বিশ্বের বিটকয়েন মুদ্রার খনি হয়ে উঠেছে কাজাখস্তান
বিশ্বের বিটকয়েন মুদ্রার খনি হয়ে উঠেছে কাজাখস্তান

সংগৃহীত ছবি

বিবিসি বাংলা’র প্রতিবেদন

বিশ্বের বিটকয়েন মুদ্রার খনি হয়ে উঠেছে কাজাখস্তান

অনলাইন ডেস্ক

এই খনির ভেতরে রয়েছে আটটি ওয়্যারহাউস, যেখানে রয়েছে ৫০ হাজার যন্ত্রপাতি। এই যন্ত্রপাতি বিটকয়েন এবং অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি বা খনন করছে।

চীন গত বছর যখন হঠাৎ করেই ক্রিপ্টোকারেন্সির খনিগুলো নিষিদ্ধ করে দেয়, তখন থেকেই প্রতিবেশি কাজাখস্তানে এই ব্যবসা দ্রুত প্রসার লাভ করতে শুরু করে। বিটকয়েন, যা ক্রিপ্টো মুদ্রা নামে পরিচিত তার খনি ব্যবসায় বা কয়েন মাইনিংয়ে মধ্য এশিয়ার এই দেশটি এখন দ্বিতীয় স্থানে।

এই ব্যবসায় প্রথম স্থানে রয়েছে আমেরিকা।

তবে কাজাখস্তানের এই মাইনিং ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠলেও এই মাইনিং ব্যবসা যেগুলোকে এক অর্থে খনি বলা যায়, সেগুলো চালাতে যে বিশাল পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হয় তা এখন দেশটির কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোর ওপর বিরাট চাপ তৈরি করছে এবং তা বড়ধরনের উদ্বেগেরও জন্ম দিচ্ছে।

কিন্তু বিটকয়েন মুদ্রার এই খনিগুলো কেমন? সেখানে মুদ্রার মাইনিং হয় কীভাবে?
নতুন এই ব্যবসায় নেমেছেন মলডির শুবাইয়েভা। ধুলো ভরা জমির ওপর নির্মাণ প্রকৌশলী আর নির্মাণ শ্রমিকরা গড়ে তুলছেন তার নতুন বিটকয়েন মুদ্রার খনি।

কেতাদুরস্ত পোশাক আর বড়সড় হলুদ রংএর সানগ্লাস পরে ৩৫ বছর বয়সী মলডির নিজের খনির নির্মাণকাজ নিজেই তদারকি করছেন। ধারণা করা হয় মলডির কাজাখস্তানের প্রথম নারী বিটকয়েন খনি মালিক।

বিটকয়েন খনির ব্যবসায় নারীও

কাজাখস্তানে ক্রিপ্টোকারেন্সির যে নতুন ব্যবসা দ্রুত জমে উঠেছে, তাতে ঝাঁপিয়ে পড়া নতুন ব্যবসায়ীদের একজন মলডির শুবাইয়েভা। আলমাটি শহরে তার নতুন খনি তৈরির কাজের সমস্ত খুঁটিনাটি তিনি নিজেই তদারকি করছেন।

পুরুষ অধ্যুষিত এই ব্যবসার জগতে মলডির বেশ ব্যতিক্রমী একজন ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। দেশটির বিটকয়েন মাইনিং ব্যবসায় তিনি প্রথম সারির একজন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠায় তার প্রতি ব্যবসায়ী মহলের সম্মানও বেড়েছে।

তিনি বলেন, "গত চার বছর আমার জীবনের প্রায় সমস্ত সময়টা আমি এই ব্যবসার পেছনে ব্যয় করেছি। আমি এমনকি রাতে অফিসেও ঘুমিয়েছি।

পাঁচ বছর আগে মলডির বিটকয়েন মাইনিং ব্যবসায় আগ্রহী হন এবং বাসায় বসে তার ভাইয়ের সাথে এই মুদ্রার মাইনিং শুরু করেন। এরপর তিনি বড় বড় খনি তৈরির কাজে নামেন এবং তার বেশ কিছু খনি অন্য খদ্দেরদের ভাড়া দিতেও শুরু করেন।

তিনি বলছেন, কাজাখস্তানে এই বিটকয়েনের ব্যবসা এবং একই সাথে তার নিজের ব্যবসাও ফুলে ফেঁপে উঠেছে। বিশেষ করে গত বছরে ব্যবসার ঊর্ধ্বগতিতে কোন সময়ই ভাঁটা পড়েনি।

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন আমার সকাল শুরু হয় বিটকয়েনের দাম কতটা বেড়েছে তা দেখার মধ্যে দিয়ে। যখন আমি দেখি একেকটা বিটকয়েনের দাম ৫০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে-আমি উৎসাহে টগবগ করতে থাকি! আমার রক্তেও অ্যাড্রিনালিনের মাত্রা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। "

বিটকয়েনের দাম নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে একটা বিটকয়েন মুদ্রার মূল্য ছিল প্রায় পাঁচ হাজার ডলার। আর মাত্র এক বছরের মধ্যে একটা কয়েনের দাম লাফিয়ে উঠে গেছে ৬৫ হাজার ডলারে। তবে এরপর বিটকয়েনের দাম কিন্তু আবার ব্যাপকভাবে পড়েও গেছে।

কাজাখস্তানের এই বিশাল খনিগুলোতে কী হয়?

