শূন্য(০), সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক আবিষ্কার
শূন্য(০), সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক আবিষ্কার

শূন্য(০), সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক আবিষ্কার

Other

শূন্য(০) এক অদ্ভুত গাণিতিক প্রতীক। এটি একাধারে একটি সংখ্যা ও অঙ্ক। এটি এককভাবে মানের অস্তিত্বহীনতা ও অন্যান্য সংখ্যার পেছনে বসে তাদের যুত পরিচয় প্রদান করে। এছাড়াও দশমিকের ডানে বসে এটি বিভিন্ন সংখ্যার দশমাংশ প্রকাশ করে।

অঙ্ক হিসেবে শূন্য একটি নিরপেক্ষ অঙ্ক এবং সংখ্যার স্থানধারক হিসেবে কাজ করে। এটি একটি স্বাভাবিক পূর্ণ সংখ্যা। এটি না ধনাত্মক, না ঋণাত্মক, না মৌলিক না যৌগিক। একে সাহায্যকারী অঙ্ক বলা হয়। এর নিজের কোনো মান নেই।

বর্তমানে শূন্যের যে প্রতীক ‘০’ ব্যবহৃত হয় প্রথমদিকে তা ছিল না। সে সময় এর প্রতীক ছিল একটি বিন্দু [•]। প্রথম দিকে এটিকে সংখ্যা বলে গণ্য করা হতো না। বরং এটি ছিল খালি বা ফাঁকা স্থানের ধারণা। শূন্যের প্রতীক কবে বিন্দু থেকে ছোট বৃত্তের আকারে উন্নীত হয় তা অনুমানের ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। নানাঘাটে যে লিপি আবিষ্কৃত হয় তাতে সংখ্যা (দশ, কুড়ি ইত্যাদি) প্রকাশের ক্ষেত্রে বিন্দু হিসেবে শূন্যের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

গণনা থেকে যে গণিতের উৎপত্তি সেই গণনা কার্য কে, কবে শুরু করেছিলেন তার ইতিহাস আমাদের জানা নেই। এমনকী, শূন্য আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মূল অবদানটি কার তাও জানা নেই। তবে এটা যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক আবিষ্কার তা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই। শূন্য আবিষ্কার না হলে মানবসভ্যতার দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব হত কিনা সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায়। এর উদ্ভাবন ছাড়া বাইনারি সিস্টেম ও আধুনিক কম্পিউটার উদ্ভাবন সম্ভব হতো না। শূন্য ছাড়া শুধু গণিত নয়, বিজ্ঞানের অনেক শাখাই মুখ থুবড়ে পড়তো।

টলেমি তাঁর ‘অ্যালমাজেস্ট’ গ্রন্থে শূন্যস্থানের জন্য গ্রিক বর্ণ ‘ওমিক্রন’ [০]ব্যবহার করেন। সপ্তম শতাব্দীতে ভারতে ১, ২, ৩, ৪,...০ অঙ্ক সৃষ্ট গণনাপদ্ধতি আরব গণিতবিদ আল-খোয়ারিজমি ও আল-কিন্দির হাত ধরে ইউরোপে প্রবেশ করে। ইউরোপে দ্বাদশ শতাব্দী থেকে দশ অঙ্ক নিয়ে গণনা শুরু হয়। বিশ্বের মান্য গণিতজ্ঞরা সেজন্য এগুলোকে ‘ইন্দু-আরাবিক নিউমেরালস’ বলেন। আল-বেরুনি ভারত ভ্রমণের সময়ে একটি প্রদেশে ১ থেকে ৯ প্ৰদেশভিত্তিক সংখ্যাচিহ্ন ও ০-র লিপির উল্লেখ করেছেন।

প্রচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষ, মিশর, ব্যাবিলন ও চীনে দশ ধরে গণনা করার পদ্ধতির প্রচলন ছিল। তবে যে সকল সঙ্কেতের সাহায্যে মিশরীয়, ব্যাবিলনীয় বা গ্রিকরা সংখ্যা প্রকাশের চেষ্টা করত তাতে শূন্যের কোনো ধারণা ছিল না। এই সকল সঙ্কেতের সাহায্যে ক্ষুদ্র সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা না হলেও বৃহৎ সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে খুবই অসুবিধা হত।

প্রাচীন মিশরীয় সংখ্যাগুলো ছিল দশ ভিত্তিক। তাদের সংখ্যাগুলো স্থানভিত্তিক না হয়ে চিত্র ভিত্তিক ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৭৪০ সালের দিকে মিশরিয়রা আয়কর ও হিসাবরক্ষণের জন্য শূন্যের ব্যবহার করত। তাদের চিত্রলিপিতে একটি প্রতীক ছিল যাকে ‘নেফর’ বলা হতো, যার অর্থ হলো ‘সুন্দর’। এই প্রতীকটি তারা শূন্য এবং দশকের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করত। প্রাচীন মিশরীয় পিরামিড ও অন্যান্য স্থাপনায় এ ধরনের সংখ্যার ব্যবহার পাওয়া যায়।

খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাবিলনীয় গণিতবিদরা ছয়ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থার প্রবর্তন ও উন্নয়ন করে। শূন্য সংখ্যাটির অভাব তারা ছয়ভিত্তিক সংখ্যার মধ্যে একটি খালি ঘর রেখে পূরণ করত। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দের দিকে দুটি যতিচিহ্ন প্রতীক এই ফাঁকা যায়গা দখল করে নেয়। প্রাচীন মেসোপটেমীয় শহর সুমের থেকে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে প্রাচীন লেখক বেল বেন আপ্লু তার লেখায় দুটি যতিচিহ্ন প্রতীক ব্যবহারের বদলে একটি ‘হুক’ দিয়ে শূন্যকে প্রকাশ করেছেন।

