এভাবেই তো পার হয়ে গেল প্রায় এক দশক
এভাবেই তো পার হয়ে গেল প্রায় এক দশক

মোফাজ্জল করিম,  সাবেক সচিব, কবি

এভাবেই তো পার হয়ে গেল প্রায় এক দশক

মোফাজ্জল করিম

একেই বোধ হয় বলে ‘পড়বি পড় মালির ঘাড়ে’। আজ শনিবার দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘সেলাই করা খোলা মুখ’ নিয়ে আপনাদের সামনে আমার হাজির হওয়ার কথা। সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দের কিছু কথামালা আমরা লেখক-পাঠক উভয়ে শেয়ার করব, অনেকটা ‘এক অন্ধ আরেক অন্ধকে পথের খবর’ জিগ্যেস করার মতো। (উপমাটি শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কোনো একটি উপন্যাস থেকে ধার করা।

বেশ কয়েক যুগ আগে ছাত্রজীবনে সেই উপন্যাসটি পড়েছিলাম, এখন দুঃখিত তার নাম মনে নেই। ) যা হোক, আসল কথা হলো, এই কলামে আমি চেষ্টা করি আমার ও আপনাদের মনোজগতে যেসব বিষয় প্রায়শই আকুলি-বিকুলি করে সেগুলোতে তেল-মসলা মাখিয়ে চেখে দেখতে। আমাদের উভয় পক্ষ এবং পত্রিকা কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে, যথাসম্ভব কারো পা না মাড়িয়ে, কারো ভুরু কোঁচকানোর সুযোগ না দিয়ে, এ আমাদের এক ধরনের পাক্ষিক বিশ্রম্ভালাপ বলা যেতে পারে। এতে ‘মনোভার নামাতে পারার’ এক ধরনের পরিতৃপ্তি তো আছে বটেই আমার। আর আপনারাও মনে হয় আমার আচরণে খুব একটা কুপিত বোধ করেন না। যা হোক, এভাবেই তো পার হয়ে গেল প্রায় এক দশক। (নাকি আরো বেশি)। আপনাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সেলাই করা মুখের সতর্ক ও শাস্ত্রসম্মত ব্যাদান স্বাস্থ্যকর মনে করেই ওটা যথাসাধ্য অব্যাহত রেখেছি। কিন্তু বিপদে পড়ে যাই যখন কোনো গুরুগম্ভীর বিষয় আচমকাই হুড়মুড় করে ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে। যেমন হয়েছে আজকে।

আজ খ্রিস্টীয় বছরের প্রথম দিবস : পহেলা জানুয়ারি। গতকাল বিদায়—বলা উচিত চিরবিদায়—নিয়েছে ২০২১ সাল। গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকামতে গতকাল রাত বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বারোটা বেজে গেছে তার, আমাদের জীবন থেকে সে চিরবিদায় নিয়েছে। সে চলে গিয়ে স্থান করে দিয়েছে ২০২২-কে। এই নতুন বছরের ইনিংস শুরু হয়ে গেছে গত রাতে। আর সে দোর্দণ্ড প্রতাপে মাঠশাসন করবে আগামী ১২ মাস। একত্রিশ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত চলবে তার একচ্ছত্র আধিপত্য। এর একদিন বেশিও না, একদিন কমও না। আর আমাদের মধ্যে যাঁরা ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি, পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব নিয়ে সদাব্যস্ত, তাঁরা ইতিমধ্যেই মরহুম ২০২১-এর শব ব্যবচ্ছেদ করতে বসে পড়েছেন : ’২১ সালে লাভের পাল্লা না লোকসানের পাল্লা ভারি ছিল, জাতি কয় পা এগোলো, কয় পা পিছালো, ’২১ সাল ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো জ্বালিয়ে গেল, না অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে গেল দেশকে—এ সবের হিসাব-নিকাশবিদরা রচনা করবেন সালতামামি। আর যেকোনো জাতির জন্য এ কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরো একটি বছরজুড়ে একটি জাতি যত রকমের ক্রিয়াকলাপে নিযুক্ত ছিল, যত ঘটনা-দুর্ঘটনা, সাফল্য-ব্যর্থতা দেখা গেছে এক বছরে তা নিক্তিতে তুলে যথাসম্ভব সঠিকভাবে মাপতে পারলেই জাতি নিজের বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারে এবং পেতে পারে ভবিষ্যত চলার পথের হদিস।

