এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি এবাদত
এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি এবাদত

এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি এবাদত

Other

সন্তান গর্ভে ধারণ করলে আর ডিউ সময়ে ডেলিভারি দিলেই মা হওয়া যায়না। সন্তান গর্ভে ধারন, জন্মদান ও প্যারেন্টিং এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি এবাদত এবং অতি অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদত বলে আমি মনে করি। কারণ, একজন শিশু শুধু ব্যক্তির সন্তান মাত্র নয়, শিশু মানে এই মানব সভ্যতার বিকাশ। সুতরাং শিশুর বিকাশের এই পুরো প্রক্রিয়ায় যে কোন একটি ধাপের ছোট ভুল পুরো এবাদতকেই শেষ করে দিতে পারে।

 

আমরা সবাই জানি, শিশুর মনোবিকাশের শুরু হয় মায়ের গর্ভ থেকে। বিশেষ করে, শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে শূন্য থেকে এক হাজার দিন। একজন মা, যার গর্ভে বেড়ে ওঠছে তার সন্তান, সেই মায়ের চিন্তা, ভাবনা, শিশুর সাথে মায়ের ইন্টারএ্যাকশন, মাযের গর্ভকালীন জীবন যাপন ও প্র্যাকটিস এসবই প্রভাব ফেলে সন্তানের মনোজগত নির্মাণের উপর।  

আমি যেদিন প্রথম জানতে পারি আমি মা হবো, তখন আমার গর্ভের ভ্রুণটির বয়স পাঁচ সপ্তাহের একটু বেশি। আমার বয়স চব্বিশ বছর। আমার মতো একজন তারছেঁড়া মানুষ, শামীমের মতো একজন বাউন্ডেলে কী করে মুহূর্তেই ‘মা’ আর ‘বাবা’ হয়ে গিয়েছিলাম সেটা এখনো এক অপার বিস্ময় আমার কাছে।  

শামীম তখন ইসিসিডি (আর্লি চাইল্ডহুড কেয়ার এন্ড ডেভেলপমেন্ট) ন্যাশনাল টীমের প্রশিক্ষকদের একজন। সেই সুবাদে সে আমার আর আমাদের সন্তানের গর্ভকালীন যত্ন ও যোগাযোগের ব্যাপারে খুব সচেতন। রিতিমতো ইসিডির মডিউল পড়ে পড়ে শেখাচ্ছে আমাকে কোন স্টেজে কী করতে হবে। শুধু আমাকেই না, বাড়ির সবাইকেই শেখাচ্ছে। একটা যৌথ পরিবারের ভেতরে থেকে পুরো পরিবারকে শিশুর গর্ভকালীন মনোবিকাশের বিষয়ে সচেতন রাখার কঠিনতম কাজটি সে করে ফেলেছিলো।  

আমার মনে আছে, আমার শ্বাশুড়ি বাড়ির পোষা পাখি, বেড়াল কুকুরের খাবার আমার হাত দিয়ে দেয়াতেন যেনো অনাগত শিশুটি প্রাণের প্রতি দয়াশীল ও দায়বদ্ধ হয়, ওই অবোধ প্রাণীগুলোর প্রাণের দোয়া যেন আমার বাচ্চার উপর থাকে।  

আর আমি ? শামীম....আমরা কী করিনি আমাদের সন্তানের পজেটিভ ডেভেলপমেন্টের জন্য !! ব্রেইনকে সারাক্ষণ সুস্থ চিন্তা, সুন্দর ভাবনার ভেতরে রাখার মতো কঠিন চর্চাটি আমি তখন পা টিপে টিপে করেছি। বিশ্বাস করুন, করেছি।  

যেহেতু ওই সময় আমি বিসিএস এর লিখিত পরীক্ষা দিচ্ছিলাম, আমার বেশিরভাগ সময় এমনিতেই টেবিলে কাটতো পড়ালেখা করে। তার সাথে ছিলো বই পড়া, গান শোনা। দ্য গড অব স্মল থিংস, মানবজমীন, পার্থিব, দূরবীন, কালবেলা, কালপুরুষ, সাতকাহন, ভোলগা সে গঙ্গা....আরো কতো বই আমার আর বাচ্চার সারাক্ষণের সঙ্গী যে ছিলো!!

আমি যেহেতু আস্তিক মানুষ, সন্তানের মঙ্গল কামনায় নিয়ম করে নামাজ পড়েছি। মারসাদ পেটে থাকতেই আমি পুরো কোরান বাংলা অনুবাদ, ব্যখ্যা সহ পড়েছি তিনবার। কোরান পড়ার সময় সুর করে জোরে পড়তাম যেনো বাচ্চা শুনতে পায়। নামাজ পড়ার সময় সুরাও জোরে পড়তাম যেনো বাচ্চা শুনতে পায়।  

বইএর যে অংশটা আমার ভালো লাগতো, সেটুকু জোরে পড়তাম, বাচ্চা যেনো শুনতে পায়। শামীম নিয়ম করে বাচ্চার জন্য গান শোনাতো আমাকে। আমি নিজে গান শুনতাম সারাক্ষণ, গাইতাম। ঘুমাতে যাওয়ার আগে সুন্দর সব স্বপ্ন কল্পনা করে রাখতাম যা আমি দেখতে চাই।

