বঙ্গবন্ধুর ক্ষমায় সর্বহারা পার্টিতে গেলেন কর্নেল জিয়াউদ্দিন

নঈম নিজাম

বঙ্গবন্ধুর ক্ষমায় সর্বহারা পার্টিতে গেলেন কর্নেল জিয়াউদ্দিন

মানুষের উপকার করতেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ব্রিটিশ শাসনকালে অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে ছিলেন শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আইনজীবী হিসেবেও সুনাম ছিল। কলকাতায় শক্ত ঘাঁটি ছিল শেরেবাংলার। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৪৭ সালের আগে তাঁর কলকাতার বাড়ি সব সময় জমজমাট থাকত। সারাক্ষণ মানুষে গমগম করত। ঢাকা, বরিশালসহ পূর্ব বাংলার লোকজন গেলে বিপদে-আপদে সহায়তা পেতেন। শেরেবাংলাকে নিয়ে অনেক ধরনের মিথ আছে। তিনি ৪০টি ফজলি আম একসঙ্গে খেতে পারতেন। ভোজনরসিক ছিলেন। নিজে খেতেন, অন্যকে খাওয়াতেও ভালোবাসতেন। মামলা-মোকদ্দমায় পাশে থাকতেন গরিব মানুষের। পাশে দাঁড়াতেন কৃষকের। একবার একজন তাঁর কাছে গিয়ে আর্থিক ১৫ টাকা সাহায্য চাইলেন। তখন ১৫ টাকা অনেক। শেরেবাংলা বাড়ির ভিতরে গেলেন। নিয়ে এলেন ২০ টাকা। সে টাকা লোকটির হাতে দিলেন। লোকটি বলল, আমি তো ১৫ টাকা চেয়েছিলাম। আপনি দিলেন ২০ টাকা। ৫ টাকা বেশি কেন? জবাবে শেরেবাংলা হাসলেন। তারপর বললেন, প্রতিদিন অনেক মানুষ আমার কাছে সাহায্যের জন্য আসে। কমবেশি সবাইকে চেষ্টা করি সহায়তা করতে। পরে দেখি যাদের সহায়তা করলাম তারা আমার বিরোধিতা করছে। আড়ালে গিয়ে কথা বলছে। মিথ্যা কুৎসা রটাচ্ছে। কীভাবে ক্ষতি করবে সেই চিন্তা করছে। এমনকি ভোট এলে সবার আগে সহায়তা গ্রহণকারী মানুষটি বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। উপকার করলে এ দেশে বাঁশ খেতে হয়। এ কারণে ৫ টাকা আগাম দিয়ে রাখলাম তোমাকে। বাড়তি টাকা দিয়ে বাঁশ কিনে রাখবে। তুমি যখন আমার বিপক্ষে যাবে তখন বাঁশ দেওয়ার জন্য নতুন করে টাকা সংগ্রহ করতে হবে না। কারও কাছে নতুন করে ধারকর্জ করতে হবে না। আমার টাকায় কেনা বাঁশ আমাকে দিয়ে দেবে। এ কারণে আগেই ৫ টাকা বেশি দিয়ে রাখলাম।

আমাদের ভূখন্ডের মানুষকে শেরেবাংলা ভালো করেই চিনেছিলেন। ইতিহাসের পরতে পরতে বিশ্বাসঘাতকরা লুকিয়ে আছে। বেইমান, মীরজাফর, খন্দকার মোশতাকরা ঘুরে বেড়ায় আমাদের চারপাশে। ইতিহাসে নায়ক থাকে, খলনায়কও থাকে। সব চরিত্রের অধ্যায়, অবস্থান আলাদা করে নির্ধারণ করা। মীরমদন, মোহনলালের অবস্থান বীরত্বে। আবার মীরজাফর, উমিচাঁদ, ঘষেটি বেগমদের অবস্থান মুনাফেকিতে। বিশ্বাসঘাতকদের কারণে প্রাণ দিয়েছেন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ ধরা পড়েন মানুষের ওপর আস্থা রেখে। বাহাদুর শাহকে ইংরেজ বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেন তাঁকে আশ্রয়দানকারী মাজারের খাদেম। আটকের পর শেষ মুহুর্তে বাহাদুর শাহ একবার তাকিয়েছিলেন খাদেমের দিকে। অর্থলোভী খাদেমের মাথাটা নিচুই ছিল। বৃদ্ধ সম্রাট হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বুঝতে এবং হজম করতে সময় লেগেছিল। যখন সব বুঝলেন তখন হাঁটতে থাকেন ইংরেজ বেনিয়া সেনাদের সঙ্গে অজানার পথে। ইতিহাস কোনো দিন খুনি বিশ্বাসঘাতককে ঠাঁই দেয় না। সাময়িক ফায়দা দেয়। কিন্তু বেশিদিন তা স্থায়ী হয় না। মীরজাফর, মোশতাকরা কত দিন ক্ষমতায় ছিলেন পুতুল সরকার হিসেবে? বেশিদিন না। অল্প সময়ে বিদায় নিতে হয়েছিল নিষ্ঠুরভাবে। মীরজাফর, ঘষেটি বেগম, খন্দকার মোশতাকদের ইতিহাসে এখন অবস্থান গালি হিসেবে। ষড়যন্ত্রকারীরা টিকতে পারে না। মানুষ সব জানে। তার পরও লোভে পড়ে মোশতাক হয়, মীরজাফর হয়। বিশ্বাস, আস্থা, সমাজ ও সংস্কৃতি ধ্বংস করে। এভাবে চলে আসছে আমাদের ভূখন্ডে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বাসই করতেন না তাঁকে কোনো বাঙালি খুন করতে পারে। এসবির ডিআইজি ই এ চৌধুরীর কাছে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিয়ে বারবার নেতিবাচক খবর আসতে থাকে। একাধিক রাত তিনি পুলিশ ও রক্ষীবাহিনী নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন। একপর্যায়ে বিষয়টি বঙ্গবন্ধুকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। একা না গিয়ে রক্ষীবাহিনীর দুই উপপরিচালক আনোয়ারুল আলম শহীদ ও সরোয়ার হোসেন মোল্লাকে নিয়ে একদিন বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলেন। সরোয়ার মোল্লা আমাকে বলেছেন, তাদের সঙ্গে ছিলেন রক্ষীবাহিনীর আরেকজন কর্মকর্তা কর্নেল সাবিহ উদ্দিন। তিনজন বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেন নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে না থাকতে। দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য ধানমন্ডি ৩২ নিরাপদ স্থান নয়। সাবিহ উদ্দিন একটি বই নিয়ে যান। বইটির নাম ‘অ্যা ম্যান অন দ্য হর্স ব্যাক’। এ বইতে দুনিয়ার শতাধিক সামরিক ক্যুর কথা লেখা ছিল। অল্প কিছু মানুষ কীভাবে ক্যু করে তার বর্ণনাও ছিল। তারা বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করলেন গণভবনে থাকতে। বঙ্গবন্ধুর নেতিবাচক ভাব দেখে ই এ চৌধুরী বঙ্গভবনে থাকতেও বলেছেন। বঙ্গবন্ধু তাদের কথা শুনলেন। তারপর বললেন, বাংলার মানুষ আমাকে মারবে! তারপর বললেন, তোমরা তোমাদের রক্ষীবাহিনী চালাও। আইনশৃঙ্খলা ঠিক কর। দেশের মানুষের শান্তি নিশ্চিত কর। শুধু রক্ষীবাহিনী নয়, বঙ্গবন্ধুকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ সতর্ক করে। ইন্দিরা গান্ধী ‘র’-প্রধানকে পাঠিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাদের কথাকেও গুরুত্ব দেননি। পাত্তা দেননি। এমনকি মৃত্যুর আগেও সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে খুনিদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন, পাকিস্তান আর্মি আমাকে হত্যার সাহস পায়নি। তোরা কারা? কী চাস? বঙ্গবন্ধু ভাবতেন কোনো বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে না। পারবে না। কারণ এই বাঙালিকে তিনি একটি দেশ দিয়েছেন। বিশে^র বুকে একটি পাসপোর্ট দিয়েছেন। কীভাবে তারা তাঁর বিরুদ্ধে যাবে!

বঙ্গবন্ধু’ ৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরার পরই ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক এ এল খতিবের ‘হু কিল্ড মুজিব’ বইতে অনেক কিছু লেখা আছে। অনেক অজানা ষড়যন্ত্রের বর্ণনা আছে।’ ৭২ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়েন। গলব্লাডার স্টোন অপারেশনের জন্য লন্ডন যান। ১১ আগস্ট হলিডে পত্রিকায় লে. কর্নেল জিয়াউদ্দিনের একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুকে আক্রমণ করা হয়। সরকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়। জিয়াউদ্দিন ঢাকা ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। এভাবে একজন কর্মকর্তার লেখা প্রকাশের পর তাৎক্ষণিক সেনা আইনে কোর্ট মার্শাল হওয়ার কথা ছিল। ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নিলেন না। সবাই তাকিয়ে ছিলেন একজনের দিকে। বঙ্গবন্ধু লন্ডনে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম কোনো সিদ্ধান্ত দিলেন না। কর্নেল তাহেরের ঘনিষ্ঠ এই সেনা কর্মকর্তা বামধারার চিন্তা করতেন। লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন লে. কর্নেল জিয়া। বঙ্গবন্ধু তাকে বললেন, ক্ষমা চাইলে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হবে না। বঙ্গবন্ধুর এ উদারতা তখনকার সেনা কর্মকর্তাদের অনেককে বিস্মিত করে। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বের হয়ে পালিয়ে যান জিয়াউদ্দিন। তারপর যোগ দেন সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টিতে। সর্বহারা পার্টির তখনকার গলা কাটা ভূমিকা সবারই জানা। রাষ্ট্রশাসনে বঙ্গবন্ধুর অতি উদারতার সুযোগই ষড়যন্ত্রকারীরা নিতে থাকে। পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধু সরকারকে করে তোলা হয় অজনপ্রিয়। বাংলাদেশে উদারতার স্থান নেই। কঠিন বাস্তবতা হলো এখানে কেউ আপনজন নেই। আবদুল আলীমের একটি গান আছে- ‘এ সংসারে কেউ নয় আপনজনা’। আসলে আপন চেনা বড় কঠিন। বঙ্গবন্ধুও চিনতে পারেননি পাশে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের। বড় উদারতা নিয়ে সবকিছু দেখতেন। বাঙালির নেতিবাচক জায়গাটুকু শেরেবাংলা ধরতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলেই বাঁশ দেওয়ার জন্য দিয়েছিলেন আগাম টাকা।

রাজনীতির হিসাব-নিকাশটা জটিল। আমাদের রাজনীতির উদারতার দৃষ্টান্তগুলো বঙ্গবন্ধু তৈরি করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ভালোবাসা দিয়ে সবটুকু জয় করতে। মানুষকে কাছে টানতে। বঙ্গবন্ধু খুব দ্রুত মানুষকে কাছে টেনে নিতেন। কাজে লাগাতেন রাজনীতিতে। এভাবে সবাই পারে না। সবাই করেও না। বঙ্গবন্ধুর আরেকটি গুণ ছিল দুঃসময়ের মানুষদের মূল্যায়ন। তিনি খুঁজে খুঁজে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসতেন। বাদ পড়েননি মোহাম্মদ উল্লাহর মতো নেতাও। আওয়ামী লীগের একজন নেতা থেকে দেশের স্পিকার, রাষ্ট্রপতি সব হয়েছিলেন। তবু তাঁর চাওয়া-পাওয়ার শেষ ছিল না। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে পড়েছি, আওয়ামী লীগের শুরুর দিকে পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগ অফিসে এই মোহাম্মদ উল্লাহ একদিন সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে দাঁড়ান। তারপর বলেন, কাজ করতে চাই। দলের অফিসে সার্বক্ষণিক থাকার জন্যও একজনকে লাগে। বঙ্গবন্ধু তাঁকে আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক করেন। পত্রিকা অফিসে প্রেস বিজ্ঞপ্তি নিয়ে যেতেন মোহাম্মদ উল্লাহ। নিজেই টাইপ করতেন প্রেস বিজ্ঞপ্তি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে সংসদে ডেপুটি স্পিকার করেন। ভাগ্যবান মানুষ মোহাম্মদ উল্লাহ। স্পিকার আবদুল হামিদের মৃত্যু তাঁর ভাগ্য খুলে দেয়। তিনি হয়ে গেলেন স্পিকার। দুই বছরের মধ্যে মোহাম্মদ উল্লাহর উত্থান হয় আরেক দফা। ১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারি মোহাম্মদ উল্লাহ প্রেসিডেন্ট হলেন বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্রেসিডেন্ট করলেন। কিন্তু এ পদের মর্যাদা মোহাম্মদ উল্লাহ বুঝতেন কি না জানি না। এক বছর পর দেশে রাষ্ট্রপতি-শাসিত পদ্ধতি শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু শপথ নিলেন রাষ্ট্রপতি হিসেবে। মোহাম্মদ উল্লাহ বাদ পড়লেন না। বঙ্গবন্ধু এবার তাঁকে মন্ত্রী করলেন। দুঃসময়ের অফিস পাহারাদারকে মূল্যায়ন করেছিলেন যথাযথভাবে। কিন্তু ইতিহাস ভীষণ নিষ্ঠুর! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যার পর মোহাম্মদ উল্লাহকে দেখা গেল আরেক রূপে। সাদামাটা চলতে অভ্যস্ত মোহাম্মদ উল্লাহ শপথ নিলেন খন্দকার মোশতাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

