আমলা লীগ জয় বাংলা আমলাতন্ত্র জিন্দাবাদ

নঈম নিজাম

আমলা লীগ জয় বাংলা আমলাতন্ত্র জিন্দাবাদ

এক সচিবের মা অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি হলেন। মন্ত্রণালয়ের আদেশে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী হাসপাতালে ডিউটি করলেন। তাদের কাজ ছিল প্রতিদিন সচিবের মায়ের চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করা এবং কী কাজ করলেন তা সচিবের পিএসকে জানানো। ঘটনা জানাজানির পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলেছেন, এমন নির্দেশ জারি হয়নি মন্ত্রণালয় থেকে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এমনিতে যেতেন দেখতে।  সাংবাদিকরা হাসপাতালে সরেজমিন প্রত্যক্ষ করে মন্ত্রণালয়ের লোকজনকে পেয়েছেন ডিউটি করতে। বড় অদ্ভুত একটা সমাজে বাস করছি। চারদিকে শুধু ক্ষমতাবান মানুষ দেখি। সীমাহীন দাপট দেখি। অনেক রাজনীতিবিদের দীর্ঘশ্বাস শুনি। আমলা লীগ স্লোগান শুনি। একদা জিন্দাবাদ শুনতাম তাদের মুখে। মাঠপর্যায় থেকে সচিবালয়ে একটা আমলা যুগ চলছে। ক্ষমতা কাকে বলে, কত প্রকার দেখিয়ে দিচ্ছেন। 

রাজনৈতিক সরকারকে মাঝেমধ্যে জিম্মি মনে হয়। অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না। রাজনৈতিক সরকার চলবে নির্বাচনের সময় দেওয়া অঙ্গীকার অনুযায়ী। সামনে থাকবে ভোটের ইশতেহার। ক্ষমতা পাওয়া রাজনীতিবিদরা নির্দেশ দেবেন, আমলারা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবেন। এটাই নিয়ম। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে সবকিছুর গাইডেন্স আছে। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছেটা কী? গত তিন বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। আমলারা সীমাহীন দাপুটে হয়েছেন। নিজেরাই সুযোগ-সন্ধানীর মতো স্লোগান ও মিছিল করছেন। রাজনীতিবিদের তোয়াক্কা করছেন না। ক্ষমতার দ্ব›েদ্ব জড়িয়ে পড়ছেন কারণে-অকারণে। এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। এভাবে সরকারকে সহায়তা করা হয় না। আনুগত্যও সঠিকভাবে প্রকাশিত হয় না। সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নই আনুগত্যের সঠিক প্রকাশ।

সব আমলেই আমলারা ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করেন। শক্তিশালী, ব্যক্তিত্ববান মন্ত্রী-এমপির সামনে অবশ্য তা পারেন না। রাজনীতিবিদের দুর্বলতা দেখলেই পেয়ে বসেন সবাই। এরশাদের জি সেভেনের কথা শুনতাম। বিএনপির ’৯১ আমলেও ক্ষমতাবান অনেক আমলার নামডাক ছিল। আর এখন তো কথাই নেই। ক্ষমতা দেখানো সচিবালয় থেকে মাঠে চলে গেছে। নিক্সন চৌধুরী লড়াই করতেন কাজী জাফরুল্লাহর মতো দাপুটে নেতার সঙ্গে। একটা ভাব ছিল। কিন্তু একজন ইউএনওর সঙ্গে লড়তে গিয়ে বিপাকে পড়লেন। সেদিন একজন এমপি দুঃখ করে বললেন, ‘আমাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। গাইবান্ধার এমপি লিটন গুলি খেয়ে মরলেন। কোনো এমপি কিন্তু সরকারি নিরাপত্তারক্ষী পাননি। অথচ একজন ইউএনওর বাসায় ডাকাতির পর সারা দেশের সব কর্মকর্তা নিরাপত্তায় আনসার পেলেন। একবারও তদন্ত হলো না ডাকাতি হওয়া বিশাল অঙ্কের টাকা কীভাবে এলো ইউএনওর বাসায়। এ টাকার উৎসের সন্ধানে তদন্ত হয়নি।’ এমপি সাহেবদের দুঃখটা বুঝি। বরিশালের ঘটনার পর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের বিবৃতি দেখে বিস্মিত, হতাশ হয়েছি। এটা কোন ধরনের ভাষা রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে? এভাবে বিবৃতি দিয়ে ‘দুর্বৃত্ত’ বলার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলাম না! রাজনীতিবিদরা আজকাল অনেক সহনশীল। খুব ভালো!

