‘ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস দখল করবে’

মারুফ কামাল খান সোহেল

‘ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস দখল করবে’

মারুফ কামাল খান সোহেল

আগের বছর গেলেন তরিকুল ভাই। আর ঠিক তার পরের বছরেই খোকা ভাই। কী আশ্চর্য! তরিকুল ইসলাম ও সাদেক হোসেন খোকা ওই দু'জনে ঠিক একই তারিখে চিরবিদায় নিলেন এই দুনিয়া থেকে। চৌঠা নভেম্বর।

তাঁরা দু'জনেই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারের কেবিনেট মন্ত্রী ছিলেন। খোকা ভাই মন্ত্রীর মর্যাদায় অখণ্ড ঢাকার মেয়রও ছিলেন। তবে বয়সে তাঁরা সমান ছিলেন না। এক লেভেলের রাজনীতিবিদও ছিলেন না। তরিকুল ভাই ছিলেন অনেক সিনিয়র এবং খোকা ভাইয়েরও নেতা। দু'জনেই মাওলনা ভাসানীর অনুসারী ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপ করতেন। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। উভয়ই খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ ছিলেন দু'জনেই। বিএনপি গঠনের সময় ভাসানী ন্যাপ এই নতুন দলে মার্জ হয়ে যায়। তরিকুল ভাই সেই গঠনকাল থেকেই বিএনপিতে যুক্ত হন। খোকা ভাই তখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও স্পোর্টিং ক্লাব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন৷ তিনি বিএনপিতে যোগ দেন আরেকটু পরে।

কেন জানিনা এই দু'জনেই আমাকে দারুণ পছন্দ করতেন। মন খুলে কথা বলতেন। মাঝে মাঝেই ডেকে নানান বিষয়ে আলাপ করতেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শুরুর দিক থেকেই আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক নিবিড় সম্পর্ক।

১৯৯১ সালে দু'জনেই মন্ত্রী হন। শত ব্যস্ততার মধ্যেও মাঝে মাঝে তারা ডেকে নানান বিষয়ে কথা বলতেন। বিভিন্ন পার্টিতে এবং বাসার অনুষ্ঠানেও দাওয়াত দিতেন। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আ.লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের মিলিত আন্দোলন ভয়ঙ্কর নৈরাজ্যের দিকে মোড় নিলে এ যোগাযোগ আরো বাড়ে। প্রতি সপ্তাহেই অন্ততঃ ২/৩ দিন সন্ধ্যায় মন্ত্রী তরিকুল ভাই তাঁর মিন্টো রোডের সরকারি বাসায় ডেকে পাঠাতেন। ১৯৯৬ সালে আ.লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রচার প্রচারণার নানান কাজে তারা আমার পরামর্শ চাইতেন।

আমি প্রধানমন্ত্রী অফিসে যোগ দিলে মন্ত্রী হিসেবে তরিকুল ভাই যেদিনই পিএমও-তে আসতেন সিগারেট খাবার ছলে আমার রুমে এসে অন্তত ঘন্টাখানেক আড্ডা দিয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে বাসায় এবং সচিবালয়ের অফিসেও ডেকে পাঠাতেন আমার হাতে কাজ না থাকলে।

খোকা ভাইও মাঝে মাঝে ছুটির দিনে তাঁর বাসায় দুপুরের খাবার দাওয়াত দিতেন। দু'জনেই রাজনৈতিক আলোচনা খুব পছন্দ করতেন। জরুরি অবস্থা জারি হলে খোকা ভাই এক দুপুরে তাঁর বাসায় আমাকে খেতে ডাকলেন। গিয়ে দেখি সেখানে হায়দার আকবর খান রনো ভাইও আছেন। খোকা ভাই আমাদেরকে বললেন, আপনাদের সঙ্গে তো মান্নান ভাইয়ের (আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া)-র সম্পর্ক ভালো। উনার ভাবভঙ্গি বিশেষ সুবিধার মনে হয়না। একটু কথা বলে দেখেন। এখন খারাপ সময়। বাঁচার জন্য কিছু চালাকি টালাকি করতে হলে করুক। কিন্তু উনি যেন বিট্রে না করেন ম্যাডামের সঙ্গে।

আমি মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে আমার সর্বশেষ আলাপ এবং ঝগড়া করে চলে আসার বিবরণ দিয়ে বললাম, "উনি অলরেডি বিট্রে করে ফেলেছেন। উনাকে ফেরাবার আর পথ নাই।" রনো ভাইও তাতে সায় দিয়ে বললেন, "আমিও সে রকমই মনে করি।" খোকা ভাই বললেন, "আচ্ছা আমিই তাহলে চেষ্টা করে দেখি। এতো সহজে হাল ছাড়বো না।" উনি সাবেক দু'জন প্রতিমন্ত্রীর নাম ধরে বললেন, "এই শয়তান দুটোই মান্নান ভাইয়ের পেছনে লেগে থেকে উনার মাথাটা খারাপ করে দিচ্ছে।"
ম্যাডামের সঙ্গে খোকা ভাই নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন বলেই জানতাম। কিন্তু এর কিছুদিন পর ম্যাডামের বাসা থেকে একজন আমাকে ফোন করে বললো, কোনো একটা কাজের ব্যাপারে খোকা ভাইকে বেশ ক'বার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। শুনে আমি ফোন করলাম খোকা ভাইকে। তিনি খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না বুঝতে পারলাম। নানা রকম গাঁইগুঁই করে বললেন, আইসেন একসময় বাসায়।