কাজাখস্তানে এই শিল্পের কী ধরনের বিস্তার ঘটেছে, তার আঁচ পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে আলমাটি থেকে ৮০০ মাইল দূরের বিচ্ছিন্ন শহর একিবাসটুজে। শহরটিতে সবসময়ই দমকা হাওয়ার প্রাদুর্ভাব।

কিন্তু এখানেই রয়েছে এতদিন পর্যন্ত যেটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সির খনি বলে পরিচিত ছিল, যেটি এনেজিক্স কোম্পানির নির্মিত একটি বিটকয়েন খনি।

বিশাল এই খনির ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই আপনার নজরে যেটা আসবে সেটা হল সেখানকার প্রচণ্ড আওয়াজ।

ভেতরে একসাথে চলছে হাজার হাজার খবুই শক্তিশালী কম্পিউটার। কম্পিউটারগুলোর ভেতরের পাখাগুলো পূর্ণগতিতে একসাথে ঘুরছে শোঁ শোঁ শব্দ তুলে।

বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই খনির অন্য প্রান্তে ঘুরছে তাপমাত্রা কমানোর জন্য প্রকাণ্ড একটা পাখার বিশাল বিশাল ব্লেডগুলো। সেখানে থেকে তৈরি হচ্ছে নিচু মাত্রার একটা শব্দ-যা আওয়াজ তুলছে একনাগাড়ে-সার্বক্ষণিক।

ওই কেন্দ্রের মালিক ৩৪ বছর বয়সী ইয়েরবোলসিন জানান, "খনির ভেতরে সর্বক্ষণ চালু থাকা এই যন্ত্রগুলোর অনবরত আওয়াজ আমাকে চাঙ্গা রাখে, উদ্দীপ্ত করে-কারণ আমার কাছে এই শব্দ হল অর্থ প্রবাহের শব্দ-ডিজিটাল অর্থ উপার্জনের শব্দ-সংকেত।

পরিবেশ ঝুঁকিতে

তবে কাজাখস্তানের এই সাম্প্রতিক সাফল্যে সবাই গর্বিত নয়। পরিবেশবাদীরা প্রায়ই সমালোচনায় সোচ্চার হয়ে উঠছেন যে এই মুদ্রার মাইনিং-এর জন্য বিশাল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে।

কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিটকয়েনে বিদ্যুত ব্যবহারের সূচক বলছে ইউক্রেন বা নরওয়ের মত দেশে সারা দেশের জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় তার থেকেও বেশি বিদ্যুতের দরকার হয় বিটকয়েন মাইনিং করতে।

এই জ্বালানির কতটা নবায়নযোগ্য তা জানা নেই, তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ডানা ইয়েমলিওনক বলছেন যে কাজাখস্তানে ব্যবহৃত জ্বালানির মাত্র ২% আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে।

জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ

ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইনিং যেভাবে বেড়েছে তাতে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে এমন উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

সরকার বলছে এক বছরে যে পরিমাণ মুদ্রা মাইনিং হয়েছে, তাতে দেশ জুড়ে এক বছরে জ্বালানির চাহিদা ৭-৮% বেড়েছে।

দেশটিতে ক্রিপ্টোমুদ্রা খননের কাজে যে পরিমাণ বিদ্যুত ব্যবহার হচ্ছে তা কাজাখস্তানের একটি বড় শহরের আলোর চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সমান।

গত নভেম্বর মাসে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়েছে। যেসব এলাকায় পর্যাপ্ত বিদ্যুত সরবরাহ নেই, সেসব এলাকায় বিটকয়েন বা ডিজিটাল মুদ্রার খনি বসানোর ওপর বিধিনিষেধ দেয়া হয়েছে। ফলে কিছু মাইনারকে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বা ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে।

দেশটির ডিজিটাল উন্নয়ন বিষয়ক উপ-মন্ত্রী আসখাত ওরাযবেক বলেছেন, কাজাখস্তানে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসার এই হঠাৎ বৃদ্ধি অতি দ্রুত ঘটেছে, যেটি নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটা উচিত ছিল।

তার সরকার জানুয়ারি ২০২২ থেকে এই খনি শিল্পের ওপর বিদ্যুত ব্যবহারের জন্য বাড়তি কর ধার্য করেছে। তাদের আশা এই বাড়তি রাজস্ব ব্যবহার করে তারা দূষণমুক্ত জ্বালানির ব্যবহার গড়ে তুলতে পারবেন।

news24bd.tv/ কামরুল 

;