সূরা বাকারা: আয়াত ৩৬-৩৭, আদম (আঃ) এর উপর শয়তানের প্রতিহিংসা
সূরা বাকারা: আয়াত ৩৬-৩৭, আদম (আঃ) এর উপর শয়তানের প্রতিহিংসা

সূরা বাকারা: আয়াত ৩৬-৩৭, আদম (আঃ) এর উপর শয়তানের প্রতিহিংসা

অনলাইন ডেস্ক

পবিত্র কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ সূরা আল-বাকারা আলোচনার আজকের পর্বে সূরা আল-বাকারা’র ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৩৬ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন - 

فَأَزَلَّهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ (36)

"এরপর শয়তান, আদম ও তার স্ত্রীকে পথভ্রষ্ট করল এবং তারা যে বেহেশতে ছিল সেখান থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করল। সে সময় তাদেরকে বললাম তোমরা নীচে নেমে যাও একে অন্যের শত্রু হিসাবে। পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।

"(২:৩৬)

আগের পর্বেও আমরা হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টির ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছি। তখন বলেছিলাম আল্লাহপাক হযরত আদম ও বিবি হাওয়ার জন্য বেহেশতের মত একটি বাগানে বসবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানে তাদের জন্য সব ধরনের খাবার ও ফলমূলের ব্যবস্থা করা হয়। শুধু নিষেধ করা হয় একটি বিশেষ গাছের ফল খেতে। কারণ ওই ফল ছিল তাদের জন্য ক্ষতিকর এবং তা খেলে তাতে তাদের আত্মার ওপর জুলুম হবে। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে হযরত আদমকে সেজদা না করায় শয়তান আল্লাহর দরবার থেকে বহিষ্কৃত হয়। আর এজন্য শয়তান প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে। তার সব রোষ গিয়ে পড়ে হযরত আদম (আ.)-এর ওপর। শয়তান প্রতিশোধ নেয়ার চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠে। যেভাবেই হোক হযরত আদমকে শান্তিপূর্ণ ও আরামের স্থান থেকে বহিষ্কার করবে বলে ঠিক করল। যেমন ভাবা তেমন কাজ। শয়তান নানা কূটবুদ্ধি, ওয়াসওয়াসা ও চাল চেলে বুঝালো যে, সে হযরত আদম আর বিবি হাওয়ার মঙ্গল চায়। ওই নিষিদ্ধ ফলের সীমাহীন প্রশংসা আর উপকারিতা বর্ণনার ফলে একসময় সত্যি সত্যিই হযরত আদম আর বিবি হাওয়া শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে ফেললেন। শেষ পর্যন্ত শয়তানের কুমন্ত্রণায় তারা ওই নিষিদ্ধ ফল খেলেন। হযরত আদম (আ.) এবং বিবি হাওয়ার অবশ্য আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে চাননি। কিন্তু তাদের অবস্থা ছিল অনেকটা ওই শিশুর মতো, যাদের ধোঁকাবাজি ও কুটকৌশল বুঝার কোন অভিজ্ঞতাই নেই। শিশু যেমন সবাইকে সৎ সত্যবাদী মনে করে তেমনি সৃষ্টির প্রথম মানব হযরত আদম ও প্রথম মানবী বিবি হাওয়া শয়তানকে সত্যবাদী ভেবে বসল। শয়তান যখন কসমের পর কসম খেয়ে তাদেরকে নিষিদ্ধ ফলের উপকারিতা ও গুণাগুণ বর্ণনা করল তখন তারা তাকে সরল শিশুর মতো বিশ্বাস করে ধোঁকা খেল। এভাবে তারা আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত কাজ করে ফেলল, আল্লাহও তাদেরকে বেহেশত থেকে বের করে দিলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এল 'তোমরা আল্লাহর দরবার থেকে নীচে নেমে যাও। শয়তান ও তোমরা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়ে গেছ এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে পৃথিবীতে বসবাস করতে হবে। '

আদমকে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীতে তার খেলাফত বা প্রতিনিধিত্ব করা। তাই হযরত আদমকে পৃথিবীতে আসতেই হতো। এজন্য আল্লাহপাক প্রথমে তার জন্য সমস্যামুক্ত শান্তিপূর্ণ একটি স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা করলেন, যাতে তিনি পৃথিবীতে আগমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পরেন। পৃথিবীর অবস্থার সাথে পরিচিত হন এবং প্রকৃত শত্রু অর্থাৎ শয়তানকে ভালোভাবে চিনতে পারেন।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-

১. শয়তানের আনুগত্য মানুষকে যেমন আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, তেমনি মানুষকে প্রকৃত শান্তি থেকেও বঞ্চিত করে এবং তাকে নানা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয়। যেমনটি হযরত আদম ও বিবি হাওয়ার জীবনে লক্ষ্য করা যায়।

২. মানুষের সাথে শয়তানের শত্রুতার ইতিহাস অতি প্রাচীন এবং সৃষ্টির সূচনা থেকে শুরু হয়ে যা এখনও চলছে।

