানি ঘটিয়া থাকে, এমতবস্থায়,  উক্ত মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা মামলা দায়ের করিতে পারিবে। আবার ধরা যাক, কোন কোম্পানি বা বিশেষ শ্রেণীর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে (যেমনঃ ডাক্তার, প্রকৌশলী,  আইনজীবি বা এরুপ ক্লাস অব পিপল) মানহানিকর বক্তব্য প্রদান করা হইলে উক্ত collection of persons এর পক্ষে যে কেউ সংক্ষুব্ধ হইয়া মানহানির মামলা দায়ের করিতে পারিবে।

প্রশ্ন থাকিয়া যায়, কোন নাটক -সিনেমা বা পুস্তকে যদি আইনজীবি-ডাক্তার বা সমাজের বিশেষ কোন পেশাজীবীদের লইয়া গড়-পড়তায় কোন বিরুপ মন্তব্য করা হয় তাহা হইলে collection of persons এর সূত্র ধরিয়া দেশের যে কোন প্রান্তের কোন আগন্তুক ডাক্তার বা আইনজীবি কি উক্ত অভিনেতা-অভিনেত্রী-লেখক-প্রকাশকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা আনয়ন করিতে পারিবে? উপমহাদেশের উচ্চ আদালত সমূহের সিদ্ধান্ত রহিয়াছে তাহাতে এরুপ আগন্তুক ব্যক্তির উক্ত মানহানিকর মামলা দায়েরের কোন অধিকার নাই।
 
সবিস্তারে বলিতে গেলে, কোন আইনজীবি (উদাহারনস্বরুপ) যদি কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা আনয়ন করিতে চাহেন তাহা হইলে উক্ত বাদী-আইনজীবিকে দেখাইতে হইবে যে কথিত আসামী অভিনেতা বা অভিনেত্রীর কর্তৃক মানহানিকর বক্তব্য collection of persons হিসাবে ঐ নিদৃষ্ট আইনজীবিদেরকে-ই টার্গেট করিয়া বলা হইয়াছে (That the complainant was the target). আইনের ভাষায় বলিতে গেলে Such collection of persons should be identifiable and definite. A defamation case will not lie merely on the ground that the complainant falls under the category of ‘class of persons' but unidentified. 
Eastwood v Holmes (1858) মামলায় বিচারপতি Willie বলেনঃ
 
 "If a man wrote that all lawyers were thieves, no particular lawyer could sue  him unless there is something to point to the particular individual.”
Lord Atkins ও Knupffer v. London Express Newspaper (1944) মামলায় উক্ত বিষয়টি সমর্থন করিয়াছেন। 
প্রফেসর স্যামন্ড (Salmond) এর বরাতে এই বিষয়ে ব্যাখ্যায় বলা যায় যে, মানহানির মামলায় এরুপ ডাক্তার বা আইনজীবি বা অন্য কেউ ক্লাস অব পার্সনস হিসাবে নিজের সংক্ষুব্ধতা প্রকাশ করিয়া মামলা করিতে চাহেন তাহা হইলে উক্ত বাদীকে দেখাইতে হইবে যে, আসামী যে মানহানিকর বক্তব্য দিয়াছেন তাহা বাদীকে Refer করিয়া দেওয়া হইয়াছে। Vague generalization এর উপর কোন মানহানিকর মামলা চলিবে না। প্রফেসর স্যামন্ড বলেন, “ Thus no action would lie at the suit of anyone for saying that all mankind is vicious and depraved or even for alleging that all clergymen are hypocrites or all lawyers are dishonest.”

ভারতীয় নজিরের দিকে তাকাইলে দেখা যায় সেইখানকার উচ্চ আদালতসমূহ Vagueness and Indefinite গ্রাউন্ডে মানহানির মামলা অচল মর্মে অনেক সিদ্ধান্ত প্রদান করিয়াছেন। Asha Prakash and Ors v The State of Bihar (1977) মামলা  এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। উক্ত মামলার ঘটনার প্রকাশ এইরুপ যে, Nadan নামক এক সিনেমায় এক অ্যাডভোকেট চরিত্র ছিলো। বাদীর দাবী ছিলো উক্ত চরিত্র অ্যাডভোকেট সমাজের জন্য মানহানিকর। ফলে, সমগ্র অ্যাডভোকেট সমাজের পক্ষে বাদী সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী-পরিচালক-প্রযোজকদের বিরুদ্ধে উক্ত মানহানির মামলা আনয়ন করেছিলেন। কিন্তু পাটনা হাইকোর্ট নির্ধারণ করেন যে, এভাবে Vague গ্রাউন্ডে Wholesale Basis এ মানহানির মামলা চলতে পারে না। পাটিনা হাইকোর্ট তার রায়ে বলেন,

