বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে খুশি নাটোরের চাষিরা
বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে খুশি নাটোরের চাষিরা

বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে খুশি নাটোরের চাষিরা

নাসিম উদ্দীন নাসিম, নাটোর 

কৃষিক্ষেত্রে সবজি চাষে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার এবং নানা ধরণের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই সাথে বাড়ে ফসলের উৎপাদন ব্যয়।  

এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারে মাটি, পানি, বায়ু দূষিত হয়। পরিবেশ ও প্রকৃতির উপকারী পোকামাকড়ও ধ্বংস হয়।

ফলে পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও জীববৈচিত্রের ক্ষতিসাধন হয়। এইসব ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আইপিএম প্রকল্পের আওতায় মডেল প্রকল্প হিসাবে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে উত্তরের জেলা নাটোরে।  

কৃষকদের ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে অন্তত পাঁচশ কৃষককে নিয়োজিত করা হয়েছে এই কাজে। সেক্স ফেরোমেন, আঁঠালো ফাঁদ ও জৈব সার ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করে দাম ভাল পাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে উৎপাদনও। এতে খুশি স্থানীয় সবজি চাষিরা।

সরেজমিনে নাটোর সদর উপজেলার ফতেঙ্গাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের ভেতরে জমির চারিদিকে সবুজ নেট দিয়ে বিদেশি সবজি স্কোয়াশ চাষ করেছেন ঐ গ্রামের কৃষক ওসমান গণি। কোন ক্ষতিকর পোকা-মাকড় যাতে বাইরে থেকে আক্রমণ করতে না পারে, তার জন্য জমির পুরোটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে নেট দিয়ে।  

আর এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে নেট হাউজ পদ্ধতি। সেই সাথে জমিতে ব্যবহার করা হয়েছে জৈব সার। শুধু নেট হাউজ নয়, সেক্স ফেরোমেন, আঁঠালো ফাঁদ আর জৈব বালাইনাশক এবং জৈব সার প্রয়োগ করে এই গ্রামের অন্তত পাঁচশ কৃষক বিষমুক্ত শিম, টমেটো, লাউ সহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন। পরিবেশ বান্ধব কৌশলগত পদ্ধতি ব্যবহার করার কারণে উৎপাদন খরচও কমেছে তাদের। আর দাম ভাল পাওয়ায় খুশি সবজি চাষিরা।

নিরাপদ সবজি উৎপাদক ওসমান গণি জানান, এই স্কোয়াশটা চাষ করেছি সম্পূর্ণ বিষমুক্ত উপায়ে। এটা উৎপাদন করতে জৈব সার ব্যবহার করেছি। সেই সাথে কৃষি বিভাগের পরামর্শে পুরো জমি নেট দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে।  

১৮ শতাংশ জমি থেকে শুরুতেই ২০ মণ স্কোয়াশ বিক্রি করেছি। প্রতি মণ স্কোয়াশ বাজারে এক হাজার থেকে বারোশত টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিষমুক্ত সবজির চাহিদা অনেক। নিরাপদ সবজি কিনতে অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠছে।  

স্থানীয় শিম চাষি মোহাম্মদ আল রাজি জানান, শীতকালীন যে সবজিগুলো আছে, যেমন স্কোয়াস, শীম, টমোটো, ফুলকপি, বাধাকপি ইত্যাদি তারা বিষমুক্তভাবে উৎপাদন করেছেন। ধীরে ধীরে এই পদ্বতি সারা দেশে ছড়িয়ে গেলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য উপকারী হবে বলে জানান তিনি।  

তিনি আরও জানান, একসময় তারা সবজি চাষে রাসায়নিক সার ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করতেন। ফলে ফসল অনেক অর্থ ব্যয় হতো। ফসলে বিষ প্রয়োগ অনেক ক্ষতিকর জেনেও তারা ফসলে কীটনাশক ব্যবহার করতেন।  

কিন্তু এখন তারা স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে জৈব সার ব্যবহারসহ সেক্স ফেরোমেন ও আঁঠালো ফাঁদ ব্যবহার করে বিষমুক্ত সবজি চাষে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বিষমুক্ত সবজি ইতোমধ্যে উপজেলা-জেলা ছাড়িয়ে রাজধানী ঢাকায়ও চলে যাচ্ছে।

একই গ্রামের আলেয়া বেগম বলেন, এক বিঘা জমিতে শীম বা টমেটো চাষ করতে আগে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকার কীটনাশক ব্যবহার করতে হতো। এখন জৈব সার, সেক্স ফেরোমেন ও আঁঠালো ফাঁদ ব্যবহার করে সেই কীটনাশকের টাকাটা আর লাগেনা। এতে সবজি উৎপাদনের ব্যয়ের পরিমান কমেছে।

নাটোর সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বাবুল হোসেন জানান, বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন এক বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। এজন্য নিরাপদ সবজি উৎপাদন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের উৎসাহিত করতে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করেছে কৃষি বিভাগ।  

২৫ জন কৃষক নিয়ে এক একটি দল গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে পাঁচশ’ জন কৃষকের ১০০ একর জমি বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের আওতায় আনা হয়েছে। নাটোর জেলায় শিম, ফুলকপি, বাধাকপি, টমেটো সহ বিভিন্ন শীতকালিন বিষমুক্ত সবজি চাষ হয়েছে ২৪৮ হেক্টর জমিতে। আর এসব জমি থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন নিরাপদ এবং বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের আশা করছেন তারা।

news24bd.tv/ নাজিম

;