৩. কোন মানুষ পাপ ও ভ্রান্তি থেকে মুক্ত নয়, যদি না আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন। যে আদম পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা এবং ফেরেশতাদের সাহচার্য লাভ করেছেন সেই হযরত আদমই মুহূর্তের গাফলতির জন্য আল্লাহর দরবার থেকে বহিষ্কৃত হন। অবশ্য হযরত আদম (আঃ)-এর এই ভুল ছিল তার নবুয়্যত লাভের আগের ঘটনা।

এরপর এই সূরার ৩৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

فَتَلَقَّى آَدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ (37)

"অতঃপর হযরত আদম (আ.) স্বীয় পালনকর্তার কাছ থেকে কয়েকটি কথা শিখে নিলেন, (এবং তাওবা করলেন) অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁর প্রতি (করুণাভরে) লক্ষ্য করলেন। নিশ্চয়ই তিনি মহা-ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু। "(২:৩৭)

সেই শান্তিময় স্থান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে কষ্টকর পৃথিবীতে নেমে আসার পর আদম তার ভুল এবং শয়তানের ধোঁকা বুঝতে পারলেন। তাই তিনি অনুশোচনা করতে লাগলেন এবং কিভাবে তওবা করা যায় সে পথ খুঁজতে লাগলেন। এখানেও আল্লাহপাক হযরত আদমকে অসহায়ভাবে ছেড়ে দিলেন না। তিনি হযরত আদমকে তওবা এবং অনুশোচনা করার ভাষা শিক্ষা দিলেন। সেই বাণী সূরা আরাফের ২৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে- "তারা বলল হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না কর, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভক্ত হব। "

এই ভাষা কেবল হযরত আদম (আ.)-এর তওবার জন্যেই নির্দিষ্ট নয় বরং হযরত ইউনুস ও হযরত মুসা (আ.)-এর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যেমন কোরআনে হযরত মুসা (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে- "তিনি বললেন-হে আমার প্রতিপালক,আমি আমার নিজের ওপর জুলুম করেছি। তুমি আমায় ক্ষমা কর। "

অবশ্য হযরত আদম (আ.) তার তওবা কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর শিখিয়ে দেয়া শাফায়াতকারীদের নাম উচ্চারণ করেন। এ সম্পর্কে বিখ্যাত আলেম আল্লামা সুয়ূতি (রহ.) তার লেখা দোরুল মানসুর তাফসীর গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ৬০ পৃষ্ঠায় বেশ কিছু হাদিস উল্লেখ করেছেন। সেসব হাদিসে এসেছে যে হযরত আদম (আ.) আল্লাহর কাছে তার তওবা কবুল হওয়ার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার বংশধরদেরকে উসিলা হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে- "আদম (আ.) আল্লাহর কাছে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার আহলে বাইতকে উসিলা হিসাবে তুলে ধরেন যাতে তার তওবা কবুল হয়। " শাব্দিকভাবে তওবার অর্থ প্রত্যাবর্তন। এ শব্দটি যখন মানুষ সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়, তখন তার অর্থ হলো পাপ কাজ থেকে প্রত্যাবর্তন। আর যখন তওবা শব্দটি আল্লাহ সম্পর্কে ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হলো আল্লাহর দয়া ও রহমত ফিরে আসা। অর্থাৎ মানুষের পাপ কাজের কারণে আল্লাহ তার দয়া ফিরিয়ে নেয়ার পর মানুষ যখন পাপ কাজ থেকে প্রত্যাবর্তন করে তখন আল্লাহ পুনরায় দয়া ফিরিয়ে দেন। আল্লাহপাক নিজে তাওয়াব বা ক্ষমাশীল। যেমন সূরা বাকারাহ'র ২২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "তাই আল্লাহর দয়া সম্পর্কে মানুষের নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনাকারীরা থাকলে আল্লাহর দয়া ও করুণার ধারাও থাকবে অবিরাম।

আরও পড়ুন


জোড়া আত্মঘাতী বিস্ফোরণ : মার্কিন সেনাসহ নিহত ৬০

বিদ্রোহী কবির ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

যে কারণে ইভ্যালিতে বিনিয়োগে করবে না যমুনা গ্রুপ

কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে বোমা বিস্ফোরণ


সূরা বাকারাহ'র ৩৭ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হচ্ছে-

১. মানুষের তওবা করার তওফিক যেমন আল্লাহর হাতে তেমনি কিভাবে তওবা করা উচিত সেই পথও পেতে হবে আল্লাহর কাছ থেকে। তাই এ আয়াতে হযরত আদম (আঃ)-কে তওবার ভাষা আল্লাহ শিখিয়ে দিয়েছেন।

২. মানুষের তওবা যদি সত্যিকার তওবা হয় তাহলে আল্লাহ তা কবুল করবেন। কারণ তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াময়।

৩. আল্লাহপাকের ক্ষমা হলো দয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত। এতে নেই কোন অপমান এবং নেই কোন ভৎর্সনা।

৪. যদি আমরা কোন সময় তওবা করে তা ভঙ্গ করি এবং পুনরায় পাপে লিপ্ত হই, তারপরও আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হতে নেই। কারণ তিনি তাওয়াব বা তওবা গ্রহণকারী। যদি আবারও আমরা তওবা করি তাহলে তিনি আমাদের তওবা কবুল করে নেবেন।

news24bd.tv এসএম

;