আরও পড়ুন


সূরা বাকারা: আয়াত ১২৪-১২৭, দুনিয়ার নানা ঘটনা আল্লাহর পরীক্ষা

বিমানবন্দর যেন সোনার খনি

সচিবের ভুয়া পরিচয়ে কোটি কোটি টাকার গাড়ি বাড়ি

কেয়ামতের যত দৃশ্যমান আলামত ও নিদর্শন


মোহাম্মদ উল্লাহকে কাছ থেকে দেখলাম ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদে। তিনি বিএনপি থেকে এমপি হয়েছেন। সংসদে মোহাম্মদ উল্লাহ কথা বলতেন না। চুপচাপ এসে বসতেন হাউসে। আবার চলে যেতেন। আমি তখন কাজ করি আজকের কাগজ, ভোরের কাগজে। আওয়ামী লীগ ও সংসদ বিটের রিপোর্টার ছিলাম। নিয়মিত সংসদে যেতাম। একদিন সংসদে মোহাম্মদ উল্লাকে বললাম, আপনার একটি সাক্ষাৎকার নিতে চাই। কথা বলতে চাই আপনার দীর্ঘ জীবন নিয়ে। রাজনীতি নিয়ে। তিনি আমার দিকে তাকালেন। জানতে চাইলেন কোথায় কাজ করি। তারপর বললেন, আচ্ছা একদিন কথা বলব। সেই কথা আর বলা হয়নি। মোহাম্মদ উল্লাহর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলান তাঁর ক্ষমতার নানা মেরুকরণ নিয়ে। তিনি সময় দেননি। আমিও সময় করতে পারিনি। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে তখন আমরা সারা দেশে যেতাম সংবাদকর্মী হিসেবে। সে কারণে সময় মেলেনি।

একজন মোহাম্মদ উল্লাহকে বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে রাষ্ট্রপতি করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কোথায় থামতে হবে বুঝতে পারেননি মোহাম্মদ উল্লাহ। ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার, রাষ্ট্রপতি সবই ছিলেন। এরপর একজন মানুষের আর কী চাওয়া থাকতে পারে? মোশতাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। বিএনপি করেছেন। সবশেষে রাজনীতির সমাপনী টানেন সংসদ সদস্য হিসেবে। আমি একবার ভুল করে লিখেছিলাম, তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। পরে তাঁর পরিবারের লোকজন আপত্তি করলেন। তারা বললেন, না, তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন না। খবর নিয়ে দেখলাম পরিবারের কথাই সত্যি। এ যুগে এই সময়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে অনেক মানুষের নানামুখী উত্থান দেখে মোহাম্মদ উল্লাহকে মনে পড়ে গেল। চাওয়ার চেয়ে বেশি পেয়ে গেলে সমস্যা। বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি দিয়েছেন মোহাম্মদ উল্লাহকে। বঙ্গবন্ধুর মেয়েকে কাছ থেকে দেখেছি। তিনিও বাবার মতো হিমালয়সম হৃদয় পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেওয়ার সময় তিনি বাবাকে ছাড়িয়ে যান। তবে বঙ্গবন্ধুর মেয়ের ইতিবাচক দিক আছে। তিনি অনেক সময় কারও পরিমিতিবোধের অভাব দেখলে কেড়েও নেন। জানিয়ে দেন কারও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। যিনি ক্ষমতায় বসান তিনি আবার কেড়েও নিতে পারেন।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

দাঙ্গা বন্ধে নোয়াখালীতে ছাগল হারান মহাত্মা গান্ধী

নঈম নিজাম

দাঙ্গা বন্ধে নোয়াখালীতে ছাগল হারান মহাত্মা গান্ধী

দাঙ্গা দমনে নোয়াখালী এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। একটানা চার মাস থাকলেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরলেন। মানুষের সঙ্গে কথা বললেন। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেননি। বরং নিজের ছাগলটাও হারিয়েছিলেন। নোয়াখালীর দাঙ্গার ধাক্কাটা গিয়ে আঘাত হানল বিহারে। দলে দলে বিহারি এলো আমাদের এ অংশে। আর এ অংশের লোক চলে গেল পশ্চিমবঙ্গ আর ত্রিপুরায়। সন্দেহ, অবিশ্বাস এমনই ভয়াবহ যে ধর্মের ভিতরে একবার প্রবেশ করলে আর শেষ হয় না। মানুষকে শেষ করে দেয়। জীবন করে তোলে অতিষ্ঠ। নারী-শিশুকে করে ঘরছাড়া। মানবতায় নেমে আসে বিপর্যয়। আঘাত হানে রাষ্ট্রের অখন্ডতায়। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা এ ভূখন্ডের সুস্থতা নষ্ট করেছিল। হারিয়েছিল স্বাভাবিকতা। বেড়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও অর্থনীতি। কেন এমন হয়েছিল সে গবেষণা এখনো অনেকে করছেন। আগামীতেও করবেন। কিন্তু আমরা এখনো বের হয়ে আসতে পারিনি সেই ভয়াবহতা থেকে। এবারকার একতরফা পূজামন্ডপ, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়িতে হামলা, মৃত্যু, জটিলতা ভয়াবহতা একটা খারাপ বার্তা দিয়ে গেল আমাদের। জানি না এ ক্ষত আর শুকাবে কি না। আধুনিক সভ্যতার এই যুগে মানুষ আরও খারাপ হয়েছে। ফিরে গেছে আদিম বর্বরতায়। আধুনিকতার আড়ালে বেড়েছে মানুষের ঈর্ষা, হিংসা, বিদ্বেষ, নষ্টামি আর ভন্ডমি। মুখ মুখোশের আড়ালে একটা ভয়াবহ সমাজের পথে এগিয়ে চলেছি আমরা। কেউ জানি না এর শেষ কোথায়।

১৯৪৬ সালে কলকাতায় দাঙ্গার খবর গেল মহাত্মা গান্ধীর কাছে। তিনি রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বললেন। আহ্‌বান জানালেন দাঙ্গা বন্ধের। গান্ধীর বিবৃতি সংবাদপত্র প্রকাশ করল। কিন্তু বন্ধ হলো না হানাহানি। কলকাতার আগুনের দাবানল ছড়াল নোয়াখালী ও আজকের দক্ষিণ কুমিল্লায়। খবর শুনে ব্যথিত হলেন গান্ধী। ধর্মের নামে বর্বরতা বন্ধে নিজেই চলে আসেন নোয়াখালীতে। সময়টা ১৯৪৬ সালের ৬ নভেম্বর। যাতায়াতব্যবস্থা এখনকার মতো ছিল না। খুব ভয়াবহ অবস্থা ছিল চলাচলে। নৌকা আর হাঁটাপথ ছিল ভরসা। বয়সের কারণে শরীরও ভালো ছিল না গান্ধীজির। দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে চলতেন। দলীয় নেতারা তাঁকে অনুরোধ করলেন না আসতে। কিন্তু তিনি কারও কথা শুনলেন না। মানুষের নিষ্ঠুরতা তাঁকে আঘাত করল। শান্তির পতাকা নিয়ে তিনি এলেন। পাশে দাঁড়ালেন আর্তমানবতার। হেঁটে হেঁটে মানুষের দরজার সামনে গেলেন। কোনো বাধাই তাঁকে আটকাতে পারল না। নেহরুসহ সহযোগীরা জানতে চাইলেন নোয়াখালীতে কত দিন থাকবেন? জবাবে বললেন, যত দিন প্রয়োজন হয় তত দিন। আগে মানুষকে বাঁচাতে হবে। মানবতা রক্ষা করতে হবে। তারপর অন্য কিছু। গান্ধী এসে প্রথম গেলেন চৌমুহনীতে। থাকলেন দুই রাত। বিশ্রামেরও দরকার ছিল টানা জার্নির কারণে। নভেম্বর- শীত শুরু হয়ে গিয়েছিল। চৌমুহনীতে দুই দিন কাটিয়ে ৯ নভেম্বর কাজ শুরু করেন গ্রামগঞ্জে। দিনের পর দিন ঘুরতে থাকেন। মানুষকে বোঝাতে থাকেন।

নোয়াখালী দাঙ্গার হিসাব-নিকাশ সহজ ছিল না। সবকিছু হুট করে শুরু হয়নি। কলকাতা দাঙ্গার সুযোগটা নিয়েছিল এখানকার লোকজন। তখনকার ঘটনাবলির দিকে চোখ রাখলে দেখা যায়, নোয়াখালী অঞ্চলে হিন্দু জমিদারদের একটা আধিপত্য ছিল। ক্ষমতার ব্যবহার, অপব্যবহার ছিল। মুসলমান সাধারণ কৃষকের সঙ্গে দূরত্ব ছিল। আর সে সুযোগটা কাজে লাগান পীর হুসাইনী। তিনি ছিলেন কৃষক প্রজা পার্টির নেতা। পীর হিসেবে এলাকায় তাঁর অনুসারী তৈরি হয়েছিল। ভোট করতেন কৃষক প্রজা পার্টি থেকে। প্রাদেশিক পরিষদে জয়ীও হয়েছিলেন ১৯৩৭ সালে। তবে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পর হেরেছিলেন মুসলিম লীগের কাছে। বিশাল অনুসারী গ্রুপ নিয়ে পীর সাহেবের অবস্থান ছিল জমিদারদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে জমিদার চিত্তরঞ্জন চৌধুরী মুসলমানদের উত্থান মেনে নিতে পারছিলেন না। মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ বাড়তে থাকে। তৈরি হতে থাকে সামাজিক দূরত্ব। কলকাতার দাঙ্গার সুযোগ নেন পীর সাহেব পুরোপুরি। প্রথম হামলা হয় লক্ষীপুর রামগঞ্জ করপাড়া জমিদার রাজেন্দ্র লাল চৌধুরীর বাড়িতে। এর আগে এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় গুজব। ভারত সেবাশ্রম সংঘের সাধু ত্রিয়াম্বাকানন্দ নামের এক পুরোহিত আসেন জমিদারবাড়ির পূজা করতে। সাধু ত্রিয়াম্বাকানন্দের হাঁটাচলায় একটা বড় মাপের পুরোহিত পুরোহিত ভাব ছিল। সেই ভাব ঘিরে গুজব ছড়ায় জমিদারবাড়ির পূজায় পাঁঠার বদলে মুসলমান তরুণকে বলি দেওয়া হবে এবার। মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হবে পূজামন্ডপ। এ কারণে ভারত সেবাশ্রম সংঘের সাধু এসেছেন। স্থানীয় সাধুদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গুজবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। জমিদার রাজেন্দ্র লাল চৌধুরীকে বৈঠকের প্রস্তাব পাঠান স্থানীয় পীর সরোয়ার হোসাইনী। তিনি ব্যাখ্যা চান সবকিছুর। জমিদার বিষয়টি এড়িয়ে যান। বসে থাকলেন না পীর সাহেব। তিনি সমাবেশ করে ঘোষণা দিলেন জমিদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। মিথ আছে- জমিদারের মাথা কেটে নেওয়ার বক্তব্যও দিয়েছিলেন পীর হোসাইনী। ব্যস, শুরু হয় হাঙ্গামা; হিন্দুু জমিদারের বিরুদ্ধে লড়াই।