বরিশালের ঘটনা মোটেও ভালো বার্তা দিল না। ব্যক্তিগতভাবে বরিশালের মেয়র সাদিক আবদুল্লাহকে জানি না। একটি রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠলেও ’৯৬ সালের সরকারের মেয়াদে তাদের দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অনেক কথা শুনতাম। সরকারের এই মেয়াদে তাকে দেখলাম মেয়র হিসেবে। মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ কতটা ভালো-মন্দ তার মূল্যায়ন বরিশালবাসী করবেন। রাজনীতিবিদদের একটা জবাবদিহি থাকে জনগণের কাছে। আমলাদের কোনো জবাবদিহি নেই। তারা যা খুশি বলতে পারেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে এ অধিকার নিজেরাই বেশি প্রকাশ করছেন। দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হলে এমনই হয়। বরিশালের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখেছিলাম। মেয়রের দোষটা কোথায় বুঝলাম না। একটি শহরে রাজনৈতিক পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন খোলা ও লাগানোর দায়িত্ব রাজনৈতিক কর্মীদের। আর এর মধ্যে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী কার্যক্রম থাকলে দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের। শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। 

বরিশালের মেয়র শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে ব্যানার, ফেস্টুন খোলার অধিকার রাখেন। এ নিয়ে লঙ্কাকান্ড বাধানো, গুলি, হামলা অবশ্যই প্রশ্ন তৈরি করে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা গুলিবিদ্ধ হলেন, তারপর কিছু ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী ইউএনওর পক্ষ নিলেন সামাজিক মাধ্যমে। একজনের কাছে জানতে চাইলাম, কী ব্যাপার? জবাবে বললেন, ইউএনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। বুঝলাম সমস্যা এখানেই। পেশাদারি থাকলে সে রাতে এত সমস্যা তৈরি হতো না।

রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে একদল অতি উৎসাহী কর্মকর্তা বেড়ে ওঠেন। তারা স্লোগান দেন, মিছিল করেন। আওয়ামী লীগ আমলে স্লোগান আসে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বিএনপি আমলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে আমলাকুল তাদের হয়ে যান। আবার ক্ষমতাচ্যুতির পর সেই দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা নিখুঁতভাবে সাজিয়ে দেন। কারাগার নিশ্চিত করেন। রাজনীতিবিদরা জেলে যান। আমলারা অবসরের পর বিদেশে গিয়ে বিলাসী জীবন কাটান। দেশে থাকলেও আরাম-আয়েশের শেষ নেই। অনেকে আবার রাজনীতিতে জড়িয়ে মন্ত্রী-এমপি হন। কেউ নেন রাজনৈতিক নিয়োগ দেশে-বিদেশে। তিল তিল শ্রম, মেধা, ঘাম ঝরিয়ে, হামলা-মামলা, জেল-জুলুমের বিনিময়ে রাজনৈতিক কর্মীরা দলকে ক্ষমতায় আনেন। আর ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক কর্মীদের দোষের শেষ থাকে না। বিরোধী দলে থাকতে তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা থাকে। পুলিশের খাতায় এ কারণে তারা আসামি। আর আমলারা থাকেন ধোয়া তুলসীপাতা। তারা রাজনীতিবিদদের ভুলটাই ধরেন। আচ্ছা, একটি সরকারি অফিসের কথা বলুন যেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ হয়? একজন এমপি বা জনপ্রতিনিধির বাড়িতে কাকভোর থেকেই মানুষের ঢল দেখা যায়। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন কাজ নিয়ে ছুটে যান। জনপ্রতিনিধিকে মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনতে হয়। ব্যবস্থা নিতে হয়। তার পরও তাদের নানামুখী দোষারোপে পড়তে হয়। আর ব্রিটিশরা নিজেদের শাসনের সুবিধার্থে আমলাতন্ত্র তৈরি করেছিল। খোদ ব্রিটেনে এ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর নেই। সবকিছু ভর করেছে আমাদের ওপর।

