সূরা বাকারা: আয়াত ৮৯-৯৩, মহানবী (সা.) কে ইহুদীদের অস্বীকার
সূরা বাকারা: আয়াত ৮৯-৯৩,  মহানবী (সা.) কে ইহুদীদের অস্বীকার

সূরা বাকারা: আয়াত ৮৯-৯৩, মহানবী (সা.) কে ইহুদীদের অস্বীকার

অনলাইন ডেস্ক

পবিত্র কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ সূরা আল-বাকারা আলোচনার আজকের পর্বে সূরাটির ৮৯ থেকে ৯৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। বনী ইসরাইলীদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহপাক সূরা বাকারাহ'র ৮৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন -

وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ (89

‘‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের কাছে রাখা নিদর্শনের সমর্থক কিতাব আসার পরও তারা সেই কিতাব অগ্রাহ্য করল। অথচ এর আগে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তারা তাদের কাছে রাখা নিদর্শনের সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করত। কিন্তু যখন তাদের কাছে তা আসল, তখন তারা সেটি প্রত্যাখ্যান করল।

সুতরাং অবিশ্বাসীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। ’’ (২:৮৯)

এর আগের আলোচনায় হযরত মূসা (আ:) ও তওরাতের বিধানের প্রতি বনী ইসরাইল জাতির বিদ্বেষ ও গোঁড়ামীর কথা উল্লেখ করেছিলাম। আর এ আয়াতে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইহুদীদের কথা বলা হয়েছে, যারা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামের নবীর আগমনের অপেক্ষায় ছিল এবং নিজেদের ঘর-বাড়ি ও মাতৃভূমি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল হিজাজে ৷

মদিনা ও মদিনার আশেপাশে বসতিস্থাপনকারী ইহুদীরা মুশরিকদেরকে বলত, খুব শিগগিরই আবির্ভূত হবেন মুহাম্মদ নামের একজন নবী যিনি শত্রুদের ওপর বিজয় লাভ করবেন৷ ইহুদীরা ওই নবীর প্রতি ঈমান আনারও কথা বলত। কিন্তু সত্যিই যখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) আবির্ভূত হলেন এবং মদীনায় হিজরত করলেন, তখন দেখা গেল ইহুদীরা তাদের গোঁড়ামী ও বস্তুপূজার কারণে ঈমান আনতে অস্বীকার করল। অপরদিকে মদিনার মুশরিকরা দলে দলে ঈমান আনল এবং গ্রহণ করল ইসলাম।

এ আয়াত থেকে বোঝা যায় স্রেফ জ্ঞানই যথেষ্ট নয় বরং সত্যকে গ্রহণ ও তা মেনে চলার মনোভাবেরও প্রয়োজন ৷ ইহুদীরা এবং তাদের পুরোহিতরা মহানবী (সা.) সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও সত্য গ্রহণ ও তা মেনে নিতে পারেনি।

এরপর ৯০তম আয়াতে বলা হয়েছে -

بِئْسَمَا اشْتَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ أَنْ يَكْفُرُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ بَغْيًا أَنْ يُنَزِّلَ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ فَبَاءُوا بِغَضَبٍ عَلَى غَضَبٍ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ مُهِينٌ (90

‘‘তারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট মূল্যে নিজেদেরকে বিক্রি করেছে। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা হিংসা বশবর্তী হয়ে প্রত্যাখ্যান করে শুধু এ কারণে যে আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। অতএব, তারা ক্রোধের ওপর ক্রোধ অর্জন করেছে। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। ’’ (২:৯০)

ইহুদীরা আশা করেছিল ইসলামের নবী আসবে তাদের বনী ইসরাইল গোত্র থেকে আর তাহলেই কেবল তারা ওই নবীর প্রতি ঈমান আনবে। কিন্তু তাদের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ায় গোত্রীয় হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। এমনকি তারা আল্লাহর এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও জানিয়ে বসে। ইহুদীরা তাদের এ আচরণের মাধ্যমে ক্ষতিকর লেনদেনের স্বীকার হয়েছে। কারণ তারা প্রতিশ্রুত নবীর প্রতি ঈমান আনার জন্যে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মদিনায় এসে বসতি স্থাপন করেছিল। এ জন্যে তাদেরকে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাই পরিণত হয় ইসলামের শত্রুতে। কেবল গোঁড়ামী আর হিংসার কারণেই তারা নবীর প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে এবং নিজেদেরকে বিক্রি করে হিংসার মূল্যে। এভাবে তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়।

