বনানীর ধর্ষণ মামলার ‘রায়’ আমার কাছে সঠিক মনে হয়েছে
Breaking News
বনানীর ধর্ষণ মামলার ‘রায়’ আমার কাছে সঠিক মনে হয়েছে

বনানীর ধর্ষণ মামলার ‘রায়’ আমার কাছে সঠিক মনে হয়েছে

Other

বনানীর ধর্ষণ মামলার ‘রায়’-টি আমার কাছে সঠিক মনে হয়েছে। উত্তেজিত না হয়ে আমার বক্তব্য একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, তাহলে আপনার কাছেও সঠিক মনে হবে।  

১। কারও বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা, আর ওই অভিযোগ প্রমাণ করা, দুটি এক জিনিস নয়।

কেউ ধর্ষণ করেছে কি না, আদালতের কাছে এটি বিবেচ্য বিষয় নয়। আদালতের কাছে বিবেচ্য বিষয় হলো, মামলার এজাহারে বর্ণিত অভিযোগ বাদী পক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে কি না।  

২। ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি অপরাধ যেনতেনভাবে প্রমাণ করলে চলবে না। এর একটি স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ডটি হলো ‘Beyond Reasonable Doubt’, অর্থাৎ কোনো আসামীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধিতে আনীত অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’ হতে হবে। কাউকে কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া, এটি কোনো ছেলেখেলার বিষয় নয়। বিচারকের যদি মনে হয় যে কোনো অপরাধ পরিপূর্ণভাবে প্রমাণ হয় নি, বা প্রমাণে এক সুতা পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে, তাহলে তিনি আসামীকে খালাস দিতে বাধ্য। এতে কে কী বলবে, কোন পত্রিকা কী লিখবে, এসব তার বিবেচ্য বিষয় নয়। আসামী ধনী না কি দরিদ্র, আসামীর নামে আরও এক হাজার মামলা আছে কি না, আসামী প্রভাবশালী কি না, এগুলোও এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। বিচারককে থাকতে হয় সম্পূর্ণ প্রিজুডিসমুক্ত।  

৩। কোনো অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার কিছু প্রক্রিয়া আছে। ফেয়ারনেস অব জাস্টিস নিশ্চিত করতে এ প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর কোনো উপায় নেই। ন্যায়বিচার মানে শুধু বাদীর পক্ষে রায় দিয়ে দেয়া নয়। ন্যায়বিচারে আসামীর মৌলিক অধিকারগুলোকে সুরক্ষা দেয়ার বাধ্যবাদকতা রয়েছে। এ সুরক্ষা দিতে গিয়ে বিচারককে যদি বিব্রতকর পরিস্থতিতির মুখোমুখি হতে হয়, বা আমজনতার রোষানলে পড়তে হয়, তাহলে সেটাও তিনি হাসিমুখে বরণ করেন। মানুষ কী চায়, সরকার কী চায়, মিডিয়া কী চায়, ফেসবুক কী চায়, এসব ভেবে কোনো বিচারক রায় লিখতে পারেন না। তিনি শুধু বিশ্লেষণ করবেন অভিযোগ, এবং প্রমাণ। প্রমাণ না হলে খালাস।  

৪। ফৌজদারি মামলায় আনীত অভিযোগ প্রমাণ করার দায়িত্ব বাদী পক্ষের, অর্থাৎ ‘বার্ডেন অব প্রুফ’ তার উপর বর্তাবে যিনি অভিযোগ আনলেন বা তদন্ত করলেন। যে-অভিযোগগুলো শাস্তিযোগ্য, সেগুলোর প্রতিটিকেই ‘সন্দেহাতীতভাবে’ প্রমাণিত হতে হবে। কোনো ফাঁকফোকর থাকতে পারবে না। ক্রিমিনাল জাস্টিসে এটাই স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাক্টিস। এখানে আবেগের বা কান্নাকাটির কোনো স্থান নেই।  