২.
স্বাধীনতার অর্ধশতক পর এই হিসাব-নিকাশ করতে গিয়ে আমি মনে করি, একাত্তরপূর্বকাল নিয়ে বেশি খোঁচাখ্ুঁচি করে আমাদের লাভ নেই। ওই ইতিহাস তো সবারই জানা। আমাদের মাথার ওপর কাঁঠাল রেখে যুগ যুগ ধরে কারা ভেঙে খেয়েছে, ফলে আমাদের যে চির রক্তশূন্যতায় ভুগতে হয়েছে সেই কাসুন্দি পরিবেশন আপাতত স্থগিত রেখে বরং স্বাধীনতা পরবর্তী ৫০ বছরে আমাদের অর্জন-বর্জন, তর্জন-গর্জনের খেরো খাতাটি ভালো করে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখা উচিত। এবং তা হওয়া উচিত সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক ও নির্মোহভাবে। কারণ আমাদের—আর কেবল আমাদেরই বা বলি কেন, এটা সব জাতির সব মানুষের বেলায়ই প্রযোজ্য—একটা সহজাত প্রবণতা হচ্ছে নিজেদের কৃতকর্মের মূল্যায়নের বেলা ছোটবড় সব অর্জনকে পাদপ্রদীপের সামনে নিয়ে আসা, আর ব্যর্থতাগুলোকে কার্পেটের নিচে চাপা দেওয়া। গত এক বছরে বা তারও বেশি সময়ে আমরা কী পাইনি তার হিসাব মেলাতে অবশ্যই বসব, তবে শুধু না পাওয়ার আফসোস নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলব, আর কষ্টার্জিত সাফল্যগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করব না তা তো হয় না। বিশেষ করে আমার মতো ত্রিকালদর্শীজনেরা এমনটি করলে তো আমাদের এগিয়ে চলার ইতিহাসকেই বিকৃত করা হবে। স্বাধীনতাপূর্ব ২৪টি বছর পাকিস্তানি আমলে আমাদের কী ছিল? বস্তুতপক্ষে কিছুই না। আমরা ওই সময়ে কোনো রকমে শুধু নাক ভাসিয়ে নিজেদের অস্তিত্বটুকু বজায় রেখে চলেছি। কৃষি-শিল্প-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-ব্যবসা-বাণিজ্য-যোগাযোগ-কর্মসংস্থান সব খাতেই আমাদের ‘দিন আনি দিন খাই’ অবস্থা ছিল। আর জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে শাসককুলের হাতে বঞ্চিত-নিগৃহীত হওয়াই ছিল আমাদের বিধিলিপি।

তখন যদি আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে, হ্যাঁ ঐক্যবদ্ধভাবে, সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে মাজা সোজা করে মাথা তুলে না দাঁড়াতাম, তাহলে না জানি আরো কতকাল শাসকদের উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করে করে আমাদের জাতিসত্তাই একদিন বিলীন হওয়ার উপক্রম হতো। এই সত্যটুকু সর্বপ্রথম সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং মত ও পথের পার্থক্য সত্ত্বেও সব জাতীয়তাবাদী নেতা যথাসময়ে বাংলা ও বাঙালির অধিকার অর্জনের বিষয়টিতে তাঁকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। ব্যতিক্রম ছিল শুধু শাসককুলের উচ্ছিষ্টপুষ্ট কতিপয় মোসাহেব, যারা নিজেদের আখের গোছানোর জন্য জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে তাদের ‘প্রভুদের’ সেবাদান করাটাকেই মোক্ষজ্ঞান করত। ষাটের দশকের ছয় দফা, এগারো দফা, স্বাধিকার আন্দোলন ছিল বাঙালির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ইতিহাস, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাস, যার অমোঘ পরিণতি ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। অবশ্য অন্যায়ের প্রতিবাদ বাঙালির রক্তে-মজ্জায় মিশে আছে বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল সেই উনিশ শ আটচল্লিশে, যখন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীদের মুখের ভাষা বাংলাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে তাচ্ছিল্যভরে উপেক্ষা করে উর্দুকে—যে উর্দু ছিল পাকিস্তানিদের অতি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা—রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। সেদিনও সারা দেশ ছাত্রদের উত্থিত প্রতিবাদী কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আওয়াজ তুলেছিল : মানি না, মানব না; রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, দিতে হবে দিতে হবে। ঢাকার রাজপথ ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এরপর সংযোজিত হয়েছিল রক্ত আখরে লেখা এক নতুন অধ্যায় : বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। আর এখন তো ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, পরবর্তী কালে সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতির গৌরবময় অর্জন স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়—এ সবই সম্ভব হয়েছিল, কারণ সেদিন বাঙালি ইস্পাতদৃঢ় একতা ধরে রাখতে পেরেছিল। হাতেগোনা কিছু পাকিস্তানপন্থী রাজাকার-আলবদর-আলশামস ছাড়া জাতি-ধর্ম-বিশ্বাস-নির্বিশেষে সব বাঙালি স্বাধীনতার প্রশ্নে একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করেছিল এক দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে। সেদিন অসম্ভব সাধন করে যে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জিত হয়েছিল তার মূলে ছিল বাঙালি জাতির অতুলনীয় ঐক্য। বাঙালি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, আদিবাসী, ধনী-গরিব সব মানুষের এই অভূতপূর্ব মিলন ও লৌহকঠিন ঐক্য চমকে দিয়েছিল বিশ্ববাসীকে।

