সূরা বাকারা: আয়াত ১৩৯-১৪২, আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসীর পালনকর্তা
সূরা বাকারা: আয়াত ১৩৯-১৪২, আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসীর পালনকর্তা

সূরা বাকারা: আয়াত ১৩৯-১৪২, আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসীর পালনকর্তা

অনলাইন ডেস্ক

পবিত্র কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ সূরা আল-বাকারা আলোচনার আজকের পর্বে সূরাটির ১৩৯ থেকে ১৪২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। বনী ইসরাইলীদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহপাক সূরা বাকারাহ'র ১৩৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন -

قُلْ أَتُحَاجُّونَنَا فِي اللَّهِ وَهُوَ رَبُّنَا وَرَبُّكُمْ وَلَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُخْلِصُونَ (139)

‘‘হে নবী, আপনি আহলে কিতাবদের বলুন, আল্লাহ সম্বন্ধে তোমরা কি আমাদের সঙ্গে বিতর্ক করতে চাও? অথচ তিনি আমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। আমাদের কর্ম আমাদের জন্য এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য, আমরা তাঁর প্রতি অকপট। ’’ (২:১৩৯)

এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, কোন কোন ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন যে, তারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহ শুধু তাদের নিয়েই ভাবেন ও তাদের জন্যই পথ-প্রদর্শক পাঠিয়েছেন।

তাই তারা অন্য কোন নবী বা তাদের অনুসারীদের গ্রহণ করতে চান না। অথচ আল্লাহর কাছে সকল মানুষই সমান এবং একমাত্র মানুষের আমল বা কৃতকর্মই আল্লাহর সাথে মানুষের দূরত্ব বা নৈকট্য সৃষ্টির মানদণ্ড। তবে মানুষ যে সব কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আঞ্জাম দেয় তাই সৃষ্টিকর্তার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। এজন্য মানুষকে শির্ক বা অংশীবাদের কদর্যতা থেকে মুক্ত হতে হবে এবং ইমানের আলোয় নিজের অন্তর ও আত্মাকে আলোকিত করতে হবে।

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, মানুষ এতটাই আত্ম কেন্দ্রীক যে সৃষ্টিকর্তাকেও তারা নিজের অধিকার ভুক্ত বিবেচনা করার চেষ্টা করে। অথচ আল্লাহ কোন ধর্ম, জাতি বা সমাজের একক অধিকারভুক্ত নন। তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীরই পালনকর্তা।

এরপর ১৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে -

أَمْ تَقُولُونَ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطَ كَانُوا هُودًا أَوْ نَصَارَى قُلْ أَأَنْتُمْ أَعْلَمُ أَمِ اللَّهُ وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَتَمَ شَهَادَةً عِنْدَهُ مِنَ اللَّهِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (140)

‘‘হে আহলে কিতাব! তোমরা কি বলতে চাও ইব্রাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরগণ ইহুদী কিংবা খ্রিস্টান ছিল? হে নবী, আহলে কিতাবদের বলুন, তোমরা বেশী জান, না আল্লাহ? তার চাইতে অত্যাচারী কে, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে প্রমাণিত সাক্ষ্যকে গোপন করে? তোমরা যা কর আল্লাহ তা অবগত আছেন। ’’ (২:১৪০)

হযরত মূসা ও হযরত ঈসা (আ.) এর কোন কোন অনুসারী তাদের ধর্মের সত্যতা প্রমাণের জন্য দাবি করে থাকেন যে স্বয়ং হযরত ইব্রাহীম ও তার পরবর্তীকালের নবীরাও তাদের ধর্মেরই অনুসারী ছিলেন। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম, হযরত মূসা ও হযরত ঈসা (আ.) ও পরবর্তীকালের নবীদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এ ধরনের দাবির পেছনে বিদ্বেষ ছাড়া গ্রহণযোগ্য কোন যুক্তি নেই। পবিত্র কোরআন সত্যের বিকৃতিকে সবচেয়ে বড় অপরাধ বলে মনে করে। কারণ সত্যের বিকৃতি বহু যুগ ধরে বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং এর ফলে সমাজের বিকাশ ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ বাধাগ্রস্ত হয়।

এরপর ১৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে -

تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُمْ مَا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ (141)

‘‘সে সম্প্রদায় অতীত হয়ে গেছে। তারা যা করেছে, তা তাদের জন্যে এবং তোমরা যা করছ, তা তোমাদের জন্যে। তাদের কর্ম সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে না। ’’ (২:১৪১)

