ইসলামে শীতকালের বিশেষ ইবাদত
ইসলামে শীতকালের বিশেষ ইবাদত

ইসলামে শীতকালের বিশেষ ইবাদত

Other

শীতকালে পৃথিবীতে আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয়। শীতকালে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার কৃপায় জমিনে জন্মে প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি। স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায় টাটকা শাক-সবজি। শীতকালীন শাক-সবজির মধ্যে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, ব্রকোলি, গাজর, শালগম, টমেটো, শিম, চিনা বাঁধাকপি, লাল বাঁধাকপি, ফ্রেঞ্চবিনসহ আরো নানা সবজি! এর সঙ্গে রয়েছে লালশাক, পালংশাক, ঢেঁকিশাক, মুলাশাক ইত্যাদি।

আর এ সব কিছুই আল্লাহ তাআলার অশেষ দান।

 এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমি তো অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। অতঃপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি। আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর, বহু বৃক্ষবিশিষ্ট বাগান, ফলফলাদি ও ঘাস। এসব তোমাদের ও তোমাদের পালিত পশুকুলের জীবনধারণের জন্য। ’ (সুরা : আবাসা : আয়াত ২৪-৩২)

শীতকালে মুসলমানদের প্রধান করণীয় হলো, মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।

ঈমানদারের জন্য শীতকাল বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। হাদিস শরিফে এসেছে, শীতকাল মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল। আমের ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, শীতল গনিমত হচ্ছে শীতকালে রোজা রাখা। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৯৫)

শীতকালে দিন থাকে খুবই ছোট। তাই শীতকালে রোজা রাখলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয় না। সুতরাং শীতকালের দ্বিতীয় করণীয় হলো, কারো যদি কাজা রোজা বাকি থাকে, তাহলে শীতকালে সেগুলো আদায় করে নেওয়া। তা ছাড়া বেশি বেশি নফল রোজা রাখারও এটি সুবর্ণ সময়। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, বিশুদ্ধ নিয়তে যে ব্যক্তি এক দিন রোজা রাখল, মহান আল্লাহ প্রতিদানস্বরূপ জাহান্নাম ও ওই ব্যক্তির মাঝখানে ৭০ বছরের দূরত্ব তৈরি করে দেবেন। (বুখারি, হাদিস : ২৮৪০)

শীতকালের তৃতীয় করণীয় হলো শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে বছর ঘুরে আসে শীত-শৈত্যপ্রবাহ। পৌষ-মাঘ দুই মাস শীতকাল। হাড়-কাঁপানো শীতে নাকাল দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ। শীতার্তসহ বিপন্ন সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দরিদ্র, এতিম ও বন্দিদের খাদ্য দান করে। ’ (সুরা : দাহর, আয়াত : ৮)

চারপাশে দেখা যায়, লাখো মানুষ একটু উষ্ণতার জন্য জবুথবু হয়ে খড়কুটা জ্বালিয়ে একটু তাপ পেতে চায়। মানবিক ও ইসলামিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে ওই সব মানুষের পাশে সাধ্যমতো দাঁড়ানো উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে মুমিন অন্য বিবস্ত্র মুমিনকে কাপড় পরিয়ে দিল, মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে জান্নাতের সবুজ কাপড় পরিয়ে দেবেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৪৯)

শীতকালের চতুর্থ করণীয় হলো তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা। শীতকালে রাত অনেক লম্বা হয়। কেউ চাইলে পূর্ণরূপে ঘুমিয়ে আবার শেষরাতে তাহাজ্জুদ পড়তে পারে। মহান আল্লাহ ঈমানদারদের গুণাবলি সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের রবকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। ’ (সুরা : সাজদা, আয়াত : ১৬)

শীতকালের পঞ্চম করণীয় হলো অজু ও গোসলের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। শীতকালে মানুষের শরীর শুষ্ক থাকে। তাই যথাযথভাবে ধৌত না করলে অজু-গোসল ঠিকমতো আদায় হয় না। আর অজু-গোসল ঠিকমতো আদায় না হলে নামাজ শুদ্ধ হবে না। তাই এ বিষয়ে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। এমনকি শীতের মৌসুমে গরম পানি দিয়ে অজু করলেও সওয়াবে কমতি হবে না। অজুর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমি কি তোমাদের এমন কিছু শিখিয়ে দেব না, যার কারণে আল্লাহ পাপ মোচন করবেন এবং জান্নাতে তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন? সাহাবারা বলেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! মহানবী (সা.) বলেন, ওই কাজগুলো হলো মন না চাইলেও ভালোভাবে অজু করা, অধিক পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষা করা। (মুসলিম, হাদিস : ২৫১)

শীতকালের ষষ্ঠ ইবাদত হলো মোজার ওপর মাসেহ করা। এ ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, অজু করে মোজা পরিধান করবে। মুকিম ব্যক্তির জন্য পরবর্তী এক দিন পর্যন্ত যতবার অজুর প্রয়োজন, তাতে পা ধোয়ার প্রয়োজন হবে না। বরং তিন আঙুল পরিমাণ মোজার ওপর মাসেহ করে নিলেই চলবে। মুসাফিরের জন্য এই সুযোগ তিন দিন পর্যন্ত। অসংখ্য হাদিস শরিফে রাসুল (সা.)-এর অনুরূপ আমলের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। (রদ্দুল মুহতার : ১/২৬০)

আরও পড়ুন:


দুনিয়াতে সফলতা অর্জনের গোপন রহস্য

তবে এখানে একটি ভুল ধারণার নিরসন প্রয়োজন। অনেকেই মনে করে, সব মোজার ওপরই মাসেহ করা যায়, যেমন—সুতা, নায়লনের মোজা ইত্যাদির ওপর মাসেহ বৈধ নয়। বরং মোজার ওপর মাসেহ করার জন্য মোজাটি এমন চামড়ার মোজা হতে হবে, যা টাখনু পর্যন্ত ঢেকে ফেলে অথবা চামড়ার মোজার গুণে গুণান্বিত—এমন মোজা হতে হবে। গুণগুলো ফিকাহবিদরা ফিকাহগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ করেছেন, যা রাসুল (সা)-এর হাদিস ও সাহাবায়ে কিরামের আমল থেকেই সংগৃহীত। ওই গুণগুলো হলো—এক. মোজা এমন মোটা হতে হবে, যেন ওপরে পানি পড়লে ভেতরে না পৌঁছে। দুই. সংকীর্ণতা বা রাবার অথবা সুতা ইত্যাদি দিয়ে বাঁধা ছাড়াও স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পায়ের সঙ্গে লেগে থাকে। তিন. শুধু ওই মোজা পরিধান করেই দু-তিন মাইল চলা যায়। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ১/১৮৮, ফাতহুল কাদির :  ১/১০৯)

মনে রাখতে হবে যে মোজার ওপর মাসেহ করা জরুরি নয়। বরং এটি বৈধ ও অবকাশমূলক বিষয়। তবে সুন্নত হিসেবে এর ওপর আমল করা উত্তম।

news24bd.tv রিমু