‘কিডনি রোগ প্রতিরোধে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ভূমিকা রাখতে পারে’ 
‘কিডনি রোগ প্রতিরোধে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ভূমিকা রাখতে পারে’ 

সংগৃহীত ছবি

‘কিডনি রোগ প্রতিরোধে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ভূমিকা রাখতে পারে’ 

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশে কিডনি রোগী দ্রুত বাড়ছে। গত ১০ বৎসর পূর্বে কিডনি রোগী ছিল ১৫ থেকে ১৬ ভাগ, বর্তমানে তা বেড়ে অনেক বেশি হয়েছে। ব্যাপক হারে কিডনি রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারন হচ্ছে প্রতি বছর ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী বৃদ্ধি পাওয়া। ২০১১ সালে ডায়াবেটিস রোগী ছিল ৮০ লাখ, ২০১৮ সালে বেড়ে দাড়িয়েছে  ১ কোটি ১০ লাখে।

২০১১ সালে উচ্চ রক্তচাপের রোগী ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ২ কোটির ওপর। সমস্যা হলো, এসব রোগের কোন উপসর্গ থাকে না। ফলে তারা চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নেবারও প্রয়োজন মনে করেন না।  

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৪০ ভাগ মানুষ জানেন না তাদের ডায়াবেটিস আছে, ৬০ ভাগ মানুষ জানেন না তারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, ৯০ ভাগ মানুষ জানেন না তাদের প্রস্রাবের সঙ্গে আমিষ নির্গত হচ্ছে। এর ফলে নিজের অজান্তেই এসব মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বা ক্রনিক কিডনি ডিজিজে আক্রান্ত হচ্ছেন। ওই সময় পরীক্ষা নীরিক্ষা করলে দেখা যায়, এর মধ্যে ৭০-৮০ ভাগ মানুষের দুটো কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে। তখন চিকিৎসা করে রোগের অগ্রগতি কমানো যায় না। ফলে ৫-৬ বৎসরের মধ্যে দুটো কিডনি ৯০ ভাগের ওপর বিকল হয়ে যায়। উপসর্গ না থাকায় তারা বিশ্বাসও করেন না যে, তাদের দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ আগে ভাগে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দিলে হয়তো তারা সুস্থ হয়ে যেতো। এজন্য গ্রাম পর্যায়ে দেশের ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে রোগ সনাক্ত করে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা যায়।

বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ ) বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে মিরপুরস্থ কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটে আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ এফ এম রুহুল হক এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশিদ আলম, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান।  অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মেজর জেনারেল (অব:) অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ, অধ্যাপক ডা. মো. মুহিবুর রহমান, অধ্যাপক ডা. শামীম আহম্মেদ, অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন রুবেল, টিনি ফেরদৌস রশিদ প্রমূখ। অনুষ্ঠানে ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের ওপর দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্য চিত্র দেখানো হয়।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. এ এফ এম রুহুল হক এমপি বাংলাদেশের অসংক্রামক রোগের ভয়াবহতা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও এতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির গুরুত্বারোপ করে বলেন, উচ্চ রক্তচাপ  থাকা স্বত্ত্বেও প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট হেঁটে ও খাদ্যাভাস পরিবর্তন করেই সুস্থ জীবন যাপন করা যায়।  

জাতীয় অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান বলেন, স্বাস্থ্য শিক্ষার উন্নয়নের সঙ্গে অর্থনীতির উন্নয়ন সম্পৃক্ত। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ও জনস্বাস্থ্য সেবা-এ দুটোই সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবার মূল ভিত্তি। সার্বজনীন স্বাস্থ্য রক্ষায় শুরুতেই অনেক রোগের মতো কিডনি রোগ নির্ণয় করা প্রয়োজন। ফলে রোগে জটিলতা বৃদ্ধির পূর্বেই সঠিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়। এতে খরচ কম হয় ও মৃত্যুর হারও কমে যায়।  
অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশিদ আলম বলেন, বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে কিডনি রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কিডনি অকেজো রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশে কিডনি অকেজো রোগের চিকিৎসা শুধু সরকারের পক্ষে একটি চ্যালেঞ্জ নয়, সার্বজনিন চ্যালেঞ্জও। এজন্য প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ সনাক্ত করতে হবে এবং প্রতিরোধের ওপর জোর দিতে হবে।
 
অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ বলেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধে গ্রাম পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপের মাত্রা দেখেও কিডনি রোগকে সনাক্ত করা যায়। এজন্য সারাদেশে থাকা প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিকে আসা ২০ বছরের অধীক বয়সী রোগীদেরকে কয়েকটি প্রশ্ন করে প্রাথমিক ভাবে জানা যায় যে, তারা কিডনি রোগে ভুগছেন কিনা।  

এসব প্রশ্ন হলো, তিনি কি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন? তার হার্টের রোগ আছে কি না বা হার্টের কার্যকারিতা কমে গেছে কিনা? রোগীর পায়ের পাতা/পায়ের নিচ অংশে অথবা চোখের নিচের পাতা বা মুখ মন্ডল ফুলে যাচ্ছে কি না? আত্নীয়-স্বজনদের মধ্যে কেউ কিডনি রোগী কি না? তিনি বেশির ভাগ সময় ব্যাথা নাশক ওষুধ সেবন করেছেন কি না?  অসুস্থ্যতার জন্য বা ওজন কমানোর জন্য তিনি কবিরাজি ওষুধ বা গাছ-গাছড়ার পাতা বেটে ব্যবহার করে থাকেন কি না?

এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর যদি না সুচক হয়, তাহলে বর্তমানে তার কোন কিডনি রোগ নেই ধরা যেতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে, ভবিষ্যতে তার কোন কিডনি রোগ হবে না। আর যদি এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ সূচক হয়, তাহলে তাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কিডনি রোগ আছে কিনা এবং কি পর্যায়ে আছে তা জেনে নিতে হবে।

অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ আরো বলেন, কিডনি রোগ সনাক্তে উচ্চতা, ওজন,  রক্তচাপ মেপে রক্তের ও প্রস্রাবের সুগার র্নিণয় এবং প্রস্রাবের সঙ্গে আমিষ যাচ্ছে কিনা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে যা মাত্র ৩শত টাকা খরচ করে করা সম্ভব। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে ও প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা দিলে কিডনি রোগ মুক্তি লাভ সম্ভব।  

news24bd.tv/এআর-কাবুল

;