বাসায় গেলে খোকা ভাই তার চরম বিপন্নতার কথা জানালেন। বললেন, "ভীষণ চাপে আছি। সিটি কর্পোরেশনে আর্মি বসিয়েছে। পই পই করে খুঁজছে কোথায় কোন অনিয়ম করেছি। সম্পদের তল্লাশি চলছে। আমাকে চব্বিশ ঘন্টা মনিটরিংয়ের আওতায় রেখেছে। নানান রকম শর্ত দিচ্ছে। বিদেশে যেতে চাইলাম তার পারমিশন দিচ্ছে না। নানান কায়দা করে এখন পর্যন্ত জেলের বাইরে আছি। ক'দিন থাকতে পারবো জানিনা।"

বললাম, "বাইরে গুজব, আপনি নাকি একজনকে দশ কোটি টাকা দিয়ে রফা করেছেন যাতে গ্রেফতার না করে?" ম্লান হাসলেন খোকা ভাই। জবাব দিলেন, "যতো কয় ততো নয়।"

অনেক দিন এরপর আর খোকা ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ নাই। ম্যাডামের মা মারা যাবার পর তিনি কয়েক ঘন্টার প্যারোলে বাসায় এলেন। খোকা ভাই ফোনে জানতে চাইলেন কোনো রকম সাহায্য লাগবে কিনা। আমি না বলে দিলাম। লাশের জানাজা হলো গুলশান আজাদ মসজিদে। সেখান থেকে ফিরে কয়েকজন নারী নেত্রী ম্যাডামকে সোৎসাহে জানালেন, খোকা ভাই এসেছিলেন জানাজায়। পার্টির ছেলেরা তারে খুব অপমান ও গালিগালাজ করেছে। ধাক্কাটাক্কাও দিয়েছে।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাগতঃ স্বরে ম্যাডাম বললেন: এটা ঠিক হয় নাই। ওদেরকে কে বলেছে এসব করতে?

এক-এগারো যামানায় খোকা ভাই আরো এক সন্ধ্যায় লোক পাঠিয়ে আমাকে তার বাসায় নিলেন। বললেন, "ভারী বিপদে পড়েছি। ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস দখল করবে।" সাইফুর রহমান ও মেজর হাফিজকে দিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা তখন বিএনপির পালটা কমিটি করেছে। অফিস তাদের দখলে দেবে। খোকা ভাই বললেন, "আমাকে এ কুকর্মে সরাসরি থাকতে বলছে। মহানগরীর সালামকেও আনিয়েছে। আমি চেষ্টা করছি এটা বন্ধ করতে। পারবো কিনা জানিনা।" আমি বললাম, "আপনি কোনো ক্রমেই এ অপকর্মের দোসর হবেন না। তাতে যা হবার হবে। এটুকু ঝুঁকি নিলে আপনার যা বদনাম হয়েছে তা দূর হবে। আপনি অনেক বেশি শ্রদ্ধার আসন পাবেন।" আমাকে একটা গোপন ফোন নম্বর দিয়ে খোকা ভাই বললেন, "দেখি চেষ্টা করে। পরে জানাবো।" রাত দু'টোর দিকে ফোন এলো ঐ নম্বর থেকে। একটা মাত্র বাক্য উচ্চারণ করে ফোন কেটে দিলেন খোকা ভাই: "পারলাম না, হেরে গেলাম, সকালেই হবে।"

ম্যাডাম জেল থেকে বেরুবার পর খোকা ভাই আমাকে ফোন করে বললেন, "একটু ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে চাই।" আমি বললাম, "এতো জলদি? কী করেছেন এতোদিন একটু ভেবে দেখেন তো।" এর তিন-চার দিন পর। ম্যাডামের বাসায় গিয়ে দেখি ড্রইং রুমে খোকা ভাই বসা। আমাকে দেখে একটু বিব্রতই হলেন। বললেন, "আপনি তো মানা করলেন। পরে বাসায় ফোন করে পিচ্চিকে বললাম, ম্যাডামকে বলো আমি খোকা দেখা করতে চাই। ম্যাডাম আজ আসতে বলে দিয়েছেন।"

এরমধ্যে ম্যাডাম ড্রইং রুমে এলেন। আমি বললাম, "খোকা ভাই আপনার মধ্যে কি একটু অপরাধবোধ কাজ করেনা? ম্যাডাম আপনাকে ঢাকার নেতৃত্ব দিয়েছেন। আপনি মেয়র। ম্যাডাম গ্রেফতার হলেন। ঢাকা শহরে গাছের একটা পাতাও নড়লো না।"