১১ অক্টোবর রাতে করপাড়া চৌধুরী বাড়িতে হামলা হয়। নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে জমিদার রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত লড়ে যান। সে হামলা সম্প্রসারিত হয়ে আঘাত হানে নিরীহ হিন্দুদের বাড়িতেও। খুন, ধর্ষণ, লুটপাটে নেমে পড়ে একদল সুযোগসন্ধানী। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ছিল- চৌমুহনী, সোনাইমুড়ী, চাটখিল, লক্ষীপুরের রামগঞ্জ, ফেনীর কিছু এলাকা। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে নিস্তার পায়নি অবিভক্ত ত্রিপুরার লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ। ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। গান্ধী পায়ে হেঁটে পুরো অঞ্চল ঘুরে বেড়ান। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। দাঙ্গার ভয়াবহতা তাদের বোঝাতে থাকেন। গান্ধীজি কথা বলেন, পীর হোসাইনীর সঙ্গেও। কয়েক মাসের চেষ্টায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে গান্ধী ফিরে যান। কিন্তু নোয়াখালীর আঘাতের পাল্টা তান্ডব ততক্ষণে গিয়ে পড়েছে বিহারে। কলকাতার পরিস্থিতি আবার অস্বাভাবিক হয়। টনক নড়ে ভারতবর্ষের রাজনীতিবিদদের। পরিবেশ শান্ত করার পরিবর্তে বল্লভ ভাই প্যাটেলরা দাঙ্গাকে রাজনীতির দিকে নিয়ে যান। মুসলিম লীগের একাংশও বসে ছিল না। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগে অনেক মুসলমান অধ্যুষিত জেলা গিয়ে পড়ে ভারতে। আবার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা থেকে যায় পূর্ব বাংলায়। তড়িঘড়ির বিভক্তিতে সংকটের সমাধান হয়নি। বরং সংকট তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদের; যা এখনো চলছে।

গান্ধী নোয়াখালী থাকাকালে হারিয়েছিলেন নিজের পোষা ছাগলটি। সবাই জানেন ছাগলের দুধ পান করতেন মহাত্মা গান্ধী। তিনি ইংল্যান্ড থেকে দুটি ছাগল নিয়ে আসেন। যেখানে যেতেন ছাগলগুলো সঙ্গে থাকত। নোয়াখালীতেও ছাগলগুলো আনতে ভুল করেননি। কিন্তু বিপত্তি বাধে সোনাইমুড়ী, চাটখিল পরিদর্শনের সময়। এক রাতে মহাত্মা গান্ধীর ছাগল চুরি হয়ে যায়। সে ছাগল আর পাওয়া যায়নি। একদল প্রচার করে- ছাগলটি নিয়েছেন পীরের অনুসারীরা। তারা ছাগল জবাই করে রান্না করেন। পরে রান্না করা মাংস পাঠান নিরামিষভোজী গান্ধীকে। পীর হোসাইনী রান্না করা মাংস পাঠিয়ে গান্ধীকে ভিন্ন বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। আবার এ নিয়ে অন্য কথাও প্রচার আছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ছাগলটির হদিস পাওয়া যায়নি। ছাগল চুরির ঘটনায় গান্ধী বিস্মিত ও হতাশ হন। নেহরু বার্তা পাঠান দ্রুত ফিরে যেতে। শরীরও ভালো যাচ্ছিল না। গান্ধী ফিরে যান। তবে আশা রেখেছিলেন তাঁর অনুরোধে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বন্ধ হবে। বাস্তবে দাঙ্গা বন্ধ হয়নি। ছাগল চুরির ঘটনায় গান্ধীর মনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। মিডিয়ায়ও খবরটি ফলাও করে প্রচার পায়। গান্ধীর ছাগল চুরি নিয়ে নোয়াখালীবাসীকে এখনো অনেকে বিদ্রুপ মন্তব্য করেন। আবার অনেকে করেন মজা।

নোয়াখালীর দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রভাব কীভাবে বিহারে পড়েছিল তার কিছু চিত্র পাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। বঙ্গবন্ধু কলকাতার দাঙ্গা, রাস্তাঘাটে মানুষের লাশ পড়ে থাকা, লুটপাটের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরেছেন। নিরীহ মানুষ কীভাবে বীভৎসতার শিকার হয়েছেন তা রয়েছে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে। বঙ্গবন্ধু দাঙ্গা বন্ধে কলকাতায় কাজ করেন। আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ান। অসহায় মানুষের খাবার সংগ্রহ করেন। নিজে ঠেলা চালিয়ে চালের বস্তা পৌঁছে দেন সাধারণ মানুষের দরজায়। ছাত্রদের হোস্টেলে খাবার পাঠান। রাত জেগে পাহারাও দেন সংঘাত বন্ধে। শুধু কলকাতা নয়, বিহারের দাঙ্গার ভয়াবহতা নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখে গেছেন অনেক কিছু। পাটনায় এক কঠিন পরিস্থিতিতে ঘরহারা মানুষের পাশে স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। নিরীহ মুসলমান, হিন্দুদের রক্ষা করেছিলেন তিনি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তখন রাজনীতি করতেন বঙ্গবন্ধু।

সময় চলে যায় পরিস্থিতি বদল হয় না। নিরীহ মানুষের ওপর হামলা এখনো হচ্ছে। মানুষ আধুনিক হচ্ছে। নিজেদের সভ্য দাবি করছে। বাস্তব অতীতের চেয়েও খারাপ। মিথ্যা কুৎসা রটিয়ে এ যুগেও মানুষ দাঙ্গা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠছে বিষোদগার ও মিথ্যাচারের কেন্দ্র। সাইবার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দেখি না। রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পাবনা, সুনামগঞ্জে দাঙ্গা ছড়ানো হয়েছিল ফেসবুকের অপব্যবহার করে। এখনো একই কৌশল চলছে। সরকারের ডিপার্টমেন্টের শেষ নেই। কিন্তু সাইবার সন্ত্রাস নিয়ে সবাই নির্বিকার। ভাবখানা এমন- কারও কিছু করার নেই। বড় মন্ত্রী দোষ দেন ছোট মন্ত্রীকে। আর ছোট মন্ত্রী দোষ দেন বড় মন্ত্রীকে। কোথায় আছি আমরা! সাইবার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। কঠোর হাতে পরিস্থিতি সামাল দিন। না দিলে আগামীতে জটিল অবস্থা তৈরি হবে। ভোটের সময় টের পাবেন কত ধানে কত চাল। সাইবার সন্ত্রাসীদের ভাড়া করা হয়েছে বাংলাদেশকে উথালপাথাল করতে। বিদেশে বসে তারা যখন যা খুশি করছে। সব বিষয়ে তৈরি করছে জটিলতা। তার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। প্রশ্ন আসে না মাস্টারমাইন্ড আর অর্থায়নকারী কারা।

আরও পড়ুন


সূরা বাকারা: আয়াত ১৪৩-১৪৭, পূর্ব-পশ্চিম আল্লাহরই মালিকানাধীন

বেপরোয়া রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরছে ক্যাম্পে

দক্ষিণ কোরিয়া সফর শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান

যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সসহ ১০ দেশের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের নির্দেশ এরদোয়ানের


আমরা অনেক কিছুই বের করতে পারি না সময়মতো। এবারকার মন্ডপ ও বাড়িঘরে হামলা সরকারের জন্য সতর্কবার্তা। এ বার্তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ভবঘুরে যুবক মন্ডপে অপকর্ম করল। কিন্তু আড়ালে কে ছিল? খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। হনুমানের লেজের আগুনে লঙ্কা পুড়েছে জানি। কিন্তু হনুমানের লেজে আগুন দেওয়ার বুদ্ধি আলাদা ছিল। কুমিল্লার ঘটনার প্রভাব পড়েছে আরও ১০ জেলায়। কী কারণে সে জেলাগুলো সতর্ক হলো না? প্রশ্ন অনেক। উত্তর নেই। গোয়েন্দা তথ্য কি সরকার আগাম পেয়েছিল? না পেলে কেন পায়নি? আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কেন পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে পারেনি? তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু বুঝি না। আইনের শাসনের কেউ ব্যত্যয় ঘটালে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সব বিষয়ে থাকতে হবে জিরো টলারেন্স। অসাম্প্রদায়িক চেতনা মুক্তিযুদ্ধের কষ্টার্জিত অর্জন। সে অর্জনকে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। কারও জন্য হওয়া যাবে না প্রশ্নবিদ্ধ। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সব জটিলতা দূর করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে।’ কবি নজরুল বলেছেন, ‘মোরা একটি বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’

আগুনের পরশমণি এখন আর কেউ ছোঁয়ায় না। কবি নজরুলের বাণী সবাই ভুলে গেছে। অসাম্প্রদায়িক নজরুলকে সবাই এখন মুসলমানের কবি বানিয়ে খুশি। তাঁর আত্মজীবনীও কেউ পড়ে না। পুত্রদের নাম তিনি কী রেখেছিলেন তা কারও মনে নেই। নজরুল মসজিদে যেতেন এক পুত্রকে নিয়ে। আরেক পুত্রকে নিয়ে স্ত্রী পূজা দিতে যেতেন মন্দিরে। কুমিল্লার হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন নজরুল। তখন নাম ছিল ত্রিপুরা। আমাদের দাদার আমলের সব দলিলে ত্রিপুরা লেখা। একসময় ত্রিপুরার রাজধানী ছিল আজকের কুমিল্লা শহর। ১৯৬৫ সালের পর নাম বদল হয়েছে। কুমিল্লায় একসময় সুরের ঝঙ্কার তুলতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শচীন দেববর্মণ। সংস্কৃতির শহর কুমিল্লা। শহরে একসময় কৃষিমেলা বসত। থাকত যাত্রা, সার্কাস, পুতুলনাচ, হাউজি। গ্রামগঞ্জে বসত জারি-সারির আসর। ধর্মচর্চারও অভাব ছিল না।  মসজিদ থেকে আসত আজানের ধ্বনি। সকালে শুনতাম আসসালাতু খাইরুমমিনান নাউম। মন্দিরে বাজত ঘণ্টা। সন্ধ্যায় উলুধ্বনি শোনা যেত। ভোরে মুসলমান বাড়ি থেকে আসত কোরআনের সুমধুর সুর। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি কুমিল্লা ঘিরে। সবকিছু হারিয়ে গেছে। মানুষ বদলে গেছে। মানুষের মন বদল হয়ে গেছে। কমে গেছে চিন্তার ব্যাপ্তি। কেউ বোঝে না ইসলাম কোনো ঠুনকো ধর্ম নয় যে ফুঁ দিলে উড়ে যাবে। আমাদের প্রিয় রসুল (সা.) বিদায় হজে বলে গেছেন, যার যার ধর্ম তার তার। অশান্তির অনল আর নয়। শান্তি চাই, স্থিতি চাই। আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে পড়ুক জগতের সব মানুষের মধ্যে।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

রক্ষীবাহিনীর অজানা কথা

বঙ্গবন্ধু যেতেই গুলি বন্ধ করল বিডিআর

নঈম নিজাম

বঙ্গবন্ধু যেতেই গুলি বন্ধ করল বিডিআর

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরতেই শুরু হয়ে গেল ষড়যন্ত্র। দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা নেমে গেল মাঠে। প্রথম আঘাতটা এলো রক্ষীবাহিনী গঠন করতে গিয়ে। রক্ষীবাহিনী ছিল প্যারা মিলিশিয়া বাহিনী। গঠনের সিদ্ধান্ত হয় বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার আগেই। ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তখনকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রবাস থেকে ঢাকায় ফেরেন। ২৩ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গঠন করা হয় ১১ সদস্যের জাতীয় মিলিশিয়া বোর্ড। এতে এক নম্বর সদস্য ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদও সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিলেন এ এইচ এম কামরুজ্জামান, মনোরঞ্জন ধর, গাজী গোলাম মোস্তফা, রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া, আবদুর রাজ্জাক ও ক্যাপ্টেন সুজাত আলী। এ ব্যাপারে সরকারকে সহায়তা করতে কর্নেল ওসমানীর নেতৃত্বে সেনা কর্মকর্তাদের একটি টিম গঠন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, যারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তাদের সবাইকে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনীতে নেওয়া হবে। পরে সবাই যার যার পেশায় ফেরত যাবেন।

‘৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে আসেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১২ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের দেশ গঠনের কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্তের অন্যতম অংশ ছিল জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের। মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আত্মার বন্ধন। এই বন্ধনকে দৃঢ় করতে ২৪ জানুয়ারি প্রেসনোট জারি হয় জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের। একই দিন বঙ্গবন্ধু টাঙ্গাইল যান। মুক্তিযুদ্ধের বিশাল সংগঠক, গেরিলা যুদ্ধের নায়ক কাদের সিদ্দিকী এক স্টেডিয়াম অস্ত্র সমর্পণ করেন বঙ্গবন্ধুর পায়ের সামনে। বঙ্গবন্ধু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সেই সমাবেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমি তোমাদের তিন বছর কিছু দিতে পারব না। আরও তিন বছর যুদ্ধ চললে তোমরা কী করতে না? মুক্তিযোদ্ধারা একসঙ্গে বলে উঠলেন, অবশ্যই করতাম। এরপর বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তা হলে মনে কর যুদ্ধ চলছে। তিন বছর যুদ্ধ চলবে। সেই যুদ্ধ দেশ গড়ার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে অস্ত্র হবে লাঙ্গল আর কোদাল।’ মুক্তিযোদ্ধাদের ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে বঙ্গবন্ধু টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা ফিরলেন। ভাবলেন, দেশটাকে নিয়ে শুরু করলেন নতুন স্বাপ্নিক যাত্রা। যে স্বপ্নের কথা দেশে ফিরে বলেছিলেন, সবাইকে নিয়ে দেশটাকে সুইজারল্যান্ডের মতো গড়ে তুলতে চাই।