৫। অনেকের ধারণা, কোনো মামলায় আসামীর কাজ হলো নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা। এটি একটি গুরুতর ভুল ধারণা। ফৌজদারি মামলায় আসামীর কোনো কাজই নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এমনিতেই নির্দোষ। আইনের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ডক্ট্রিন হলো ‘প্রিজামশন অব ইনোসেন্স’, যেটিকে আমরা বলি ‘ইনোসেন্ট আনটিল প্রোভেন গিল্টি’। অর্থাৎ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামী সম্পূর্ণ নির্দোষ। এজন্য নিজেকে আলাদা করে নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো কাজ আসামীর থাকে না। অনুমানের ভিত্তিতে, বা বাদীর বক্তব্য শুনে, বা স্বাক্ষীর জবানবন্দী পড়ে, তাকে অপরাধী হিশেবে বিবেচনা করা যাবে না।  

৬। কোনো অপরাধের আইনি সংজ্ঞা আর আমজনতার সংজ্ঞা এক জিনিস নয়। বিচারকার্যে আমজতার সংজ্ঞা আমলে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। চুরি, খুন, ধর্ষণ, এ শব্দগুলো দিয়ে আমজনতা ও পত্রিকা যা বুঝে, একজন বিচারক বা আইনজীবী তা বুঝেন না। এ শব্দগুলোকে অপরাধ হতে হলে, দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়। একটি হলো ‘অ্যাক্টাস রিয়াস’, আরেকটি হলো ‘মেন্স রিয়া’। যৌন সঙ্গম সম্পাদিত হয়েছে, এটি হলো ধর্ষণের অ্যাক্টাস রিয়াস, আর সঙ্গমের সময় বাদীর সুস্পষ্ট অসম্মতি ছিলো, এটি হলো ধর্ষণের মেন্স রিয়া। আসামীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে, অ্যাক্টাস রিয়াস ও মেন্স রিয়া, দুটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়। একটু ফাঁকফোকর থাকলেই বিচারক আসামীকে খালাস দিতে বাধ্য।  

৭। যে-মামলার শাস্তি যতো কঠিন, সে-মামলা ততো ‘কঠিনভাবে’ প্রমাণ করতে হয়। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কাউকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হলে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সর্বোচ্চ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে। সেক্ষেতে ‘ল অব এভিডেন্স’ ও স্থানীয় সাক্ষ্য আইন অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। সাক্ষ্য-প্রমাণ বলতে সাধারণ জনতা যা বুঝে, আদালত কিন্তু তা বুঝে না। কোনো সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য কি না, এটি আদালতকে নিশ্চিত হতে হয়। এটিকে আমরা বলি ‘টেস্ট অব এডমিসিবিলিটি’। যে-প্রমাণ বা সাক্ষ্য আদালতে এডমিসিবল না, সে-সাক্ষ্য বা প্রমাণের উপর ভিত্তি করে রায় দেয়া যাবে না। যেমন কোনো ঘটনার অডিও রেকর্ড বা ভিডিও ফুটেজ। প্রমাণ হিশেবে আমজনতার কাছে এগুলো খুব জনপ্রিয়। কিন্তু কোনো দেশের আইনে এগুলো এডমিসিবল এভিডেন্স না-ও হতে পারে। আবার এডমিসিবল হলেও এগুলোকে ‘টেস্ট অব অথেনটিসিটি’ অতিক্রম করতে হয়। এক্ষেত্রে ‘ফরেনসিক রিপোর্ট’ ও ‘এক্সপার্ট ওপিনিয়োন’ দরকার পড়ে। ঘটনার ছবি বা ফুটেজ যতো সত্য-ই হোক, ‘ফরেনসিক রিপোর্ট’ ও ‘এক্সপার্ট ওপিনিয়োন’-এ যদি প্রতিবেদন নেগেটিভ আসে, তাহলে আদালতের কী করার আছে? এমন কি

