মাহফুজ আনামরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চক্রান্তে লিপ্ত: হিন্দু মহাজোট
মাহফুজ আনামরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চক্রান্তে লিপ্ত: হিন্দু মহাজোট

মাহফুজ আনামরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চক্রান্তে লিপ্ত: হিন্দু মহাজোট

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘মাহফুজ আনাম তার সম্পাদিত ইংরেজি ডেইলি স্টার পত্রিকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কল্পকাহিনি ছাড়িয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। হিন্দু আইন সংস্কারের নামে কূটকৌশল নিয়েছেন। তারা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চক্রান্তে লিপ্ত। ’

রোববার (২২ আগস্ট) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নসরুল হামিদ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে হিন্দু ধর্মীয় আইন পরিবর্তন প্রচেষ্টার প্রতিবাদে হিন্দু সম্প্রদায়ের সকল ধর্মীয় সংগঠনের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তেব্যে এসব কথা বলা হয়।

একাধিক হিন্দু সংগঠনের নেতার উপস্থিতিতে এই সংবাদ সম্মেলনে ১৯৩৭ সালের আইনের কথা উল্লেখ করে আরও বলা হয়,  স্বামীর সম্পত্তি হিন্দু নারী পান না, এই অপবাদ দিয়ে আপনারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন।

লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন হিন্দু মহাজোটের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রতিভা বাগচি।

এসময় তিনি বলেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি এনজিও হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা সুসংহত হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে অশান্তির বীজ বপন করছে। ১০ হাজার বছরের পুরনো এই হিন্দু পরিবার ব্যবস্থা ধ্বংস করে বাংলাদেশকে হিন্দুশূন্য করার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে চক্রটি। তাদের দুরভিসন্ধি হাসিলে হিন্দু আইন সংস্কারের জন্য আইন কমিশনে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। যার নেতৃত্বে আছেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক শাহীন আনাম ও তাঁর স্বামী মাহফুজ আনাম সিন্ডিকেট।  

তিনি আরও বলেন, হিন্দু পারিবারিক সম্পত্তি বিভাজন করে ব্যক্তি কেন্দ্রিক সম্পত্তি বণ্টন, বিবাহ বিচ্ছেদ, হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক ও শাস্তির বিধান, দত্তক, ভরণ-পোষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে হিন্দু ধর্ম শাস্ত্রীয় পবিত্র বিধি-বিধান পরিবর্তনের চক্রান্ত করছে। আর এটা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভেদ ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে হিন্দু সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের’ পরিচালক শাহীন আনাম ও ‘বাঁচতে শেখা’র পরিচালক এঞ্জেলা গোমেজের নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে সভা-সেমিনার করে হিন্দু বিধিবিধান সম্পর্কে মিথ্যা ও বিদ্বেষমুলক তথ্য প্রচার করছে। সারাদেশের হিন্দু সমাজের মধ্যে একটা অস্থিরতা সৃষ্টি পাঁয়তারা চালাচ্ছে।

শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধেও হিন্দু সম্প্রদায়কে ক্ষেপিয়ে তোলার গোপন মিশনের মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছে সংগঠনটি। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, শাহীন আনাম সিন্ডিকেটের এই অপতৎপরতার কারণে সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায় মনে করছে এই সরকার আমাদের ধর্মীয় বিধি-বিধান ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস শুধু নষ্ট হচ্ছে না, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিও হিন্দু সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে। এইভাবে শাহীন আনাম গং কৌশলে হিন্দু সম্প্রদায়কে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার নীল নকশা বাস্তবায়নের পাঁয়তারা করছে। তারা আওয়ামী লীগ সরকার ও হিন্দু সম্প্রদায়কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

অন্যদিকে, মাহফুজ আনাম তার সম্পাদিত ডেইলি স্টারে কল্পকাহিনী ছাপিয়ে হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে বলে দাবি করে সংগঠনটি। প্রতিভা বাগচী বলেন, অতীতেও মাহফুজ আনাম ও শাহীন আনাম গংদের দেশবিরোধী নানা চক্রান্তের কথা সবাই জানেন। তারা কীভাবে এক-এগারোর সময়ে দেশকে রাজনীতিশূন্য করতে চেয়েছিল। রাজনীতিবীদদের চরিত্রহরণ করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ তাদের পছন্দ নয়। তারা চায় দেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠুক, বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করাই যেন তাদের ধ্যানজ্ঞ্যান। কৌশলে তারা অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় আসার পথ উন্মুক্ত করার প্রয়াস চালান। ওই চক্রের সঙ্গে দেশি-বিদেশি কিছু ষড়যন্ত্রকারী যুক্ত হয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে।  

