‘হাউস পার্টি’ থেকেই ছড়াচ্ছে ভয়ংকর নতুন মাদক
‘হাউস পার্টি’ থেকেই ছড়াচ্ছে ভয়ংকর নতুন মাদক

ক্রিস্টাল মেথ

‘হাউস পার্টি’ থেকেই ছড়াচ্ছে ভয়ংকর নতুন মাদক

অনলাইন ডেস্ক

রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরাসহ অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাটে ‘হাউস পার্টি’র নামে মদ, সিসা, গাঁজা, ইয়াবার সঙ্গে ক্রিস্টাল মেথসহ (আইস) বিভিন্ন নতুন মাদক সেবনের আড্ডা বসানো হচ্ছে। ঘরোয়া ‘ডিজে পার্টি’ বা ‘রিক্রিয়েশন পার্টি’র নামে ফ্ল্যাটগুলোতে চালানো হচ্ছে রমরমা মাদক কারবার।  

এখানে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের ‘নিউ এক্সপেরিমেন্টের’ নামে লাইসার্জিক এসিড ডাই-ইথালামাইড (এলএসডি), ডাইমিথাইলট্রিপ্টামাইন (ডিএমটি), গাঁজার কেক, ম্যাজিক মাশরুম ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে মাদক কারবারি চক্রের সঙ্গে মিলে এসব হাউস পার্টির আয়োজকরা নতুন ধরনের এসব মাদক সরবরাহ করছেন।

এমন সব তথ্য পেয়ে নজরদারি করছেন পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) গোয়েন্দারা।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া প্রতারকচক্রের হোতা শরফুল হাসান ওরফে মিশু হাসান এবং তাঁর সহযোগী মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসান অভিজাত এলাকায় ইয়াবার সঙ্গে আইস সরবরাহ করতেন বলে তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। খামারের জন্য বিদেশি গরু আমদানির নামে তাঁরা গরুর পেটে করে আইস, ইয়াবা, এলএসডি এনেছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারকৃত প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ ও চিত্রনায়িকা পরীমনির কস্টিউম ডিজাইনার জিমি হাউস পার্টিতে মাদক সরবরাহকারী চক্রের অন্যতম সদস্য। এ ছাড়া শাকিল, জবির খান, জমিল, নাতাশা, নাজিম সরদার, তুহিনসহ কয়েকজনের নাম পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তাঁরাও হাউস পার্টিতে মদের পাশাপাশি ইয়াবা, আইসসহ নতুন মাদক সরবরাহ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, কথিত মিডিয়াকর্মী এবং বিদেশে থাকা কিছু যুবকের মাধ্যমে অনলাইনে ও অফলাইনে চলছে পার্টির নামে নতুন মাদকের কারবার।

একাধিক সূত্র জানায়, পরীমনি, পিয়াসা, মৌ, রাজ, মিশু, জিসানসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর হাউস পার্টিতে নতুন ধরনের মাদক সরবরাহকারী চক্রগুলো গাঢাকা দিয়েছে। তবে তাঁদের কারবার বন্ধ হয়নি। অনেক আসক্ত ব্যক্তি পার্টি না হলেও বাসায় বসেই মাদক পাচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে সহযোগীদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

গত ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান গলা কেটে প্রকাশ্যে আত্মহত্যা করার মর্মান্তিক ঘটনার সূত্র ধরে আলোচনায় আসে নতুন মাদক এলএসডি। সর্বশেষ নায়িকা পরীমনির বাসা থেকেও এলএসডি জব্দ করেছে র‌্যাব। হাফিজুর রহমান ঘটনার আগে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে এলএসডি সেবন করেছিলেন। তাঁর তিন বন্ধুসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, অভিজাত এলাকায় হাউস পার্টিতে অনেকে এখন এলএসডি ও আইস সেবন করছে। অনলাইনে সংগ্রহ করা হয় এলএসডি।

