নিউইয়র্কের বেসমেন্ট: প্রদীপের নীচে অন্ধকার
নিউইয়র্কের বেসমেন্ট: প্রদীপের নীচে অন্ধকার

মনিজা রহমান

নিউইয়র্কের বেসমেন্ট: প্রদীপের নীচে অন্ধকার

Other

গত ঈদের পরের দিন এক বয়স্ক দম্পতির সঙ্গে দেখা করতে জ্যামাইকায় গিয়েছিলাম। করোনার কারণে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে তাদের দেখে চলে আসি। ওনারা অবশ্য কয়েকবার বাসায় যেতে বলেছিলেন। কিন্তু আমার বর কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না।

আসার পথে সে বলল, ওনারা ছেলের বাসার বেসমেন্টে থাকেন। তাই বাসায় নিয়ে গেলে অস্বস্তিতে পড়ে যেতেন।  

এই হল নিউইয়র্কের বেসমেন্টের চিত্র। স্বল্প আয়ের মানুষ কিংবা কাগজপত্র বিহীন ইমিগ্র্যান্ট, অথবা বাড়ির সবচেয়ে অবহেলিত মানুষদের ঠাঁই হল এই বেসমেন্ট। নিয়ম না থাকার পরেও বাড়িওয়ালা বেসমেন্ট ভাড়া দেয়।  

নিয়ম না জেনেও কর্তৃপক্ষ কিছু বলে না। দেখে না দেখার ভান করে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় নিউইয়র্কের বেসমেন্টে এগারো জন মানব সন্তানের সলিল সমাধি, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে-প্রদীপের নীচে আসলেই কত অন্ধকার!

পৃথিবীর রাজধানী বলা হয় নিউইয়র্ক সিটিকে। পৃথিবীর সব দেশের সব ভাষার মানুষ বলতে গেলে এখানে বাস করে। ম্যানহাটনের মত এত আকাশচুম্বি ভবন পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমেরিকা তথা সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক কেন্দ্রও নিউইয়র্ক।  

যে কারণে এখানে কাজের সুযোগ অনেক বেশী। কাউকে বেকার ঘরে বসে থাকতে হয় না। কাগজপত্র না থাকলেও এখানে কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। তদুপুরি বিভিন্ন দেশ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের একটি বিশাল অংশ নিউইয়র্ক সিটি ও তার আশেপাশে থাকে।  

নিউইয়র্ক সিটির জনসংখ্যার চাপ কমাতে বাসা ভাড়া সব সময়ই আকাশ ছোঁয়া থাকে। সিটি কর্তৃপক্ষ চায়, বেশী বাসা ভাড়া দেবার সামর্থ্য যাদের নেই, তারা যেন অন্য কোন শহরে চলে যায়। কিন্তু তারপরও বেশীরভাগ মানুষ শহরের মাটি আকড়ে পড়ে থাকতে চায়।

এই শহরের পাঁচ বোরোর মধ্যে ম্যানহাটানের বাসা ভাড়া সবচেয়ে বেশী। তারপর আসে ব্রুকলীন ও কুইন্স। ব্রঙ্কস ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ড আছে তারপরে। সবচেয়ে বাঙালির বাস যেখানে বেশী সেই কুইন্সে এক বেডরুমের বাসা ভাড়া গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার।  

কোন পরিবারের এই ভাড়া দেবার সামর্থ্য না থাকলে তারা সাবলেটে থাকে অন্য পরিবারের সঙ্গে। সাবলেট মানে ওই এক রুমের ফ্ল্যাটে হয়ত লিভিং রুমে বাস করে একটা পার্টিশন দিয়ে। দুই পরিবারের জন্য একটি মাত্র বাথরুম ও রান্নাঘর।  

যারা আরেক পরিবারের সঙ্গে সাবলেটে থাকতে অস্বস্তিবোধ করেন তাদের জন্য আছে বেসমেন্ট।   যেখানে আলো নেই, জানালা নেই। কমোড ওভার ফ্লো হয়। দেয়ালে ফাটলের কারণে বৃষ্টির পানি ঘরে ঢোকে। কিন্তু এসব নিয়ে ভাড়াটিয়া কিংবা বাড়িওয়ালা কোন অভিযোগ করতে পারেন না। কারণ এই সব বেসমেন্টে বসবাসের কোন বৈধ অনুমোদন নেই। কিন্তু মর্গেজের অর্থ সংস্থানের জন্য বাড়িওয়ালাকে বেসমেন্ট ভাড়া দিতে হয়। অন্যদিকে ভাড়া কম হওয়াতে স্বল্প আয়ের মানুষ বেসমেন্টে বাস করেন। যেহেতু বেসমেন্টে বসবাস বৈধ নয়, তাই বড় কোন বিপদ না হলে কেউ ৯১১ এ ফোন করেনা।  