বঙ্গবন্ধুকে সেই তিন বছর কী দিয়েছিল বাঙালি? ঘরে বাইরে সংকট প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে গেল। প্রেসনোট জারির পর থেকে মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতীয় মিলিশিয়ার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় মেজর নুরুজ্জামানকে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের একজন। দুজন বেসামরিক বড় মুক্তিযোদ্ধাকে উপপ্রধান করলেন বঙ্গবন্ধু। একজন টাঙ্গাইলের আনোয়ারুল আলম শহীদ, আরেকজন মাদারীপুরের সরোয়ার মোল্লা। দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রধানের পদমর্যাদা পরিচালক। উপ-প্রধানদের মর্যাদা উপ-পরিচালক। তাদের বলা হয় দ্রুততম সময়ে কাজ শুরু করার জন্য।

মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের শুরুতেই অনেক বিপত্তি শুরু হয়। সদ্য স্বাধীন দেশে সংকটের শেষ ছিল না। সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল বিলুপ্ত ঘোষিত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যৌথভাবে মিলিশিয়া বাহিনী হবে। তাদের কাজ হবে সীমান্ত পাহারা ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারকে সহায়তা করা। সেভাবেই শুরু হয়ে যায় কাজ। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর নুরুজ্জামান বীরউত্তম কাজ শুরু করেন। সঙ্গে সরোয়ার মোল্লা ও আনোয়ারুল আলম শহীদ। প্রধান কার্যালয় করা হয় পিলখানা। মিলিশিয়া বাহিনীতে যোগ দিতে সারা দেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা জড়ো হতে থাকেন। ইপিআর সদস্যরা তো আছেনই। ইপিআর সদস্যদের সঙ্গে দুটি গ্রুপ ছিল। এক গ্রুপে ছিল সাধারণ সদস্য, যারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তবে তাদের প্রায় সবাই ছিলেন সাধারণ সিপাহি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কারণে তখন গর্বিত ও প্রশংসিত ভূমিকায়। অন্যদিকে ছিল নন-কমিশন্ড অফিসার, যারা যুদ্ধে অংশ নেননি। তারা পাকিস্তানের হয়ে কাজ করেছেন একাত্তরে। উভয় পক্ষের মধ্যে ছিল মানসিক দূরত্ব। মুক্তিযোদ্ধা সাধারণ সিপাহিরা বিষয়টি জানান জাতীয় মিলিশিয়ার পরিচালক মেজর নুরুজ্জামানকে। তিনি সবকিছু খতিয়ে দেখতে একটি যাচাই-বাছাই স্ক্রিনিং কমিটি গঠন করেন। এতে আনোয়ারুল আলম শহীদকে প্রধান করা হয়। সঙ্গে রাখা হয় সেনাবাহিনীর সুবেদার হাফিজ উদ্দিন ও ইপিআরের নায়েব সুবেদার আহসান উল্লাহকে। একই ধরনের কমিটি মুক্তিযুদ্ধের পর সেনাবাহিনীতেও করা হয়েছিল। এ কমিটি কাজ শুরুর আগেই নানারকম গুজব ছড়িয়ে পড়ে ইপিআর সদস্যদের মধ্যে। গুজবের ডালপালা বাড়তে থাকে। এক ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়া হয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠন প্রক্রিয়ার আগেই। পাকিস্তান থেকে যারা ফিরেছিলেন তারাই এমন কান্ড ঘটিয়েছিলেন ঠান্ডামাথায়।

কর্নেল (অব.) সরোয়ার মোল্লার সঙ্গে সেই সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, মাত্র প্রজ্ঞাপন হয়েছে। কাজই শুরু করতে পারিনি। এর মধ্যে এক দিন খবর পেলাম আমাদের প্রধান মেজর নুরুজ্জামানকে মারধর করছে ইপিআরের জিসিও, এনসিওরা। তারা সবাই নন-কমিশন্ড অফিসার। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের পক্ষে ছিলেন। ইপিআর ছাড়েননি। খোঁজ নিলাম আনোয়ারুল আলম শহীদ কোথায় আছেন। জানলাম গোলমাল শুনে তিনিও নুরুজ্জামানের কাছে গেছেন। দুজনের ওপর হামলা হয়েছে। দুজনকে মারধর করা হচ্ছে। আমার সঙ্গে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারা সারা দেশ থেকে জড়ো হয়েছেন মিলিশিয়া বাহিনীতে যোগ দিতে। তাদের সঙ্গে অস্ত্র ছিল। এই সময় গুলির আওয়াজ শুনলাম। বুঝলাম এখনই তৎপর না হলে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার নুরুজ্জামানকে বাঁচানো যাবে না। দৌড়ে গেলাম সবাইকে নিয়ে। গিয়ে দেখলাম চারদিকে যুদ্ধ ভাব। বিচ্ছিন্নভাবে গোলাগুলি হচ্ছে। একদল লোক আঘাত করছে পরিচালক নুরুজ্জামান ও শহীদকে। কোনোমতে তাদের দুজনকে উদ্ধার করলাম। নিয়ে এলাম ইপিআরের ভিতরে নিরাপদ স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের বলয়ে। কিন্তু ততক্ষণে ইপিআরের অমুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র নিয়ে নিয়েছে। তারা গুলি শুরু করল। খুঁজতে থাকল মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা অবস্থানে। রক্তাক্ত মেজর নুরুজ্জামান ও আনোয়ারুল আলম শহীদকে হাসপাতালে নেওয়া দরকার। কিন্তু বের হওয়ার পথ নেই। গুলির জবাবে মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা অবস্থান নেন। মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা অবস্থান না নিলে আমরা কেউ বাঁচতাম না। গোলাগুলির শব্দে ঢাকা শহর কেঁপে উঠতে থাকে। এভাবে গোলাগুলিতে ঢাকাবাসী আতঙ্কিত হয়। বিশেষ করে ধানমন্ডি এবং আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা তখন এখনকার মতো এত বড় শহর ছিল না। ছোট্ট শহর। চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা নুরুজ্জামানের ওপর হামলার খবর পৌঁছে যায় ক্যান্টনমেন্টে। সশস্ত্র বাহিনী প্রধান আতাউল গনি ওসমানী ৪৬ ব্রিগেডের অধিনায়ক কে এম শফিউল্লাহসহ সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে চলে আসেন পিলখানার গেটে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে তারা ভিতরে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। তারা এসেছেন নুরুজ্জামানসহ আমাদের উদ্ধার করতে। সরোয়ার মোল্লার কাছে জানতে চাই তারা পরিবেশ পাননি না সাহস পাননি? জবাবে তিনি বললেন, দুটোই হতে পারে। তারা বাইরে অপেক্ষা করছেন এ খবর ভিতর থেকে আমরা পাই। কিন্তু গুলির ভিতরে আমাদের পক্ষে বাইরে আসার মতো অবস্থা ছিল না। খবরটা বঙ্গবন্ধুর কাছে চলে যায়। তিনি বললেন, পিলখানা যাব। তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা এবং উপস্থিত সবাই না করলেন। সবাই বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার কথা ভাবছিলেন। বঙ্গবন্ধু গাড়ি তৈরি করতে বললেন। দ্রুততম সময়ে গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি পিলখানার গেটে এলো। বঙ্গবন্ধু এসে দেখলেন, সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে ওসমানী বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধুকে সবাই অনুরোধ করলেন ভিতরে প্রবেশ না করতে। তিনি কারও কথা শুনলেন না। ধানমন্ডির দিক থেকে সোজা প্রবেশ করলেন পিলখানায়। তিনি খবর নিলেন নুরুজ্জামান কোন দিকে আছে। সেদিকে চলতে থাকলেন। বঙ্গবন্ধু পিলখানা প্রবেশের খবরে মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যায়। সরোয়ার মোল্লা বললেন, আকাশছোঁয়া ইমেজ তখন বঙ্গবন্ধুর। তিনি জাতির পিতা। গুলির মাঝখানে তিনি আসতেই সবাই অস্ত্র ফেলে সটকে পড়তে থাকে। তিনি কোনো কিছুর তোয়াক্কা করলেন না। গুলি থেমে গেল মুহূর্তে। বঙ্গবন্ধু উদ্ধার করলেন রক্তাক্ত পড়ে থাকা মেজর নুরুজ্জামান ও আনোয়ারুল আলম শহীদকে। তিনি সরোয়ার মোল্লা ও আহত দুজনের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে সব শুনলেন। আহত দুই কর্মকর্তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠালেন চিকিৎসার জন্য। গম্ভীর মুখে বের হলেন পিলখানা থেকে। বঙ্গবন্ধু এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করবেন কেউ ভাবতে পারেনি। সরোয়ার মোল্লা বলেন, এমনকি আমরাও কল্পনা করতে পারিনি। হিমালয় সমান উচ্চতার সাহসী মানুষটি এভাবে প্রথম গোলাগুলি মোকাবিলা করেন দেশে ফিরে এসে।

আরও পড়ুন


মানুষের সঙ্গে যেভাবে কথা বলতেন বিশ্বনবী

সূরা বাকারা: আয়াত ১২৮-১৩৩, আল্লাহর নির্দেশ ও হয়রত ইব্রাহিম (আ.)

কলকাতা প্রেস ক্লাবে ‘বঙ্গবন্ধু মিডিয়া সেন্টার’

সাইবার আগ্রাসন থামছেই না


সরোয়ার মোল্লা বলেন, এ ঘটনার পর বঙ্গবন্ধু বুঝলেন ইপিআরের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র, যুবকদের মিলবে না। মানসিকভাবে সবাই আলাদা অবস্থানে। তিনি তখন দুটো বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। সীমান্ত পাহারার জন্য ইপিআর সদস্যদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর। যার পরবর্তিত নাম বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ বা বিজিবি। আর মুক্তিযুদ্ধফেরত ছাত্র, যুবকদের নিয়ে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গঠন করলেন জাতীয় রক্ষীবাহিনী জেআরবি। মন্ত্রিসভার পরের বৈঠকে এ সিদ্ধান্তগুলো পাস হয়। বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান লে. কর্নেল সি আর দত্ত। আর রক্ষীবাহিনীর পরিচালক পদে মেজর নুরুজ্জামান, উপ-পরিচালক পদে সরোয়ার মোল্লা ও আনোয়ারুল আলম শহীদ। কাজ শুরু করার পর প্রশিক্ষণ ও কাঠামো তৈরি করতে সেনাবাহিনীর মেজর আবুল হাসান খানকে উপ-পরিচালক পদে আনা হয়। একই সঙ্গে যুক্ত করা হয় বেশ কয়েকজন সুবেদার ও হাবিলদার পর্যায়ের নন-কমিশন্ড কর্মকর্তাকে। শৃঙ্খলা ও প্রশিক্ষণের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল। সবাইকে নিয়েই শুরু হয় রক্ষীবাহিনীর যাত্রা। সরোয়ার মোল্লা বলেন, সেই সময়ে অনেক কষ্ট করেছি আমরা। রক্ষীবাহিনী নিয়ে আওয়ামী বিরোধী অনেকে অপপ্রচার করেন। কিন্তু সেই সময়ের বাস্তবতা একবারও কেউ ভাবেন না।

সদ্য স্বাধীন দেশ। পুলিশসহ কোনো বাহিনী গঠন হয়নি। আমাদের টিমের প্রায় সবাই মুুক্তিযোদ্ধা। দেশ গঠনের কর্মস্পৃহা তাদের মাঝে। চুরি, ডাকাতি, চরমপন্থিদের তৎপরতা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বন্ধে শক্ত অবস্থান দরকার ছিল। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম সবকিছু স্বাভাবিক করতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সদ্য স্বাধীন দেশে কাজ শুরু করল রক্ষীবাহিনী। কিন্তু ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। সরোয়ার মোল্লা বলেন, রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বিব্রত করতে তৎপরতা বাড়ল নতুনভাবে। গণকণ্ঠ, হককথা, হলিডেতে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ হতো নিয়মিত। পক্ষে বলার কেউ ছিল না। বিপক্ষের পুস্তিকা-লিফলেট চলে যেত ঘরে ঘরে। পাল্টা জবাব সরকারি দল দিতে পারেনি।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