৩.
কিন্তু এও সত্য, এই মিলন, এই ঐক্যের বন্ধন দ্রুত আলগা হতে লাগল স্বাধীনতা লাভের পরে পরেই। যে চিন্তার গোঁড়ামিকে পরাভূত করে একমাত্র দেশপ্রেমই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উজ্জীবনী শক্তি, যুদ্ধে বিজয় লাভের পর সেই গোঁড়ামি, সেই ধনী-গরিবের বৈষম্য, সেই সবল-দুর্বলের অসম অবস্থান হয়ে দাঁড়াল নানা বিষয়ের নিয়ামক। আর সব কিছুকে ঠেলে দূরে সরিয়ে আসল এজেন্ডা, হয়ে গেল ক্ষমতা। এবং সেই ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে দ্রুত পেছনে পড়ে রইল মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তি সাম্য, মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন। সোজা কথায়, চিরবঞ্চিত, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল। আর এদিকে স্বাধীনতার পর থেকেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে লাগল। বাস্তবতা মানুষকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করল : দেশে সবচেয়ে সস্তা নুন আর খুন। সেই সঙ্গে ক্ষমতাধরদের এক বড় অংশ হাঁটতে শুরু করলেন দুর্নীতির পঙ্কিল পথে। ক্ষমতা ব্যবহার-অপব্যবহার করে বিপথগামী রাজনীতিক ও আমলাদের জুটি দুর্নীতির ময়দানে পিটিয়ে চৌকা-ছককার রেকর্ড গড়তে লাগলেন। বহু আঙ্গুল ফুলে বটগাছ হলো। আর অন্যদিকে সততা-নিষ্ঠার ধানগাছগুলো ন্যায়নীতিকে আঁকড়ে ধরে শুকাতে শুকাতে খড়-বিচালিতে পরিণত হলো। একদিকে কালো-ধলো পন্থায় দেশে কোটিপতিদের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে, আর তাতে আত্মশ্লাঘার ঢক্কানিনাদ বাজিয়ে জগদ্বাসীর কান ঝালাপালা করে তুলছেন তাঁরা। অপরদিকে দ্রুত ক্ষীয়মাণ আর্তজনের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক প্রবৃদ্ধির হারে। করোনাবিবির আগমনের পূর্বে দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা নাকি শতকরা ২২ না ২৩ জনে নেমে এসেছিল, আর গত দেড় বছরে তা আবার হপ-স্টেপ-অ্যান্ড জাম্প দিয়ে চুয়াল্লিশ ছুঁয়েছে। তার মানে কি দেশের সব মানুষ গরিব হয়ে পড়েছে? জ্বি না, যে বিশারদরা দারিদ্র্যসীমার হিসাব দিয়েছেন নিষ্ঠাভরে, তারাই খেটেখুটে অঙ্ক কষে বলছেন একই সময়ে করোনার অভিঘাত সত্ত্বেও কোটিপতিদের সংখ্যা বেড়েছে হু হু করে। একেই বোধ হয় বলে কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। স্বাধীনতার আগে আমাদের সত্যকথন ছিল আমাদের মাথায় পাঞ্জাবিরা-ইংরেজরা-মাড়োয়ারিরা যখন যে সুযোগ পেয়েছে কাঁঠাল ভেঙে খেয়েছে, তা বাপু যদি জানতে চাই এখন এই কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্বটা কে পালন করছে, তাহলে কী বলবেন?

