অবিশ্বাসীদের ওপর কোরআন নাজিলের প্রভাব
অবিশ্বাসীদের ওপর কোরআন নাজিলের প্রভাব

প্রতীকী ছবি

অবিশ্বাসীদের ওপর কোরআন নাজিলের প্রভাব

সাইয়েদ কুতুব শহীদ (রহ.)  

কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় আরব ভূখণ্ডে যেসব কাফির-মুশরিক ছিল, তারা কোরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে কখনো তাকে কাব্য আবার কখনো তাকে জাদু আখ্যা দিয়েছিল। তবে আমরা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে তাদের কাছে শৈল্পিক সৌন্দর্যের মাপকাঠি কী ছিল। অবশ্য এ কথা আমরা খুব ভালোভাবেই জানি, তারা কোরআন দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিল। কোনো সন্দেহ নেই, কোরআন অবতীর্ণের সময় বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয় শ্রেণির ওপর জাদুকরী প্রভাব বিস্তার করেছিল।

কেউ এই প্রভাবে মুসলিম হয়েছে আর কেউ তার স্পর্শ পেয়েও পালিয়ে গেছে। বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয় শ্রেণি কোরআনের ব্যাপারে তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাদের কেউ এটি চিহ্নিত করতে পারেনি যে কোরআনের ঠিক কোন অংশ তাদের প্রভাবিত করেছে। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কোরআন শোনার পর আমার ভেতর ভাবান্তর হলো, আমি কাঁদতে লাগলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করলাম।
’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আমি বললাম, এ কথাগুলো কত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাহাত্ম্য কত বেশি। ’

ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.) উভয়কে অস্বীকার করেছে। সে তাঁর সঙ্গে মারাত্মক শত্রুতাও পোষণ করত। নবীজি (সা.)-এর এমন চরম শত্রুর মুখ থেকেও বের হয়েছিল, ‘আল্লাহর শপথ! কোরআনের মধ্যে মাধুর্য পাওয়া যায়। মনে হয়, এটি শাশ্বত এক বাণী। সব কিছুকে জয় করে নেয়। সবচেয়ে উন্নত ও মর্যাদাসম্পন্ন কোনো কিছুও এর চেয়ে উত্তম হতে পারে না। ’

সে আরো বলেছিল, ‘কোরআনের মধ্যে জাদুকরী প্রভাব আছে। তোমরা দেখো না তা কিভাবে একজন মানুষকে তার আত্মীয়-স্বজন ও সঙ্গী-সাথিদের থেকে পৃথক করে দেয়?’

আর মুমিনের প্রতিক্রিয়া খোদ কোরআনুল কারিমে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন উত্তম বাণীসংবলিত কিতাব, যা সুসামঞ্জস্য ও যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয়। এতে যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের গা রোমাঞ্চিত হয়, অতঃপর তাদের দেহ-মন বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। ’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ২৩)

আহলে কিতাবদের ওপর কোরআন নাজিলের প্রতিক্রিয়া ছিল নিম্নরূপ—‘যাদের এর আগে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তাদের কাছে যখন এটি পাঠ করা হয়, তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। তারা বলে, আমাদের প্রতিপালক পবিত্র, মহান। আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি কার্যকরী হয়ে থাকে এবং তারা কাঁদতে কাঁদতে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটি তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে। ’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১০৭-১০৯)

অবশ্য কোরআনে সেসব মানুষের অবস্থাও বর্ণিত হয়েছে, যারা কোরআন দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার পরও তাদের হঠকারিতার ওপর অটল ছিল এবং অন্যদের কোরআন শ্রবণ করা থেকে বাধা দিত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা বলে, এগুলো তো সেকালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার কাছে পাঠ করা হয়। ’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৫)

আরও পড়ুন:


যে সাহাবির লাশ মাটি গিলে ফেলেছে


নাজর বিন হারিস নামে মক্কায় একজন মন্দ লোক ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মসজিদে মানুষদের কোরআন শোনাচ্ছিলেন, তখন সে পারস্যের রূপকথা ও কিচ্ছা-কাহিনি আরবিতে বলা শুরু করল। তার উদ্দেশ্য ছিল লোকদের কোরআন শুনতে বাধা দেওয়া। কিন্তু তার ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। তবু অবিশ্বাসী কুরাইশরা এ কাজ থেকে বিরত থাকেনি; বরং তারা বলেছে, অবিশ্বাসীরা বলে, তোমরা এই কোরআন শ্রবণ কোরো না এবং তা আবৃত্তিকালে শোরগোল সৃষ্টি কোরো, যাতে তোমরা জয়ী হতে পারো। (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ২৬)

কোরআন সম্পর্কে এমন কথা ও কাজ তারা সব সময় বলত ও করত। তবে এটি বলতেই হবে, অবিশ্বাসীরা কোরআন যতটুকু শ্রবণ করার সুযোগ পেয়েছে, আরবিভাষী হওয়ার কারণে সবটুকুই তাদের মন-মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট হয়েছে। এরপর তারা হয়তো ‘লাব্বাইক’ বলে ইসলাম গ্রহণ করেছে, না হয় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে গেছে।

‘আত-তাসবিরুল ফান্নি ফিল কোরআন’ থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর

news24bd.tv রিমু