মুহুর্তেই আমার সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল!
মুহুর্তেই আমার সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল!

জাকারিয়া স্বপন

মুহুর্তেই আমার সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল!

জাকারিয়া স্বপন

তিন বন্ধু মিলে ডিনারে গিয়েছি। সবজি দিয়ে যেই না এক টুকরো পরোটা মুখে দিয়েছি, তখুনি খেয়াল করলাম ঠিক সামনের টেবিলের ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি একটু তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেই। ছেলেটিকে আমি চিনি বলে মনে হলো না।

তার সাথে যে মহিলাটি এসেছেন তিনি সুখ করে অনেক কিছু খেয়ে চলেছেন। তার চেহারায় এক ধরণের তৃপ্তির ছাপ। অনেক দিন অভুক্ত থেকে খেতে বসলে যেমন চেহারা হয়, তাকে তেমন মনে হলো। তবে ছেলেটি তেমন কিছু খাচ্ছে না। মাঝে মাঝে কিছু একটা মুখে দিচ্ছে।  

ছেলেটির বয়স কত হবে বুঝতে পারছিলাম না। তবে তিনি প্রাপ্তবয়ষ্ক যুবক। নিজের জীবন শুরু করার বয়স তার হয়েছে। সাথের নারীটি কে, সেটা যদিও নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ ছিল না, তবে তিনি ছেলেটির চেয়ে বয়ষ্ক - হয়তো মা, নয়তো বড় বোন!

ছেলেটি একটু গম্ভীর হয়ে অন্য দিকে তাকালো। সে যেহেতু আমার ঠিক চোখের সামনেই বসেছে, সেও আবার আমার দিকে তাকিয়েছে। আবারো কেমন করে যেন হাসলো। আমি ভাবলাম একবার হাত নাড়ি। বলি, আমি কি আপনাকে চিনি?

এটা বলার মতো আর সুযোগ হলো না। আমি মূহুর্তেই নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, আমরা কেউ কাউকে চিনি না। যিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন, তিনি একজন অটিস্টিক মানুষ। তার অঙ্গভঙ্গি দেখে আমি কিছুটা সময় পর নিশ্চিত হলাম। এবং মুহুর্তেই আমার সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল! এই মানুষটির জীবন কাটবে কিভাবে! এই পৃথিবীর সমস্ত চিকিৎসা তো এখনও এমন জায়গায় আসেনি যে, এই মানুষটিকে একটি স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেবে! আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তাতে এই মানুষটির তো কোনও কাজে লাগলো না। প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের এই গ্রহে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের জীবনকে আমরা চাইলেও স্বাভাবিক করতে পারছি না।

বিষন্ন মন নিয়ে খেতে শুরু করলাম। একটু পর পর লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলেটিকে দেখি, যেন সে টের না পায়। কিন্তু যতবারই দেখি, চোখে চোখ পড়ে যাচ্ছে। নিজের ভেতর এক ধরনের অসহায়ত্ব এসে ভর করে! এখনও ছেলেটির মুখটা আমার চোখে আটকে আছে! 

১.
লেখালেখিতে ভাটা পড়েছে। একটা সময়ে প্রতি সপ্তাহে লিখতাম। আস্তে আস্তে লেখার আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। আমি লিখতাম পরিবর্তনের জন্য, বিনোদনের জন্য নয়। অনেকেই আমাকে বলেন, আপনার লেখা পড়ে মজা পেতাম অনেক। ভালো লাগতো অনেক। প্লিজ লেখেন না কেন? তাদেরকে আমি কোনও উত্তর দেই না। মুচকি হাসি। মনে মনে বলি, আমি তো সং নই যে কারো বিনোদনের জন্য লিখছি। আমার কাজ কাউকে বিনোদন দেয়া নয়।

লেখালেখি করে বর্তমান সময়ে কোনও পরিবর্তন আনা যায় বলে মনে হচ্ছে না। হয়তো যায়, কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা নেই। কিংবা আমি যেই সমাজে বসবাস করি, সেই সমাজে লেখালেখি করে পরিবর্তন আনা যায় না। পরিবর্তনের জন্য যে থ্রেশহোল্ড ভ্যালু প্রয়োজন হয়, যেই প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজের প্রয়োজন হয় - সেটা হয়তো বিরাজ করে না। তাই অসির চেয়ে মসি বড়, সেটা বর্তমানে বলা যাবে না।

পাশাপাশি আরেকটি বিষয় খেয়াল করলাম, চারপাশে তেমন কোনও মানুষ নেই যারা পরবর্তনের জন্য সিরিয়াসলি লিখছেন। সমস্ত মসি এখন কালির চেয়ে তেল দিয়ে ভর্তি। তাই যা আসে, তাতে আর যাই হোক, সমাজে পরিবর্তন আসে না।

আমরা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ থেকে সরে গিয়েছি অনেক দূর। এখন আমরা সবাই টাকার জন্য মরিয়া হয়ে গেছি। যে কোনও উপায়েই হোক, টাকা আয় করতে হবে - ভালো মন্দ এগুলো কোনও বিষয়ই নয়। পুরোটাই নির্ভর করে, আপনি কোন দিকে আছেন। যখন শোষণ করবেন, ব্যাংক খালি করবেন তখন তার একটি ব্যাখ্যা আপনার কাছে থাকবেই - যেমনটা ছিল যুগে যুগে। আর আপনি যখন শোষিত তখন ব্যাখাটি ভিন্ন। একটি সমাজে ক্রমাগত শোষিতরা যখন হেরে যায়, তখন সেই সমাজকে কখনই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বলা যাবে না! জ্ঞান চর্চার কোনও জায়গা এখানে আপাতত নেই।  

২. 
ক্যালেন্ডারে দিন যতই যাচ্ছে ততই আমরা জ্ঞাননির্ভর সমাজকে ইতিহাসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। চারপাশ খুব ভালো সাহিত্য হচ্ছে বলা যাবে না, ভালো সঙ্গিত হচ্ছে তেমন কিছু কানে আসেনি, ভালো সিনেমা হচ্ছে তাও নয় (বরং টেলিভিশনের নাটকগুলোকে সিনেমা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার এক ধরণের প্রতারণার চরমে পৌঁছেছে)। একটা সময়ে খুব ভালো কবিতা হতো। তেমন কবিতা অনেক দিন মন ছুঁয়ে যায়নি। কবিতার তীক্ষ্ণতা হারিয়েছে। আমি ছবির খুব ভক্ত নই। হয়তো ভালো ছবি হচ্ছে। আমি ছবির খোঁজ রাখি না। তবে একটা সময়ে সাংবাদিকতার খোঁজটা রাখতাম। এখন সেটাও ছেড়ে দিয়েছি। মানুষের সততা দেখতে কতই আর নিজের জীবনের সময় ব্যয় করা যায়! 

৩.
সময় একটি কঠিন জিনিস। মানুষ তার সীমিত সময় নিয়ে এই গ্রহে আসে। এবং একটা সময়ে সেই জীবনের যখন যতি পড়ে, তখনই শেষ হয়ে যায় তার গল্প। মানুষের জীবন এতো অল্প, সেটা বুঝতে অনেকটা সময় লেগে গেছে।

আমার খুব কাছের একজন মানুষ অসুস্থ। তিনি তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। তার পরিচয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে মানুষটি আমার জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। কিন্তু বিগত দুই বছরে যেই উপলব্ধি আমার হলো, সেটা ঠিক ভাষায় গাঁথা যাবে না। একটি তরতাজা প্রাণ মুহুর্তেই কেমন শুকিয়ে গেলেন, যেমনটা শুকনো পাতা ঝড়ে গিয়ে উলঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকে বুনো বৃক্ষগুলো। প্রতিদিন নিজেকে বুঝাতে হয়, এটাই জীবন। একদিন আমাকেও ছেড়ে যেতে হবে এই মায়াময় গ্রহ ছেড়ে হেমন্তের ওই মরমর পাতার শব্দে।

এটুকুই জীবন! কারো ষাট, কারো সত্তর, কারো আশি! নয়তো আরেকটু বেশি - এই তো। এর বেশি তো আর নয়! কী হয় এটুকু জীবন দিয়ে? মারামারি, কাটাকাটি, যুদ্ধ, অন্যের সম্পদ সংগ্রহ, নিজের আয়েশ, অন্যের ক্ষতি, কুটনামি, ছলে-বলে-কৌশলে কত কি অদ্ভুত যুক্তি - সবই তো ওই কিছু নেশার জন্যই! একেকটি মানুষ আছে একেক নেশায়! কেউ ক্ষমতা নিয়ে, কেউ সম্পদ, কেউ শিল্প, কেউ কূটনীতি, কেউ গান, কেউ রাজনীতি! এগুলোর বাইরে যারা, তারা হয়তো নিজের জীবনের বেসিক চাহিদা মেটাতেই পুরো সময়টা ব্যয় করে ফেলেছেন। কিন্তু একটা সময়ে গিয়ে থাকে কি কোনও পার্থক্য? দুই পা, দুই হাত আর একটি মাথা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো জন্তুগুলোর সাথে অন্যদের কোনও পার্থক্য কি আসলেই আছে!  