তিনি আরও বলেন, দেশে অনেক ইস্যু থাকলেও হাজার বছর আগের মীমাংসিত ইস্যুকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। হিন্দু আইন সংস্কারের নামে বিভেদ সৃষ্টির কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু মানুষ এখন আর এতো বোকা নয়, অনেক সচেতন, তারা সহজেই চালাকি ধরে ফেলতে পারে। তারা দেশের বাইরে থেকে ফান্ড এনে গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে। চক্রটি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চায়। তারা আসলে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ও বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে। চক্রটির এসব হীন তৎপরতায় বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটসহ হিন্দু ধর্মালম্বীদের ২৩টি সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সারাদেশের প্রায় পৌনে দুই কোটি হিন্দু সমাজ চরম উদ্বিগ্ন। আমরা মনে করছি তাদের অপতৎপরতা সফল হলে হিন্দু সমাজের মধ্যে সংঘাত-গৃহবিবাদ অনিবার্য। অতীতে তাদের এসব অপচেষ্টা বন্ধে অনুরোধ জানালেও চক্রটি অপতৎপরতা থেকে নেই।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, শাহীন আনাম এর আগে ২০১৭-১৮ সালে তার এক কর্মচারীকে দিয়ে হিন্দু ধর্মে তালাক প্রথা চালু করার জন্য রিট দায়ের করেন। তখন কোর্ট বিষয়টি শুনানীযোগ্য নয় বলে খারিজ করে দেয়। হিন্দু বিবাহে বর ও বধুকে নানা বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়। এই বৈদিক মন্ত্র হলো, পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ থেকে সংকলিত। বিবাহের মন্ত্রগুলো কোনো পুরুষের রচিত নয়; মন্ত্রদ্রষ্টা নারী ঋষি সূর্যার নিকট আবিভূত হয়েছিল। আর বিয়ের সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি স্ত্রী আচার দিয়ে মহিমামণ্ডিত। যে বিধান হাজার হাজার বছর ধরে এই নারী ঋষির তৈরি এই বিবাহ ব্যবস্থা অবিকৃতভাবে চলমান থেকে শান্তিপূর্ণ পরিবার ব্যবস্থা উপহার দিয়ে চলেছে। এই মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে দুটি হৃদয়, দুটি মন, দুটি শরীর একসূত্রে গ্রথিত হয়। হিন্দু নারী পুরুষের জীবনে আসে অর্ধাঙ্গীনি হিসাবে; তাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। হিন্দু কুমারী যখন বিয়ের পিড়িতে বসে তখন রাজরাণীর মুকুট পড়ে বসে। রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার ফলে দুষ্ট মানুষেরা বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিয়ে গোপনে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করে সহজ সরল নারীদের প্রতারিত করবে। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য নষ্ট হবে; ধর্মীয় বিশ্বাস নষ্ট হবে। অতএব তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ যে নামেই হোক না কেন কোনটাই হিন্দু সমাজ মেনে নেবে না।

শাহীন আনাম চক্র অনেক দিন ধরেই হিন্দু ধর্মের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে এবং সামান্য কিছু অনৈতিক ও বিকৃত রুচির নর-নারীর জন্য কোটি কোটি জনগণকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলা ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করে সংগঠনটি। ‘গুটিকয়েক পাশ্চাত্য চিন্তা চেতনার অসুস্থ মস্তিষ্ক ও বিকৃত রুচির হৃদয়হীন নর নারীর কারণে লক্ষ লক্ষ নারী ও শিশুর জীবন বিপন্ন হতে দেওয়া যায় না; সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও খুনি তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া যায় না। ’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, হিন্দু মহাজোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট বিধান বিহারী গোস্বামী, সহ-সভাপতি প্রদীপ কুমার পাল, মহাসচিব অ্যাডভােকেট গােবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, যুগ্ম মহাসচিব সুজন দে, অ্যাডবোকেট লাকী বাছার, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক নরেশ চন্দ্র হালদার, প্রকাশনা সম্পাদক সাগরিকা মন্ডল, হিন্দু মহাজোট ঢাকা মহানগরের সভাপতি ডিকে সমির, বাংলাদেশ মতুয়া মহাসংঘের মহাসচিব সাগর সাধু ঠাকুর, হিন্দু আইন সংশােধন প্রতিরােধ কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভােকেট জে.কে পাল, হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতির সভাপতি অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, প্রণব মঠ ঢাকা’র অধ্যক্ষ স্বামী সঙ্গীতানন্দ মহারাজ, ব্রাহ্মণ সংসদের সভাপতি কর্নেল (অব.) নিরঞ্জন ভট্টাচার্য, মহাসচিব বিজয় কৃষ্ণ ভট্টাচার্য, ইসকনের ফুড ফর লাইফ এর পরিচালক রূপানুগ গৌরদাস ব্রহ্মচারী, সত্সংঘ বাংলাদেশের সভাপতি ড. রবীন্দ্রনাথ সরকার, সানতন বিদ্যার্থী পরিষদের সভাপতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কুশল চক্রবর্তী, বৈদিক সমাজ বাংলাদেশ সভাপতি স্বামী চিদানন্দ সরস্বতী, বৈদিক কৃষ্টি সংরক্ষন প্রক্রিয়ার প্রধান আচার্য রবীন্দ্রনাথ দেবনাথ, যােগী অরুণ জ্যোতি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সহদেব বৈদ্য, হরিগুরু সেবা সংঘের সভাপতি নির্মল ঠাকুর, হিন্দু ল ইয়ার্স অর্গানাইজেশনের সভাপতি সিনিয়র এ্যাডভােকেট নারায়ন চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভােকেট শঙ্কর দাস, বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ সাধারণ সম্পাদক সাজন মিশ্র, হিন্দু মহিলা মহাজোটের সহ-সভাপতি কাকলী নাগ, দেবী হালদার, সাধারণ সম্পাদক মুক্তা বিশ্বাস, বাংলাদেশ সেবা সংঘের বাবুল হাওলাদার সহ শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

news24bd.tv এসএম