সাবেক সচিব ইব্রাহিম হোসেন খানের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি অফিসার্স ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস ছিলেন। তাকে বললাম বরিশালের ঘটনা ঘিরে আপনার সার্ভিসের বিবৃতিটি কীভাবে দেখেন? জবাবে বললেন, বিস্মিত হয়েছি। এভাবে রাজনীতিবিদদের খাটো করার অধিকার কোনো সার্ভিসের নেই। আর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অ্যাসোসিয়েশন কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নয়। যখন যা খুশি বিবৃতি প্রদান এ সার্ভিসের কাজ নয়। তিনি দুঃখ করে বলেন, অতি উৎসাহীরা সর্বনাশ বেশি করে। সরকারের আপন সেজে অনেক সময় কেউ কেউ সরকারের বারোটা বাজায়। প্রশাসন সার্ভিসেও এখন তা-ই চলছে। একই ধরনের অভিমত প্রশাসন ক্যাডারের আরেক সাবেক কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের। তিনি বললেন, রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে এভাবে বিবৃতি প্রদান ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও দুঃখজনক।

প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে এ সরকারের ভুল বোঝাবুঝি বরিশালেরটাই প্রথম নয়। এর আগে এমপি নিক্সন চৌধুরীর ঘটনাসহ আরও বেশ কিছু কাহিনি বিভিন্ন সময় প্রত্যক্ষ করেছি। এভাবে অতীতে এত অ্যাকশন, রি-অ্যাকশন দেখিনি। আজকাল প্রশাসন থেকে সহনশীলতা শব্দ উঠে যাচ্ছে। ক্ষমতার ইগোতে ভুগছেন সবাই। জনপ্রতিনিধিরা এখন মাঠপর্যায়ে কথা বলতে ভয় পান। কোনটির কী অ্যাকশন কর্মকর্তারা কীভাবে নেন এ নিয়ে তাদের মধ্যে দোটানা কাজ করছে। এ দোটানা মনোভাবই আগামীতে ক্ষতিগ্রস্ত করবে ক্ষমতাসীন দলকে। ভোট নিয়ে প্রশাসন মনে করে, জনগণ নয়, তারাই জয়ের নায়ক। জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্ব না দিলেও চলে। একবারও তারা বুঝতে চাইছেন না, ২০১৪ আর ২০১৮ এক ছিল না। ২০১৮ সাল সবকিছু আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। মাঠ ছিল আওয়ামী লীগ কর্মীদের দখলে। আর আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল। এ দলের সঙ্গে কিছু পরিবার, ব্যক্তি অঞ্চলভিত্তিক স্বকীয় অবস্থান নিয়ে কাজ করেন। এ দলের জন্ম ক্ষমতার চেয়ারে হয়নি। জনগণের দল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ শব্দটি অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ। সে ইতিহাস ভুলে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে দূরত্ব ও বিবাদ বাড়ানো আগামী দিনে ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