প্রতিবেদন পজিটিভ এলেও, আসামী পক্ষের জেরার মুখে যদি দেখা যায় যে ওই প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ, তাহলেও আদালতের কিছু করার নেই। আদালত আসামীকে খালাস দিতে বাধ্য।  

৮। ধর্ষণের ঘটনায় চাক্ষুষ সাক্ষী সাধারণত পাওয়া যায় না। এজন্য ধর্ষণের ‘অ্যাক্টাস রিয়াস’ প্রমাণ করতে একমাত্র ভরসা মেডিক্যাল রিপোর্ট, ডিএনএ রিপোর্ট, ইত্যাদি। আলোচ্য ধর্ষণের মামলায় মেডিক্যাল রিপোর্ট নেগেটিভ। ডিএনএ রিপোর্ট-ও নেগেটিভ। বিচারকের এখানে কী করার আছে? এই রিপোর্ট তো বিচারক তৈরি করেন নি। বিচারক যে ৭২ ঘন্টার ভেতর ধর্ষণের মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন, এর প্রধান কারণ এটি। কারণ ধর্ষণের ৩৮ দিন, বা ১ বছর পর মামলা করলে, মেডিক্যাল রিপোর্ট পজিটিভ আসে না। আলামত ততোদিনে নষ্ট হয়ে যায়। যতো দেরিতে মামলা, ততো কঠিন সে-মামলা প্রমাণ করা।  


আরও পড়ুন:

বুড়িরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত

বিসিবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন সালাহউদ্দিন

রাজবাড়ীতে আওয়ামী লীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা

যে শর্তে নাগরিকত্ব দেবে সৌদি আরব


৯। বিচারক যে বলেছেন:

“তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে এ মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের ডাক্তারি প্রতিবেদনে কোনো সেক্সুয়াল ভায়োলেশনের (যৌন সহিংসতা) বিবরণ নেই। ভুক্তভোগীর পোশাকে পাওয়া ডিএনএ নমুনা আসামিদের সঙ্গে মিলেনি। ৩৮ দিন পর এসে তারা (দুই ছাত্রী) বললো ‘রেপড হয়েছি’, বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তার বিবেচনা করা উচিত ছিল” 

এটি সঠিকই বলেছেন। কারণ অ্যাক্টাস রিয়াসের সুস্পষ্ট প্রমাণ না পেলে তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশীট দেবেন কেন? কিন্তু বাংলাদেশে এটি রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কিছু আইনে মামলা হলে অবশ্যই চার্জশীট দিতে হবে। এটি একটি কুসংস্কার। প্রমাণযোগ্য অপরাধ না পাওয়া গেলে, মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া উচিত। এতে আদালতগুলোতে মামলাজট কমবে। আর “তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে…” মানে এই নয় যে তিনি বাদী বা আসামী পক্ষ থেকে টাকা-পয়সা খেয়েছেন। টাকা-পয়সার পাশাপাশি, আমজনতা ও মিডিয়ার বাড়াবাড়ি অনেক বড় প্রভাবক। বহু মামলায় মিডিয়া ও আমজনতার চাপে পড়ে, প্রমাণ না পাওয়া সত্বেও তদন্ত কর্মকর্তা বানিয়ে বুনিয়ে চার্জশীট দিয়ে থাকেন। মিডিয়া ট্রায়ালের এ সংস্কৃতি দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিত। আপনি যদি জানেন যে অপরাধের মেন্স রিয়া দূরের কথা অ্যাক্টাস রিয়াসও খুঁজে পান নি, তাহলে আপনি শুধু শুধু চার্জশীট দিয়ে ‘পাবলিক টাইম নষ্ট’ করবেন কেন? 

