বৈশ্বিক উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধির পরিণাম
বৈশ্বিক উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধির পরিণাম

ফ্রান্সে দাবানল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনো পরিস্থিতি ভয়াবহ। ছবি : রয়টার্স

বৈশ্বিক উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধির পরিণাম

অনলাইন ডেস্ক

শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে পৃথিবীর উষ্ণতা ১.১  থেকে ১.৩ ডিগ্রি বেড়েছে। এখনকার শিশুদের তাদের পিতামহদের থেকে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার শিকার হওয়ার আশঙ্কা ৭ গুণ বেশি। বৈশ্বিক উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধির পরিণাম হতে পারে বিপর্যয়কর। এর প্রভাবে দাবদাহ, খরা, অতিবৃষ্টি, দাবানল দেখা দেবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হলিউডের বিপর্যয় বিষয়ক চলচ্চিত্রগুলোতে যা দেখা হয় তা নিছকই গল্প হলেও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপকভাবে না কমালে ভবিষ্যতের বাস্তব তার থেকে খুব আলাদা হবে না।  

বিশ্বের কিছু কিছু স্থানে উষ্ণতাবৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বস্তিগুলো ভরে উঠেছে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে। বন্যা ও নদীভাঙনে জমি হারিয়ে বস্তিতে ঠাঁই নিচ্ছে তারা।

মাত্র ১.১ থেকে ১.৩ পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধিই তাদের জীবনযাত্রা পাল্টে দিয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে ঢাকায় পাড়ি জমানো লোকের সংখা বছরে ৪ লাখ। জলবায়ু মডেল বলছে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।

জলবায়ু বিজ্ঞানী ইউরি রগেলি দশটি বছর কাটিয়েছেন জাতিসংঘের জন্য ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জলবায়ু মডেলিং তৈরি করে। বিশ্বব্যাপী শত শত বিজ্ঞানীর সংগৃহীত তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করে এসব মডেল তৈরি করেন তিনি।

রগেলির ধারণা, বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রতি চার এ এক। সব প্রতিশ্রুতি মেনে চললেও তা হতে পারে ২ ডিগ্রি। তারপরও ২০ এ ১ সম্ভাবনা থাকবে ৩ ডিগ্রিতেই ওঠার।

৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি সবাইকে প্রভাবিত করবে। ধনী দেশগুলোর সমৃদ্ধ নগরগুলোও রেহাই পাবে না। প্যারিস ও বার্লিনের মতো শহর দাবদাহে ধুঁকবে। ঘন ঘন ঝড় ও জ্বলোচ্ছ্বাস নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন অংশকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে পারে।

দ্য ইকনমিস্টের ব্রিফিংস এডিটর অলিভার মর্টন বলেন, ‘নগরগুলো সাধারণত আশপাশের অঞ্চল থেকে বেশি উষ্ণ। সেখানে বন্যার প্রবণতা বেশি। শহরে মানুষ বেশি বলে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অনেক বেশি লোক। অনেক শহর ভবিষ্যতের সমস্যার জন্য তৈরি নয়। ’ তবে ৩ ডিগ্রির জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া শহরের অবস্থা হয়তো তত খারাপ হবে না। অন্যদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠবে খুবই খারাপ। এ পর্যন্ত কিছু শহর হালকা সমস্যার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক গ্রামীণ অঞ্চল অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ভুগছে।  

তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ক্ষুদ্রচাষীদের ক্ষতি হচ্ছে বেশি। তারাই বিশ্বের খাদ্য সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে। মধ্য আমেরিকায় চরম খরার আশঙ্কা এখন গত শতাব্দীর চেয়ে চারগুণ বেশি। এ অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো লোকের সংখ্যা ১৯৯০ সাল থেকে ৪ গুণ বেড়েছে। এর সবই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য না হলেও খরার মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে আরও লোক দেশান্তরী হবে।  

৩ ডিগ্রি তাপ বাড়লে মধ্য আমেরিকা অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমতে পারে ১৪% পর্যন্ত। বিশ্বের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস চরম খরার শিকার হতে পারে। উত্তর আফ্রিকায় খরা হতে পারে টানা কয়েক বছর ব্যাপী।

আবার অনেকের জন্য সমস্যা হবে অতিমাত্রায় বৃষ্টি। বিশ্বের জনসংখ্যার ১০% বাস করে উপকূল ঘেঁষে যার উচ্চতা কিনা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটারের কম। ওই উপকূলবাসীর জন্য ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধি মহাবিপদ ডেকে আনবে। ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০০৫ সালের তুলনায় আধা মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশেষ করে নাইজেরিয়ার লেগোসের মত নিচু এলাকায় গড়ে ওঠা নগরগুলো বিপদে পড়তে পারে। শহরটির জনসংখার এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপ ফিজি ইতিমধ্যেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির শিকার। সেখানে ছোট ছোট জনপদ গিলে খাচ্ছে সাগর।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে ঝড়জনিত বন্যাও বাড়বে। ৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ফিলিপাইন ও মিয়ানমারের মতো বহু দেশে ঝড়ের কারণে বহু মানুষ ঘরহারা হবে। তারা পাড়ি দেবে শহরে। শহরে ইতিমধেই থাকে বিশ্বের অর্ধেক মানুষ। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থাকে বস্তিতে। তাদের জন্য ৩ ডিগ্রি হবে এক মহা বিপর্যয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের মডেল আবহাওয়ার কথা বললেও তাতে সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো সেভাবে উঠে আসে না। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভিবাসনের ধরনে বদল আসবে। পানি হয়ে উঠবে মহার্ঘ। এ কারণে অভিন্ন জলপ্রবাহের পানিবন্টন দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে।

বিভিন্ন অঙ্গীকার সত্ত্বেও উষ্ণতাবৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিন হাউস গাস নিঃসরণ ২০১০ এর পর্যায় থেকে ২০৩০ নাগাদ ১৬% বাড়বে। এ কারণে ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধি এড়াতে প্রশমনের ওপর জোর দেওয়াটা খুব জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

দ্য ইকনমিস্টের ব্রিফিংস এডিটর অলিভার মর্টন মনে করেন, শস্য বহুমুখীকরণ ও সাগরে বাঁধ জাতীয় কাঠামো কার্যকর কৌশল হবে। তবে তার মতে ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধি মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে ৩ ডিগ্রিতে আদৌ না পৌঁছানো।

সূত্র: দ্য ইকনমিস্ট