এবার ভিন্ন একটা গল্প শোনাই। ইউটিউবে সৌরভ গাঙ্গুলীর একটি বক্তব্য শুনছিলাম। আইপিএলের তখন প্রথম মৌসুম। রয়েল চ্যালেঞ্জার বেঙ্গালুরুর সঙ্গে খেলা কলকাতা নাইট রাইডার্সের। বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ। নাইট রাইডার্স ড্রেসিং রুম জমজমাট বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানকে ঘিরে। ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী ও পাকিস্তানের বিখ্যাত ক্রিকেটার শোয়েব আখতারসহ অন্য খেলোয়াড়রাও। কলকাতার হয়ে খেলছেন শোয়েব। সৌরভ খেয়াল করলেন শাহরুখকে দেখলেই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকেন শোয়েব। মনে হয় দেবদূতকে দেখছেন। সৌরভ প্রশ্ন করলেন কেন এভাবে এত বিস্ময় নিয়ে শাহরুখকে দেখেন শোয়েব। আরও বললেন, ‘ভগবানের মতো শাহরুখের দিকে তাকিয়ে থাক। আমার দিকে তো তাকাও না।’ শোয়েব হাসলেন। তারপর বললেন, ‘পাকিস্তানে শাহরুখের জনপ্রিয়তা বিশাল। পাকিস্তানের মানুষ তাকে কী পরিমাণ ভালোবাসে চিন্তাও করতে পারবে না তুমি। চিন্তা করি এই মানুষটি কী করে এ বিশালত্ব তৈরি করেছেন।’ সৌরভ বললেন, ‘শাহরুখ পাকিস্তান কেন ভারতেও বিশাল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। সবাই এখানে তাকে আরও বেশি ভালোবাসে।’ দুজনের কথা শুনছিলেন শাহরুখ খান। তিনি তাদের কথা শুনে হাসলেন। সৌরভ এবার শাহরুখকে বললেন, ‘আমরা ১১ জনের টিম নিয়ে খেলে নিজেদের প্রকাশ ঘটাই। টিম পারফরম্যান্স ১১ জনের। তার পরও নির্বাচকদের ওপর পরের খেলার ভাগ্য নির্ভরশীল। নির্বাচকের পছন্দ না হলেই ক্যারিয়ার শেষ। কেউ বুঝতে চান না ১১ জনের টিমে একার করার কিছু নেই। শাহরুখের কোনো টিমের ব্যাপার নেই। একাই এক শ। দর্শক মুগ্ধ হয় একজনের ওপরই। ছবি হিট হয়ে যায় একজনের অভিনয়ে। ১১ জনের টিমওয়ার্কের প্রয়োজন নেই। একজন শাহরুখ খানের নামই যথেষ্ট।’

সৌরভের কথা শুনে হাসলেন শাহরুখ। বললেন, ‘ভাইরে! একদিনে হুট করে আমার জীবনে কোনো কিছু আসেনি। যখন মুম্বাই আসি অনেক কষ্ট করেছি। হৃত্বিক রোশানের মতো সেরা ড্যান্সার, সালমানের মতো হ্যান্ডসাম, বলিষ্ঠ ট্যালেন্টেড ছিলাম না। দেখতেও তেমন কিছু না। আবার চলচ্চিত্রে কাপুর পরিবার থেকে আসিনি। থাকার জায়গা ছিল না মুম্বাই শহরে। এক রুমের একটি বাসায় বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করে থাকতাম। মাঝেমধ্যে বান্দ্রার সৈকতের পাশে লোহার বেঞ্চিতে শুয়ে-বসে সময় কাটাতাম। ভাবতাম সমুদ্রের তীরের এ বাড়িটি যদি আমার হতো! এখন সেই বাড়িটির মালিক আমি। সেই বাড়ির মালিক হতে হয়েছে কঠিন শ্রম-মেধা-ঘামের বিনিময়ে।’ বিভিন্ন খেলোয়াড় এবার প্রশ্ন করেন, তুমি কী করে সফল হলে আরও বিস্তারিত বল। জবাবে শাহরুখ বললেন, ‘প্রতি সকালে ঘুম ভাঙলে আয়নার সামনে দাঁড়াতাম। বুঝতাম অনেক বড় নায়কের মতো চেহারা আমার নেই। নিজের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করতাম, আমার যা আছে তা নিয়েই সফল হতে চাই। আমার যতটুকু আছে ততটুকু নিয়েই নিরলসভাবে কাজ করে যেতে চাই। সারা দিন কাজ করতাম। একাগ্রতা, হতাশাকে ঠাঁই না দিয়ে লেগে থাকা, কঠিন শ্রম, কষ্ট আর চেষ্টাই আমাকে আজকের অবস্থানে এনেছে। ডেডিকেশন ছাড়া কিছু জয় সম্ভব নয়।’