১০। মেডিক্যাল রিপোর্ট ও ডিএনএ রিপোর্ট নেগেটিভ এলে, অ্যাক্টাস রিয়াস প্রমাণের একমাত্র ভরসা পারপার্শ্বিক প্রমাণ, যেটিকে আমরা ‘সার্কামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স’ বলে থাকি। এখন দেখুন: “হোটেলের কোনো সাক্ষী বলেননি, সেদিন ওই দুই নারী হোটেলে ছিলেন। এমনকি হোটেলের রেজিস্ট্রার খাতায় ওই দুই ভুক্তভোগীর নাম নেই”
এখানে বিচারকের কী করার আছে? বিচারকের কাজ কি এভিডেন্স ম্যানুফ্যাকচার করা? নো, নেভার। এভিডেন্সকে বাদীর পক্ষে ম্যানিপুলেটও করার সুযোগও তার নেই।  

১১। ‘সার্কামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স’-কে ক্রস-ইগজামিনেশনে টিকতে হয়। ক্রস-ইগজামিনেশনের সময় যদি সাক্ষী ত্রুটিপূর্ণ কথা বলেন, বা সন্তোষজনক জবাব আদালতকে না দিতে পারেন, সেক্ষেত্রে বিচারক কী করবেন? ক্রস-ইগজামিনেশনে যদি কোনো এভিডেন্স ইনঅ্যাডমিসিবল হয়ে পড়ে, তখন বিচারক চাইলেও ওই এভিডেন্সকে আমলে নিতে পারেন না। এখন আমজনতার দাবি হলো, বিচারক যেন প্রিজুডিসড হয়ে এভিডেন্স আমলে নেন! এটা কোনো কথা? আমজনতাকে খুশি করা কি বিচারকের কাজ? 

১২। সব এভিডেন্সের মূল্যও সমান নয়। যেমন হিয়ারসে এভিডেন্স। ফৌজদারি মামলায় প্রচুর হিয়ারসে এভিডেন্স আসে, যেগুলো আদালতকে খুব সাবধানে আমলে নিতে হয়। আবার সাক্ষীর ক্রেডিবিলিটিও এখানে বড় ব্যাপার। উকিল যদি জেরা করার সময় বের করেন যে, ওই সাক্ষীর অতীতে মিথ্যে কথা বলার ইতিহাস আছে, তাহলে তার দেয়া জবনাবন্দী দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল জবানবন্দীর ভিত্তিতে কোনো বিচারক কাউকে কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন না।  

১৩। ধর্ষণের মেন্স রিয়া প্রমাণে, অর্থাৎ সঙ্গমে বাদীর সম্মতি ছিলো কি না, এটি নিশ্চিত হতে অনেকগুলো বিষয় আদালতকে বিবেচনায় নিতে হয়। যেমন কোনো নারী যদি আসামীর অপরিচিত হন, বা তার সাথে যদি আসামীর প্রণয়সুলভ বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক না থাকে, তাহলে মেন্স রিয়া প্রমাণ করা সহজ হয়। সেক্ষেত্রে অনেকটা প্রিমা-ফ্যাসি ধরে নেয়া হয় যে সঙ্গমে নারীটির সম্মতি ছিলো না (যদি নারীটির পতিতাবৃত্তির ইতিহাস না থাকে, কারণ পতিতাবৃত্তির ইতিহাস থাকলে টাকার বিনিময়ে কানসেন্সুয়াল সেক্সের সম্ভাবনা থাকে, যা ধর্ষণের মেন্স রিয়ার শর্ত পূরণ করে না)। তবে এটাই শেষ কথা নয়। বাদীকে পারিপার্শ্বিক অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপন করে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে হবে যে সঙ্গমে তার সুস্পষ্ট অসম্মতি ছিলো।  