খোকা ভাই করুণ চোখে তাকিয়ে বললেন: "ম্যাডামের সামনে সত্যি কথাটা কই। ভয় পেয়ে গেছিলাম খুব। খালি নিজের জন্য না। এরা এতো খারাপ, বৌ-বাচ্চা পর্যন্ত ধরে নিয়ে যেতো। এখন ম্যাডাম মাফ করলে আছি। না করলে জীবনেও আর রাজনীতি করবো না।"

ম্যাডাম খোকা ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে আমাকেই বুঝাতে লাগলেন, "দ্যাখেন ওরা তো প্রেসিডেন্ট জিয়ার পর আমার ওপর ভরসা করেই রাজনীতি করে আসছে। আমি নিজেই যেখানে বিপন্ন হয়েছি, সেখানে আর ওদের সাহস থাকে?"

বিএনপি সরকারের শেষের দিকে তরিকুল ভাই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আমার কাছে কিছু মন্তব্য করেছিলেন। অচিরেই তাঁর সব ভবিষ্যদ্বাণী 'প্রোফেটিক' হয়ে ফলে যায়। তাদের দু'জনকে নিয়েই আরো অনেক কথা আছে। সব কথা তো আর সব সময় বলা যায় না।

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের অফিসে আমার একদিন বুকে ব্যথা হলো। ঘামছি আর বুক চেপে বসে আছি। বিভিন্ন জনে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন। রাত সাড়ে ন'টায় এলেন খোকা ভাই। এসে শুনেই হাত ধরে টেনে তুললেন। "এখনো বসে আছেন? চলেন আমার সঙ্গে।" গাড়িতে তুলে নিয়ে গেলেন সোজা ইউনাইটেড হাসপাতালে। ভর্তি, সিটি স্ক্যান ও ইটিটি সহ নানান টেস্ট এবং শেষ অব্দি এঞ্জিওগ্রাম পর্যন্ত করে তারপর ছাড়লো ওরা। পাঁচ-ছয় দিন থাকতে হলো হাসপাতালে। তাও আবার  ভিআইপি কেবিনে। এক রাতে খোকা ভাই এলেন ডাক্তার মুমিনুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে। হাসিমুখে বললেন, "সব ঠিক আছে। কোনো অসুবিধা নাই। ছুটি এখন। চলেন বাসায়।" বিপন্ন মুখে জিজ্ঞেস করলাম, "সব মিলিয়ে বিল কতো হয়েছে?" খোকা ভাই বললেন, "বিল ক্লিয়ার। আপনাকে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে না। আমার নিজের হলে চিকিৎসা করতে হতো না?"

একটা সার্জারির জন্য একবার সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম। আমি দেশেই করাতে চাইলাম। ম্যাডাম নিজে থেকে জোর করে কিছু টাকা আমাকে দিয়ে বললেন, না সিঙ্গাপুরেই যান। বাধ্য হয়ে তেমন কাউকে না জানিয়েই যাওয়ার আয়োজন করলাম। যাবার দিন পথে ফোন খোকা ভাইয়ের। "কোথায় আপনি?" বললাম, "ভাই এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছি। এখন বুকওয়ার্মের সামনে।" তিনি একটু দাঁড়াতে বললেন। কাছাকাছিই আছেন। পাঁচ মিনিটেই এসে যাবেন। খোকা ভাই এসেই একটা খামে দুই হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার ধরিয়ে দিলেন। বললেন: "কিছু তো জানানও না। এটা রাখেন। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গোণা পয়সা নিয়ে যাওয়া যায় না। যদি আরো লাগে, হেসিটেড না করে ভাই হিসেবে জানাবেন অবশ্যই।"

সিঙ্গাপুরে যে সার্ভিস এপার্টমেন্টে উঠেছিলাম তার মালিক বাংলাদেশী। তার গণযোগাযোগ খুব ভালো। আমাদের দেশের অনেকেই সেখানে গিয়ে ওঠেন। উনি আমাকে বললেন যে, তরিকুল ভাই ফোন করে আমার খোঁজ-খবর নিয়েছেন। দু'দিন পরেই ভদ্রলোক আমার হাতে দু'হাজার ডলার তুলে দিয়ে জানালেন, তরিকুল ভাই এটা পাঠিয়েছেন। বলেছেন, আমার যেন কোনো অর্থকষ্ট না হয়। যদি সমস্যা হয় আমার বিল আপনি দিয়েন না। ওটা তরিকুল ভাই নিজেই দিয়ে দেবেন।
আমার এতো টাকা লাগেই নি। সব সেরে দেশে ফেরার পরও প্রায় তিন হাজার ডলার বেচে গিয়েছিল। আমি একদিন তরিকুল ভাইকে বললাম, "আপনি কেন টাকা পাঠাতে গেলেন?" উনি রেগে বললেন, তাতে তোমার কি? অ্যাহ্! তারজন্য কি তোমার কাছে আমার কৈফিয়ত দিতে হবে? তোমার অবস্থা আমি কিছু জানিনা মনে করো?"

