তালে বান কি যুদ্ধে জিতেছে, নাকি অন্য কোনো খেলা?
তালে বান কি যুদ্ধে জিতেছে, নাকি অন্য কোনো খেলা?

তালে বান কি যুদ্ধে জিতেছে, নাকি অন্য কোনো খেলা?

Other

তালে বান দ্বিতীয়বারের মতো আফ গানিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অবসান হয়েছে দেশটিতে ২০ বছরের মার্কিন নেতৃত্বাধীন শক্তির আনুষ্ঠানিক দখলদারিত্বের।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই এই ঘটনাকে তালেবানের কাছে মার্কিন বাহিনীর পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার একে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গেও তুলনা করছেন।

কিন্তু মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী কি আসলেই তালে বানদের কাছে পরাজিত হয়েছে? কিংবা তালে বান কি আসলেই যুদ্ধে জিতে গেছে? নাকি পর্দার আড়ালে হয়েছে অন্য কোনো খেলা?

এ প্রশ্নের উত্তর পেতে চলুন, রাজনীতির বাইরে আফ গান অর্থনীতি ও প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করা যাক।
আফ গান অর্থনীতি আসলে ড্রাগ ইকোনমি আর ওয়ার ইকোনমির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আফ গানিস্তান হলো বিশ্বের এক নম্বর পপি তথা আফিম উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বের মোট আফিমের ৮০ শতাংশই উৎপাদিত হয় আফ গানিস্তানে। এই আফিম মধ্য এশিয়ার দেশগুলো হয়ে চলে যায় ইউরোপে। যেখানে গিয়ে রূপ নেয় হেরোইনে।

হেরোইন ব্যবসার সঙ্গে রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পর্ক। কিন্তু সাধারণ দরিদ্র কৃষক যে সেই হাজারো কোটি ডলারের ভাগ পায় না, এই সত্য বুঝতে বিরাট বিজ্ঞানী হওয়ার দরকার পড়ে না।

বিশ্বের বড় বড় সব ব্যবসায়ী আফিম উৎপাদনের জন্যে বিনিয়োগ করে আফ গানিস্তানে। যা ফুলে-ফেঁপে হাজার গুণ হয়ে চলে যায় তাদের পকেটে। যথাযথ রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর থাকলে তা যে সম্ভব হবে না, এ কথা ব্যবসায়ীরা ভালোই বোঝেন।
বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অনুপস্থিতিতে তালে বানই হলো একমাত্র শক্তি, যাদের রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃতি। তাই, আফিম আর হেরোইন ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে নিয়ে যেতে হলে দরকার তালে বানেরই।

এ ছাড়া, দেশটিতে রয়েছে মূল্যবান খনিজ আর বনজ সম্পদের বিশাল সম্ভার। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকার কারণে এর সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র। আর এসবের মোড়লও পশ্চিমের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। হেরোইন ব্যবসার মতোই খনিজ আর বনজ সম্পদের ব্যবসারও নিয়ন্ত্রক তারাই, যাদের কাছে তালে বান হলো অধিক উপযোগী বিকল্প।

করোনা মহামারির সময়েও চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি আফগানিস্তান বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সালমাই খালিলজাদ এক ঝটিকা সফরে কাতারের রাজধানী দোহায় তালে বান নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করেন। আপাত উদ্দেশ্য বলা হয়, তালে বানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা।

এর ঠিক এক মাস পরই তালে বান মুখপাত্র শাহীন সুহাইল এক বিবৃতিতে জানান, তারা (তালে বান) প্রস্তাবিত ট্রান্সন্যাশনাল গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

উল্লেখ্য, প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিতব্য এই প্রকল্প একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথা। যার ৫৪ শতাংশ শেয়ার ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক মার্কিন কোম্পানি ইউনোকোলের।

এছাড়া, রয়েছে অয়েল পাইপ লাইনের বিষয়। তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানের আরব সাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রকল্পেরও মূল বাস্তবায়নকারী হলো ইউনোকোল। এক্ষেত্রেও তালে বানদের কাছ থেকে সমর্থন আদায় করা হয়ে গেছে। ইউনোকোল অনেক আগেই বলে দিয়েছিল যে, তালেবানরা ক্ষমতায় থাকলে তাদের ব্যবসা করতে সুবিধা হয়।

এবারে আসা যাক আফ গান অর্থনীতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। সেটা হলো ওয়ার ইকোনমি। আফ গানিস্তানে মার্কিন বাহিনী গত ২০ বছর ধরে তালে বান দমনের নামে বিলিয়ন ডলারের এক নিরাপত্তা ব্যবসার জাল বিস্তার করে রেখেছে। এক বাগরাম ঘাঁটিকে ঘিরেই বছরে হাজারো কোটি ডলারের ব্যবসা হয় বলে ধারণা করা হয়।

কিন্তু সবকিছুর মতো ব্যবসারও একটা স্যাচুরেশন পয়েন্ট থাকে। যেখানে পৌঁছে গেলে ব্যবসায়ীরা পুরনো ব্যবসা গুটিয়ে নতুন ব্যবসা খোঁজে। মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা যখন বুঝেছে তাদের এই ব্যবসা থেকে ভবিষ্যৎ লাভের অঙ্ক কমে আসছে, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যবসা গোটানোর। আর এ কথা কে না জানে যে, অস্ত্র আর ওষুধ কোম্পানিগুলোই নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিন রাষ্ট্রীয় পলিসি।

এসব বিশ্লেষণ থেকে মনে হচ্ছে, আফ গানিস্তানে যা ঘটছে, তা সমঝোতার মাধ্যমেই ঘটেছে। কেউই এখানে হারেনি। উইন-উইন খেলায় কেউ হারে না। যদি কেউ হেরে থাকে, তারা হলো ওই দেশের জনগণ।  (ফেসবুক থেকে নেওয়া)

লেখক : হারুন আল নাসিফ : কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক।

news24bd.tv তৌহিদ

সম্পর্কিত খবর