২ সেপ্টেম্বর প্রচণ্ড বৃষ্টিতে নিউইয়র্ক সিটিতে যে তের জনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে এগারো জনই মারা গেছেন বেসমেন্টে। তারা পানির তোড়ে বেসমেন্টে আটকে পড়েন। আর কোনভাবে বের হয়ে আসতে পারেননি। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত শহরের একটিতে এভাবে ঘরের ভিতরে শিশুসহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্তম্ভিত আমেরিকার প্রশাসন।  

গত কয়েক বছর আগে কুইন্সের উডসাইডে বেসমেন্টে আগুনে পুড়ে এক বাংলাদেশি পরিবারের তিনজনের করুণ অসহায় মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পরে নিউইয়র্কর মেয়রের নেতৃত্বে বেসমেন্ট সংস্কারের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মহামারীর কারণে সেটা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এগোরো জনের মৃত্যুর পরে সিটি কর্তৃপক্ষ বেসমেন্ট সংস্কারের বিষয়ে আবার নড়েচড়ে বসেছে। রাস্তার লেভেল থেকে বেসমেন্টের গভীরতা, ফায়ার সেফটি, সিলিং হাইট, জানালার সংখ্যা ও কোন বিপদ হলে বিকল্প ‘এক্সিট’ এর রাস্তা- এসব বিষয়গুলো এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।  

দূর থেকে আমেরিকানদের জীবনের চাকচিক্য শুধু দেখা যায়। কিন্তু একটি মেগাসিটির বাতাসে অনেক হাহাকার ও বেদনার দীর্ঘশ্বাসও ভেসে বেড়ায়। মনে আছে, আমার এক বন্ধু বলেছিল এদেশে প্রথম আসার পরে ওর পদে পদে ধাক্কা খাওয়ার কথা। ওর স্বামী এই দেশে আগে থেকে থাকতো। আর বিভিন্ন দ্রষ্টব্য ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে পাঠাতো। সেই সব ছবি দেখে আমার বন্ধুর ধারণা হয়েছিল, ওর স্বামী বুঝি ওখানে থাকে। এয়ারপোর্ট থেকে নেবার পরে যখন বেসমেন্টের বাসাতে ওঠাল, তখন ও স্তম্ভিত হয়ে যায়। কল্পনাও করতে পারেনি বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে বেসমেন্টে থাকতে হবে। পরে আমার সেই বন্ধু বাড়ি কিনেছে। কিন্তু এখনও বেসমেন্ট জীবনের সেই দিনগুলির কতা ভুলতে পারেনা।  

আরও পড়ুন:


শিগগির নিয়ন্ত্রণে আসছে ফেসবুক টুইটার ইউটিউব

ফেসবুক ইউটিউব কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি চান এসপিরা

গাবতলী বেড়ীবাঁধ এলাকায় উত্তর সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান

রমিজ রাজা পিসিবির চেয়ারম্যান


অনেক শিক্ষিত-প্রগতিশীল পরিবার তাদের বাবা-মাকে বেসমেন্টে রাখেন। ছেলের বাড়িতে যেমন এটা হয়ে থাকে, মেয়ের বাড়িতেও হয়ে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মা নিজেরাও এটা পছন্দ করেন। তারা আগের দিনের নিয়মে সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে ভালোবাসেন বলে বেসমেন্টে বাস করে স্বস্তি বোধ করেন। এটা শুধু বাংলাদেশী ইমিগ্র্যান্ট নয়। শ্বেতাঙ্গরা ছাড়া নিউইয়র্কের কম বেশী সবাই করে।  

প্রবল বৃষ্টিতে বেসমেন্টের মৃতুর ঘটনায় স্বয়ং আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রচন্ড মর্মাহত হয়েছেন। গত ৭ সেপ্টেম্বর তিনি নিজে এসেছেন উপদ্রুত এলাকা দেখতে। ক্ষতিগ্রস্তরা সবাই মোটা অঙ্কের অনুদান পাচ্ছে অচিরেই। কিন্তু এরপরেও নিউইয়র্কের বেসমেন্ট কালচারের খুব সহসা কোন পরিবর্তন হচ্ছে না।  

লেখাটি নিউইয়র্ক প্রবাসী মনিজা রহমানের ফেসবুক থেকে নেওয়া।  (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv নাজিম