রাজনীতিবিদের আড়ালে ব্যক্তিমানুষটি কিন্তু হারিয়ে যায়। আমরা রাজনীতির ইতিহাস লিখি। ব্যক্তিমানুষটির ভেতরকার মানবিকতা ও ভালোবাসার দ্যুতিগুলো সে ইতিহাসে ঠাঁই পায় না।আমি আজ তরিকুল ভাই ও খোকা ভাইয়ের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তেমন কিছু লিখলাম না। কেবল আমার জীবনের ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতির কথাই লিখলাম। আমি ছাড়া আর তেমন কারো জানা নেই এসব গল্প। ভালোবাসা ও অশ্রুতে মাখা এসব স্মৃতি কি কখনো ভোলা যায়?

লেখক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল।

(মত-ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

অর্থনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রাধান্য পাবে মানুষ

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব

অর্থনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রাধান্য পাবে মানুষ

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা

করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমে আসায় মহামারি-উত্তর বাস্তবতা চোখের সামনে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে সমঝোতা ও ব্যবস্থাপনার একটি ক্রমঅগ্রসরমান রূপ ফুটে উঠেছে, যা কি না বিকাশমান বিশ্ব ব্যবস্থার ভিত্তি।

অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, মন্দার পর আসে চাঙ্গাভাব। ভারতের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, অর্থনৈতিক উৎপাদন ও কার্যক্রম চাঙ্গা হচ্ছে ক্রমশ। নজিরবিহীন মাত্রা ও জটিলতার এক টিকাদান কর্মসূচি স্বাস্থ্য নিরাপত্তার উন্নয়ন ঘটিয়েছে। রেকর্ড কম সময়ে তা বিপন্নতার মাত্রা কমিয়েছে। বলা যায়, স্বাভাবিকতায় ফিরে এসে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মঞ্চটা এখন তৈরি।

এ কারণে এটি ভারতের জন্য এক সুযোগের মুহূর্ত। এই ক্রান্তিলগ্নে ভারত যেসব সিদ্ধান্ত নেবে তা থেকেই ইঙ্গিত মিলবে, অধিকতর সুন্দর এক ভবিষ্যৎ কোথায় নিহিত বলে মনে করছে দেশটি।

করোনাভাইরাস মহামারি দেখিয়েছে, বর্তমানের চেয়ে কম তো নয়ই, বরং আমাদের দরকার আরো আন্ত সংযুক্ত একটি বিশ্ব। অভিন্ন সমস্যাগুলোর অবশ্যই অভিন্ন সমাধান থাকা দরকার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত কয়েক মাস ধরে জি-৭, জি-২০, কপ-২৬, প্রথম কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি, ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন কাউন্সিলে মহামারি-পরবর্তী বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থার রূপকল্প তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চের মাধ্যমে একগুচ্ছ কৌশল এবং লক্ষ্য তুলে ধরেছেন, যা ভারতের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোকে সবার জন্য ভালো এক আগামীর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করবে। ভারত জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় ধরনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা প্রদানে ভূমিকা রেখেছে। উন্নয়নমূলক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য আমরা দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছি।

সাম্প্রতিকতম ঘটনায় গ্লাসগোতে কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘পঞ্চামৃতের’ মাধ্যমে ভারতের জলবায়ু ভাবনার রূপরেখা দিয়েছেন। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের অজীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা ৫০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করা এবং নবায়নযোগ্য উৎস থেকে শক্তির চাহিদার ৫০ শতাংশ পূরণ করার পথ ত্বরান্বিত করবে। পাশাপাশি ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ এক বিলিয়ন টন হ্রাস ও কার্বনের তীব্রতা ৪৫ শতাংশের নিচে আনা হবে। আর কার্বন নিঃসরণ ২০৭০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’তে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্বেগের কথা তুলে ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়ন এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়েও তাদের তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ভারতের সূচনা করা দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স এবং কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং অভিযোজন প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই সংস্থাগুলোর অধীন বৈশ্বিক পর্যায়ে আন্ত সংযুক্ত সৌরশক্তি অবকাঠামোর জন্য ‘এক সূর্য, এক বিশ্ব, এক গ্রিড’ এবং উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ প্রতিরোধী অবকাঠামোর জন্য ‘ঘাতসহ দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য অবকাঠামো’ কর্মসূচি চালু করেছেন।