শুধু মারসাদের সময়ই নয়, তিনটা বাচ্চার সময়ই আমি প্রেগন্যান্সিকে প্রার্থনার মতো করে মেনেছি। বিশ্বাস করুন, আমি এই দু:খী দেশের কিছু অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মায়েদের অন্যতম যার গর্ভকালীন শারিরীক ও মানসিক যত্নের অভাব হয়নি। তার ফল আমি পেয়েছি।  

আমার মেয়েটার শান্ত ও মানবিক একটা হ্রদয় হয়েছে। সে শিশুকাল থেকেই টেবিল আর বইএর সাথে এটাচ্ড হয়েছে। শৈশব থেকেই তার সমস্ত খেলাধুলা টেবিল আর কলম কেন্দ্রিক। তার গলায় করুণাময় মধুছন্দ ঢেলে দিয়েছেন। আমার ছেলেরাও মানবিক হ্রদয় নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে, পরমেশ্বরের কাছে এই কৃতজ্ঞতা জাননোর ভাষা আমার নেই।  

এই যে এতো কাহিনী বললাম কেনো জানেন? নিচের ছবির ওই সাজাপ্রাপ্ত আসামীর কোলের শিশুটিকে দেখে। হ্যাঁ, নুসরাত হত্যা মামলার আসামী কামরুন্নাহার মণির কথা বলছি।  

এই শিশুটিকে পাঁচমাসের গর্ভে রেখে এই মেয়েটি আরেকজন জীবন্ত মানুষের গায়ে আগুন দেয়ার কাজটি করেছে। এই মেয়েটি তার বান্ধবী নুসরাতকে ডেকে এনেছে, অন্যদের সাথে হাত বেঁধেছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী প্রথম আগুন সেই লাগিয়েছে।  

পেটের ভেতর সন্তান রেখে একটি মেয়ে মনের মধ্যে এতো ঘৃণার চাষ কী করে করতে পারে!! গর্ভে সন্তানের নড়াচড়া বুঝেও, হ্রদস্পন্দন শুনতে শুনতেও  কী ভয়ানক সব চিন্তা সে করেছে, একটি জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনায় অংশ গ্রহন করেছে, অন্য খুনীদের জন্য বোরকা, হাতমোজা কিনে এনেছে!!  

কী ভয়ঙ্কর, কী ভয়ঙ্কর!!! আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই মেয়েটির পরিবারে এমন কেউ ছিলোনা যে তাকে এই সুন্দর সময়ে এইসব অসুন্দর থেকে দূরে রাখবে? এমন কেউ ছিলোনা যে এই শিশুটির কথা একবার ভাববে ? কেউ ছিলোনা যে এই মেয়েটির ভয়ঙ্কর মনোবৈকল্যকে বুঝতে পারবে ? কেউ না !!! পুরো পরিবারটিই তবে অসুস্থ !!!!

কথা উঠেছে মণির সাজা মওকুফের বিষয়ে। আইন এইসব সংবেদনশীল বিষয় কিভাবে বিবেচনা করবে সেটা আইনের এখতিয়ার। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মণির মাতৃপরিচয় কোনভাবেই তার সাজা মওকুফের জন্য বিবেচ্য হতে পারেনা। একমাত্র বিবেচ্য বিষয় তার অপরাধ।   

বরং তার অপরাধের মাত্রা বেড়েছে এখানেই যে, সে তার মনের ঘৃণা, হিংস্রতা আর বর্বরতার বীজ বপন করে দিয়েছে তার গর্ভের সন্তানের মনোজগতে। সে ব্যহত করেছে একজন মানবশিশুর স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশকে।  

আরও পড়ুন: শহীদ আফ্রিদি-শাহিন আফ্রিদিকে নিয়ে আইসিসির টুইট

মা হয়ে সন্তানের ভেতরে ঘৃণা ও সহিংসতার যে বীজ সে বপন করে দিয়েছে এখন অন্তত সেই বীজ উপড়ে ফেলার জন্যও শিশুটিকে তার কাছ থেকে দূরে রাখা জরূরী। খুব জরূরী। শিশুটিকে রাষ্ট্রিয় সম্পদ হিসেবে একটি সুস্থ পরিবেশ দেয়া দরকার। সব মায়ের কাছে সন্তান নিরাপদ নয়।  

মণির সাজা যদি কমাতে হয় সেটা তার অপরাধের মাত্রা ও মোটিভ বিবেচনায় করা হতে পারে, কোনভাবেই তার নারীত্ব ও  মাতৃপরিচয় বিবেচনায় নয়। একজন অপরাধী নারী হিসেবে বিশেষ সুবিধা পেতে পারেনা, মা হিসেবে আনুকূল্য পেতে পারেনা।  

অপরাধীর কোন লৈঙ্গিক পরিচয় নেই। অপরাধীর একটাই পরিচয়, অপরাধী। খুনীর জেন্ডার একটাই, ‘খুনী’।

লেখক-সাদিয়া নাসরিন, উন্নয়ন কর্মী। (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের সব লেখার আইনগত ও অন্যান্য সব দায় লেখকের। মতামত লেখকের নিজস্ব, সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv নাজিম

;