রাজনীতির এক ভুলে হয়ে যায় সর্বনাশ

নঈম নিজাম

রাজনীতির এক ভুলে হয়ে যায় সর্বনাশ

‘বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও, মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও’ শ্রীকান্তের এ গানের মতো পথের সাথীকে কি চেনা যায়? মনের মাঝেতে কি দেওয়া যায় ঠাঁই? এ কঠিন ইট-পাথরের চলার পথে নানা রঙের মানুষের দেখা মেলে। সবাইকে চেনা যায় না। হৃদয়ের গহিনে ঠাঁই দিলেও ভালোবাসার মর্যাদা সবাই ধরে রাখে না। প্রথম জীবনের স্বপ্নছোঁয়া দিনগুলো একসময় পানসে হয়ে যায়।  বাঁধনহারা পাখি দরজা খোলা দেখলেই যায় উড়ে। খাঁচায় থাকে না বন্দী হয়ে। আলো-আঁধারির গোলকধাঁধায় বাঁধা পড়ে লাভ নেই। রাতের কালো অন্ধকার শেষে ভোর ঠিকই আসে। আলোর ঝলকানিতে মুছে যায় রাতের সব দুঃস্বপ্নের চিহ্ন। আমাদের চারপাশটা বড় অদ্ভুত। আবেগহীনতার যুগে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা কখনো চিরস্থায়ী হয় না। আগুন ঝলকানো ভালোবাসা একসময় সান্ধ্যপ্রদীপের তেল ফুরানোর মতো শেষ হয়ে যায়। শুধু পোড়া দহনের ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়। পুরনো স্মৃতিগুলো ঘুরেফিরে আসে কষ্ট হয়ে। তার পরও আমরা বারবার সঠিক ঠিকানা খুঁজে বেড়াই। চিনতে পারি না আপনারে। ভালোবাসার মানুষ ও স্বার্থহীন বন্ধু বাছতে বাছতে একটা জীবন কেটে যায়। জীবনের সৌন্দর্যটুকু দেখা হয় না। লড়াই করতে করতে ভিতর ক্ষয়ে গেলেও বলার থাকে না কিছুই।

বঙ্গবন্ধু একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন মোশতাকের মতো নষ্ট, ভন্ডকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে, তাকে পাশে রেখে। কিন্তু তাকে চিনতে পারেননি। এমনকি বঙ্গবন্ধু জেনেও যেতে পারেননি তাঁর সর্বনাশের আড়ালের মানুষটির নাম খন্দকার মোশতাক। বঙ্গবন্ধুর পিতার মৃত্যুর পর মোশতাকই বেশি কেঁদেছিলেন। লাশ দাফন থেকে শুরু করে সব কাজেই ছিলেন এগিয়ে। খুনি মেজর ডালিম নিয়মিত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যেতেন। সঙ্গে থাকতেন তার স্ত্রী নিম্মি। বেগম মুজিব তাদের আদর করে ভাত খাওয়াতেন। সেই ডালিম ১৫ আগস্ট ঘোষণা দিলেন বেগম মুজিবকে হত্যার। দুনিয়ায় বিশ্বাস শব্দটা বড় কঠিন। সবাই এ বিশ্বাস রাখতে পারে না। সারা দুনিয়ার রাজনৈতিক সরকারগুলো ক্ষমতায় আসে দলীয় কর্মীদের শ্রম-ঘামে। ক্ষমতায় বসার পর সবকিছু চলে যায় রাজনৈতিক কর্মীদের বাইরে। আমলাকুল, কামলাকুল, হাইব্রিডকুল তৈরি হয়। তাদের হাতেই সব সর্বনাশ হয়ে যায়। কেউ টের পায় না। যখন পায় তখন আর কিছুই করার থাকে না। রাজনীতির জগৎটাই জটিল। ক্ষমতার আকাশছোঁয়া চেয়ার বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে।

ক্ষমতার আকাশ থেকে মাটি দেখা যায় না। একটা অহংকারের ভাব তৈরি করে। তখনই কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, সমন্বয়হীনতায় সর্বনাশ হয়ে যায়। একবার ভুল হলে সে চক্রবাঁকে কাটিয়ে দিতে হয় বাকি জীবন। ভারতীয় কংগ্রেসের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল রাজনীতি থেকে সরকারকে দূরে সরিয়ে রাখা। রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার বাইরে রাখা। অরাজনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বসানো। মনমোহন সিংয়ের স্থলে প্রণব মুখার্জির নাম ছিল প্রধানমন্ত্রীর তালিকায়। সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী ঠিক করলেন সরকারকে তাঁরা রাজনীতি থেকে দূরে রাখবেন। অভিজ্ঞ পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জিকে মন্ত্রিসভায় রাখবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী করবেন না। প্রণব দুই মেয়াদে অর্থ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। শেষ মেয়াদে তাঁকে করা হলো রাষ্ট্রপতি। ভারতজুড়ে কংগ্রেস নেতা-কর্মীদের কাছে প্রণব মুখার্জির আলাদা অবস্থান ছিল। মর্যাদা ছিল। তিনি রাজনীতিটা ভালো বুঝতেন। যে কোনো পরিস্থিতি ম্যানেজ করতে পারতেন। তাঁকে বলা হতো গুড ক্রাইসিস ম্যানেজার। ইন্দিরা গান্ধী লাইমলাইটে নিয়ে আসেন প্রণবকে। রাহুলের সঙ্গে রাজনীতি করতে গিয়ে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তার পরও ঘুরেফিরে কংগ্রেসেই ছিলেন। পররাষ্ট্র, অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। ভারতীয় রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতি কোনোভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যেতে পারেন না। রাজনীতি করেন না। প্রধানমন্ত্রী রাজনীতি করেন। মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হলেও কোনো ধরনের রাজনীতির সাতেপাঁচে ছিলেন না। তিনি দিন কাটিয়েছেন সরকার নিয়ে। ব্যস্ত ছিলেন ভারতীয় অর্থনীতিকে নতুন মাত্রায় নিতে। মনমোহনকে আনা হয়েছিল প্রণবকে ঠেকাতে। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। সেই এক ভুলে কংগ্রেস আজ ভারতীয় রাজনীতিতে কঠিন এক পরিস্থিতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালে সরকারের সঙ্গে দলের বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। যার খেসারতে বিজেপির উত্থান। বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারছে না কংগ্রেস। বিজেপির বিপক্ষে তৃণমূলে মানুষের আস্থা বাড়ছে। কংগ্রেস হারিয়েছে ঐতিহ্য ধরে রাখার রীতি।

প্রণব মুখার্জির পুত্র অভিজিৎ কংগ্রেস ছাড়লেন। যোগ দিলেন তৃণমূলে। ফোন করেছিলাম তাঁকে। জানতে চাইলাম বাবার আদর্শের বাইরে চলে গেলেন না তো? জবাবে বললেন, ‘মোটেও না। বাবার আদর্শের ভিতরেই আছি। এক কংগ্রেস ছেড়ে এলাম আরেক কংগ্রেসে। সমস্যা দেখি না। দুই দলের আদর্শ একই। এ মুহুর্তে গেরুয়া শিবিরের পতন একমাত্র দিদিকে দিয়েই হতে পারে। তাই যোগ দিয়েছি।’ অভিজিৎ আরও বললেন, ‘অসাম্প্রদায়িক অবস্থান দুই কংগ্রেসেই রয়েছে। বিজেপিকে থামাতে হলে তেমন শক্তির প্রয়োজন যা আছে মমতা ব্যানার্জির।’ শুধু অভিজিৎ নন, প্রতিদিনই দলবদল চলছে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের রাজনীতিতে। প্রণব মুখার্জির মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি সর্বশেষ কংগ্রেস ছাড়লেন। ফোনে তাঁর সঙ্গেও কথা হলো। জানালেন, রাজনীতিকে বিদায় দিয়েছেন। আর রাজনীতি করবেন না। বললাম, বাবার আদর্শ ধরে রাখবেন না? জবাবে বললেন, ‘রাজনীতি না করেও মানুষের সেবা করা যায়। মানুষের জন্য কাজ করা যায়। প্রণব মুখার্জি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কাজ করব।’ জানতে চাইলাম দল ছাড়ার সময় সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে কথা হয়েছিল কি না? জবাবে বললেন, ‘কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিও। আমি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরও বললেন, ‘আমি মনে হয় মায়ের ধাঁচটা পেয়েছি। মা গান করতেন। ছবি আঁকতেন। রাজনীতি আমার জন্য না। তা ছাড়া ছোটবেলা থেকে আমি রাজনীতি করিনি। যারা ছোটবেলা থেকে রাজনীতি করছে তাদের কথা হয়তো আলাদা।’ আরও বললেন, ‘মানুষ রাজনীতিটা করে সেবা করার জন্য। রাজনীতি না করেও মানুষের সেবা করা যায়। আমি তা-ই করব। বাবার আদর্শ ধরে রাখব। বাবার নামের ফাউন্ডেশনটা শক্তিশালী করব।’

শর্মিষ্ঠার শেষ পর্যন্ত সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা চমকই ছিল দিল্লির রাজনীতিতে। কংগ্রেসে থেকে ভোট করেছেন। দলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছিলেন দ্রুত সময়ে। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে দিলেন। এভাবে সবাই পারে না, করেও না। অনেকে দলবদল করেন। গোয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে দেখলাম কংগ্রেস ছেড়ে যোগ দিলেন তৃণমূলে। তাঁরই পথ অনুসরণ করেছেন বাবুল সুপ্রিয়। দারুণ গান করেন বাবুল সুপ্রিয়। এমপি হওয়ার পরও ঢাকা এসেছিলেন। গান করেছেন ঢাকা ক্লাবে। তাঁর গান শুনেছি। দরাজ গলায় গান। মনে হয়েছে রাজনীতিটা না করলেই পারতেন। কিন্তু বিজেপিতে গিয়ে এমপি-মন্ত্রী হলেন। হুট করে বিজেপি ছাড়লেন। বাবুল সুপ্রিয় এখন মমতার তৃণমূলে। সমালোচনা করেন বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির। পশ্চিমবঙ্গে আজ এই দল, কাল ওই দল করা নিয়ে চলছে রাজনৈতিক চেহারা বদল। বামেরাও কম যান না। তাঁদের অনেকে বাম ছেড়ে যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে! এভাবে দলবদল হতো আমাদের দেশের ফুটবলে। ফুটবলের সে ঐতিহ্য আর উত্তেজনা নেই। এ কারণে আগের মতো হইচই ফেলে দলবদলও দেখি না।

বাংলাদেশে ফুটবলের মতো রাজনীতির মাঠও এখন ঠান্ড। উদীয়মান অর্থনীতির দেশে ভোট নিয়ে মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা নাকি কমে যায়। হয়তো তাই। তার পরও গত ১২ বছরে বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতা ঠাঁই পেয়েছেন আওয়ামী লীগে। কিন্তু তাদের দিনকালও খুব সুবিধার যাচ্ছে না। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চর্চা আলাদা। অন্য দল থেকে আওয়ামী লীগে এসে খুব বেশি ভালো করা যায় না। আর ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও আলাদা। আজ কংগ্রেসে কাল দেখি বিজেপিতে। আবার বিজেপি ছেড়ে চলে আসছেন তৃণমূলে। আমাদের সেই চর্চা নেই। গ্যাঞ্জাম লাগে অরাজনৈতিক সরকারগুলোর সময়। দিনের বেলায় গরম বক্তৃতা দিয়ে কোরবান আলী রাতে চলে গেলেন জাতীয় পার্টিতে। সিরাজুল হোসেন খান শ্রমিক আন্দোলন ডেকে সন্ধ্যায় শপথ নিয়ে মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন। জিয়া-এরশাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রাজনীতিবিদরা কম-বেশি কিছু পেয়েছেন। বিপাকে পড়েছেন ওয়ান-ইলেভেনের সময়। কম বিতর্কে থাকা রাজনীতিবিদদের ডেকে কথা বলতেন বিশেষ সংস্থার লোকজন। তারপর তালিকা তৈরি করতেন। সে তালিকা ধরিয়ে দিতেন ফেরদৌস আহমদ কোরেশীকে। নতুন নতুন দল গড়ার একটা হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল। নরসিংদীর মাঈনুদ্দিন ভূঁইয়া করতেন আলাদা তালিকা। সে তালিকা নিয়ে বৈঠক করতেন বারী-আমিনের সঙ্গে। কিন্তু বিভিন্ন গাছের ছালবাকল দিয়ে তো একটা গাছ বানানো যায় না। ছালবাকল থাকতে পারে গাছের সঙ্গে। আর রাজনীতির জন্য একজন নেতার প্রয়োজন হয়। একটি আদর্শের প্রয়োজন। সেটুকু না থাকলে কিছুই হয় না। মাঝখান থেকে কিছু মানুষের সর্বনাশ হয়ে যায়। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তা-ই হয়েছিল। অনেক ইতিবাচক রাজনীতিবিদ বলি হয়েছেন ভয়ে অথবা লোভে। আবার অনেকে পরিস্থিতির শিকার।