ভারত জাতীয় হাইড্রোজেন মিশনের অধীনে গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন ও রপ্তানির এক বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ারও চেষ্টা করছে। জলবায়ু পরিবর্তন সংকট মোকাবেলার লক্ষ্যে টেকসই জীবনাচরণের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি যে বক্তব্য দিয়েছেন, রোমে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে তা প্রশংসিত হয়। তিনি ‘লাইফ’ (Life) নামে এক শব্দের এক বিশ্ব আন্দোলনেরও প্রস্তাব করেছেন। এর মূল বিষয় হচ্ছে, পরিবেশ অনুকূল জীবনধারা। টেকসই জীবনধারার ব্যাপারে ভারতের নিজস্ব উদাহরণ বৈশ্বিকভাবে গ্রহণ করা গেলে তা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার লড়াইকে আমূল বদলে দেবে।

করোনা মহামারি সরবরাহ চেইনকে ঝুঁকিমুক্ত ও আরো স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের সরবরাহ চেইন উন্নত করার জন্য তিনটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন : বিশ্বস্ত উৎস, স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত সময়সীমা।

‘আত্মনির্ভর ভারত অভিযান’ কর্মসূূচি স্থিতিস্থাপকতা এবং নির্ভরযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে। এটি ভারতকে একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহ চেইন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

এটি আর্থিক সহায়তা, তারল্য সরবরাহ, শিল্পের জন্য আর্থিক সহায়তা, ব্যবসা করার পদ্ধতি আরো সহজ করা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর নীতি কাঠামোরই একটি অংশ।

একটি উৎপাদনসংক্রান্ত বিশেষ প্রণোদনা স্কিম বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। এটি দেশীয় উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় সক্ষম ভারতীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। মহাকাশ, প্রতিরক্ষা এবং পারমাণবিক শক্তির মতো এত দিনের নিয়ন্ত্রিত খাতগুলোতে বেসরকারি অংশগ্রহণের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় একুশ শতকের উপযোগী কর্মশক্তি গড়ে তোলা ও ভারতকে বৈশ্বিক শিক্ষা ও দক্ষতা তৈরির কেন্দ্রে পরিণত করার কাঠামো তৈরি হচ্ছে।

ভারত তার অবকাঠামোর উন্নতিতেও বিশাল সরকারি বিনিয়োগ করছে। প্রধানমন্ত্রীর ‘গতি শক্তি’ কর্মসূচি (মাল্টিমোডাল সংযোগ বিষয়ক জাতীয় মাস্টারপ্ল্যান) সারা দেশকে সংযুক্ত করবে। এটি সংযোগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি আনার পাশাপাশি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষকে এক ছাতার নিচে আনবে।

ভৌত অবকাঠামোর উন্নতির পাশাপাশি থাকবে ডিজিটাল সংযুক্তি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ইমিউনাইজেশনের মতো উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে এসডিজি লক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি ‘জন ধন’ ও আধারের মতো বিশ্বেও বৃহত্তম বায়োমেট্রিক কর্মসূচি সরাসরি সহায়তার অর্থ সরবরাহকে ব্যাপকভাবে এগিয়ে নিয়েছে। এটি এখন অর্থ-প্রযুক্তিগত বিপ্লবে গতি সঞ্চার করছে। জয় জীবন ও আয়ুষ্মান ভারত সবাইকে বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মাধ্যমে জীবনকে বদলে দিচ্ছে।

এসডিজি-৩-এর আওতায় আমাদের ওপর সব বয়সের সবার স্বাস্থ্যকর জীবন নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সারা বিশ্বের জন্য ‘এক পৃথিবী, এক স্বাস্থ্য’ বিষয়ে সামগ্রিক রূপকল্প তুলে ধরেন।

করোনাভাইরাস মহামারি আন্তর্জাতিক কর্মপ্রক্রিয়াকে ডিজিটাল পরিসরে নিয়ে গেছে। দক্ষ ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম টিকাদান কর্মসূচির পোর্টাল কোউইন থেকে শুরু করে ডিজিটাল ভারত উদ্যোগ, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রমাণ করছে ভারত নিজেকে অনেকটাই ডিজিটাল করে নিয়েছে।

জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ভারত অনেক উন্নয়নমূলক সমস্যার জন্য উপযুক্ত সমাধানগুলো তৈরি করেছে। তিনি বলেন, এ দেশ উন্নয়নের এক প্রমাণস্থল। ভারতের সাউথ-সাউথ উন্নয়ন সহযোগিতার বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশকে তারা অনেক ধারণা দিয়ে সহায়তা দিতে পারবে। এর আগে জি-৭ সম্মেলনে তিনি বলেন, ভারতের তৈরি ওপেন সোর্স ডিজিটাল সলিউশনগুলো সবাইকে উপকৃত করবে।

করোনা মহামারির অন্ধকারতম দিনগুলোতেও ভারত ভুলে যায়নি যে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ। সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ভারত দেড় শতাধিক দেশে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। এর বিনিময়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে সবার সমর্থনও পেয়েছে ভারত।

নিজ দেশে সফল টিকাকরণ অভিযান চলমান অবস্থায় ভারত তার প্রতিবেশী এবং অংশীদারদের কাছে আবার টিকা রপ্তানি শুরু করেছে। এগুলোসহ আরো অনেক উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরিতে অন্যতম এবং গঠনমূলক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সে হবে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা, যা নিছক অর্থনীতির সীমা ছাড়িয়ে মানুষ ও তার মঙ্গলকেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হিসেবে দেখবে।

লেখক: ভারতের পররাষ্ট্রসচিব

আরও পড়ুন


এত খাবার তাহলে কে খায়?