অথচ স্বাধীনতার আগে আমরা সাম্যের কথা, সৌভ্রাতৃত্বের কথা পারস্পরিক ভালোবাসাবাসীর কথা বলে বলে সবাইকে এক পতাকার নিচে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমাদের ছেলেরা-যুবারা যখন অস্ত্র হাতে হায়েনা তাড়াতে গেছে, রণক্ষেত্রে জীবনদান করেছে অকাতরে, তখন আমরা দেশবাসী সবাইকে বলেছি, ‘আর ক’টা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি’, শত্রুনিধন করে দেশ স্বাধীন করব, ধনী-নির্ধন এক পঙক্তিতে বসে পলান্ন খাব, শাকান্ন খাব, কোনো বৈষম্যের স্থান হবে না সোনার বাংলায়। (ভাগ্যদেবী বোধ হয় তখন অলক্ষে মুচকি হেসে বলেছিলেন, খোকন, তুই চিরকালই বড় অবোধ সোজাসাপ্টা রয়ে গেলি, তোর কপালে দুঃখ আছে রে বাপ!)

৪.
কথা বাড়িয়ে আর কী হবে। এসব বাখান শুনতে শুনতে আপনারা নিশ্চয়ই এখন তিতিবিরক্ত বোধ করেন। থাক, আর বলব না। তবে শেষ করার আগে আমার একটা বিশ্বাসের কথা বলি। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে যে ঐক্য, যে প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল এক দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার আগে, সেটা ফিরিয়ে আনুন, দেখবেন ২০৪১ নয়, ৩১-এর মধ্যেই টেককা দিতে পারব আমরা বিশ্বের তাবড় তাবড় মোড়লকে। আর সেটা করতে ব্যর্থ হলে আগামী প্রজন্মের কপালে দুঃখ আছে। (আল্লাহ না করুক। ) আর আমাদের সন্তান-সন্ততির জীবনে দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা লেগে থাকুক আমরা নিশ্চয়ই তা চাই না। কিন্তু জন্মের পর থেকে যদি তারা কেবল মিথ্যাচার, ভাঁওতাবাজি ও কথায় কথায় টুঁটি টিপে ধরা, বন্দুকবাজি-বোমাবাজির সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে, যদি ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচারের উদাহরণ তাদের সামনে দুর্লভ হয়, তাহলে তারা সুনাগরিক হবে, দেশপ্রেমিক, ন্যায়পরায়ণ রাজনীতিবিদ হবে, প্রশাসক হবে, এরূপ আশা আমরা করি কীভাবে? এ এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে কেউ কাউকে সাধারণ শিষ্টাচারটুকুও প্রদর্শন করে না। কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত না হয়ে যেন ইন্নালিল্লাটাও পড়া যাবে না। আর কথা কথায় ডিএনএ টেস্ট করে নিশ্চিত হতে হবে কোনো তরুণ বা তরুণী কোনো সরকারি চাকরির জন্য বা পদোন্নতির জন্য যোগ্য কিনা। এই ডিএনএ টেস্ট হচ্ছে তার রাজনৈতিক পরিচয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নেওয়া। কী অদ্ভুত মনমানসিকতা পেয়ে বসেছে দেশটাকে। মনে হয় যেন সত্যি ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। (শামসুর রাহমান)।

অনৈক্য-বিভাজন অবশ্যই থাকতে পারে। এটা তো আর একনায়কতন্ত্রের দেশ নয়। তবে তাই বলে কথায় কথায় বিভক্তি-বিভাজন কেন? বিশেষ করে জাতির সামনে যেসব সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে, যেমন—গণতন্ত্রের বিকাশে স্থবিরতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যুবসমাজের ভেতর অপসংস্কৃতি ও মাদকের বিস্তার, নারী ও শিশু নির্যাতনের অবিশ্বাস্য রকম প্রসার, বাল্যবিবাহ, দ্রব্যমূল্য ইত্যাদি বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সমাধানের চেষ্টা না করে কেবল দোষারোপ, যাকে বলা হয় ব্লেইম গেম নিয়ে পড়ে থাকলে জাতির ৫০ বছরের প্রশংসনীয় অর্জনটুকুও ধরে রাখা যাবে না।

শেষ করব খ্রিস্টীয় নববর্ষে সবার জন্য সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে। বিশেষ করে পোড়াকপালি দেশটার জন্য।

সৌজন্যে, কালের কণ্ঠ

(মত ভিন্নমতের বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv/এমি-জান্নাত  

;