আরও পড়ুন


সূরা বাকারা: আয়াত ১০৮-১১২, ইহুদীদের অবাঞ্ছিত আশা ও শিক্ষা

মুনিয়ার বাসায় শেষ গিয়েছিল নুসরাতের ৩ সহযোগী

থ্রিলার ম্যাচে জিতলো মুস্তাফিজের রাজস্থান

আজ থেকে শুরু ঢাকা-আবুধাবি রুটে বিমানের ফ্লাইট


বিএনপি নেতা মরহুম আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর বাড়িতে দলের সংস্কারপন্থিদের বৈঠক হতো। টেলিভিশনে একদিন দেখলাম বাড়ির ভিতর থেকে বের হচ্ছেন এহছানুল হক মিলন। ফোন করলাম তাঁকে। জানতে চাইলাম ঘটনা কী? জবাবে মিলন বললেন, মান্নান ভূঁইয়ার ভবনেই তাঁর বাসা। বাড়ির সামনে সাংবাদিক আর টিভি ক্যামেরার ভিড় থাকে মধ্যরাত অবধি। সকাল-সন্ধ্যায় বাড়িতে মিলনকে আসা-যাওয়া করতে হয়। আর টিভি ক্যামেরা বের হওয়া ও প্রবেশের ছবিগুলো ভালোভাবে তুলে ধরে সম্প্রচার করে। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের অনেকবার বলেছি বৈঠকে যাই না। আমার বাসা এখানে। স্ত্রী এবং মেয়েকে নিয়ে বসবাস করি। তার পরও কে শোনে কার কথা। প্রতিদিনই টিভি খবরে দেখিয়ে দেয় আমাকে। এ সংবাদগুলোর খেসারত মিলনকে দিতে হয়েছে। তারেক রহমানের মুক্তির দিন তাঁর ওপর হামলা করেছিল দলের কিছু লোক। এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ফিরে পাননি তিনি। ওয়ান-ইলেভেনের শেষ বছর রাজনীতিবিদরা বুঝে ফেলেন ঘটনা ভালো নয়। মইন উ আহমেদের রাজনীতি করার মতো ব্যক্তিত্ব নেই। আন্তর্জাতিক কমিউনিটি তাঁকে সমর্থন দিচ্ছে না আর। তিনি ভারত গিয়ে প্রণব মুখার্জি ও গোয়েন্দাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই বৈঠক থেকে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে বলা হলো। দেশে ফিরে তিনি ইউটার্ন করেন। প্রণব মুখার্জির একটি সাক্ষাৎকার একবার নিয়েছিলাম। তিনি অনেক কথা বলেছেন ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে। যা প্রকাশ করেছি প্রণব মুখার্জির জীবিত থাকাকালে। প্রণব মুখার্জি নিজের বইতেও অনেক কিছু লিখে গেছেন। পরিষ্কার করেছেন বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেনের অনেক ঘটনা।

ভারত সফরকালে মইন উ আহমেদ ক্ষমতা ছাড়ার ইনডেমনিটির গ্যারান্টি চেয়েছিলেন প্রণব মুখার্জির কাছে। প্রণব তাঁকে বলেছিলেন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে মইনের যাতে কিছু না হয় তা তিনি দেখবেন। মইনের কিছুই হয়নি। মইন এখন আমেরিকায় আছেন। ক্যান্সারের চিকিৎসা করাচ্ছেন। আর তাঁর দিকে তাকিয়ে যারা যোগ দিলেন ওয়ান-ইলেভেনে সেই রাজনীতিবিদদের সর্বনাশ হয়ে গেছে সবার অজান্তে। শেষ বয়সে চিকিৎসা করানোর টাকাও ছিল না রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ফেরদৌস কোরেশীর। বিএনপি, আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থি নেতারা এখন ভালো নেই। অনেকে মারা গেছেন নীরব কষ্ট বুকে ধারণ করে। দলের ভিতরের সম্মানটুকুও পাননি মৃত্যুর পর। তাঁদের জানাজায় যাননি অনেক নেতা-কর্মী। আবার অনেকে টিকে আছেন তুচ্ছতাচ্ছিল্য নিয়ে। করার কিছু নেই, বলার কিছু নেই।

একসময় রাজনীতিতে তাঁদের দাপট ছিল, অবস্থান ছিল। এখন কিছুই নেই। ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে সেই গানের মতো- ‘ভুল সবই ভুল এই জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা, সে ভুল, সবই ভুল...।’ চলার পথে অনেক ভুল নিয়ে থাকতে হয় আমাদের। সব ভুলের কথা প্রকাশও করা যায় না। বলা যায় না।  আবার মেনেও নেওয়া যায় না।  একটা ভুলের সঙ্গে অনেক সময় পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

বঙ্গবন্ধু হত্যায় চুপ ছিল কেন রক্ষীবাহিনী

নঈম নিজাম

বঙ্গবন্ধু হত্যায় চুপ ছিল কেন রক্ষীবাহিনী

মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম হাসপাতালে দেখতে গেছেন অসুস্থ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে। ভালো লাগল। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সৌজন্যবোধ উঠে গেছে অনেক আগেই। এখন কেউ কারও খবর রাখেন না। পাশে দাঁড়ান না। সবাই ভুলে গেছেন আমাদের কিছু ইতিহাস ছিল, ঐতিহ্য ছিল। এখন কোনো কিছু নেই। ছাত্রলীগ ছেড়ে জাসদে চলে গিয়েছিলেন আ স ম রব। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন। একদিন আহত হলেন পুলিশের গুলি খেয়ে। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন বঙ্গবন্ধু নিজে। আ স ম রব আমাকে একবার বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে ফোন করে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন। বারবার বললেন, তোরা আমাকে ছেড়ে চলে গেলি। নিজেরাও শেষ হবি। আমাকেও শেষ করবি। সেই সংস্কৃতি আর নেই। বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। তাঁকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাঠের ইতিহাস হতে পারে না। দেশের ভিতরে থেকেই যুদ্ধ করেছেন। অংশ নিয়েছেন সম্মুখসমরে। একটা অঞ্চল রেখেছেন শত্রুমুক্ত। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতীয় ছত্রীসেনারা আকাশ থেকে নেমেছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন মুক্তাঞ্চলে। তারপর তাঁকে নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে প্রবেশ করে ঢাকা শহরে। ১৬ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন একজন কাদের সিদ্দিকীও। মিত্রবাহিনীর জেনারেল মানেকশর পাশে ছিলেন তিনি। নিয়াজি হাত মেলালেন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এ সময় কাদের সিদ্দিকীকে দেখিয়ে মানেকশ বললেন, ডু ইউ নো হিম? নিয়াজি তাকালেন। তারপর মানেকশ বললেন, টাইগার সিদ্দিকী। টাঙ্গাইলে তোমার বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করেছে। নিয়াজি বিস্ময় চোখ নিয়ে হাত বাড়ালেন। কাদের সিদ্দিকী হ্যান্ডশেক করলেন না। বললেন, শিশু, নারী ও নিরীহ মানুষ হত্যাকারীর সঙ্গে হাত মেলাতে পারি না। সেই কাদের সিদ্দিকী ১৯৭২ সালে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুর পায়ের নিচে এক স্টেডিয়াম অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন। ‘বাঘা বাঙ্গালী’ ছবি এ বাস্তবচিত্র নিয়েই তৈরি।

আমাকে একবার প্রণব মুখার্জি বলেছিলেন, ‌‘৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাঘা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ সময় আমি তাঁকে সহায়তা করেছিলাম। সেই সময়ে নির্বাসনে ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে শপথ গ্রহণকারীরা তাঁর নেতৃত্বে চলে যায় ভারতে। জিয়াউর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে প্রতিরোধ। তাঁর সহযোদ্ধাদের অনেকে ধরা পড়েন। ফাঁসির মঞ্চে যান, যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয় অনেকের। সে ইতিহাস আমরা ভুলে গেছি। কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে একবার দীর্ঘ গল্প শুনিয়েছিলেন লেখক বুদ্ধদেব গুহ। বললেন, বর্ধমান, কলকাতায় তোমাদের বাঘা ঘুরতেন হুড খোলা গাড়ি নিয়ে। লেখক বুদ্ধদেব গুহের চাচা ছিলেন বিপ্লবী সত্যেন গুহ। কাদের সিদ্দিকী মাঝেমধ্যে তার বাড়ি যেতেন।

একদিন বাড়ির দোতলা থেকে বুদ্ধদেব গুহ দেখলেন চে গুয়েভারার মতো পোশাক, একই রকম দাড়ি, হুড খোলা জিপ চালিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করছে একজন। তিনি বাড়ির লোকজনের কাছে প্রশ্ন করলেন এই বিপ্লবী লোকটি কে? জবাবে কাজের লোকজন জানাল, বাংলাদেশের বাঘা। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ প্রতিরোধে ভারতে অবস্থান করছেন। সীমান্তে গেরিলা যুদ্ধ করছে। বুদ্ধদেব গুহ বিস্ময় নিয়ে তাঁকে দেখলেন। বললেন, তাঁর মধ্যে চে গুয়েভারার ভাবটা ছিল। আমি বলেছিলাম, সবাই প্রতিবাদ করতে পারেননি। কাদের সিদ্দিকী করেছেন। তাঁর ৪ শতাধিক প্রতিরোধ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন মোশতাক ও জিয়া সরকারের আমলে। সেসব ইতিহাস আজ মূল্যহীন। কাদের সিদ্দিকী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রার্থনা করছি এই বীর যোদ্ধার জন্য। আল্লাহ যেন তাঁকে দ্রুত সুস্থ করে দেন।

দিল্লির একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের আরেক সংগঠক তোফায়েল আহমেদ। তিনি জাতির পিতাকে বঙ্গবন্ধু খেতাব দিয়েছিলেন ’৬৯ সালের উত্তাল সময়ে। অসুস্থ হওয়ার আগের রাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম বনানীর বাড়িতে। সুস্থ ছিলেন। দীর্ঘ সময় গল্প করলেন। শেয়ার করলেন অনেক সুখ-দুঃখ। তাঁকে বললাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পথচলা লিখে রেখে যান আগামী প্রজন্মের জন্য। তিনি সম্মত হলেন আমার সঙ্গে। বললেন, ঠিকই বলেছ। লিখে যাব। বললাম মাওলানা আজাদের মতো অনেক কিছু প্রকাশ করতে না পারলেও লিখে যাবেন। পরে প্রকাশিত হবে মাওলানা আজাদের মতো। বললেন, খারাপ বলনি। হতে পারে। সে রাতে তিনি স্মৃতিচারণা করেন ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের কথা। বললেন, রাষ্ট্রদূত জমিরের ভাইয়ের বাড়ি ছিল শেখ মণির বাড়ির পাশে। জমিরের ভাইয়ের মেয়ে ঘুম থেকে তুললেন তাঁকে। বললেন, চাচা কারা যেন মণি চাচার বাড়িতে হামলা করেছে। গুলি করছে। তোফায়েল বললেন, ফোন করলাম মণি ভাইয়ের বাসায়। ফোন ধরেছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। বীভৎস হামলার কথা শুনলেন শেখ সেলিমের কাছ থেকে। এরপর তিনি ফোন করলেন বঙ্গবন্ধুকে। শেখ মণির বাড়িতে হামলার কথা বলতেই বঙ্গবন্ধু তোফায়েলকে বললেন ৩২ নম্বরে হামলার কথা। ব্যবস্থা নিতে বললেন। তোফায়েল আহমেদ জানান, তিনি ফোন করেন সেনাপ্রধান, পুলিশপ্রধান, বিডিআর-প্রধানসহ অনেককে। হামলার কথা জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে বললেন। কিন্তু কেউই এগিয়ে গেল না।

তাঁকে বললাম আনোয়ার উল আলম শহীদের বইটি পড়েছি। কর্নেল (অব.) সরোয়ার মোল্লার সঙ্গে মাঝেমধ্যে আড্ডা দিই। তাঁর কাছ থেকে সেসব দিনের কথা জেনে রাখছি। তিনিও অনেক কথা বলেছেন। লিখেছেন বাংলাদেশ প্রতিদিনে। সরোয়ার মোল্লার রক্ষীবাহিনী নিয়ে বইটি তোফায়েল ভাই দেখেননি। বললাম আপনার জন্য কপি পাঠিয়ে দেব। অন্বেষা প্রকাশনী বের করেছে। আরও অনেক কথা হলো। এক দিন পরই তোফায়েল আহমেদ অসুস্থ হলেন। এখন দিল্লিতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছি।