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

নিয়ম অনুযায়ী ১৮+ বয়সীরা একাউন্ট খুলতে পারবে

এমি জান্নাত

নিয়ম অনুযায়ী ১৮+ বয়সীরা একাউন্ট খুলতে পারবে

এমি জান্নাত

বতর্মান বিশ্বে যোগাযোগের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম সোশ্যাল মিডিয়া। এর মাধ্যমে যেকোনো খবর খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বে। আর সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফেসবুক। যেখানে সব শ্রেণীর মানুষের বিচরণ সবচেয়ে বেশি। কারণ এটি সহজবোধ্যও বটে।

কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা থেকে পরিলক্ষিত হয়, ফেসবুকের অপব্যবহার দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। বিভিন্ন উদ্ভট নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া আইডির মাধ্যমে বিভিন্ন মিথ্যা খবর প্রচার করা হয়। বিভিন্ন ছবি, ভিডিও পোস্টের মাধ্যমে খবর অপপ্রচার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয় জনমনে। তাছাড়া কমেন্টের মাধ্যমে হয়রানি তো রয়েছেই। যেগুলো যৌন হয়রানিমূলক কমেন্ট বা পোস্ট, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, এমনকি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অপপ্রচারের কারণে সংঘর্ষও তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এগুলো কে বা কারা করছে? সহজ উত্তর হচ্ছে, যারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই ধরণের অপকর্ম চালাচ্ছে তারা অধিকাংশই ফেইক অর্থাৎ ভুয়া নামে একাউন্ট ব্যবহার করে। এতে পরিচিত গন্ডির মধ্যে হলেও তাদের চেনা বা "আইডেন্টিফাই" করা যায় না। ফেসবুকের নিয়ম অনুযায়ী ১৮+ বয়সীরা একাউন্ট খুলতে পারবে। কিন্তু স্কুলের ছেলেমেয়েরাও বয়স বাড়িয়ে দিয়ে একাউন্ট খুলতে পারছে কারণ এখনো ভোটার আইডি বা জন্ম নিবন্ধন কার্ড নাম্বার দিয়ে একাউন্ট খোলার অনুমোদন চালু হয়নি। এক্ষেত্রে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন। 

আর একটা বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো ফেসবুকের এসব অপপ্রচার বন্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা কার কাছে যাবো? কতৃপক্ষের কাছে যেতে হলে আমরা সরাসরি নিশ্চয়ই ফেসবুক অথোরিটির সাথে এক ধাপে যোগাযোগ করতে পারবো না। অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশেই তাদের অফিস রয়েছে যেখানে এই সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা সমাধানে চাইলেই সরাসরি সেসব দেশের মানুষ যোগাযোগ করতে পারে।

আমাদের দেশের মানুষের জন্য সেই সুযোগটা নেই। শুধু হয়রানি বা অপপ্রচার নয়, ফেসবুক সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় জানতে আমরা কতৃপক্ষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারিনা। তাই বাংলাদেশেও সেই ব্যবস্থা থাকাটা দরকার যেন চাইলে সহজেই অথোরিটির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়। কারণ সব বিষয়ের জন্য সব সময় আইনের হস্তক্ষেপ দরকার পরে না, বরং প্রয়োজন হয় ফেসবুক অথোরিটির সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ। বাংলাদেশ থেকে সেই পর্যন্ত যেতে প্রসিডিওর এত দীর্ঘ হয় যে কেউ আর এগোতে চায় না। 

তাই ফেসবুকের মাধ্যমে যেকোনো অপকর্ম রোধে সরকারের নজরদারি যেমন অধিক প্রত্যাশিত  তেমনি সহজবোধ্য বলেই অপব্যবহারের জন্য যেন সহজলভ্য না হয় সেদিকটা সুনিশ্চিত করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বিভিন্ন  শিক্ষমূলক পেইজ থেকে জ্ঞানার্জন, অনলাইন ব্যবসায় আয়ের মাধ্যম হিসেবে বিভিন্নভাবে ফেসবুক আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত এবং সহজ করে দিয়েছে। তাই এই মাধ্যমটি "প্রটেক্টিভ" অর্থাৎ সংরক্ষণশীল হওয়াটা ভীষনভাবে জরুরি।

আরও পড়ুন:

খোলামেলা দৃশ্যে জোর করে অভিনয় করানো হয়েছিল উরফিকে


news24bd.tv/ নকিব

পরবর্তী খবর

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়া ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

নাজনীন আহমেদ

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়া ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