ব্যাবিলনীয় শূন্যটি প্রকৃতপক্ষে শূন্য হিসেবে গন্য করা সমীচীন মনে করা হয় না। কারণ এই প্রতীকটিকে স্বাধীনভাবে লেখা সম্ভব ছিল না। কিংবা এটি কোনো সংখ্যার পেছনে বসে কোনো দুই অঙ্ক বিশিষ্ট অর্থবোধক সংখ্যা প্রকাশ করত না।

ভারতীয় গণিতের ইতিহাস অতি প্রাচীন। ধারণা করা হয়, গণিতে ‘শূন্য’ আবিষ্কার ভারতবর্ষেই হয়েছিল। এবং ভারতবর্ষের সংস্কৃত শব্দ শ্যুন্যেয়া (শ্যূন্য)’ আরবের ‘সিফর’ হয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে ‘জিরো’তে পরিণত হয়েছে। অনেকে মনে করেন, সর্বপ্রথম ভারতীয় উপমহাদেশের আর্যভট্ট (৪৭৫-৫৫০ খ্রি) প্রথম '০' (শূন্য) সম্পর্কে ধারণা দেন। তবে তিনি শূন্য প্রতীকটি ব্যবহার করেননি। ব্রক্ষ্মগুপ্ত (৫৯৮-৬৬৫ খ্রি) শূন্য আবিষ্কার করেন এবং এই শূন্যকে ব্যাপকভাবে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে আসেন। এসময় শূন্য একটি স্বতন্ত্র সংখ্যা হিসেবে মর্যাদা পায়। তবে বিশ্বব্যাপী এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে কয়েক শতাব্দী সময় লেগে যায়। মাত্র ষোড়শ শতাব্দীতে এসে এটির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়।
ইংরেজি জিরো শব্দটি এসেছে ভেনিশিয় শব্দ জিরো থেকে, যা আবার ইতালীয় জিফাইরো (zefiro) থেকে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। আবার ইতালীয় জিফাইরো শব্দটি এসেছে আরবি থেকে। আরবি ‘সাফাইর’ বা ‘সাফাইরা’ (صفر) অর্থ ‘সেখানে কিছু ছিল না’। তাই তারা সংস্কৃত শব্দটির অনুবাদ করেন ‘সিফর’। কারণ সংস্কৃত শব্দ শ্যুন্যেয়া (শ্যূন্য) অর্থ খালি বা ফাঁকা। এই ‘সিফর’ ল্যাটিনে গিয়ে হয় ‘Zephyr’। পরে এটি হয় Zero। ইংরেজি শব্দ জিরোর প্রথম ব্যবহার পাওয়া যায় ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে। জার্মানরা এটিকে বলে Ziffer, পোলিশরা Cyfra, স্প্যানিশরা Cifra, সুইডিশরা বলে Siffra। এসবের উচ্চারণে আরবি প্রভার লক্ষণীয়। ইংরেজিতেও আছে Cipher শব্দটি।

এটা সহজেই অনুমেয় যে শূন্য আবিষ্কৃত না হলে দশমিক স্থানিক অঙ্কপাতন পদ্ধতির উদ্ভব সম্ভব হত না। শূন্য ধরে মাত্র দশটি সঙ্কেতের সাহায্যে হিন্দু পণ্ডিতদের আবিষ্কৃত অঙ্কপাতন পদ্ধতি এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই নিয়ম আবিষ্কৃত হওয়ার ফলেই সংখ্যার ঘরগুলো একক, দশক, শতক, শহস্র ইত্যাদি ভাগে ১০ গুণ করে ভাগ করা হয় (দক্ষিণ থেকে বামে)।

‘ছন্দসূত্রের’ রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব ২০০। পিঙ্গল রচিত এই রচনায় শূন্যের ব্যবহার দেখা যায়। আর্যভট কর্তৃক বর্গমূল নির্ণয় পদ্ধতি দশমিক স্থানিক অঙ্কপাতন ও শূন্যের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বৃহৎসংহিতা ও পঞ্চসিদ্ধান্তিকা প্রভৃতি গ্রন্থে বরাহমিহির (খ্রিস্টাব্দ ৫০৫) বারবার শূন্যের উল্লেখ করেছেন। বরাহমিহিরের সমসাময়িক জিনভদ্রতানির রচনায় শূন্যের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তিনি তাঁর রচনায় বৃহৎ বৃহৎ সংখ্যা লেখার সময় একাধিক শূন্যের ব্যবহার করেছেন।

আর্যভট, বরাহমিহির প্রমুখ বিজ্ঞানীদের রচিত গাণিতিক ও জ্যোতিষীয় রচনার এই পদ্ধতির বহুল ব্যবহার দেখা যায়। তাই অনুমান করা হয়, আর্যভটের (আনুমানিক খ্রিস্টাব্দ ৪৯৯) সময়কালের বহু আগে থেকেই ভারতে এই পদ্ধতির প্রচলন ছিল। এছাড়া একক, দশক, শতক ইত্যাদি ভাগে ৫০২ সংখ্যাটি লিখতে হলে দশকের ঘরের ফাঁক (শূন্যস্থান) কোনো প্রতীকের সাহায্যে ভারাট করার প্রয়োজন হয়। তাই মনে হয় আর্যভটের সময়কালের বহুপূর্বেই সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে হিন্দুরা শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

লেখক : হারুন আল নাসিফ : কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক।

আরও পড়ুন: 


নদীতে নিখোঁজ যুবককে উদ্ধারে নেমে পানির নিচে ‘আটকে গেল’ ডুবুরি

জিয়ার জানাজায় বহু মানুষ ছিল, কফিনে লাশ ছিল না


news24bd.tv তৌহিদ

সম্পর্কিত খবর