আবার কোনো নারীর সাথে যদি আসামীর প্রণয়সুলভ সম্পর্ক থাকে, বা তার সাথে যদি অতীতে নিয়মিত কানসেন্সুয়াল সেক্সের ইতিহাস থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে অনেকটা প্রিমা-ফ্যাসি ধরে নেয়া হয় যে সঙ্গমে নারীটির সম্মতি ছিলো। এখানেও এটাই শেষ কথা নয়। বিচারককে প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা কেইস-টু-কেইস বিশ্লেষণ করতে হয়। অতীতে কানসেন্সুয়াল সেক্সের ইতিহাস থাকার পরও, কোনো নারী যদি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে বিচারাধীন সঙ্গমের ঘটনায় তার সুস্পষ্ট অসম্মতি ছিলো, তাহলে মেন্স রিয়ার শর্ত পূরণ হবে।  

আলোচ্য মামলায় বিচারক বাদীর অতীত ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছেন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এটি বলা তার দায়িত্ব। অন্যথায় তিনি কী উপায়ে মেন্স রিয়া নিরূপণ করলেন, তা জানা যাবে না। এমন নয় যে বিচারক ইচ্ছে করে বা বানিয়ে এটি বলেছেন। কোনো মামলার ক্রস-ইগজামিনেশনে আসামীপক্ষই এগুলো উপস্থাপন করে থাকে। এ উপস্থাপন তার ‘রাইট টু সেলফ-ডিফেন্স’-এর অংশ। আদালতে যদি এটি প্রমাণিত হয় যে আসামীর সাথে বাদী অতীতে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা করেছেন বা কানসেন্সুয়াল সেক্স করেছেন, বা এমনভাবে চলাফেরা করেছেন যেন মনে হয় যে আসামীকে তিনি সঙ্গমে সম্মতি দিয়েছেন, তাহলে বিচারক তার রায়ে এ ইতিহাস সুস্পষ্টভাবে লিখতে বাধ্য। কারণ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল হলে, উচ্চ আদালত জানতে চাইবেন কীসের ভিত্তিতে এ রায় দেয়া হয়েছে। অতীত ইতিহাস উল্লেখ করা মোটেও চরিত্র হননের কোনো অংশ নয়। বরং কানসেন্সুয়াল সেক্সকে যারা খারাপ চরিত্র হিশেবে দেখে, তাদের চরিত্রেই সমস্যা আছে। কেউ কানসেন্সুয়াল সেক্স করেছে মানে তার চরিত্র খারাপ, এটি একটি কুসংস্কার মাত্র। চরিত্রের সাথে সেক্সের কী সম্পর্ক? 

১৪। কেউ ধর্ষণের মামলায় খালাস পেলেন, এর অর্থ এই নয় যে তিনি ধর্ষণ করেন নি। এর অর্থ হলো: তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’ হয় নি। আবার কেউ ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তার মানেও এই নয় যে তিনি আসলেই ধর্ষণ করেছেন। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার অর্থ হলো, বাদীপক্ষ আসামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, সন্দেহাতীতভাবে ‘প্রমাণ করতে সক্ষম’ হয়েছেন।  

এই প্রমাণ প্রক্রিয়ায় বিচারকের ভূমিকা খুব সামান্যই। তবে ফেয়ারনেস অব জাস্টিস নিশ্চিত করার জন্য, দোষী সাব্যস্ত করার চেয়ে খালাসকে অধিক প্রাধান্য দিতে হয়। কারণ অধিকাংশ মামলায় ‘এক্সেসোরিয়াল লাইয়াবিলিটি’ জড়িত থাকে। ফলে এক আসামীকে শাস্তি দিতে আরেকজন নিরপরাধ মানুষকেও শাস্তি দিতে হয়। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান, এটিও আদালতকে নিশ্চিত করতে হয়। এজন্য আমি অনুরোধ করবো, বিচারক কামরুন্নাহারকে অযথা গালাগালি না করতে। তাঁর জায়গায় আপনি থাকলেও তাই করতেন।  

লেখাটি মহিউদ্দিন মোহাম্মদ​-এর ফেসবুক থেকে নেওয়া (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv নাজিম

;