খুব মৃত লাগে সবকিছু কেন যেন
খুব মৃত লাগে সবকিছু কেন যেন

খুব মৃত লাগে সবকিছু কেন যেন

Other

লেখালেখি একদমই করতে ইচ্ছা করে না ইদানীং। খুব মৃত লাগে সবকিছু কেন যেন। Very mechanized, robotic, lifeless.  এখানে কিছুদিন থাকলে বোঝা যায় জীবনে অনিয়ম থাকাও জরুরী। অনিয়মগুলো হচ্ছে নিস্তরঙ্গ জলে হঠাৎ ঢিল ছোঁড়ার মত।

তাতে একঘেয়েমিটা কাটে।    

দুই মাস সাত দিন হলো এবারের মত নিউ ইয়র্কে। এই দুই মাসের বেশি সময় ধরে একেবারে ঘড়ির কাটায় জীবন। ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠা, সাতটার মধ্যে বাস স্টপ এ পৌঁছানো। একটা বাস দু'টো ট্রেন ঠেলে অফিসে যাওয়া। আটটা-চারটা অফিস। তারপর আবার বাস ট্রেন ঠেলে বাড়ি ফেরা।  

ছুটির দিনে গ্রোসারী লন্ড্রি রান্না বা হুট হাট ডিসিশনে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। Life is so certain here. So routine. So systematic. তাই ওই অনিয়মটুকুর অভাবেই বোধহয় সব থাকার পরেও মনে হয় কি যেন নাই।   

আমি মাঝে মাঝে বৈচিত্র্য আনবার জন্যে অফিসে যাওয়ার রুট বদল করি। ট্রেনে গেলে সুবিধা জেনেও বাসে উঠে পড়ি। মনে হয়, দেখিনা গিয়ে কি হয়! নতুন নতুন পথে গন্তব্য আবিস্কারের মধ্যেও একটা এডভেঞ্চার আছে। আমি আমার নিস্তরঙ্গ জীবনে ঢিল ছোড়ার চেষ্টা করি এভাবে।  

যেমন কাল একটা নতুন পথে অফিস গেছি। শনিবার ছিলো তাই রাস্তা ঘাঁট ভীষণ ফাঁকা। একটা বাস থেকে নেমে দেখি ছুটির দিন বলে পরের বাস আধঘণ্টা ডিলে। আমি কালক্ষেপণ না করে গুগল ম্যাপে অফিসের ঠিকানা দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। বাসে করে যাবার পথেই আবিস্কার করেছিলাম সে এলাকাটায় অনেকগুলো সেমেট্রি। একটা এলাকায় এত সেমেট্রি কেন কে জানে?   

হাঁটতে হাঁটতে একটা সেমেট্রির পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মৃতদের নাম আর জন্ম মৃত্যুর তারিখগুলো পড়লাম। আর অবাক হয়ে খেয়াল করলাম শত শত মৃতের এত কাছে দাঁড়িয়েও আমার কোন ভয় লাগছে না। বরং মনে হচ্ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তির যায়গা আসলে এটাই। যেখান থেকে কোথাও যাবার কোন তাড়া নেই, পাশ নেই, ফেল নেই , সাকসেস নেই, ফেইলার নেই। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সম্বিৎ ফেরে, মনে পড়ে অফিসের দেরি হচ্ছে। আবার পা চালাই জোরে।  

অফিসে অবশ্য অনেকগুলো জীবনের অনেকগুলো গল্প। সবগুলোর একটু একটু জানা হয় রোজ। আমার আল্বেনিয়ান কলিগ সিভিল ওয়ারের সময় দুই মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল। সেই অবস্থায় ইউ এস আর্মির প্লেনে করে কিভাবে দেশ থেকে পালিয়েছিলো সে গল্প করেছিলো একদিন। ওর গল্প শুনে আমার গুজবাম্পস হচ্ছিলো। ওর গল্পটা নিয়ে একটা গল্প লিখব কোনদিন।  

আমার বিদেশী কলিগদের কেউ কেউ শুরুতে আমাকে ভালোভাবে accept করতে না পারলেও এখন সবার সাথে ভাব হচ্ছে। একটা মেয়ে বিনা কারনেই আমাকে বেশি অপছন্দ করতো বলে মনে হতো। কাল সেও হঠাৎ খুব ভালোবাসা নিয়ে হেসেছে। And that smile made my day. মানুষের মনে নিজের জন্যে ভালোবাসা জাগানোর থেকে অভূতপূর্ব সাফল্য আর কিই বা হতে পারে? 

অফিস থেকে বের হয়ে ষ্টেশন এ পৌঁছে আমি তখনো প্লাটফর্ম পর্যন্ত যেতে পারিনি এর মধ্যেই ট্রেন চলে এলো। আমি দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে চীৎকার করতে থাকলাম hold the door please. এরকম মুহূর্তগুলোতে নিজেকে দিলওয়ালে দুলহানিয়ার কাজল মনে হয়। মনে হয় ট্রেন এর ভেতর থেকে কোন স্প্যানিশ শাহরুখ খান হাত বাড়িয়ে দেবে। হাত না বাঁড়ালেও কেউ না কেউ দরজা সত্যিই ধরে কিন্তু মাস্ক এর কারণে সে শাহরুখ খান নাকি অনন্ত জলিল সেটা বুঝি না।  

আরও পড়ুন:


আমি মাথা উঁচু করেই কথা বলব: ডা. মুরাদ


তবে সত্যি কথা কয়েক সেকেন্ড এর মধ্যে ট্রেন ছেঁড়ে দিবে এমন মুহূর্তে মানুষ যে ডেডিকেশন নিয়ে দৌড়ায় সেই ডেডিকেশন মানুষ তার প্রেমিক প্রেমিকার প্রতিও দেখায় না। আমি আর একটা জিনিস বুঝতাম না, পাঁচ মিনিট পর পর ট্রেন আসে তার পরেও মানুষ ট্রেন ধরার জন্য এরকম জান হাতে নিয়ে দৌড়ায় কেন? পরে মনে হলো হয়ত সবাই আমার মতই। নিস্তরঙ্গ জীবনে তরঙ্গ আনার জন্যেই দৌড়ায়...!!

লেখাটি রাখি নাহিদের ফেসবুক থেকে নেওয়া (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv রিমু 

;