১৫ আগস্ট নিয়ে সবকিছু বের হওয়া দরকার। রক্ষীবাহিনীর উপপরিচালক আনোয়ার উল আলম শহীদ তাঁর বইতে তোফায়েল আহমেদ সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছেন। বলেছেন, ১৫ আগস্ট মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর রক্ষীবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ে তোফায়েল আহমেদ। তিনি হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না। সরোয়ার মোল্লা বলেছেন, সেদিন আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ দুজনই গিয়েছিলেন রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে। প্রতিরোধ করার মতো লোকবল, অস্ত্র কোনোটাই হেডকোয়ার্টারে ছিল না। রাতে শেরেবাংলানগরে অবস্থানরত বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র রাখা হতো বিডিআর সদর দফতরে। সকালে সে অস্ত্র ফেরত দেননি বিডিআর-প্রধান মেজর জেনারেল খলিল। অথচ এ খলিলকে বঙ্গবন্ধুই বিডিআর-প্রধান করেন। রক্ষীবাহিনী প্রধান কর্নেল নুরুজ্জামান ছিলেন দেশের বাইরে। মেজর হাসান ছিলেন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক। দুই উপপরিচালক দিনভর কথা বলেন জেনারেল শফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফসহ সব সিনিয়র সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে। কোথাও থেকে কোনো সহায়তা আসেনি। বরং তাদের সবাই দিনভর নিজেদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন। বিকালে রক্ষীবাহিনীর দুই কর্মকর্তা সরোয়ার ও শহীদ সিদ্ধান্ত নিলেন সাভারে যাবেন। সেখান থেকে প্রতিরোধ করবেন। বিকালে রক্ষীবাহিনী অফিস ছেড়ে চলে যান আবদুর রাজ্জাক। তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, রাজ্জাক ভাই চলে গেলে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাভার রক্ষীবাহিনী অফিসে রওনা হওয়ার পর ১৫ আগস্ট তাঁকে আটক করেন ঢাকা সিটির এসপি আবদুস সালাম। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় এসপি অফিসে।

আনোয়ার উল আলম শহীদ লিখেছেন, রক্ষীবাহিনী অফিস থেকে তোফায়েল আহমেদকে পুলিশ নিয়ে যায়। তাঁকে আটকে রাখা হয়। পরে বাসায় নামিয়ে দেওয়া হয়। বাসা থেকে আবার আটক করা হয়। তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, চোখ বেঁধে আটকে রাখা হয় শাহবাগ পুলিশ লাইনসে। এক দিন পর নিয়ে যাওয়া হয় শাহবাগ রেডিও অফিসে। সেখানে তাঁর ওপর চালানো হয় ভয়াবহ নির্যাতন। এ সময় মেজর ডালিম ছিলেন বেপরোয়া। ডালিমের একটা ক্ষোভ ছিল তোফায়েলের ওপর। সে ক্ষোভটা কুমিল্লার আফজাল খানকে জরুরি আইনের সময় আটক করেছিলেন ডালিম। ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময়ের একটি ক্ষোভ ঝাড়তে আফজাল খানের ওপর নির্যাতন চালান ডালিম। পুরো ঘটনা বঙ্গবন্ধুকে জানিয়েছিলেন তোফায়েল। চাকরি যায় ডালিমের। সে ক্ষোভ মেটাতে নির্যাতন করা হয় তোফায়েল আহমেদের ওপর।

তোফায়েল আহমেদ সম্পর্কে তথ্য নিতে আটক করা হয়েছিল তাঁর এপিএস মিন্টুকে। নিষ্ঠুরভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে শাহবাগ থেকে জিল্লুর রহমান ও তোফায়েল আহমেদকে একদিন নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গভবনে। দুজনের চোখ খোলা হয় মোশতাকের সামনে। মোশতাক তাঁদের মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে বলেন। দুজনই নিচুস্বরে বললেন, তাঁদের যেন মন্ত্রিসভায় না রাখা হয়। তোফায়েল আহমেদ বলেন, মোশতাকের কণ্ঠস্বর ছিল উঁচু। তিনি ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। তাঁরা দুজনই নিচুস্বরে যখন বললেন মন্ত্রিসভায় থাকতে চান না তখনই মোশতাক বললেন, আমি কিন্তু তোমাদের রক্ষা করতে পারব না। ওরা তোমাদের দুজনের ওপর অনেক বেশি ক্ষুব্ধ। তোমাদের শেষ করে দেবে। মোশতাকের রুম থেকে বের করে দুজনকে আবার চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় শাহবাগ পুলিশ ক্যাম্পে। তারপর কিছুদিন রেখে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কারাগারে।

ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায় বেরিয়ে আসছে। ১৫ আগস্ট নিয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের কয়েকটি বই আমাদের সম্বল। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় থাকার সময় রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে অনেক অপপ্রচার ছিল। শহীদ ও সরোয়ার তাঁদের বইতে কিছু জবাব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর মেনে নিতে পারেননি রক্ষীবাহিনীর অনেক সদস্য। কিন্তু তাদের কিছু করার কিছু ছিল না। সঠিক নির্দেশনা ও সহায়তা ছিল না। খুনির ট্যাঙ্কগুলো তাদের দিকেই তাক করা ছিল। দুঃখে ক্ষোভে সাভার ক্যাম্পে রক্ষীবাহিনীর দুই সদস্য আত্মহত্যা করেন। তাদের নামও অনেকে জানেন না। আনোয়ার উল আলম শহীদ তাদের কথা লিখে গেলেও নাম মনে করতে পারেননি। সরোয়ার মোল্লার সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার। তিনিও নাম দুটি বলতে পারেননি। তবে বলেছেন, আত্মহত্যার খবর তারা জানতেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ ব্যর্থতা নিয়ে আরও অনেক গবেষণা দরকার। ব্যর্থতা নিয়ে পুরনো সব দলিল বের করতে হবে। দেশের জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো, নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতরা কিছুই করতে পারলেন না। দুঃখজনক এ কালো অধ্যায়ের হিসাব-নিকাশ জানতে হবে।

আরও পড়ুন


সূরা বাকারা: আয়াত ৯৪-৯৮, শিক্ষাণীয় বিষয়

খালেদা জিয়া স্যুটকেস ভর্তি টাকা সৌদির লকারে রেখেছেন: প্রধানমন্ত্রী

ফুঁসছে ঘূর্ণিঝড় গুলাব, আঘাত হানবে কোথায় (লাইভ দেখুন)

টাকাই নয়,কাজ দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় : আইজিপি


নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। সেদিন কেন ৪৬ ডিভিশন পাল্টা ব্যবস্থা নিল না? তা-ও বের হয়নি। সাফায়েত জামিল ও খালেদ মোশাররফ কেন শক্ত অবস্থান নিতে পারলেন না তা-ও জানা দরকার। সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ কেন নিঃসঙ্গ, একা হয়ে পড়েছিলেন, কেন কেউ তাঁর পাশে দাঁড়ালেন না জানতে হবে। জানাতে হবে। রক্ষীবাহিনীর মেজর হাসান, সরোয়ার মোল্লা, শহীদকে কারা বারবার সেনানিবাসে ডেকে নিয়ে ব্যস্ত রেখেছিলেন? কেন রেখেছিলেন একদিন সবকিছু বের হবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ’৭৫-এর নিষ্ঠুর ইতিহাসের সঠিক তথ্য তুলে আনতে হবে সে সময়ের মানুষদের। অনেকে চলে গেছেন। যাঁরা আছেন তাঁরা পরিষ্কার করতে পারেন অনেক কিছু।

প্রয়াত আবদুর রাজ্জাক ভাইকে বারবার বলেছিলাম লিখতে। তিনি সময় দেননি। আজ আর আমাদের মাঝে নেই। চলে গেছেন সবকিছুর বাইরে। মানুষের জীবন-মৃত্যুর হিসাব-নিকাশ সব সময় বলে কয়ে আসে না। আবার অনেকে মেলাতেও পারেন না। রাজনীতি, সমাজ, বাস্তবতা ভীষণ কঠিন। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালত গঠনের সময় আমরা কাজ করতাম ভোরের কাগজে। আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী, সৈয়দ হাসান ইমাম, শাহরিয়ার কবির, কর্নেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামান প্রমুখ বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। সে সময় একদিন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক প্রয়াত আবদুর রাজ্জাকের বাসায়। রাজ্জাক ভাইকে বলেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখে রেখে যেতে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কীভাবে কাজ করতেন নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে যেতে। তিনি বলেছিলেন লিখে যাবেন। কিন্তু কিছুই লিখে যাননি। একবার বললেন, লোক দাও। বলে যাব। তোমরা সাজিয়ে নিও। জিগাতলায় তাঁর বাসায় একজনকে নিয়েও গিয়েছিলাম। শেষ দিকে বলতেন, সময় করে নিই। সেই সময় আর আসেনি।  মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা তাঁদের কথাগুলো লিখে রেখে গেলে আগামী প্রজন্ম রক্ষা পেত বিকৃতির হাত থেকে। এ যুদ্ধ এক দিনের ছিল না। দীর্ঘ ত্যাগ-তিতিক্ষার ইতিহাস উঠে আসা দরকার আরও বেশি করে।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

রাজনীতি কারও চিরস্থায়ী জমিদারি নয়

নঈম নিজাম

রাজনীতি কারও চিরস্থায়ী জমিদারি নয়

‘এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বল তো’ ছবির নাম সপ্তপদী। উত্তম-সুচিত্রার দারুণ রোমান্টিক ছবি। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানটি গেয়েছেন হেমন্ত ও সন্ধ্যা মুখার্জি। পথ শেষ হতে দিতে না চাইলেও একসময় শেষ হয়ে যায়। বেলা শেষে ফিরতে হয় বাড়ি। আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো পাখিরাও নীড়ে ফেরে অন্ধকার নামলে। এই তো জীবন। এর বাইরে আমরা যাই কী করে? প্রকৃতি অনেক নিয়ম-কানুন বেঁধে পাঠিয়েছেন জগৎ-সংসারে। এ নিয়মের ব্যত্যয় হয় কখনো কখনো। এ কারণে হয়তো কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, সব ঠিক আছে তো? জবাবে বলি, কীসের মাঝে কী, পান্তা ভাতে ঘি! সব ঠিক না থাকার কোনো কারণ তো দেখি না। দেশে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায়। রাজনৈতিক সরকারের একটা আলাদা হিসাব-নিকাশ থাকে। জনসম্পৃক্ততা রেখে স্বাভাবিকভাবে সবকিছু চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ওয়ান/ইলেভেন-মার্কা সরকারগুলো ক্ষমতায় থাকার সময় যা মনে আসে তা-ই করে। দূরত্ব তৈরি করে সবার সঙ্গে। আপন-পর বলে কিছু থাকে না। জনসম্পৃক্ততার ধার ধারে না। অকারণে সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী সবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। নতুন নতুন উইং খোলে। সরকারের ভিতরে তৈরি হয় সরকার। কে কোথায় কী কাজ করছে সমন্বয় থাকে না। পরে কঠিনভাবে ধরা পড়লে কেউ পাশে থাকে না। মইন-ফখরুদ্দীনের খবর এখন কেউ নেয় না। অথচ একসময় তাদের অনেক তোষামোদকারী ছিল। অভাব ছিল না চাটুকারের।

এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। বাস্তবতা আলাদা। বঙ্গবন্ধু আমাদের বাংলাদেশ দিয়েছেন। তাঁর মেয়ে দেশকে এগিয়ে দিচ্ছেন। বিশ্বে বাংলাদেশ আজ নতুন উচ্চতায়। উন্নয়ন -সমৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশালত্ব অর্জন করেছে। দেশ-বিদেশে প্রশংসা হচ্ছে। সে সমৃদ্ধি অনেকের পছন্দ নয়। উন্নয়ন ব্যাহত করতেই চলছে নানামুখী ষড়যন্ত্র। বাইরের শত্রু নিয়ে চিন্তা নেই। ভয় ঘর নিয়ে। অনেক মানুষের অতি উৎসাহ নিয়ে। বাইরের মানুষদের বোঝা যায়। ঘরেরগুলো চেনা যায় না। সরকারের ভিতরে ঢুকে পড়েছে উইপোকা। দেশ-বিদেশে সরকারবিরোধী কুৎসা রটানোর উৎসব চলছে। মিথ্যাচারের রেকর্ড অতীতের সব সময়কে হার মানিয়েছে। কিন্তু কুৎসা রটনাকারীদের নিয়ে সরকারি উইংগুলোর কোনো মাথাব্যথা নেই। দেখার, ব্যবস্থা নেওয়ার কেউ নেই। জাগতিক সমস্যাহীন জগতে তারা অকারণে খুলছে নতুন নতুন উইং। কারা খুলছে, কেন খুলছে জানি না। শুধু জানি অকারণে আপনজনদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে জানি না। নিয়তি বলে একটা কথা আছে। চাইলেও আমরা কেউ নিয়তির বাইরে যেতে পারি না। ইতিহাস তা-ই বলে। অসুস্থতার জগৎটা সাময়িক দাবিয়ে বেড়ায়।