এরপর ৯১তম আয়াতে বলা হয়েছে -

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آَمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهِ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (91

‘‘যখন তাদেরকে বলা হয় আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তাতে বিশ্বাস কর। তারা বলে আমাদের নবীর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাস করি। তা ছাড়া সব কিছুই তারা প্রত্যাখ্যান করে। যদিও এ কোরআন সত্য এবং তাদের কাছে যা আছে তা (কোরআনকে) সমর্থন করে। হে নবী! আপনি তাদের বলুন, যদি তোমরা অতীতে তোমাদের ওপর অবতীর্ণ হওয়া বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসী হতে তবে কেন তোমরা অতীতে নবীদেরকে হত্যা করেছিলে?’’ (২:৯১)

এ আয়াতে ইহুদীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, 'তোমরা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনছো না এ জন্যে যে, তিনি তোমাদের গোত্রের নন। তোমরা যদি সত্যিই ঐশি গ্রন্থ মেনে চল তবে কেন তোমরা অতীতে নবীদেরকে হত্যা করেছিলে? এ থেকে বোঝা যায় তোমরা মূলত: সত্যের বিরোধী ৷ ওই সত্য তোমাদের নবীই বলুক অথবা ইসলামের নবীই বলুক তাতে তোমাদের কিছু এসে যায় না৷ কোরআনের বাণীকে তোমরা যেমন অগ্রাহ্য করেছ তেমনি তওরাতের কথাও তোমরা গ্রহণ করনি। '

মূলত: আসমানী গ্রন্থের সব বিষয় এসেছে এক আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং সেসব কোন বিশেষ জাতি বা গোত্রের জন্যে আসেনি বরং এসেছে তাবত মানুষের জন্যে। তাই এটা কারো বলার অধিকার নেই যে, আমি কেবল আমার জাতির নবীকে অনুসরণ করব, অন্য কাউকে নয়। সব ঐশী ধর্মের বিষয়বস্তুর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক এবং একটির সঙ্গে অন্যটির কোন বিরোধ নেই ৷

এরপর ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে -

وَلَقَدْ جَاءَكُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ (92)

‘‘নিশ্চয় মূসা তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছে। কিন্তু তোমরা তার অনুপস্থিতিতে বাছুর পূজা শুরু করেছিলে। সত্যিই তোমরা ছিলে বড় অত্যাচারী। ’’ (২:৯২)

ইহুদীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করার পেছনে যে যুক্তি এনেছিল তাহলো, মহানবী (সা.) আরব, আর অন্যদিকে হযরত মূসা ছিলেন বনী ইসরাইল। কিন্তু হযরত মূসা তাদের জন্য মোজেযাসহ আসার পর যখন তুর পাহাড়ে গেলেন, তখন বনী ইসরাইল জাতি বাছুর পূজার দিকে ঝুঁকে পড়ল। হযরত মূসার দীর্ঘ দিনের শ্রম এক নিমিষে পানি হয়ে গেল। এভাবে ইহুদীরা জুলুম করেছিল তাদের নবীর প্রতি।

আরও পড়ুন


জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিলেন শেখ হাসিনা

‘শাহীন আনাম ও মাহফুজ আনাম হিন্দুদের ঐক্যে চিড় ধরানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত’

পরিবেশ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধতা পৃথিবীকে বাঁচাবে : তথ্যমন্ত্রী

বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশে প্রথম মোবাইল ও ইন্টারনেট এনেছেন: দীপু মনি


এবারে সূরা বাকারা’র ৯৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে -

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آَتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاسْمَعُوا قَالُوا سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَأُشْرِبُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ قُلْ بِئْسَمَا يَأْمُرُكُمْ بِهِ إِيمَانُكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (93)

