তিনি মানবিক হৃদয় নিয়ে পালিয়েছিলেন কিন্তু বেদনা রেখে গিয়েছিলেন
তিনি মানবিক হৃদয় নিয়ে পালিয়েছিলেন কিন্তু বেদনা রেখে গিয়েছিলেন

শান্তা আনোয়ার

তিনি মানবিক হৃদয় নিয়ে পালিয়েছিলেন কিন্তু বেদনা রেখে গিয়েছিলেন

Other

জঁ লিও জ্যেঁহোম ইংরেজিতে Jean-Léon Gérôme তিনি একজন জনপ্রিয় ফ্রেঞ্চ পেইন্টার। দুটো কারণে আমি তাঁর পেইন্টিং এর প্রতি আকৃষ্ট হই। প্রথম কারণ আমি গ্রিক দার্শনিক ডায়োজেনিসের কথা শুনে তার একটা পেইন্টিং দেখি।  

আপনারাও দেখেছেন ডায়াজেনিস একটা পাইপের মধ্যে একটা হ্যারিকেন হাতে সামনে কুকুর।

সেই পেইন্টিং টা জঁ লিও জ্যেঁহোমের। এরপরে আমি এই পেইন্টারের অন্য পেইন্টিং দেখতে শুরু করলাম। ইন্টারনেটে সার্চ করলে তার পেইন্টিং গুলো দেখেতে পারবেন। কী ছবি আঁকেননি তিনি!!

তিনি ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম প্রতিভাবান নিউ ক্লাসিক্যাল পেইন্টার। শুধু পেইন্টিংই নয় দারুন দারুণ সব ভাষ্কর্য বানাতেন। তবে তাঁর সবচেয়ে মুন্সিয়ানা ছিলো ন্যুড আঁকাতে। কিন্তু তিনিই প্রথম ফ্রেঞ্চ পেইন্টার যিনি ইসলামী জীবন নিয়ে প্রচুর ছবি এঁকেছেন।   

১৮৬৮ সালে তিনি মিশরে যান, সেইখানে গিয়ে তিনি সম্পুর্ণ ভিন্ন এক সাংস্কৃতিকে আবিষ্কার করেন। সেই ইসলামী সংষ্কৃতির নানা দিক তাকে দারুণ ভাবে আকৃষ্ট করে। তিনি মুলত নামাজ, আজান আর মসজিদের নানা আঙ্গিক নিয়ে ছবি আঁকতেন, ঘুরতেন মসজিদ থেকে মসজিদে।   জঁ লিও জ্যেঁহোমের আঁকা এই মসজিদে নামাজের পেইন্টিংটা আছে, নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটল মিউজিয়াম অফ আর্টে।    

মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি তার বন্ধুকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, "সেই সময়ে, প্যারিসের সাথে আজকের প্যারিসের কোন সম্পর্ক নেই: ট্রেন, সাইকেল , গাড়ি কিচ্ছু ছিলোন; আমরাও কম উত্তেজিত ছিলাম, এবং যেখানে আমরা থাকতাম সেই শহর যেগুলোকে আমরা ল্যাটিন কোয়ার্টার বলতাম, সেই শহরগুলো  শান্ত ও প্রশান্তিতে মাখামাখি ছিল। এখন সবকিছু বদলে গেছে; আমরা আর  আগের মতো হাঁটছি না, সবাই পাগলের মতো দৌড়াচ্ছি; আমরা যদি দিনের বেলায় বিধ্বস্ত না হই, তাহলে রাতে খুন হয়ে যাবোই। এটি কি কোন জীবন??!!  

আমরা পৃথিবীর শেষ সময়টা দেখেছি, আমরা একটি নতুন ভোরের সাক্ষী হয়েছি, যার মধ্যে নান্দনিকতা এবং সর্বোপরি প্রশান্তির অভাব রয়েছে। সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন আমাদের রীতিনীতি, আমাদের বেচে থাকার উপায়, ডলারের প্রতি আমাদের ভালোবাসার জন্য আমরা আর ফরাসি থাকবো না, না আত্মায়, না হৃদয়ে। ভাবতে ভয়ঙ্কর! আমরা তখন  আমেরিকান হয়ে যাবো!” 

তার কিছুদিন পরে সকালে ছবি আঁকার স্টূডিওতে তাঁর মৃতদেহ আবিষ্কার করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭৯ বছর। তাঁর মৃতদেহ পড়ে ছিলো তারই আঁকা একটা বিখ্যাত পেইন্টিং এর পায়ের নিচে। সেই পেইন্টিং এর নাম ছিলো ট্রুথ বা “সত্য”। দার্শনিক ডেমোক্রিটাসের “সত্য” সম্পর্কে একটা বিখ্যাত কোটেশন থেকে অনুপ্রানিত হয়ে।  

আরও পড়ুন:


গ্রেপ্তার জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, রিমান্ডে চায় পুলিশ

করোনায় আক্রান্ত জাপা মহাসচিব, হাসপাতালে ভর্তি

৭ বছর কারাদণ্ড হতে পারে নুসরাতের

দুদকের তৃতীয় দিনের রিমান্ডে পিকে হালদারের সহযোগী নাহিদা-শুভ্রা


ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন, “সত্য সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না, কারণ সত্য একটি কুয়ার মধ্যে থাকে। ” ছবিতে জঁ লিও জ্যেঁহোম আঁকলেন এক নগ্নিকা কুয়ো থেকে উঠে আসছেন।  জঁ লিও জ্যেঁহোমের ইচ্ছে ছিলো খুব সাদামাটা ভাবে তার শেষকৃত্য হবে।  

খুবই সাদামাটাভাবে তার শেষকৃত্য হয়, ফরাসীদের ঐতিহ্য অনুসারে কোন ফুল ছিলোনা তার শেষকৃত্যে। তাঁকে সমাহিত করা হয় তাঁর জন্মস্থান ভ্যেজুলে। তার সমাধির উপরে আছে তারই এক বিখ্যাত ভাষ্কর্য La Douleur, বাংলায় যার মানে বেদনা। এই ভাষ্কর্যটা তিনি করেছিলেন তার ছেলের মৃত্যুর পরে বেদনাহত হয়ে। শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা নারী বেদনা আর কষ্ট বুকে নিয়ে গালে হাত দিয়ে অসহায়ভাবে বসে আছেন।  

জঁ লিও জ্যেঁহোমের জীবনটা ছিলো বেদনার। তিনি মৃত্যুর দশদিন আগে তাঁর এক ছাত্রকে লিখেছিলেন, আমি পরিপূর্ণভাবে আমার জীবন যাপন করে ফেলেছি। আমি অন্যদের জীবনে এতো বেশি দুঃখ এবং দুর্ভাগ্য দেখেছি যা আমি এখনও প্রতিদিনই দেখছি, আমি সেই রঙ্গমঞ্চ থেকে পালাতে চাই। ” 

তিনি পালিয়েছিলেন, তার মানবিক হৃদয় নিয়ে কিন্তু তার বেদনা তিনি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিলেন। নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটল মিউজিয়াম অফ আর্টে রাখা জঁ লিও জ্যেঁহোমের সেই ছবিটা এখানে দিয়ে দিলাম।

লেখাটি শান্তা আনোয়ার- এর ফেসবুক থেকে নেওয়া (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv নাজিম