নিষ্ঠুরতার প্রতীক হিটলারের ডান হাত ছিলেন মিথ্যার রাজা গোয়েবলস। তার কাজই ছিল মিথ্যা প্রচারণা চালানো। তার বিখ্যাত থিওরি ছিল- ‘একটি মিথ্যাকে বারবার প্রচার কর। একসময় সবাই সত্য বলে ধরে নেবে। বিশ্বাস করতে শুরু করবে।’ আসলেও তাই। আজকাল সত্যকে বিশ্বাস করানো কঠিন। মিথ্যা আর গুজবের প্রতি বাঙালির একটা মমত্ব আছে। ফিসফাঁস শুনতে ভালো লাগে। আড়ালে কথা বলে আনন্দ পায়। হিপোক্র্যাসি মানুষের অন্দরে লুকিয়ে থাকে। নিজের অপকর্মের খবর নেই, অন্যকে নিয়ে গুজবে কান দেয় সবাই। ফেসবুক, ইউটিউবে এ কাজটি গভীর মনোযোগ দিয়ে করছে। মিথ্যাচারে কিছু মানুষ লাইক শেয়ারে ডলার কামাচ্ছে। সুস্থধারার রাজনীতি না থাকায় মিথ্যাচারকে উৎসাহিত করছে সবাই লাইক, শেয়ার দিয়ে। বঙ্গবন্ধু পরিবার ও সরকারের বিরুদ্ধে কতটা মিথ্যাচার হচ্ছে তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। ভাবখানা এমন- সরকার ডুবলে কারও কোনো দায়ভার নেই। জবাবদিহি নেই। ভাবতে অবাক লাগছে সরকারের গোপন কাগজপত্র, ডকুমেন্ট সাইবার ক্রিমিনালদের কাছে চলে যাচ্ছে! কীভাবে যাচ্ছে, কারা পাঠাচ্ছে সেসব নিয়ে কারও জবাবদিহি নেই। অনেকে বুঝতেই পারছে না- ‘এই দিন দিন না, আরও দিন আছে’।

স্বার্থপরদের একটা যুগ চলছে। আওয়ামী লীগের খেয়ে-পরে কেউ কেউ বারোটা বাজাচ্ছে দলটির। কোথায় যেন একটা অসংগতি চলছে। সুর-তাল-লয়ের ঘাটতি আছে। দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। সরকারের পৌনে তিন বছর চলে গেছে। আগামী দুই বছর সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই সময়ে অনেক কিছু দৃশ্যমান করতে হবে। উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার বাস্তব চিত্রের প্রকাশ ঘটাতে হবে। কথামালার রাজনীতি ভুলে বাস্তবতার নতুন গতিপথে ফিরে আসতে হবে। দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রচারিত মিথ্যা ও কুৎসার জবাব দিতে হবে। বিভিন্ন খাতের হারানো ইমেজ জাগিয়ে তুলতে হবে। নতুন ধ্যান-ধারণার সময়কে অস্বীকার করা যায় না। সময়কে আড়াল করা যায় না। ইতিহাস সব সময় আপন মহিমায় একই তালে ঘুরে-ফিরে আসে না। অনেক সময় উল্টো স্রোতেও ভেসে যায়। চিরদিন ভোট একই কায়দা-কৌশলে হয় না। ১৯৭০ সালে যেভাবে হয়েছে ’৭৩ সালে একইভাবে হয়নি। আবার ’৭৯, ’৮৬, ’৮৮ ছিল আলাদা। ’৯১, ’৯৬, ২০০১ হয়েছিল ভিন্নমাত্রায়। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লোক দেখানো স্বল্প সময়ের একটি ভোট দেখেছে দেশবাসী। সে ভোটের কোনো আগামাথা ছিল না। বিএনপি একই ধরনের আরেকটি ভোট করতে চেয়েছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে। পারেনি। স্বপ্ন তছনছ হয়ে গিয়েছিল। ধরা পড়েছিল নিজেদের তৈরি ফাঁদে। বিএনপিকে এখনো কঠিন খেসারত দিয়ে যেতে হচ্ছে সেসব কান্ডের।

সাদা চোখে সবকিছু গতিশীল ও স্বাভাবিক মনে হয় ক্ষমতায় থাকলে। কিন্তু অতি ভালো অনেক সময় ভালো হয় না। এমপি-মন্ত্রী সাহেবরা এখনো ব্যস্ত ভাই লীগ, আত্মীয় লীগ, শ্যালক লীগে। দলের কর্মীদের মূল্যায়ন নেই। হাইব্রিডদের উৎপাতে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কর্মীরা অনেক এলাকায় এতিমের মতো দিন কাটান। মন্ত্রী-এমপিরা এলাকায় যান না ঠিকমতো। ভাবেন ভোট ও জনগণ কোনোটারই দরকার নেই। সবকিছু একতালে যাবে। তাই অনেকে রাজনীতিটা করেন শুধু পরিবার আর চামচা লীগ নিয়ে। বঞ্চিত হচ্ছেন কর্মীরা। সুবিধাবাদী লীগ ব্যস্ত বাণিজ্য নিয়ে। আওয়ামী লীগের সত্যিকারের মাঠের কর্মীরা আছেন আগের মতোই। আবার দুঃসময় এলে এরাই থাকবেন। সুবিধাভোগীরা খারাপ সময়ে থাকে না। কেউ একবার সুবিধা পেলে বারবার চান। আক্ষেপ করেন একটি ব্যবসা পেয়েছেন আরও কেন পাননি। যিনি একবার মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন তার দুঃখ- বারবার কেন হন না। প্রেষণে দেশে-বিদেশে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদেরও কষ্টের শেষ নেই। তাদের দুঃখ- বারবার কেন পান না। কেউ বুঝতে চান না এই দলে নেতা-কর্মীর অভাব নেই। সবারই চাওয়া-পাওয়ার হিসাব আছে। দুঃসময়ের অনেক কর্মীই সরে গেছেন, সরে আছেন। অভিমানী মনে অন্ধকার মেঘ জমেছে। আলো-আঁধারির খেলার দিনেও কুমিল্লা-৭ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত। ভালো মানুষ। ভদ্রলোক। এই কঠিনতম সময়ে একজন প্রাণ গোপালের মূল্যায়ন দেখে ভালো লাগছে। প্রয়াত এমপিদের শূন্য আসনে মনোনয়ন নিয়ে শেখ হাসিনার সঠিক একটি অবস্থান প্রশংসিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বেরিয়ে আসছে প্রয়াত এমপি পরিবার থেকে। দুঃসময়ের মানুষদেরও চাওয়া-পাওয়া আছে। রাজনীতি জমিদারতন্ত্র নয়। কোনো আসনই কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। ভালো-মন্দ কাজের হোক মূল্যায়ন। দুঃসময়ে অবদানের স্বীকৃতি পাক সবাই। আওয়ামী লীগ বেরিয়ে আসুক রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রয়াতদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের মনোনয়নের ধারাবাহিকতা থেকে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, শেখ হাসিনার স্বাপ্নিক যাত্রা এগিয়ে চলুক বাস্তবতার নিরিখে। চলার পথে কখনো কখনো সংসারের হিসাবের খাতায়ও পরিবর্তন আনতে হয়। চিরদিন এক হিসাবের খাতায় চলতে পারে না। সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকার তিনটিসহ বিভিন্ন আসনে এমপি পরিবারের বাইরে মনোনয়ন প্রদান ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা। শেখ হাসিনার আরেকটি শুভ উদ্যোগ। এ উদ্যোগ নেত্রীর প্রতি আস্থা আরও বাড়াবে কর্মীদের। কারণ এখনো তাদের বিশ্বাস-আস্থার ঠিকানা একজনই। এটাই কঠিন বাস্তবতা। এ বাস্তবতা নিয়েই টিকে আছে আওয়ামী লীগ। আগামী দিনেও টিকে থাকবে। যদিও এখন পাড়ায় আপনি মোড়ল-মার্কা লোকেরও অভাব নেই। হামবড়া ভাবসাবের হাইব্রিডরা নানামুখী দোকান খুলে বসেছে। খারাপ সময় এলে বানের পানির মতো ওরা ভেসে যাবে। চারদিকের কথার রাজারা হারিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন


সূরা বাকারা: আয়াত ৮০-৮৪, ইহুদীদের ধারণাকে আল্লাহর মিথ্যা ঘোষণা

বিদ্যুৎ উৎপাদনের মেগা হাব হচ্ছে মহেশখালীর মাতারবাড়ী

ইভ্যালীর এমডিকে জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ঢাবির হল খুলছে ৫ অক্টোবর


নিজেকে ভাবেন বিশাল লেখক কেউ কেউ, তাদের লেখা কেউ পড়ে না। বিশাল রাজনীতিবিদ ভাবেন অথচ কোথাও কোনো অনুসারী নেই। মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই। কথায় আছে- অতি ঘরনি ঘর পায় না। অতি সুন্দরী বর পায় না। বড় বড় কথা বলা সহজ। বড় কাজ করা কঠিন। সবকিছুতে খুঁত ধরলে চলে না। বাস্তবতায় থাকতে হয়। নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা বলে লাভ নেই। জোর করে রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রতিক্রিয়া ভালো হয় না। ষাটের দশকের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নেতৃত্ব আর প্রত্যাশা করি না। সাহস সবার নেই। রাজনীতিতে সাহস, সততা দুটোই দরকার। ষাটের দশক ইতিহাস হয়েছে। এ কারণে হয়তো মতিয়া চৌধুরী একজনই। বারবার ঘুরে-ফিরে আসেন না। এ যুগে, নষ্ট সমাজে প্রত্যাশাও করা যায় না। আমার ভাতিজিদের নিয়ে বাবা বলতেন, নাতনিরা বড় হয়ে মতিয়া চৌধুরীর মতো অগ্নিকন্যা হবে। দুঃসাহস নিয়ে চলবে। কাউকে তোয়াক্কা করবে না। ইতিহাসের সবাই সাহসী হয় না। সবাই পথ দেখায় না। এখন উপমা দেওয়ার মতো নেতা-নেত্রী নেই রাজনৈতিক দলে। সারা দেশের মানুষ চেনে এমন ছাত্র নেতৃত্ব নেই। সুস্থধারার সংস্কৃতি এগিয়ে নেওয়া মানুষও চলে গেছেন। নতুন করে চেতনার কেতন জাগিয়ে তোলার সংস্কৃতিসেবী তৈরি হয়নি। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। মানুষ এখন আর জটিলতা চায় না। চায় না বলেই সিনেমা হল নয়, ঘরে বসে নেটফ্লেক্স দেখছে। প্রাণবন্ত সংসদ নেই, ইউটিউবে অন্যের কুৎসা দেখে বিকৃত আনন্দ নিচ্ছে। আলাপ-আলোচনা করছে কুৎসা রটনাকারী বিকৃতদের নিয়ে। ছোটকালে শুনেছি কলিকালে জগৎ-সংসারে ভালো মানুষগুলো চুপসে যাবে। খারাপদের উল্লাস চলবে। হৃদয়ের আকুলতা নিয়ে ভালো কাজে মানুষ মনোনিবেশ করবে না। খারাপ দেখবে, শুনবে প্রতিবাদী হবে না। পথচলার মানুষগুলোকেও চেনা যাবে না। ভালো-মন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। আলাদা করে সামনে আসবে না।

কঠিন এক সময় অতিক্রম করছি। কেউ বলছে না দেশকে এগিয়ে নিতে সাহসী মানুষের দরকার। সুস্থধারার সংস্কৃতি দরকার। মানুষ ধরেই নিয়েছে কোনো ধরনের সুস্থতা আর আসবে না, অসুস্থতাই টিকে থাকবে সবখানে। কেউ বুঝতে চাইছে না মানুষের মধ্যে আছে শয়তান, আছে ফেরেশতা। হিসাব-নিকাশ দিন-দুনিয়াতেই হয়ে যায়। পরকালের অপেক্ষা করতে হয় না।  ইহকালের বিচারটা অন্যভাবে হয়। অনেক সময় সাদা চোখে তা ধরা পড়ে না। আবার কখনো কখনো শেষ পরিণতিটা সবাই দেখে যায়।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর