শিশু মৃত্যু ও উদযাপন নিয়ে কিছু কথা 
শিশু মৃত্যু ও উদযাপন নিয়ে কিছু কথা 

আনোয়ার সাদী, সিনিয়র নিউজ এডিটর, নিউজ টোয়েন্টিফোর

শিশু মৃত্যু ও উদযাপন নিয়ে কিছু কথা 

আনোয়ার সাদী

রাজধানী ঢাকায় চার মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই নিউজটি অনলাইনেও বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বছরের প্রথম দিন শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির তিন ঘণ্টা পর শিশু ওমায়ের মারা যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন সে হার্টফেল করে মারা গেছে।

এর আগের রাতে নগরবাসীর বর্ষবরণ উদযাপনের সময় আতশবাজি ও পটকার বিকট শব্দে সে বার বার ভয়ে কেঁপে উঠে বলে শিশুটির বাবা অভিযোগ করে। তখন তিনি ফেইসবুকেও বিষয়টি লেখেন এবং পরদিন শিশু মৃত্যুর খবরটিও তিনি ফেইসবুকে জানান। ফলে, বর্ষবরণ উৎসবের শব্দের সঙ্গে শিশু মৃত্যু মিলিয়ে একধরনের বর্ণনা কেউ কেউ করছেন, তার ফলে আলোচনার পালে আরেকটু হাওয়া লেগেছে।  

এখানে প্রশ্ন উঠেছে দুটি। এক. উৎসবের কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে কী না? দুই. এই মৃত্যু কী আতশবাজি ও পটকা ফাটিয়ে উৎসব করাকে অনৈতিক করে দেয় কী না? 

প্রথম প্রশ্ন দিয়ে আলোচনা শুরু করি। জানা যায় জন্মগতভাবেই শিশুটির হৃদযন্ত্রে ছিদ্র ছিলো। তার নিয়মিত চিকিৎসা চলছিলো। ছেলের বাবা ইউসুফ রায়হানের দাবি, থার্টিফার্স্ট নাইটে আতশবাজির বিকট শব্দে ভয়ে ছেলেটা বারবার কেঁপে উঠছিলো। সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। সকাল থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ইউসুফ বলেন, ওই রাতের বিকট শব্দের কারণেই তার ছেলের এই পরিণতি হলো কি না, সেটা তিনি বলতে পারবেন না। তবে চিকিৎসকেরা বলেছেন, তার ছেলে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে। ’ 

যাহোক, পত্রিকাগুলো থেকে জানা গেছে, গত মাসের প্রথম দিকে নিউমোনিয়া হয়েছিল উমায়েরের। গত ১০ ডিসেম্বর তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হয় তাকে। চার দিন পর সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরে। এর সপ্তাহখানেক পর আবার তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে ওই দিন চিকিৎসক ব্যস্ত থাকায় তাকে সেদিন আর নেওয়া হয়নি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে ওমায়ের আগে থেকেই অসুস্থ ছিলো এবং বছরের প্রথম দিনে তা করুণ পরিণতি পায়। বিকট শব্দ হার্টের রোগীর জন্য ভালো নয়, এই তথ্যটি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। ফলে, তার মৃত্যু আতশবাজির শব্দকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে হলে চিকিৎসকের মতামত লাগবে। কেবল একজন চিকিৎসকের পক্ষেই এই বিষয়ে সঠিক মতামত দেওয়া সম্ভব। আমি তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত।  

এবারে আসি উৎসব উদযাপন বিষয়ে। আনন্দ উদযাপন করা মানুষের সহজাত প্রবণতা । নদীর প্রবাহ যেমন আটকে রাখা যায় না, তেমনি মানুষের উৎসব উদযাপনও আটকে রাখা যাবে না। কাজেই নানাভাবে মানুষ বর্ষবরণ করবে এটাই স্বাভাবিক ।

বাংলা বছর বরণ করার জন্যে আমাদের নিজস্ব কিছু পদ্ধতি আছে । পান্তা-ইলিশ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রাপালা, হালখাতা ইত্যাদি। খোদ রাজধানীতেই বাংলা বছরের প্রথম দিনে লাল সাদা পোশাকে রঙিন হয়ে উঠে রাজধানীবাসী। এটাই বাঙালির এমন একটা উৎসব যেখানে সব ধর্মের মানুষ, সব বয়সের মানুষ উৎসবে মেতে উঠতে পারে। তবে  এর বিরোধীতা করার লোকও দেশে রয়েছে।  

পহেলা বৈশাখের বিরোধীতা করা আর থার্টিফার্স্ট নাইটে আতশবাজির বিরোধীতা করা কী তাহলে কী এক সমান হয়ে উঠলো? এই নিয়ে আলোচনার দরকার আছে। দুনিয়াজুড়ে বর্ষবরণে আতশবাজি ফোটানো হয়, টিভিতে তা দেখানো হয়, ফানুস উড়ানো হয় কী না, তা আমার জানা নেই। এসবই আমি ব্যাক্তিগতভাবে পছন্দ করি।  

তবে, ফানুসের আগুনে ক্ষয়ক্ষতি হওয়া কিংবা বিকট শব্দের কারণে কারো  শান্তি নষ্ট হওয়াটাও মানা যায় না।  তাহলে ইংরেজি নববর্ষ বরণের জন্যে আমরা কী করতে পারি? সাধারণ মানুষ হিসাবে আমাদেরতো আনন্দ করার উপায় থাকতে হবে। আমি মনে করি, এখানে আমাদের ভাবার দরকার আছে। যদি আমাদের বুদ্ধিজীবী বা নীতিনির্ধারকরা ইংরেজি বর্ষবরণের উপায় ভেবে বের করতে না পারে তাহলে নাগরিকরা স্বত:স্ফূর্তভাবে  নিজেদের মতো করে আনন্দ করবে। যার উদাহরণ আমরা এবার দেখেছি।  

জাতি হিসাবে আমরা অর্থনীতির বিচারে এগিয়ে যাচ্ছি। সবাই মিলে একটু গুছিয়ে চলতে পারলে এই এগিয়ে যাওয়ার গতি আরো বাড়বে বলেই মনে করি।  

লেখা : আনোয়ার সাদী, সিনিয়র নিউজ এডিটর, নিউজটোয়েন্টিফোর।  
(সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv/আলী