দৃষ্টিহীনদের বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ঢাবির দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শাহীন আলম
Breaking News
দৃষ্টিহীনদের বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ঢাবির দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শাহীন আলম

দৃষ্টিহীনদের বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ঢাবির দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শাহীন আলম

Other

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার অজপাড়াগায়ের ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শাহীন আলম বিনামূল্যে দৃষ্টিহীনদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন।

২০২০ সালের জুলাই মাসে তিনি দৃষ্টিহীনদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিবেন মর্মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দেন। তাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সাড়া পড়ে। তার ডাকে সাড়া দেই বাংলাদেশ ও ভারতের ৬০ জন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী। শুধু ভারতেরই ২০ জন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী। শুরু হয় তার অনলাইন ক্লাসের মধ্যমে প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ। সপ্তাহে ৩ দিন রবি, বুধ ও শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে দেড় ঘণ্টা ক্লাস নেন শাহীন আলম। এর পর চলতি বছর শুরু হয় তার দ্বিতীয় ব্যাচ। এ ব্যাচেও বাংলাদেশ-ভারতের মোট ৫৩জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এখানেও ছিল ২০ জন দৃষ্টিহীন ভারতীয় নাগরিক। জুলাইয়ে শুরু হয় তিনমাস মেয়াদি তৃতীয় ব্যাচ। এখানেও বাংলাদেশ-ভারত থেকে অংশগ্রহণকরী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৫ জন।   ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে তৃতীয় ব্যাচের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। চতুর্থ ব্যাচ শুরুর প্রস্তুতি চলছে।

শাহীন আলম ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার আলমপুর গ্রামের কৃষি শ্রমিক আব্দুল কাদেরের ছেলে। মা মিনারা বেগম গৃহিণী। শহীন আলমসহ তার আরেক ভাই রয়েছে। বড় ভাই ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন শাহীন টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারায়। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় মনোবলের কাছে হেরে যায় প্রতিবন্ধকতা। ২০১৩ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর আওতাধীন সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রমের সহায়তায় তুলারামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নড়াইল থেকে এসএসসি পাশ করেন। কলেজে ভর্তির সময় তার বেশ কিছুু বাধা আসে। কলেজের শিক্ষকরা তাকে কলেজে ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে নিজের পড়াশুনার দায়ভার নিজে নিলে কলেজে ভর্তির সুযোগ মিলে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে নিজ এলাকার শামসুল হুদা খান কালেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

এইচএসসি পাশের পর তার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। কিন্তু অর্থনৈতিক অনটনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে পারেননি। অন্য বন্ধুদের শীট সংগ্রহ করে মোবাইলে রেকর্ড করে ভর্তি প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন। অবশেষে অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে তার স্বপ্ন পূরণ হয়। সুযোগ পায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়ার। ২০১৯ সালে তার অনার্স সমাপ্ত হয়। বর্তমানে তিনি মাস্টার্স পরীক্ষার্থী।

তিনি নবম শ্রেণিতে থাকাকালীন বেসরকারিভাবে ১২ দিনের একটি কোর্সের মাধ্যমে কম্পিউটার শিখা শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তিনমাস মেয়াদী আরো একটি কোর্স করেন। শাহীন আলম দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের যা যা শিখান তা হলো: ফান্ডামেল্টাল অফ কম্পিউটার, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, মাইক্রোসফট এক্সেল, মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্ট, ইন্টারনেট ব্রাউজিং ইত্যাদি।

স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার ব্যবহার তিনি কম্পিউটার পরিচালনা করেন। শিক্ষার্থীরাও এই মাধ্যম ব্যবহার করে কম্পিউটার শিখে। নন ভিজুয়াল ডেক্সটপ এক্সেস (NVDA) ও জাভ এক্সেস উইথস্পিচ এই দুই স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার কম্পিউটার স্ক্রিনে প্রদর্শিত হওয়া সকল তথ্যাদি অডিও ভয়েসের মাধ্যমে দৃষ্টিহীনদের নির্দেশনা প্রদান করে।

শাহীন আলম জানান, বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা করে সরকারি কোনো কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। যার ফলে তথ্য প্রযুক্তির জ্ঞান থেকে পিছিয়ে পড়ছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী। তারা যাতে কোনভাবেই তথ্য প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে না পড়ে সেই জন্য তার এই উদ্যোগ।

শাহীন আলম আরো জানান, প্রতিমাসে তার ইন্টারনেট বিল পরিশোধ করা কষ্টকর হচ্ছে। তার নিজস্ব লাইসেন্সকৃত জুম সফটওয়্যার হলে তার এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা সহজতর হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন তার স্কলারশিপের জমাকৃত অর্থ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ করানোর ক্ষেত্রে ব্যায় করেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে; খরচ বেড়েছে। তার পক্ষে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যাপক কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের শিখার আগ্রহ বেড়ে চলছে।

আরও পড়ুন

গাজীপুর সাফারি পার্কে জেব্রা পরিবারে নতুন অতিথি

মনোনয়ন ফরমের আগেই ১০ হাজারে কিনতে হচ্ছে উপজেলা আ.লীগের দলীয় ফরম

ট্রলারে করে ঝুঁকি নিয়েই ফিরছে সেন্টমার্টিনে আটকা পর্যটকরা

মহেশখালীতে সাবেক যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা

শাহীন আলম বলেন, প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় সকল কিছুর ব্যবস্থা করা হলে দৃষ্টিহীনরা আউটসোর্সিং ফ্রিল্যান্সিং শিখে ঘরে বসেই অর্থ উপার্জন করতে পারবে। কম্পিউটার হার্ডওয়্যার সম্পর্কেও বেশ পারদর্শিতা রয়েছে শাহীন আলমের। ইতোপূর্বে শাহীন আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রিসোর্স সেন্টারে খন্ডকালীন কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের একটি প্রকল্পে কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসাবে ছিলেন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাকুড়া জেলার বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ফাল্গুনী পাল জানান, "আমি শাহীন স্যারের কাছে কম্পিউটার শিখে এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ব্যবহার করে চাকুরী করছি। বাংলাদেশের শেরপুর জেলার অপু আহমেদ ঢাকার সরকারি বাংলা কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী জানায়, এত সুন্দরভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিতে পেরে সে উপকৃত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাকার মোঃ সরওয়ার হোসেন খান জানান, "শাহীন আমাদের রিসোর্স সেন্টারে এসে নিজের পড়াশুনার ক্ষেত্রে কম্পিউটার ব্যাবহার করত। তার কম্পিউটারের দক্ষতা বুঝতে পেরে আমরা তাকে ২০১৯ সালে খন্ডকালীন কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করি। সে ১ বছরে ছয়মাস মেয়াদি দুটি ব্যাচে দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার শিখিয়েছে। সে অনেক মেধাবী, কম্পিউটারের ভালো পারদর্শী। ভবিষ্যতে সে আরো ভালো কিছু করতে পারবে। "

সরকারের কাছে শাহীন আলমের দাবি, বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য যেন আলাদা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরী করা হয় এবং  যোগ্যতার ভিত্তিতে তাকে যেন একটি সরকারি চাকুরী প্রদান করা হয় সেই দাবী জানান।

news24bd.tv এসএম