‘‘স্মরণ কর যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুরকে তোমাদের উর্ধ্বে স্থাপন করেছিলাম৷ বলেছিলাম তাওরাত ও এর যেসব বিধান তোমাদেরকে দিলাম সেসব দৃঢ়ভাবে গ্রহণ কর এবং শ্রবণ কর ৷ কিন্তু তারা বললো, আমরা শ্রবণ করলাম ও অমান্য করলাম। ’’ (২:৯৩)

কুফরী ও অবিশ্বাসের কারণে তারা তাদের অন্তরে বাছুরকে স্থান দেয়৷ হে নবী আপনি তাদের বলুন যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তাহলে তোমাদের বিশ্বাস যা নির্দেশ দেয় তা কত নিকৃষ্ট।

এর আগে বলেছি- ইহুদীরা মহানবী (সা.)-এর প্রতি ঈমান না আনার অজুহাত হিসাবে বলেছিল- রাসূলে খোদা বনী ইসরাইল জাতির লোক না। তারা বলেছিল আমরা কেবল এমন নবীর প্রতি ঈমান আনবো যে আমাদের গোত্রের হবে। আর আমরা কেবল মূসার আনা কিতাব তাওরাতই মেনে চলব৷ এর আগের কয়েকটি আয়াতে উদাহরণ দেয়া হয়েছে যা দেখে বুঝা যায়, ইহুদীরা তাদের নবী মূসা ও তার ধর্মগ্রন্থ মেনে চলা দূরের কথা বরং তার বিপরীতভাবে চলে। আর এ আয়াতে সেরকম আরেকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। তুর পাহাড়ে আল্লাহপাক বনী ইসরাইলের কাছ থেকে কিছু বিষয়ে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। কিন্তু তারা সেগুলো জেনে শুনে বেমালুম ভুলে গেল৷ কারণ তাদের অন্তরের ভেতর শিরক্‌ ও দুনিয়া পূজা এমন গভীরভাবে গেড়ে বসল যে, সেখানে চিন্তা ও বিশ্বাসের কোন স্থান ছিল না। তাদের এ দুনিয়া পূজার বিষয়টি ফুটে উঠে স্বর্ণের বাছুর পূজার মাধ্যমে। আর অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে- আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার সঙ্গে সঙ্গে তারা ঈমানেরও দাবি করত। পবিত্র কোরআন তাদের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন করে তাদেরকে জবাব দেয়। প্রশ্ন করা হয়, তোমাদের ঈমান কি তোমাদেরকে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গের নির্দেশ দেয়? ওই বিশ্বাস কি বাছুর পূজা এবং আল্লাহর নবীদের হত্যা করতে বলে? যদি তোমাদের ঈমান এ ধরনের হয়, তবেতো সে খুব নিকৃষ্ট নির্দেশই তোমাদের দিচ্ছে।

সূরা বাকারা’র ৮৯ নম্বর থেকে ৯৩ নম্বর মূল শিক্ষা হচ্ছে -

১. আজ ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে ইসলাম গ্রহণ না করতে দেখলেও ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ করা উচিত নয়। কারণ তাদের অনেকে সত্য বোঝার পরও প্রবৃত্তিগত কারণে ইসলাম মেনে নিতে রাজী হয় না। যেমনিভাবে মদীনার ইহুদীরা নবীজিকে চিনেও ইসলাম গ্রহণ করে নি ৷

২. হিংসা হলো কুফরী, অবিশ্বাস ও সত্য প্রত্যাখ্যানের উৎস। বনী ইসরাইল যখন দেখল রাসূলে খোদা তাদের গোত্রের নয় তখন তারা হিংসা বশবর্তী হয়ে অবিশ্বাস করতে লাগল।

৩. আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কোন কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বিপজ্জনক। কারণ এ জাতীয় আকর্ষণ মানুষকে সত্যের ব্যাপারে অন্ধ করে ফেলে৷

news24bd.tv এসএম