 “If they contain no reflection upon a particular individual or individuals, but  equally apply to  others  although belonging to the same class, an  action for defamation will not lie.... the class of  person attributed to  must be a small determinate body. Advocates as a class are incapable  of being defamed. If any publication can be shown to refer specifically to  particular individuals  then alone an action for defamation may lie, not  otherwise.”
 সুতরাং,  দেখা যায় যে, অ্যাডভোকেট বা কোন পেশাজীবি হিসাবে কোন অভিনেতা-অভিনেত্রী-লেখক-সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য বাদীকে শুধু তিনি যে ঐ Class of Persons দের মধ্যে পড়েন হেতু তাহার মামলা করিবার অধিকার রহিয়াছে ইহা দেখানোই যথেষ্ট নহে বরং বাদীকে উহাও দেখাইতে হইবে যে, কথিত মানহানিকর বক্তব্য বাদী যে শ্রেণীভূক্ত উহা টার্গেট করিয়া কৃত হইয়াছে। উদাহরণ স্বরুপ Sahib Singh Mehra র মামলার কথা বলা যাইতে পারে। উক্ত মামলায় বর্ণিত এক পত্রিকায় আলিগড়ের সমস্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এবং সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরদের দূর্ণীতিবাজ এবং নিয়মপরিপন্থি কাজে জড়িত থাকার বিষয়ে রিপোর্ট হইলে ভারতীয় উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, কথিত মানহানিকর বক্তব্য আলীগড়ের পিপি/এপিপি দের লক্ষ্য করিয়া বলা হইয়াছে যাহা Definite, Specific and identifiable; ফলে, আসামীদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা চলিতে পারে।
 
দ্বিতীয় প্রশ্নঃ নাটক-সিনেমায় অভিনয় বা পুস্তক-পত্রিকায় কোন রচনা প্রকাশের অভিনেতা-অভিনেত্রী-পরিচালক-প্রযোজক বা লেখক-সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হওয়া সমীচীন কিনা?
 
এক কথায় এই প্রশ্নের উওর প্রদান সমীচীন হইবে না। ইহা লেখার মান এবং মানহানিকর বক্তব্যের গ্রাভিটির উপর নির্ভর করিবে। তবে সাদামাটা চোখে যা দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলার বাদী নাম নিজেকে আলোচনায় আনিবার জন্য উক্তরুপ মামলা দায়ের করিয়া থাকেন যাহা অনভিপ্রেত।  ইহা আদালত এবং প্রসিকিউশনের উপর একটি বোঝাও বটে।
 
 Shah Rukh Khan vs State Of Rajasthan And Ors. on 20 August, 2007 মামলায় ভারতীয় সুপারস্টার শাহরুখ খান 'রাম জানে' নামক এক মুভিতে হিরোর ভূমিকায়  অভিনয় করেন। উক্ত সিনেমায় তিনি তিনটি হত্যাকান্ড সংঘটিত করিয়া বিচারের সম্মুখীন হইলে এক পর্যায়ে তিনি দোষ স্বীকার করিবার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন কিন্তু তাহার আইনজীবি তাহাকে রক্ষা করিতে চাইলে তিনি আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন যে, উক্ত আইনজীবী টাকার নিকট তাহার নীতি, মূল্যবোধ এবং আইনকে বিক্রি করিয়াছেন এবং একজন অপরাধীকে বাচাইবার প্র‍্য়াস করিতেছেন যাহার মাধ্যমে অপরাধীরা আইন হইতে রক্ষা পাইয়া যায়। হিরোর এরুপ বক্তব্য মানহানিকর দাবী করিয়া জনৈক আইনজীবী শাহরুখ খান সহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে একখানা মানহানির মামলা আনয়ন করেন। উক্ত মামলায় আদালত আসামী শাহরুখ খান সহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ Abuse of Process মর্মে Quash করিয়া আসামীগনকে মামলার দায় হইতে অব্যহতি প্রদান করেন।
 
 Shah Rukh Khan vs State Of Rajasthan And Ors. 20 August, 2007 মামলা এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, উক্ত মামলায় নাটক-সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রদত্ত ডায়লগ মানহানিকর হইতে পারে কিনা তৎবিষয়ে বিশদ আলোকপাত করেন। উক্ত মামলায় আদালত বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ প্রপোজিশন সমূহের চুম্বকাংশ এভাবে বর্ণনা করা যাইতে পারেঃ

 এক. ফিল্ম, নাটিক, বই বা সাহিত্যকর্ম এইগুলি সৃজনশীল কর্ম। উক্ত সৃজনশীল কর্মে কিছু Prize Speech রহিয়াছে। সাধারণ মতামত বা সৃজনশীল কর্মে মানহানিকর মামলা দায়ের হইলে উক্ত Prize Speech  এর কোন মূল্যায়ন থাকে না। 
 দুই. যে কোন অপরাধমূলক কর্মে আসামীর অপরাধী মনোবৃত্তি বা Criminal Mind (Intention) থাকা বাঞ্চনীয়। কিন্তু অভিনেতা-অভিনেত্রীগণ শুধুমাত্র পরিচালক বা নাট্যনির্দেশক দের স্ক্রিপ্ট বা নির্দেশনা অনুযায়ী তাহাদের চরিত্র উপস্থাপন করেন। S/He is merely parroting an imaginary character.  যেহেতু কাউকে আঘাত দেওয়া বা কারো মানহানিকর কোন পূর্ব উদ্দেশ্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের থাকে না ফলে তাহাদের বিরুদ্ধে মানহানিকর মামলা আনয়ন অযৌক্তিক।
 
 তিন. যিনি বা যাহারা আইনগতভাবে কোন কাজ করিতে বাধ্য থাকেন তিনি বা তাহারা যদি সদ্বিশ্বাসে কোন কর্ম করিয়া থাকেন তাহা হইলে তাদের উক্ত কর্ম অপরাধের আওতা বহির্ভূত হইবে। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কর্মও উক্ত বিধানের আওতায় মানহানির অভিযোগ হইতে অব্যহতিপ্রাপ্ত হইবে। [দ.বি.  ধারা ৭৯]
 চার. অপরাধ হইবে কোন ব্যক্তির সেই আচরণ যাহা Social Order এ impact ফেলিতে পারে এবং যাহা সমাজ কর্তৃক Serious Condemnation এর আওতাধীন।  কিন্তু বিনোদনের জন্য যে অভিনয় বা শিক্ষনীয় পুস্তক রচনার মধ্যে এইরুপ Social Impact বা Social Condemnation না থাকায় তাহা অপরাধের আওতাধীন হওয়া উচিৎ নহে।
 
মূলত কবি-সাহিত্যিক বা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিজস্ব চরিত্রের বাহিরে ভিন্ন চরিত্র রহিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, John Keats ২৭ অক্টোবর ১৮১৮ সালে Richard Woodhouse-কে একখানা পত্র লিখেন যাহাতে তিনি বলেন যে  ' কবিদের যে Poetical Character রহিয়াছে তাহাতে কবির কোন নিজস্বতা  নাই। অনুরুপভাবে An actor's skillful execution of a role represents his personal craft, not his personal opinion or intention.  ফলে, একজন অভিনেতার অভিনয় দক্ষতার জন্য তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হওয়া অনুচিত। সর্বোপরি,  বাক-স্বাধীনতা সংবিধান প্রদত্ত একটি মূল্যবান Gift. সৃজনশীল কর্মের দরুন যদি কাউকে মানহানির মামলায় পড়িতে হয় তাহা হইলে সংবিধান প্রদত্ত বাক-স্বাধীনতার মূল্য থাকে না। John Stuart Mills এর ‘ On Liberty (1859)’ হইতে কতিপয় বাক্যাংশের আলোকপাত করিয়া অদ্যকার রচনার যবনিকাপাত টানিবো।  John Stuart Mill বলেন, যদি মানুষের মতামতকে চেপে ধরা মানে প্রকারান্তরে  Human Race কে Robbing করা; শিল্প-সংস্কৃতির উপর খড়্গ আরোপ মানে Tyrannical System কে  আহ্বান করার নামান্তর। মুক্ত চিন্তার স্বাধীনতা দূর্ণীতি এবং বিশৃংখল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ।
 
একটা মামলা অর্থ শুধু একটা মামলা নয়। ইহা Tension Creator. সৃজনশীল কর্ম এবং সদ্বিশ্বাসে মতামত প্রকাশের জন্য যদি কাউকে আদালতের কাঠগড়ায় উঠিতে হয় ইহা একাধারে সৃজনশীলতার বিনাশ ঘটানোর পাশাপাশি ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনকে সংকুচিত করিয়া দেয়। ফলে, মানহানি মামলা দায়েরে যেমন সতর্কতা জরুরি তেমনি উক্ত মামলা গ্রহণের বিষয়েও আদালতের বিচক্ষণ ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ!

লেখাটি সিনিয়র সহকারী জজ মোঃ আল-ইমরান খান -এর ফেসবুক থেকে নেয়া হয়েছে। (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/এমিজান্নাত

পরবর্তী খবর

আগুনমুখো চাঁদটা যেন লেক অন্টারিওর পানিতে ডুব দিয়ে মাত্রই ভেসে উঠলো

শওগাত আলী সাগর

আগুনমুখো চাঁদটা যেন লেক অন্টারিওর পানিতে ডুব দিয়ে মাত্রই ভেসে উঠলো

পার্কিং লটে থামতে না থামতেই চোখটা আটকে যায়। লোকালয়ের পেছন থেকে ‘আগুনমুখো’ চাঁদটাকে মনে হচ্ছে লেক অন্টারিওর পানিতে ডুব দিয়ে ভুস করে এই মাত্রই ভেসে উঠলো যেনো! কিন্তু চাঁদের গায়ে কেউ কী  লাল একটা আভা মেখে দিয়েছে! চাঁদটা এত্তো বড় কেন আজ!

পোর্ট ইউনিয়নে লেকের ধারে জোছনা শিকারীদের ভীড় দেখে আঁচ পাওয়া যায়- এই শহরের কতো মানুষ জোছনাকে ভালোবেসে রাতের বেলা ঘর ছাড়ে!
 
ওয়াটার ফ্রন্টপার্কের ট্রেইল ধরে আমরা লেক অন্টারিওর তীরে এসে দাঁড়াই। চাঁদটা ততক্ষণে নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে রুপালী আভা ছড়াতে শুরু করেছে। সেই আভায় লেক অন্টারিওর বুক জুড়ে চোখ ধাঁধানো এক চাকচিক্যময় রূপের তৈরি হয়েছে। লেক অন্টারিওর গা ঘেষে ১৩.৫ হেক্টর সবুজ জমিনের উপর প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াটার ফ্রন্ট ট্রেইল। সেই ট্রেইল ধরে আমরা হাটতে থাকি। আমরা মানে আমি, সেরীন, নাজমা কাজী ও মহিউদ্দিন কাজী (খসরু ভাই) এবং ফারহানা আজিম শিউলি।
 
রাতের গভীর অন্ধকার আর নিস্তব্ধতায় এই ট্রেইল ধরে হাটাও যেনো ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। ভুল বললাম, ট্রেইলটা আসলে নিস্তব্ধ নয়। জোছনা কী আজ লেক অন্টারিওকে খুব বেশি টালমাটাল করে দিয়েছে! না কি দিন পেরিয়ে যাবার পর ‘অনাহুত’ অতিথির উপস্থিতি তার মনে ‘বিরক্তি’ তৈরি করেছে!

লেকটার বুকের ভেতর উথাল পাতাল করা ঢেউ এসে আছড়ে আছড়ে পরছে ট্রেইলটার পায়ের কাছে। ট্রেইলটা অতিক্রম করতে পারলেই বিশাল সবুজ অরণ্য। ঢেউগুলো কী তা হলে সবুজ প্রকৃতিতে নিজেকে মিশেয়ে দিতে চায়? কে জানে!
 
ট্রেইল ধরে আমরা হাটতে থাকি, মাথার উপর ‘আকাশ ভাঙা’ জোছনা, লেকের বুক চিরে ভেসে আসা একটা হাহাকার, আর ট্রেইলের পায়ের কাছে আছড়ে পরা ঢেউয়ের শব্দ, টানা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। এর ভেতর দিয়ে আমরা হাটতে থাকি, হাটতে থাকি, কাছাকাছি মানুষের কোনো শব্দ পাওয়া যায় না, ট্রেইলের পাশের গভীর অরণ্য থেকে হঠাৎ হঠাৎ দু একটা পাখি ডানা ঝাপটে তাদের ‘রাজত্বে’ ঢুকে পরার বিরুক্তি ছুড়ে দিচ্ছে কেবল।

আরও পড়ুন:

চীনে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮

টি-স্পোর্টসে আজকের খেলা

সিরাজগঞ্জে তিন দিনের ব্যবধানে একই পরিবারের তিন জনের মৃত্যু

চীনে গুদামে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৪

মাথার উপর ভরা পূর্ণিমার চাঁদটা তখনো অকৃপণভাবে লেক অন্টারিওর বুকে আলোর শিখা ঢেলে দেয়ায় ব্যস্ত। কাছাকাছি থাকা শুকতারাটা যেনো প্রতিযোগিতা করে করে তার দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার তুমুল প্রতিযোগিতা করছে।
  
ঘরির কাঁটা ততক্ষণে ডানদিকে হেলে পরার উপক্রম হয়েছে সেদিকে কারোই  খেয়াল ছিলো না। উপচে পরা জোছনায় ভিজতে ভিজতে লেক অন্টারিওর গহীন থেকে উঠে আসা অসাধারন সুরের মূর্চ্ছনা আর  অরণ্যের ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকে  বিহ্বল আমরা তখনো  চার  কিলোমিটার দৈর্ঘের ওয়াটার ফ্রন্ট  ট্রেইল ধরে হাঁটতে থাকি,হাঁটতে থাকি, হাঁটতে থাকি।

(মত-ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv রিমু 

 

পরবর্তী খবর

এটাই ব্রুস লী আর কুং ফুর দর্শন

শান্তা আনোয়ার

এটাই ব্রুস লী আর কুং ফুর দর্শন

শান্তা আনোয়ার

শারীরিক দক্ষতা এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাথে তাঁর করুণ অকাল মৃত্যু। যিনি মাত্র ৩৩  বছর বয়সে মারা যান। বলছিলাম কিংবদন্তি চীনা-আমেরিকান মার্শাল আর্টিস্ট, দার্শনিক, এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা ব্রুস লী'র কথা। তিনি বিরল সাংস্কৃতিক আইকনগুলির মধ্যে অন্যতম করে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। 

ব্রুস লী মারা যান মাত্র ৩৩ বছর বয়সে ২০ শে জুলাই। ভেবেছিলাম সেদিনই এই লেখাটা লিখবো। কয়েকদিন দেরী হয়ে গেলো। 

ব্রুস লীর উপরে একটা বই আছে, "আর্টিস্ট অব লাইফ" নামে। এটা না পড়লে জানা সম্ভব না না ব্রুস লীকে শুধু মার্শাল আর্টিস্ট, অভিনেতা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়না, তাকে দার্শনিক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। 

“দার্শনিক” শব্দটাকে আমি খুব সতর্কতার সঙ্গেই ব্যবহার করছি কারণ, কয়েকদিন আগে বাংলাদেশে কাকে দার্শনিক বলা যাবে আর কাকে দার্শনিক বলা যাবেনা সেটা নিয়ে মহা হুলুস্থূল লেগে গিয়েছিলো। এই লেখাটাকে আপনারা অবশ্য ব্রুস লীর উপরে লেখা "আর্টিস্ট অব লাইফ" এর একটা রিভিউ বলতে পারেন।   

ব্রুস লীর একজনই মার্শাল আর্টের শিক্ষক ছিলেন 'ইপ ম্যান' যার নাম।  তেরো থেকে আঠারো বছর এই পাঁচ বছর তিনি মার্শাল আর্ট শিখেছিলেন। ইপ ম্যান কে নিয়ে অনেক সিনেমাও হয়েছে হলিউডে।  ইং উইং চুনের মূল নীতিগুলি দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রাচীন চীনা মার্শাল আর্টকে ব্রুস লী নিজের কৌশলের সাথে মিলিয়ে মার্শাল আর্টের নতুন ধারার সুচনা করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি হংকং থেকে চলে আসার পরে ব্রুস লি মার্শাল আর্টের ধারা উইং চুন  নিজস্ব মার্শাল আর্টের ধারাকে অভিযোযিত করে  জুন ফ্যান গুং ফু মার্সাল আর্টের ধারা তৈরি করেছিলেন। এর আক্ষরিক অনুবাদ: ব্রুস লি'র কুংফু। ব্রুস লীর কুং ফু এর পরে আমেরিকাতে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

ব্রুস লীর দর্শন ছিলো “জীবনকে পানির মতো করে তোলো”। এই পানির মেটাফোরে তিনি কীভাবে আবিষ্কার করেছিলেন তা জানা যায়না। তবে ব্রুস লী লিখেছিলেন, যখন তিনি তার মার্শাল আর্ট শিক্ষকের দেখিয়ে দেয়া একটা কৌশল রপ্ত করতে পারছিলেন না। তখন তার ট্রেইনার বলেছিলেন,  প্রাকৃতিক বাঁক অনুসরণ করে নিজেকে রক্ষা করবে এবং প্রকৃতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। 