নাজনীন আহমেদ

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি এখন চূড়ান্ত। এই অর্জন আমাদের জন্য যেমন আনন্দের, সম্মানের ও সম্ভাবনার, একই সাথে নানা রকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হতে হবে।

এ সম্পর্কে যাদের ধারণা অস্পষ্ট তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যারা অর্থনৈতিক সূচকের নানান দিকে পিছিয়ে এবং যাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দুর্বল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, সেরূপ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত করে। জাতীয় আয় ও মানবসম্পদের উন্নয়ন কিছু নির্দিষ্ট মাত্রার উপরে নিতে পারলে এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা কমাতে পারলে কিছু কঠিন শর্ত পূরণ করে একটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা ভুক্ত উন্নয়নশীল দেশ সেই তালিকা থেকে বের হয়ে যেতে পারে। একেই বলে LDC graduation.

২০২৬ সালে যখন আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাব তখন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যবসা বাণিজ্য, মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ, অর্থ ঋণের উপর সুদের হার, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সহযোগিতায় অগ্রাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার একটি smooth transition strategy (STS) করার প্রক্রিয়ায় আছে।

সরকার দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সাথে মিলে কাজ করছে। আমার বর্তমান কর্মপ্রতিষ্ঠান UNDP‌ বাংলাদেশের জন্য একটি STS তৈরি করতে Economic Relations Division (ERD) এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশের এই যুগান্তকারী অর্জনকে অর্থবহ ও সাধারণ মানুষের জন্য fruitful করার প্রক্রিয়ায় অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। আমরা সবাই মিলে সে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করবো। এ ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের অনেক দায়িত্ব আছে। আমাদের আচার-আচরণে মানব সেবায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। আমি আশাবাদী মানুষ তাই LDC Graduation কে সুযোগ হিসেবে মনে করি বেশি।

আরও পড়ুন


টেকনাফে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২ রোহিঙ্গা ডাকাত নিহত

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

তখন আমরা ’স্টুডেন্ট’ বললেই কন্ডাক্টর হাফ ভাড়া নিতো

শওগাত আলী সাগর

তখন আমরা ’স্টুডেন্ট’ বললেই কন্ডাক্টর হাফ ভাড়া নিতো

শওগাত আলী সাগর

আমরা যে শিক্ষায় বিনিয়োগের কথা বলি, শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দের বড় অংশ যায় বলে দাবি করি, সেটা আসলে কোথায় যায়! একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন নিষ্কন্টক করতে তাকে আমরা কী ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা, সুযোগ সুবিধা দেই! ঢাকার রাস্তায় ‘হাফ পাসের’ দাবিতে শিক্ষার্থীদের গত কয়েকদিনের আন্দোলনের খবর পড়তে পড়তে কথাগুলো মনে হলো। 

শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে বাস বাড়া অর্ধেক দেয়ার সুযোগের দাবিতে। আমাদের ছাত্রবেলায় এমন একটা ব্যবস্থা ছিলো বলে স্পষ্ট মনে পরে।ইন্টারমেডিয়েটে  শিবপুর থেকে বাসে চড়ে কিছু দিন আমি জেলা সদরের নরসিংদী সরকারি কলেজে এসে ক্লাশ করেছি। তখন আমরা ’স্টুডেন্ট’ বললেই কন্ডাক্টর হাফ ভাড়া নিতো। কখনো কখনো পরিচয়পত্র দেখতে চাইতো।

সত্যি বলতে কী- ছাত্র অবস্থায় হাফ ভাড়ায় বাসে চড়ার কথাটা ভুলেই গিয়েছিলাম। ছাত্রদের আন্দোলন দেখে সেটি নতুন করে মনে পড়লো। পত্রিকায় দেখলাম- হাসান ভাইও ( তথ্যমন্ত্রী) হাফ ভাড়ায় বাসে চড়ার কথা মনে রেখেছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- ‘বড় পদে’ থাকা অনেকেই জীবনে যে বাসে চড়েছেন- সে কথাই সম্ভবত ভুলে বসেছেন। নইলে ছাত্রদের বাস ভাড়া নিয়ে কয়েক দিন রাস্তায় পরে থাকতে হবে কেন! এটি অবশ্য রাষ্ট্রের তথা সরকারের ’রেসপনসিভনেস’ এরও ব্যাপার। জনগনের সমস্যায়, জনগনের ডাকে রাষ্ট্র কতোটা সাড়া দেয়, কতো দ্রুত সাড়া দেয়- তারও প্রমান।
 
কানাডায় দেখি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ছাত্র এবং বয়স্কদের (সিনিয়র সিটিজেন) আলাদা ভাড়ার ব্যবস্থা আছে। এগুলো নিয়ে কথা বলতে হয় না, সিস্টেমই সব ঠিক করে রেখেছে। কানাডায় অবশ্য পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এখনো ব্যক্তিমালিকানায় ছাড়া হয়নি।  ব্যক্তিমালিকানায় থাকলেও সরকার একটি নীতিমালা করে দিতে পারবে না- তা তো নয়। বিষয়টা হচ্ছে- আমরা কী চাই- সেটা আমাদের কাছে পরিষ্কার কী না।

আরও পড়ুন

হোটেলে ফ্রিজে পাশাপাশি কাঁচা মাংস ও পচা তরকারি!