সূত্র জানায়, গত ২৬ জুন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে ডিএমটিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে তদন্তে জানা গেছে, উত্তরায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে তাঁরা নতুন মাদকের আখড়া তৈরি করেছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের একজন সৈয়দ মঈন উদ্দিন আহমেদ ওরফে শাদাব পাঁচ বছর আগে থাইল্যান্ডে পড়তে গিয়ে ডিএমটিতে আসক্ত হন। হাউস পার্টির নামে অবৈধ কাজে নাম আসা জবির খান থাইল্যান্ডে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। দেশে নতুন মাদকের প্রচলন ঘটানোর অপকর্মের পেছনে তাঁরও হাত রয়েছে। শাকিল নামের অরেকজন তাঁর পার্টিতে ইয়াবার সঙ্গে আইস রাখেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারের সময় মিশু হাসানের কাছ থেকে সাড়ে ১৩ হাজার ইয়াবা এবং সিসার উপাদান জব্দ করেছে র‌্যাব। পিয়াসা, মৌসহ কথিত কিছু নারীকে নিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাততে মিশু মাদক ব্যবহার করেন। জিসান ও তাঁর সিন্ডিকেট গরুর পেটে করে নতুন মাদক নিয়ে আসেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। গুলশান-বনানীকেন্দ্রিক অভিজাত মাদকচক্রে তাঁরা জড়িত। মিশু হাসান প্রায়ই বিদেশে যেতেন। এসব ভ্রমণে তিনি ছোট ছোট চালানে বিদেশি মাদক নিয়ে আসতেন বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। গুলশান থানায় মাদকের মামলার পর খিলক্ষেত ও ভাটারা থানায়ও মাদকের মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। একটি পর্নোগ্রাফি এবং একটি চাঁদাবাজির মামলাও করা হয়েছে। তিন মামলায় মিশুকে ৯ দিন হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে সিআইডি।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসির একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, বারিধারার একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে আইসে আসক্ত উচ্চবিত্ত পরিবারের তিন যুবককে পাওয়া গেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, গুলশানে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে পার্টিতে মদের সঙ্গে তাঁরা এখন ইয়াবা ও আইস সেবন করেন। নিউ এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে তাঁরা এই মাদকদ্রব্য নিচ্ছেন। সেসব পার্টিতে সুন্দরী নারী-মডেলদের সঙ্গে সময় কাটানোর অফারও দেওয়া হয় তাঁদের।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, মিশু ও জিসান চক্রের সদস্য ১০ থেকে ১২ জন। তাঁরা অভিজাত এলাকায় পার্টির নামে বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করে থাকেন। পার্টিতে তাঁরা অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নেন। পার্টিতে অংশ নেওয়া ক্লায়েন্টদের গোপন ছবি ধারণ করে অপব্যবহার করতেন তাঁরা। তাঁদের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। সেখানে হয়তো আরো তথ্য পাওয়া যাবে।

আরো ছয় মামলার তদন্ত সিআইডিতে : হেলেনা জাহাঙ্গীর, পরীমনিসহ সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃতদের আরো ছয়টি মামলার তদন্তভার অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তর করা হয়েছে। এর আগে আটটি মামলা সিআইডতি পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত ১৪টি মামলার তদন্ত করছে এ ইউনিট।

আরও পড়ুুুন:


ফরিদপুরে একদিনে ৬ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ৯৮

পিএসজির হয়ে অনুশীলন করলেন মেসি (ভিডিও)

চতুর্থবারের মতো পদ্মা সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কা


তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পরীমনি, রাজ, মিশুসহ পাঁচজন রিমান্ডে রয়েছেন। বাসায় তল্লাশির সময় ছয়টি গাড়ি জব্দসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে তদন্ত চলছে এখন। আজ শেষ হচ্ছে রিমান্ডের মেয়াদ। মাদকের মামলাগুলোতে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজাদ রহমান জানান, ৫ আগস্ট জিসান ও পিয়াসার বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলা, বনানী থানায় রাজ ও সবুজের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা, ভাটারা থানায় জিসানের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা, একই থানায় মিশু হাসানের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের মামলা এবং জিসান ও মিশু হাসানের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে করা মামলার তদন্ত সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া গুলশান থানায় গত ৩০ জুলাই হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলা সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। সূত্র: কালেরকণ্ঠ

news24bd.tv নাজিম