নিজেকে কখনই প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর কথা মনে করবে না; কখনই কোনও সমস্যাকে সামনে থেকে মোকাবেলা করতে যাবেনা, সমস্যার বাক, তার চলন তার গতি খেয়াল করো। আর তার সাথেই চলতে চলতে তাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করো।”

সেদিন ইপ ম্যান ব্রুস লিকে প্রাক্টিস না করে একটা সপ্তাহ ঘরে বসে থাকতে বলেছিলেন। মার্শাল আর্টের সেই কৌশল রপ্ত করতে না পারার হতাশা তো আছেই তার উপরে ইপ ম্যানের জ্ঞানের কথা ব্রুস লীকে শান্ত করতে পারলো না। হতাশা কাটাতে ব্রুস লী সমুদ্রে নৌকা বাইতে যায়। সাগরে হাওয়াতেও ব্রুস লীর হতাশা কাটেনা। তীব্র হতাশায় রাগে বিরক্তিতে ব্রুস লী পানিতেই ঘুষি মারেন। 

ঠিক তখনই -  হঠাৎ একটি চিন্তা ব্রুস লীর মাথায় এলো। এই পানিই তো আগামীর কুং ফুর দর্শন, ব্রুস লীর দর্শন। পানিকে আমরা সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করলেও - পানি আহত হয়না!  এই পানি, বিশ্বের সবচেয়ে নরম পদার্থ যা সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম পাত্রে থাকতে পারে, আবার মহাসমুদ্রেও থাকতে পারে।পানি দুর্বল হলেও তা বিশ্বের সবচেয়ে শক্ত পদার্থ রুপান্তরিত হতে পারে। পানিকে আঘাত করা না গেলেও সেই পানি দুনিয়াতে মহাপ্রলয় ঘটয়ে দিতে পারে। জলোচ্ছাসের শক্তির সামনে যেকোন শক্তিই অসহায় হয়ে যায়। 

আরও পড়ুন:


শ্রদ্ধার ফুলে ঢেকে গেল ফকির আলমগীরের মরদেহ

স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাসব্যাপী আগস্টের কর্মসূচী ঘোষণা

জার্মানিতে বন্যায় প্রাণহানির ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শোক প্রকাশ

রেকর্ড গড়েই টোকিও অলিম্পিকের প্রথম সোনা জিতলেন চীনা তরুণী


পানি এতই সূক্ষ্ম যে এর এক হাতের মুঠোয় ধরা অসম্ভব; আবার এতো বিশাল জলরাশি সে তৈরি করতে পারে যা মহাসাগরও ধারণ করতে পারেনা। পানিকে আঘাত করা যায়, তবুও তা আহত হয় না; ছুরিকাঘাত করেও রক্তাক্ত করা যায় না; পানিকে কেটে ফেলা যায়না, বিভক্ত করা যায়না।

পানির নিজস্ব কোনও আকৃতি নেই তবে এটি যেই পাত্রে থাকে সেই পাত্রের আকার ধারণ করে। বাষ্পে উত্তপ্ত হলে পানি অদৃশ্য হয় তবে অদৃশ্য অবস্থাতেই এই বাষ্প বিপুল শক্তি ধরে। পানি কখনো  নায়াগ্রা জলপ্রপাতের মতো অশান্ত এবং কখনো স্থির পুকুরের মতো শান্ত, জলোচ্ছাসের মতো ভয়ঙ্কর এবং উত্তপ্ত গ্রীষ্মের দিনে বসন্তের মতো সতেজ। পানি শান্তভাবে প্রবাহিত হতে পারে আবার ধংস করে দিতে পারে। 

কুং ফুর শিক্ষা পানির প্রকৃতির মতো হয়ে ওঠা। এটাই ব্রুস লীর আর কুং ফুর দর্শন। ব্রুস লীর এই দর্শন তার একটা টিভি ইন্টারভিউয়ে সে নিজেই ব্যখ্যা করেছে। ব্রুস লীর সাথে তার বিখ্যাত উক্তি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে, “বি ওয়াটার মাই ফ্রেন্ড”। 

কমেন্ট বক্সে একটা ভিডিও লিংক দিলাম, সেখানে তার সেই সাক্ষাৎকার দেখতে পাবেন।

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন:

 (মত-ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv নাজিম

পরবর্তী খবর