গুরুত্বপূর্ণ ৭০ স্পটে ৪১১ সিসি ক্যামেরা

বিচারের দাবিতে নটর ডেম শিক্ষার্থীদের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম 

শিক্ষা নিয়ে, শিক্ষার্থীদের নিয়ে সত্যিই আমাদের আগ্রহ কিংবা আন্তরিকতা আছে কী না- তার প্রমান পাওয়া যায় শিক্ষা এবং শিক্ষার্থী বিষয়ক কোনো ইস্যূতে সরকার কতো দ্রুত সাড়া দেয়, কী পদক্ষেপ নেয়- তার উপর। শিক্ষাখাত সরকারের অগ্রাধিকার হারালে শিক্ষার্থীরা গুরুত্ব পাবেন কীভাবে!

লেখাটি শওগাত আলী সাগর ​-এর ফেসবুক থেকে নেওয়া (মত ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

 news24bd.tv/এমি-জান্নাত   

পরবর্তী খবর

পঞ্চাশ বছর কিংবা একশ বছর পর হলেও এটা হবে

রউফুল আলম

পঞ্চাশ বছর কিংবা একশ বছর পর হলেও এটা হবে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপান থেকে অনেক বেশি স্টুডেন্ট আমেরিকায় যেতে শুরু করে। আমেরিকার গবেষণা সম্পর্কে জানতে শুরু করে। যে আমেরিকা তাদের দু’টি শহর উড়িয়ে দিয়েছে, সে দেশ কেন সেরা—সেটা জানার জন‍্য জাপানিজ তরুণরা অধীর উৎসাহি হয়ে পড়ে। অসংখ‍্য জাপানিজ তরুণ আমেরিকার থেকে পিএইচডি-পোস্টডক করে জাপানে ফিরে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান গবেষণায় প্রচুর টাকা ঢালে। আজকের যে জাপান—সেটা হলো জ্ঞান-গবেষণার ফল। শুধু সত্তরের দশকের পর ২৫ টি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনের নানজিং (নানকিন) শহরে ভয়াবহ গণহত‍্যা ও ধর্ষন চালায় জাপানিজ সৈন‍্যরা। চীনের স্কুলের বইতে জাপানের এই গণহত‍্যার কথা পড়ানো হয়। কিন্তু তাই বলে, চীনের সরকার কিংবা চীনের কোন ইউনিভার্সিটি জাপানের সাথে জ্ঞান-গবেষণার সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। চীনের অসংখ‍্য স্টুডেন্ট জাপানের ইউনিভার্সিটিগুলোতে গবেষণা করছে।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়ের এক ভিসি ক্ষমতা পাওয়ার পরপর ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়ের সকল সম্পর্ক ছিন্ন। যেহেতু তিনি কাজ করার মতো আর কিছুই পেলেন না, সেহেতু শিক্ষা কার্যক্রম ছিন্ন করার ঘোষণা দিলেন। একজন ভিসি এধরণের নিম্নমানের কাজ করতে পারে—ভাবলেই আমার লজ্জা ও ঘৃণা হয়। পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সকল সম্পর্ক ছিন্ন থাকতে পারে। কিন্তু শিক্ষার আদান-প্রদান, জ্ঞান-গবেষণার সেতু বন্ধ থাকবে কেন? কোন যুক্তিতে?
 
ইসরাইলের সাথে বাংলাদেশে সকল সম্পর্ক ছিন্ন থাকলেও, জ্ঞান-গবেষণার দরজা খুলে দেয়া উচিত। আমাদের তরুণরা যেনো সেদেশের ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে গবেষণা করতে পারে, সে সুযোগ তৈরি করে দেয়া উচিত। ইসরাইলের শিক্ষক-গবেষকরা যেনো বাংলাদেশে এসে শেখাতে পারে, সে দরজা তৈরি করা উচিত। (আমি জানি, পঞ্চাশ বছর কিংবা একশ বছর পর হলেও এটা হবে।)
 
বন্দুকের নল যখন মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি করেছে, সেখানে শিক্ষা-শিল্প-সঙ্গীত মানুষে মানুষে দূরত্ব কমিয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা যদি সত‍্যিকারে জাগতে চাই, তাহলে দুনিয়ার সব দেশ, সব জাত থেকেই শিখতে হবে। জ্ঞান-গবেষণা ধার করতে হবে। আজ আমরা যাদেরকে উন্নত জাতি বলি, তারা ঠিক এই কাজটিই করছে।

লেখাটি রউফুল আলম ​-এর ফেসবুক থেকে নেওয়া (মত ভিন্নমত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

 news24bd.tv/এমি-জান্নাত    

পরবর্তী খবর