এই আয়াতে ইহুদী ও খ্রিস্টানদের ভিত্তিহীন দাবির জবাব দেয়া হয়েছে। এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, কেন তারা তাদের ইতিহাসকে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর যুগ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাচ্ছে? একটি জীবন্ত বা গতিশীল সমাজের মূল্যায়ন হবে সেই সমাজের কর্ম ও বৈশিষ্ট্যের উপর। অতীত ইতিহাসের ওপর নয়। অতীতের সমস্ত নবী ও জাতি গত হয়ে গেছে। তাদের কর্ম তাদের সঙ্গেই সম্পর্কিত। তেমনি ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে তাদের কাজকর্মের জন্য নিজেদেরকেই জবাবদিহিতা করতে হবে। গুণাবলী হল অর্জন করার বিষয়। আর প্রত্যেক ব্যক্তি ও সমাজকে নিজের প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। গুণাবলী উত্তরাধিকারের মত কোন বিষয় নয় যে তা সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে লাভ করবে।

এরপর সূরা বাকারার ১৪২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে -

سَيَقُولُ السُّفَهَاءُ مِنَ النَّاسِ مَا وَلَّاهُمْ عَنْ قِبْلَتِهِمُ الَّتِي كَانُوا عَلَيْهَا قُلْ لِلَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (142)

‘‘নির্বোধ লোকেরা বলবে, তারা এ যাবৎ যে কেবলা অনুসরণ করে আসছিল তা থেকে কিসে তাদেরকে ফিরিয়ে দিল? বলুন, পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই, তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন। ’’ (২:১৪২)

এর আগেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে কাবা শরীফের দিকে কেবলা পরিবর্তনের বিষয়টিকে ইহুদীরা মুসলমানদের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করত। এই আয়াতে ও পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে এ বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট আলোচনা এবং ইহুদীদের আপত্তির জবাব দেয়া হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) নবুয়্যত লাভের পর মক্কায় থাকাকালীন সময়ে অর্থাৎ দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ রেখে নামাজ পড়তেন। এর কারণ ছিল-

প্রথমত: আগে একত্ববাদীদের কেবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস এবং সমস্ত ঐশী ধর্মের কাছেই বায়তুল মোকাদ্দাস অত্যন্ত সম্মানিত স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো।

দ্বিতীয়ত: তৎকালীন মুশরিকরা কাবা ঘরকে মূর্তির ঘরে রূপান্তরিত করেছিল। এ অবস্থায় ইসলামের নবী (সা.) যদি কাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন, তাহলে বাস্তবে তা হতো মূর্তিদের দিকে মুখ ফেরানো। মদীনায় হিজরত করার পরও কয়েক মাস পর্যন্ত মুসলমানরা বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন। আর ইহুদীরা এ বিষয়কে অজুহাত করে বলতো, মুসলমানরা তো আমাদের অনুসারী। কারণ তাদের স্বতন্ত্র কেবলা নেই। এ নিয়ে উপহাস ও বিদ্রুপ মুসলমানদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ তা'লা কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেন।

আরও পড়ুন


চেয়ারম্যান সাহেব, অপকর্মকারীদের ভালো হয়ে যেতে বলুন : সেতুমন্ত্রী

পীরগঞ্জের ঘটনার অন্যতম হোতা গ্রেপ্তার

এটি সহজ কাজ নয়: ফখরুল

কক্সবাজারের বিচে গান করছিলেন ইকবাল, অতঃপর যেভাবে ধরা


একদিন রাসূল (সা.) যখন মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন, তখন জিব্রাইল ফেরেশতার প্রতি নির্দেশ দেয়া হলো, নামাজের মধ্যেই রাসূল (সা.) কে যেন কাবামুখী করা হয়। সেই থেকে ওই মসজিদ জু-কেবলাতাইন অর্থাৎ দুই কেবলার অধিকারী মসজিদ হিসাবেই খ্যাতি লাভ করে। কিন্তু বাহানাবাজ ইহুদীরা এবার নতুন আপত্তি তুলে মুসলমানদেরকে বলল, যদি আগের কেবলা সঠিক হয়, তাহলে কোন কারণে তা বাতিল করা হলো এবং কেন এতকাল পর্যন্ত বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়া হলো? পবিত্র কোরআনে এর জবাবে বলা হয়েছে, কেবলার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ স্থান বা কোন অঞ্চল নিয়ে আছেন বা আল্লাহ পশ্চিম দিকে আছেন বা পূর্ব দিকে আছেন।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ পূর্ব-পশ্চিম সব দিকেই আছেন এবং সবই তার মালিকানাধীন। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোন স্থানেরই বিশেষ কোন মর্যাদা নেই। আল্লাহর নির্দেশেই আমরা কোন বিশেষ স্থানকে সম্মান করি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহর নির্দেশের অনুগত হওয়া। আল্লাহ যেদিকেই মুখ ফেরানোর নির্দেশ দেন, সেদিকেই আমাদের মুখ ফেরানো উচিত-তা কাবাই হোক বা বায়তুল মোকাদ্দাস হোক। তারাই আল্লাহর সহজ ও সঠিক পথে পরিচালিত হবে, যারা আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করবে।

news24bd.tv এসএম

;