হুলহুলিয়া: ২০০ বছরেও যে গ্রামে ঢোকেনি পুলিশ
হুলহুলিয়া: ২০০ বছরেও যে গ্রামে ঢোকেনি পুলিশ

হুলহুলিয়া: ২০০ বছরেও যে গ্রামে ঢোকেনি পুলিশ

Other

নাটোরের সিংড়া উপজেলা চৌগাছা ইউনিয়নের একটি ছোট গ্রাম 'হুলহুলিয়া'। দেশের মোট ৬৮ হাজার গ্রামের মতোই একটি সাধারণ গ্রাম এটি। তবে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রামটিকে করে তুলেছে অনন্য সাধারণ। দেশের মানুষের কাছে হুলহুলিয়া এখন পরিচিত আদর্শ গ্রামের প্রতিচ্ছবি হিসেবে।

নাটোরের হুলহলিয়া এমন একটি গ্রাম যেখানে নেই কোন হানাহানি, কোন অনাচার। গত দুইশ' বছরে অপরাধজনিত কারণে এ গ্রামে যায়নি পুলিশ। গ্রামের শতভাগ মানুষ শিক্ষিত। সাড়ে তিন হাজার মানুষের এই গ্রামে হাজারো গল্প থাকলেও সেই গল্পে নেই কোনো সংঘাত, নেই ধর্ষণ খুন কিংবা রাহাজানির মতো অনাচার। আর তাইতো নাটোরের সিংড়া উপজেলার এই গ্রামটি সারা দেশের কাছেই এখন আদর্শ।

হুলহুলিয়ার প্রবেশ পথ

গ্রামটি বাল্যবিবাহ, মাদক ও যৌতুকমুক্ত। 'হুলহুলিয়া' গ্রামটি নাটোর জেলা সদর থেকে ৩৮ কিলোমিটার এবং সিংড়া থানা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে চলনবিলের মাঝে অবস্থিত। ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ গাছে ঘেরা এ গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় তিন হাজার। মোট ১১টি পাড়া নিয়ে গঠিত গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে 'নিয়ামত খাল' নামের একটি ছোট নদী, যা এ গ্রামের সৌন্দর্যকে অনেকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। শীতে এ গ্রামে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি। কিন্তু পাখি মারার প্রবণতা নেই গ্রামবাসীর তাছাড়া গ্রামটিতে আরো রয়েছে ছোট-বড় অনেকগুলো পুকুর।

গ্রামবাসী মনে করেন, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ও শতভাগ শিক্ষিত হওয়ার কারণে মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও মননে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। একারণে গ্রামের মানুষজন কলহ ও সংঘাত থেকে দূরে থাকেন। এছাড়া গ্রামটি পরিচালনার জন্য তাদের নিজস্ব সংবিধান রয়েছে। যা সবাই মেনে চলেন। গ্রামে কোনো সমস্যা-সংকট দেখা দিলে গ্রামবাসী মিলে সংবিধানের আলোকে তা সমাধান করেন।  

এজন্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত তাদের একটি কমিটিও রয়েছে। এছাড়া স্কুল, মাদ্রাসা, বাজার, মসজিদ ও গোরস্থানভিত্তিক তাদের আলাদা আলাদা পরিচালনা কমিটিও রয়েছে। এ কমিটিও ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।

গ্রামবাসী গ্রামের মধ্যে কোনো বিভাজন তৈরি করেন না। দরিদ্রদের সহায়তায় সবাই একসাথে এগিয়ে আসেন। গ্রামের জনসংখ্যা ৬ হাজার হলেও প্রায় ৪ হাজার মানুষ গ্রামের বাইরে চাকরি করেন।   তারাও অর্থনৈতিকভাবে গ্রামবাসীকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন।  

হুলহুলিয়া সেতু

ছেলেমেয়েদের জন্য এসএসসি পাশ করা বাধ্যতামূলক। এসএসসি পাশ না করালে কেউ তার মেয়েও বিয়ে দিতে পারেন না। দরিদ্রদের শিক্ষার জন্য দরিদ্র তহবিল কমিটিও আছে যে কমিটি থেকে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সহায়তা করা হয়ে থাকে। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এ গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দাদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। তবে গ্রামের স্বাক্ষরতার হারও শতভাগ।  

প্রতিটি বাড়িতেই এক বা একাধিক উচ্চ শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন। অনেকেই বর্তমানে দেশ-বিদেশে উচ্চ পর্যায়ে চাকরি করছেন। এমনকি মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করাদেরও এ গ্রামে অর্ধশিক্ষিত হিসেবে গণ্য করা হয়। শিক্ষার প্রতি হুলহুলিয়ার বাসিন্দাদের এমন আগ্রহ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

গ্রামের ৬০ বছর বয়সী বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য এসএসসি পাশ করা বাধ্যতামূলক। এসএসসি পাশের আগে কেউ তার মেয়েকে বিয়ে দিতে পারবে না। যদি কেউ কোনো কারণে তার মেয়েকে ১৮ বছরের পূর্বে বিয়ে দিতে চাইলে, কেন বিয়ে দিতে চাচ্ছে তা জেনে সমাধান করা হয়। কিন্তু এসএসসি পাশ না করে বিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিয়ের সময় যৌতুক নেওয়া ও দেওয়াও এখানে সম্পূর্ণ নিষেধ। গ্রামটি শতভাগ মাদকমুক্ত ও সবার জন্য স্যানিটেশনের ব্যবস্থা আছে।