৪.
বিজ্ঞান আমার জীবনের সবচে বড় ক্ষতি করেছে। এই ব্যাটা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, আমি কতটা ক্ষুদ্র। আমার জীবন একটি সামান্য ডটের চেয়েও ক্ষুদ্র। সে আমার এই ক্ষতিটুকু না করলেও হয়তো পারতো।

সে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, এই গ্রহই পুরোটা নয়। তার বাইরে সৌরজগৎ আছে, তারও বাইরে গ্যালাক্সি আছে, আরো এমন কোটি কোটি গ্যালাক্সি আছে। আবার এটাই সত্যি যে, এখন পর্যন্ত যেটুকু জানা গেছে, বিষয়টি তো এটুকুই নয়, তার আরো ব্যপ্তি আছে। এবং সেটা কতটুকু তাও আমরা জানি না!

আমার জীবনে রেস্টুরেন্টে খেতে বসা ওই অটিস্টিক ছেলেটি যেমন সত্যি, তেমনিভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে যে মহাশূন্য দেখতে পাই সেটাও তো সত্যি। এটাও তো সত্যি যে, আমাদের মতো এমন অসংখ্য গ্রহ থাকতে পারে যা আমরা এখনও কিছুই জানি না। এক সৌরজগতকেই এখনও আমরা জানতে পারিনি। তাহলে কবে অন্য গ্যালাক্সিগুলোকে জানা হবে? আর এগুলো না জেনেই আমি এই গ্রহ ছেড়ে চলে যাবো!

এই গ্রহের যে বয়স, এই সৌরজগতের যে বয়স, এই মহাবিশ্বের যে বয়স তার কাছে আমার বয়সটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? তার কাছে ২০২১ কিংবা ২০২২ - তার কোনও অর্থ আছে? মহাকালের গর্ভে এগুলোর কোনই অস্তিত্ব নেই।  

৫.
আমার ধারণা, এই আমাদের বর্তমান সভ্যতা - এমন আরো অসংখ্য সভ্যতা আগে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের ইতিহাস জানার পরিধি খুবই সামান্য। লিখিত ইতিহাস তো এই কিছু দিনের। এই যে আমরা মনে করছি, আমরা কত কিছুই করে ফেলেছি - কিন্তু রাতের অন্ধকারে খোলা আকাশের দিকে তাকালেই তো বুঝা যায়, আমরা আসলে কিছুই করিনি। উই হ্যাভ ডান নাথিং। জাস্ট নাথিং! আজ যদি আমরা অনায়াসেই এই গ্যালাক্সি পার হয়ে পাশের গ্যালাক্সিতে যেতে পারতাম, তবুও মনে হতো কিছু একটা করা হয়েছে!

একটা সময় হয়তো আসবে, আমরা সত্যি সত্যি আরেকটি গ্যালাক্সিতে যেতে পারছি। কিন্তু সেটা কত সময় পর? কত মিলিয়ন বছর পর? সেটা কি আমি দেখে যেতে পারবো? যদি না-ই পারি, তাহলে বিষয়টি দাঁড়াল কী? একটা বিশাল সিস্টেমের ধুলাকনার চেয়েও কম শক্তি নিয়ে আমি গুনছি ২০০১, ২০০২, ২০২১, ২০২২, ২০২৩ -- সো হোয়াট! পুরো বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই ছেড়ে যেতে হবে এই সিস্টেম!

আরও পড়ুন: ছাত্রলীগের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

৬.
বস্তুর ওপর আমার কখনই তেমন আগ্রহ ছিল না, এখন আরো কমে যাচ্ছে। ঘড়ি যেভাবে বছর কেড়ে নিচ্ছে, তাতে বস্তুর ওপর আগ্রহ আরো নিম্নগামী। রাষ্ট্র, ক্ষমতা, যশ, খ্যাতি, টাকা - এগুলোর কোনও কিছুই আর টানছে না! আমি কি তাহলে মৃত্যুর দিকে এগুচ্ছি!

নাহ, সেটা হয়তো নয়। মৃত্যু চিন্তা আমাকে টানছে না। শুধু মনে হচ্ছে, এই বিশাল জগৎটাকে জানার কোনও কি উপায় নেই?

আর ওই যে ছেলেটি? রেস্টুরেন্টে বসে আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছিল! তার জন্য তো কিছু করা হলো না! এবং তার জন্য বর্তমান সময় কিছু করতেও পারবে না। কারণ, আমরা সবাই কেমন যেন অটিস্টিক হয়ে গেছি। একটি অটিস্টিক সমাজ তো আর অন্যকে সাহায্য করতে পারে না!

 (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv রিমু