ত্যাগীদের মূল্যায়ন - বড় তামাশা; বড় দায়!
ত্যাগীদের মূল্যায়ন - বড় তামাশা; বড় দায়!

ত্যাগীদের মূল্যায়ন - বড় তামাশা; বড় দায়!

Other

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রাণ হচ্ছে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কারণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ গণমানুষের দলে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে অনেক নেতা দ্বিধান্বিত হয়েছেন, অনেক নেতা ভুল করেছেন, অনেক নেতা দল ত্যাগ করে চলে গেছেন, কিন্তু কর্মীরা কখনো দ্বিধান্বিত হয়নি, কর্মীরা সবসময় ঐক্যবদ্ধ ছিল, কর্মীরাই দলকে টিকিয়ে রেখেছে।

২০০৭ সালে যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয় তখন অনেক নেতা দ্বিধান্বিত ছিলেন, অনেক নেতা ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন, অনেক নেতা আপোষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ ছিল বিধায় তাদের আন্দোলনে জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তি লাভ করেছিলেন এবং দেশে গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দল ক্ষমতায় আসার পর থেকে ত্যাগের মূল্যায়ন পাচ্ছেন না দুর্দিনের নেতারা। অন্যদিকে দলে সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। সারা দেশে দলের একটি বড় অংশ বঞ্চিত। দলের অনেক মন্ত্রী-এমপির ব্যক্তিগত বলয়ের কারণে তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। সারাদেশে জনবিচ্ছিন্ন নেতা ও বলয় তৈরি করে রাজনীতি করা এমপি-মন্ত্রীদের দাপটে আওয়ামী লীগের তৃণমূল বেদখল হতে চলেছে।

অনেক জায়গায় ক্ষমতাবান নেতারা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে বলয়ের রাজনীতি শুরু করে ত্যাগী ও দুর্দিনের নেতাদের অবমূল্যায়ন করছেন। বিভিন্ন অঞ্চলে বলয়ের রাজনীতি ভেঙে দিয়ে ঐক্যের রাজনীতি শুরু করতে এবং ত্যাগী নেতাদের ক্ষোভ-মান ভাঙাতে কেন্দ্রের এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তাই শুধু জেলায়ই নয়, উপজেলায়ও নেতা বানানো বা জনপ্রতিনিধি বানানোর ক্ষেত্রে ওই এলাকার প্রভাবশালীদের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে হবে। কারণ প্রভাবশালীদের হাতে নেতা নির্বাচন ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ দিয়ে সারা দেশে বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনের অভ্যন্তরে সুবিধাবাদী নেতাদের আধিপত্য বেড়ে গেছে। আর এই সুযোগ তৈরি হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতাবান হওয়ার মনোবাসনা থেকে। ফলে সংগঠন দুর্বল হচ্ছে। পারিবারিক উত্তরাধিকারী হলেই অনেক সময় রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা না থাকার পরও প্রয়াত মন্ত্রী, এমপির পরিবারের সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু উত্তরাধিকারীদের আগে দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। ধীরে ধীরে তারা অভিজ্ঞ হয়ে উঠবে। এরপর তাদের মনোনয়নের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।

বস্তুত উত্তরাধিকারীদের দলীয় রাজনীতির জন্য প্রস্তুত করতে হবে। হুট করে এসেই পুরনো নেতাদের বাদ দিয়ে মনোনয়ন পেয়ে যাওয়া, এ বিষয়টি ঠিক নয়। আগে দলের সঙ্গে যুক্ত হোক, রাজনীতি করুক, বুঝুক, এরপর তাদের মূল্যায়ন করা হোক। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আগে কিছুটা স্ট্রাগল করুক। এমপি হওয়া তো অনেক কঠিন। কিন্তু এখন ফাঁকা মাঠ পেয়ে নৌকা পেলেই অনেকে এমপি হয়ে যাচ্ছেন। দলের সাথে সম্পৃক্ততা না থাকলেও নৌকার জোরে এমপি হয়ে যাচ্ছে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের ক্ষতি হচ্ছে।

তৃণমূলের কর্মীরাই সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি। আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার ও সুযোগ সন্ধানীদের তৎপরতাসহ নানামুখী সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগ।

