ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: টালমাটাল বিশ্ববাজার, প্রভাব দেশের বাজারেও
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: টালমাটাল বিশ্ববাজার, প্রভাব দেশের বাজারেও

সংগৃহীত ছবি

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: টালমাটাল বিশ্ববাজার, প্রভাব দেশের বাজারেও

অনলাইন ডেস্ক

ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরাশক্তি রাশিয়া। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে টালমাটাল আন্তর্জাতিক বাজার। যার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও দৃশ্যমান। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে।

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এমন আশঙ্কায় বৈশ্বিক পণ্যবাজার হয়ে উঠছে আরো অস্থিতিশীল।

যুদ্ধ শুরুর পর গত এক মাসে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস, নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামাল, গম, সয়াবিন, পাম তেলসহ প্রায় সব খাদ্যপণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নিত্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী ও ধাতুপণ্যের দাম আরো বাড়বে।

এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে ও বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়েছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে মানুষের।

দেশের অর্থনীতিবিদ, কূটনৈতিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন আন্তর্জাতিক সমস্যা। এর প্রধান কারণ রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা।

নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ছে। একইভাবে ইউক্রেন থেকে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বাড়ছে। দেশের বাজারে দাম বৃদ্ধির তালিকায় যোগ হচ্ছে তেল, সিমেন্ট, গ্যাস, রডসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের।

জ্বালানি তেলের দামে রেকর্ড

ট্রেডিং ইকোনমিকসের হিসাবে দেখা যায়, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি অস্থির জ্বালানি তেলের বাজার। আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত ডাব্লিউটিআই তেলের দাম প্রায় ২২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৪ এবং লন্ডনের ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২২ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে ওঠে। এক বছরে উভয় তেলের দামই ৮৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

খাদ্যপণ্যের দাম লাগামহীন

খাদ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গমের দাম। গত এক মাসে বিশ্ববাজারে এর দাম বেড়েছে ১৯.১৪ শতাংশ। আর এক বছরে বেড়েছে ৭৮.১৫ শতাংশ। চলতি মাসের শেষ দিকে শিকাগোর অগ্রিম বাজারে গম বিক্রি হচ্ছে প্রতি বুশেল ১১ ডলারে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে গম সরবরাহের ২৯ শতাংশ, ভুট্টার ১৯ শতাংশ এবং সূর্যমুখী তেলের ৮০ শতাংশ আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে। ইউক্রেনের সব বন্দরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ। অন্যদিকে রাশিয়ার পণ্য নিচ্ছে না জাহাজ কম্পানিগুলো। ফলে বিশ্ববাজারে বাড়ছে গমের দাম।

ট্রেডিং ইকোনমিকসের হিসাবে দেখা যায়, গত এক মাসে সয়াবিনের দাম বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। পাম তেলের দাম বাড়লেও আবার কিছুটা কমেছে। চিনির দাম ৯.১১ শতাংশ, চালের দাম ৫.৭৯ শতাংশ এবং ভুট্টার ৭.৯৯ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্ববাজারে সয়াবিন সরবরাহকারী শীর্ষ ১০ দেশের দুটি ইউক্রেন ও রাশিয়া। যুদ্ধ শুরুর পর সয়াবিনের বিশ্ববাজারে প্রভাব পড়েছে। দাম বাড়ছে দেশের বাজারেও।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি লোহা, নিকেল ও কপার উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন। এ ছাড়া নিয়ন, প্যালাডিয়াম ও প্লাটিনামের মতো আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাতু উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত এই দুটি দেশ। যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে সোনা, রুপা, তামাসহ মূল্যবান সব ধাতুর দামও অনেক বাড়ছে।

দেশের বাজারে প্রভাব

দেশে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে রড ও সিমেন্টের বাজারে। দেশের বাজারে রডের টন এক লাখ টাকা ছুঁইছুঁই। সিমেন্টের বস্তা ৫০০ টাকায় ঠেকেছে।

গম আমদানিকারকরা বলছেন, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ডসহ তৃতীয় দেশে ঋণপত্র খুলে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে পণ্য আমদানি করেন ব্যবসায়ীরা। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে তৃতীয় দেশগুলোর সরবরাহকারীরা ঋণপত্র (এলসি) নিচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর আগে যেসব ঋণপত্র নেওয়া হয়েছে এবং পণ্য জাহাজীকরণের অপেক্ষায় ছিল, সেগুলোও আসছে না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের একই দশা। তাই ২০০৮ সালের পর বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম এখন সর্বোচ্চ।

বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, দেশে জ্বালানির পুরোটাই আমদানিনির্ভর। যুদ্ধ শেষ না হলে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অন্যান্য জিনিসের দামও বাড়বে। পণ্য পরিবহন ব্যয় তো বেড়েছেই। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গত ১৪ বছরের মধ্য সর্বোচ্চ। গ্যাসের দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধির কারণে দেশে গমের আমদানি খরচ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১১৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের গম আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি।

গবেষকরা বলেন, এই দুই দেশের ক্রেতার মধ্যে রয়েছে মিসর, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আজারবাইজান, তুরস্কসহ অনেক দেশ। এই পরিস্থিতে আমদারিকারকরা যখন বিকল্প বাজার থেকে গম কিনতে প্রতিযোগিতা করবে, তখন দাম আরো বেড়ে যাবে।

দেশের বাজারে প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকরা যা বলেন

দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর বলেন, এটি মোটেই দেশীয় ব্যবসায়ীদের সৃষ্টি করা সমস্যা নয়। যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্ব এমনকি ইউরোপের অবস্থা অনেক খারাপ। ব্যবসায়ীদের বেশি দামে কিনতে হলে বেশি দামেই বিক্রি করতে হবে—এটি স্বাভাবিক।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, একটি পণ্যের দাম বাড়লে তার চেইনে যতগুলো পণ্য উৎপন্ন হয়, সেগুলোর দাম বাড়বে—এটিই স্বাভাবিক। তবে গমসহ আমদানি করা পণ্যের বিকল্প দেশ দ্রুত খুঁজতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের পর পৃথিবীতে পণ্যের সরবরাহ চেইনের ব্রেক ডাউন হয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশেও পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে।

রাশিয়ার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি উল্লেখ করে মির্জ্জা আজিজুল বলেন, ‘সরকারের ক্ষতি হলেও দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। দরকার হলে ভর্তুকি বাড়াতে হবে।

আইএমএফের সতর্কতা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘যুদ্ধ ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্য যেমন—গম, সার ও খনিজ ধাতুপণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তখন এই যুদ্ধ শুরু হলো’।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা দ্য সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট (সিজিডিইভি) জানায়, যুদ্ধে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় চার কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমায় নামবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক এই থিংকট্যাংক জানায়, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি আগের সব অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১০ সালে যে হারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছিল, এখনো একই মাত্রায় বাড়ছে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আংকটাড) এক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় খাদ্য ও জ্বালানি খাত। রাশিয়ার উৎপাদন কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়েছে।

আংকটাডের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বেশি বিপদে পড়বে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। এসব দেশ যে খাদ্যপণ্য আমদানি করে, তার ৫%-এর দাম বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) পরিচালক এনগোজি ওকোঞ্জো আইওয়ালা আগেই বলেছিলেন, ‘ইউক্রেনের গম সরবরাহ বিঘ্নিত হলে গম ও রুটির দাম বেড়ে যাবে। সেই সঙ্গে বাড়বে এগুলো দিয়ে বানানো পণ্যের দাম।

আমদানি পণ্য নিয়ে শঙ্কায় সরকার

বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তার আলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশনায় সংকট মোকাবেলায় ছয়টি সুপারিশ করা হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়, চলমান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আগেই বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যাপ্ত গম ও ভুট্টা আমদানি করে মজুদ করা, রাশিয়া ও ইউক্রেন ছাড়া নতুন নতুন দেশে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের বাজার তৈরি করা, রাশিয়ার ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নে দেশে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ চালিয়ে নিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, ওই অঞ্চলে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষ্ণ সাগরের আশপাশের দেশগুলোর আকাশপথ ব্যবহার করা, গম ও ভুট্টা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশে উৎপাদন বাড়ানো এবং রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অপপ্রচার বা গুজব ছড়িয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সেদিকে নজরদারি বাড়ানো।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়ার ওপর একের পর এক কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করে। সূত্র : কালের কণ্ঠ 

news24bd.tv রিমু

;