হুলহুলিয়ার বিশ্রামাগার

বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রাম থেকে হুলহুলিয়া গ্রামটিকে যে কারণে পৃথক করেছে তার অন্যতম প্রধান কারণ এই হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ নামের সামাজিক প্রতিষ্ঠানটি। একে উচ্চ আদালতও বলা হয়। এই পরিষদের মাধ্যমেই গ্রামের সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান এবং গ্রামবাসীর মধ্যে কখনো কলহ দেখা দিলে তা মীমাংসা করা হয়।

সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ পরিচালনার একটি কমিটিও রয়েছে। কমিটিতে একজন চেয়ারম্যান ও একজন ভাইস চেয়ারম্যানসহ সদস্য রয়েছেন আরও ২১ জন। তারা সবাই গ্রামের পুরুষ ভোটারদের দ্বারা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। দুইবছর পর পর ভোটের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, যারা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন তারাই সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। এছাড়া পাঁচ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটিও রয়েছে তাদের। এছাড়া গ্রামের বিচার বিভাগীয় আটটি পাড়াতেও আলাদা আলাদা কমিটি রয়েছে। যাকে বলা হয় নিæ আদালত। এই কমিটি পাড়ার আকার-আকৃতি অনুসারে ৫ থেকে ৮ সদস্যের হয়ে থাকে।

জানা গেছে, ১৯১৪-১৫ সালের দিকে একবার প্রবল বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গ্রামে অভাব দেখা দেয়। গ্রামের অনেক চাষী ধান-বীজের অভাবে জমি ফেলে রাখতে বাধ্য হন। সবার মনে কষ্ট, হতাশা। বিষয়টি গ্রামের মাতবর মছির উদ্দিন মৃধার মনে দাগ কাটে। একদিন গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে লোক ডেকে সভায় বসেন তিনি। সিদ্ধান্ত হয়, যাদের ঘরে অতিরিক্ত ধান-বীজ আছে, তারা বিনাশর্তে অন্যদের ধার দেবেন। সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, খালি জমি ফসলে ভরে ওঠে। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে গ্রামের উন্নয়নে ১৯৪০ সালে 'হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ' নামে একটি পরিষদ গঠিত হয়।

হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিশদ

ব্রিটিশ আমল থেকে স্বশাসন ব্যবস্থা চলে আসছে এখানে। সবাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতন। এর প্রতিফলন দেখা যায় এ গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসা মেধাবীদের পরিসংখ্যানে। গ্রামের দেড় শতাধিক সন্তান প্রকৌশলী, শতাধিক চিকিৎসক। আছেন কৃষিবিদ, আইনবিদ, প্রতিরক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও। এই পরিষদ গ্রামের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা করে।  

গ্রামে কোন বিরোধ হলে এই প্যানেল আলোচনার মাধ্যমেই তা মীমাংসা করে। বিচারক প্যানেল ও পরিষদের ওপর গ্রামবাসীর আস্থা আছে বলে তারা পরিষদের উপরই নির্ভর করে। পরিষদের উদ্যোগে স্কুল, মাদ্রাসা, কবরস্থান, চলাচলের রাস্তা সবই তৈরী করা হয়েছে। এ সংগঠন ছাড়াও হুলহুলিয়ায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করে আসছে ‘শেকড়’ ও ‘বটবৃক্ষ’ নামের দু’টি সামাজিক সংগঠন। এই প্রতিষ্ঠানের সদস্য সবাই চাকুরিজীবী। তাদের অনুদানে গ্রামের অভাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, অসহায় মানুষকে সহায়তা ও বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়।

শুধু তাই নয়, গেল দুইশ বছরে অপরাধজনিত কারণে এ গ্রামে আসেনি কোনো পুলিশ। থানায় হয়নি একটি মামলাও। আর যদি কোনো বিরোধও হয় তা মীমাংসায় আছে হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ।

রও পড়ুন:

ধীর জীবন মানেই অলস জীবন নয়

একটি হটডগ আয়ু কমাতে পারে ৩৬ মিনিট পর্যন্ত!

ইভ্যালি ধরলেও সমস্যা, ছাড়লেও সমস্যা! কোথায় যাবেন ফারিয়া?

তৃতীয় স্বামীর কাছে শুধু বিচ্ছেদই নয়, খরচও চাইলেন শ্রাবন্তী


নাটোরের সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, নিজেরাই যদি নিজেদের সমস্যাগুলো সমাধান করা যায় তাহলে প্রশাসনের উপর চাপ অনেকাংশেই কমে আসে। দেশের সবগুলো গ্রাম যদি হুলহুলিয়ার আদলেই গড়ে ওঠে তাহলে হয়তো বিশ্ব মানচিত্রে রূপকথার দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে বাংলাদেশ- এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় প্রশাসনের।

চৌগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুহাম্মাদ জাহেদুল ইসলাম ভোলা বলেন, পরিষদ থাকায় হুলহুলিয়া গ্রামে কোন বিবাদ বা সংঘর্ষ হয় না বললেই চলে।

জেলা প্রশাসক শামীম আহম্মেদ বলেন, হুলহলিয়া গ্রামের নিয়ম নীতিগুলো যদি অন্যান্য গ্রামেও ব্যবহার করা হয় এবং সকলে মিলে সম্মিলিত প্রয়াসে সর্বদা ভাল কিছু করার মানসিকতা নিয়ে কাজ করা যায় তবে হুলহলিয়া গ্রামের মতোই গড়ে উঠবে আরও অসংখ্য গ্রাম। হুলহুলিয়া গ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ ভালো। এখানকার শান্তিপূর্ণ মনোভাব ও সমৃদ্ধির চেষ্টাকে দৃষ্টান্ত হিসেব দেশের অন্যান্য গ্রামে ছড়িয়ে দেয়া গেলে গড়ে উঠবে সুন্দর এক বাংলাদেশ।  

news24bd.tv/ নকিব