গত ১৩ বছর ধরে দলে ‘বঞ্চনার শিকার’ তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের এবার মূল্যায়নের সময় এসেছে। দলের সব পর্যায়ে ত্যাগী, সৎ, কর্মীবান্ধব নেতাকর্মীদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পাশাপাশি হাইব্রিড, সুযোগসন্ধানী ও দুর্নীতিবাজদের দল থেকে বাদ দেওয়া হোক। উড়ে এসে জুড়ে বসাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের ব্যাপারেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হোক। সংগঠনের সর্বস্তরে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হোক।

‘৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে যারা ২১ বছর বুকে পাথর বেঁধে সংগঠনটা করেছে তাদের মূল্যায়ন করুন। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল না তখন যারা নির্যাতন, কষ্ট সহ্য করেছে সেই সব ত্যাগী নেতাকর্মীদের দলে মূল্যায়ন করতে হবে। তবেই তৃণমূল পর্যায়ে দল সুসংগঠিত হবে। অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বিতাড়িত করা হোক।

টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আর এ সুযোগে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা, শেখ রাসেলসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন ‘রাজনৈতিক দোকান’। মূল দলের নামের সঙ্গে মিল রেখে অর্থাৎ ‘লীগ’ শব্দটি যোগ করে সংগঠন গড়ে চাঁদাবাজি বা সরকারি সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে এসব ভুঁইফোড় সংগঠন। দেশজুড়ে এসব সংগঠনের ছড়াছড়িতে ক্ষুন্ন হচ্ছে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে কেউ ধরা পড়লে দুই চার দিন হৈচৈ তারপর যা তাই।

ক্ষমতাসীন দলের উপ-কমিটিতে থেকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন শাহেদ, হেলেনার মতো ব্যক্তিরা। আর এসব কারণে শুরু থেকেই কম-বেশি বিতর্কে পড়েছে আওয়ামী লীগের বিষয়ভিত্তিক এসব উপ-কমিটি। ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগে প্রবেশ করে সুবিধাবদীরা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে। কোন যোগ্যতা না থাকলেও চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিবের নিজ এলাকার লোক হিসেবে জায়গা পেয়েছে অনেকে। এইসব উপ কমিটি গুলোতে এমন অনেককেই রাখা হয়েছে, অতীতে যাদের আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল না। তাদের জীবনের প্রথম রাজনৈতিক পদ এই উপকমিটির সদস্য।

আরও পড়ুন


৩ অক্টোবর দেশ ছাড়বে বাংলাদেশ দল

শেখ হাসিনার জন্মদিনে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রীর

অবশেষে সাকিবকে না খেলানোর কারণ জানালো কেকেআর

আজ বিশ্ব হার্ট দিবস


বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ভালোবেসে যারা রাজনীতিটা করতে চান তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। পদ পদবিকে যারা উপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করবে না। সংগঠন বিতর্কিত হয় এমন কোন কাজের সাথে জড়াবে না। বরং শ্রম, ঘাম, মেধা ও ডেডিকেশন দিয়ে দলকে সার্ভ করবে তাদেরকেই বঞ্চিত করা হচ্ছে। দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে।

টানা এক যুগের ক্ষমতা দল আওয়ামী লীগের চরম সর্বনাশ করেছে। সরকারে বিলীন হওয়ার পথে ঐতিহ্যবাহী দলটি। কেন্দ্রের সাথে তৃণমূলের দূরত্ব এতটাই প্রকট যেটা সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জেলা কমিটি গুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাবেন সর্বত্রই ‘ম্যাইম্যান’। সংগঠনে কার অবদান কতটুকু সেটা আর এখন বিবেচিত হয় না। ‘কার লোক’ এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে। হাইব্রিডদের চাষাবাদ এবং ফলন খুবই উচ্চ। এদেরকে জায়গা করে দিতে আওয়ামী লীগের তৃণমূল কোনঠাসা হতে হতে বেদখল হয়ে গেছে।  

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলে আসছেন; দলে এবার ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে। যেকোন নির্বাচন বা কাউন্সিলের আগে সবচেয়ে বেশি বার উচ্চারিত শব্দ- ‘ত্যাগীদের মূল্যায়ন’। কিন্তু দিনশেষে যে লাউ সেই কদুই। দলীয় পোস্ট পদবি এবং ক্ষমতা এখনো তৃণমূল ও ত্যাগীদের কাছ থেকে হাজার মাইল দূরে। ত্যাগীদের মূল্যায়ন তাই আজ বড় তামাশা; বড় দায় !

বাণী ইয়াসমিন হাসি, সম্পাদক, বিবার্তা২৪ডটনেট

news24bd.tv এসএম

সম্পর্কিত খবর

;