সৌরভ গাঙ্গুলীকে একবার একজন প্রশ্ন করেছিলেন- শচীনের মতো বিশ্বখ্যাত তারকার সঙ্গে খেলতে অসুবিধা হতো কি তোমার? জবাবে বললেন, ‘আড়াই শ-তিন শ ম্যাচে একসঙ্গে খেলেছি। আমি ব্যাট করার সময় বিপরীত দিকে থাকা তারকার দিকে তাকাতাম না। আমি খেলতাম আমার মতো। বিপরীতে কে আছেন ভাবতাম না। চিন্তা করতাম আমার সেরাটা দিতে হবে। ক্রিকেট ১১ জনের খেলা। এখানে ১১ জনকে পারফরম্যান্স করতে হয়। শচীন সাত শ ম্যাচ খেলেছেন। সেঞ্চুরি করেছেন শত ম্যাচে মাত্র। সেঞ্চুরি সব ম্যাচে করা যায় না।’ সৌরভ ঠিকই বলেছেন। জীবনের উত্থান-পতন আছে। আজকের সাফল্য কাল না-ও থাকতে পারে। কবি নজরুলও বলেছেন, চিরদিন সমান যায় না। আজকের এই দিন কাল হারিয়ে যেতে পারে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের অবস্থান ২০২৩ সালের পরিবেশ-পরিস্থিতি হিসাব-নিকাশ এক করে মেলানো যায় না।  আর যে কোনো কাজে টিমওয়ার্কে ভাঙন ধরলে সর্বনাশ হয়ে যায়; যা ঠেকানো যায় না। বাস্তবতা সব সময় কঠিন।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

 

আরও পড়ুন:


আম্পায়ার নাদির শাহ এখন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছে!

হত্যার হুমকি দিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ করে আসছিল আপন চাচা!

শ্রীপুরে মধ্যরাতে পোশাক শ্রমিককে ডেকে নিয়ে গণধর্ষণ!

পুলিশ সদস্যের অবসরপ্রাপ্ত টাকা আত্মসাৎ, অতঃপর উদ্ধার...


NEWS24.TV / কামরুল

পরবর্তী খবর

রাজনীতি কারও চিরস্থায়ী জমিদারি নয়

নঈম নিজাম

রাজনীতি কারও চিরস্থায়ী জমিদারি নয়

‘এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বল তো’ ছবির নাম সপ্তপদী। উত্তম-সুচিত্রার দারুণ রোমান্টিক ছবি। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানটি গেয়েছেন হেমন্ত ও সন্ধ্যা মুখার্জি। পথ শেষ হতে দিতে না চাইলেও একসময় শেষ হয়ে যায়। বেলা শেষে ফিরতে হয় বাড়ি। আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো পাখিরাও নীড়ে ফেরে অন্ধকার নামলে। এই তো জীবন। এর বাইরে আমরা যাই কী করে? প্রকৃতি অনেক নিয়ম-কানুন বেঁধে পাঠিয়েছেন জগৎ-সংসারে। এ নিয়মের ব্যত্যয় হয় কখনো কখনো। এ কারণে হয়তো কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, সব ঠিক আছে তো? জবাবে বলি, কীসের মাঝে কী, পান্তা ভাতে ঘি! সব ঠিক না থাকার কোনো কারণ তো দেখি না। দেশে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায়। রাজনৈতিক সরকারের একটা আলাদা হিসাব-নিকাশ থাকে। জনসম্পৃক্ততা রেখে স্বাভাবিকভাবে সবকিছু চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ওয়ান/ইলেভেন-মার্কা সরকারগুলো ক্ষমতায় থাকার সময় যা মনে আসে তা-ই করে। দূরত্ব তৈরি করে সবার সঙ্গে। আপন-পর বলে কিছু থাকে না। জনসম্পৃক্ততার ধার ধারে না। অকারণে সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী সবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। নতুন নতুন উইং খোলে। সরকারের ভিতরে তৈরি হয় সরকার। কে কোথায় কী কাজ করছে সমন্বয় থাকে না। পরে কঠিনভাবে ধরা পড়লে কেউ পাশে থাকে না। মইন-ফখরুদ্দীনের খবর এখন কেউ নেয় না। অথচ একসময় তাদের অনেক তোষামোদকারী ছিল। অভাব ছিল না চাটুকারের।

এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। বাস্তবতা আলাদা। বঙ্গবন্ধু আমাদের বাংলাদেশ দিয়েছেন। তাঁর মেয়ে দেশকে এগিয়ে দিচ্ছেন। বিশ্বে বাংলাদেশ আজ নতুন উচ্চতায়। উন্নয়ন -সমৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশালত্ব অর্জন করেছে। দেশ-বিদেশে প্রশংসা হচ্ছে। সে সমৃদ্ধি অনেকের পছন্দ নয়। উন্নয়ন ব্যাহত করতেই চলছে নানামুখী ষড়যন্ত্র। বাইরের শত্রু নিয়ে চিন্তা নেই। ভয় ঘর নিয়ে। অনেক মানুষের অতি উৎসাহ নিয়ে। বাইরের মানুষদের বোঝা যায়। ঘরেরগুলো চেনা যায় না। সরকারের ভিতরে ঢুকে পড়েছে উইপোকা। দেশ-বিদেশে সরকারবিরোধী কুৎসা রটানোর উৎসব চলছে। মিথ্যাচারের রেকর্ড অতীতের সব সময়কে হার মানিয়েছে। কিন্তু কুৎসা রটনাকারীদের নিয়ে সরকারি উইংগুলোর কোনো মাথাব্যথা নেই। দেখার, ব্যবস্থা নেওয়ার কেউ নেই। জাগতিক সমস্যাহীন জগতে তারা অকারণে খুলছে নতুন নতুন উইং। কারা খুলছে, কেন খুলছে জানি না। শুধু জানি অকারণে আপনজনদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে জানি না। নিয়তি বলে একটা কথা আছে। চাইলেও আমরা কেউ নিয়তির বাইরে যেতে পারি না। ইতিহাস তা-ই বলে। অসুস্থতার জগৎটা সাময়িক দাবিয়ে বেড়ায়।

নিষ্ঠুরতার প্রতীক হিটলারের ডান হাত ছিলেন মিথ্যার রাজা গোয়েবলস। তার কাজই ছিল মিথ্যা প্রচারণা চালানো। তার বিখ্যাত থিওরি ছিল- ‘একটি মিথ্যাকে বারবার প্রচার কর। একসময় সবাই সত্য বলে ধরে নেবে। বিশ্বাস করতে শুরু করবে।’ আসলেও তাই। আজকাল সত্যকে বিশ্বাস করানো কঠিন। মিথ্যা আর গুজবের প্রতি বাঙালির একটা মমত্ব আছে। ফিসফাঁস শুনতে ভালো লাগে। আড়ালে কথা বলে আনন্দ পায়। হিপোক্র্যাসি মানুষের অন্দরে লুকিয়ে থাকে। নিজের অপকর্মের খবর নেই, অন্যকে নিয়ে গুজবে কান দেয় সবাই। ফেসবুক, ইউটিউবে এ কাজটি গভীর মনোযোগ দিয়ে করছে। মিথ্যাচারে কিছু মানুষ লাইক শেয়ারে ডলার কামাচ্ছে। সুস্থধারার রাজনীতি না থাকায় মিথ্যাচারকে উৎসাহিত করছে সবাই লাইক, শেয়ার দিয়ে। বঙ্গবন্ধু পরিবার ও সরকারের বিরুদ্ধে কতটা মিথ্যাচার হচ্ছে তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। ভাবখানা এমন- সরকার ডুবলে কারও কোনো দায়ভার নেই। জবাবদিহি নেই। ভাবতে অবাক লাগছে সরকারের গোপন কাগজপত্র, ডকুমেন্ট সাইবার ক্রিমিনালদের কাছে চলে যাচ্ছে! কীভাবে যাচ্ছে, কারা পাঠাচ্ছে সেসব নিয়ে কারও জবাবদিহি নেই। অনেকে বুঝতেই পারছে না- ‘এই দিন দিন না, আরও দিন আছে’।

স্বার্থপরদের একটা যুগ চলছে। আওয়ামী লীগের খেয়ে-পরে কেউ কেউ বারোটা বাজাচ্ছে দলটির। কোথায় যেন একটা অসংগতি চলছে। সুর-তাল-লয়ের ঘাটতি আছে। দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। সরকারের পৌনে তিন বছর চলে গেছে। আগামী দুই বছর সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই সময়ে অনেক কিছু দৃশ্যমান করতে হবে। উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার বাস্তব চিত্রের প্রকাশ ঘটাতে হবে। কথামালার রাজনীতি ভুলে বাস্তবতার নতুন গতিপথে ফিরে আসতে হবে। দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রচারিত মিথ্যা ও কুৎসার জবাব দিতে হবে। বিভিন্ন খাতের হারানো ইমেজ জাগিয়ে তুলতে হবে। নতুন ধ্যান-ধারণার সময়কে অস্বীকার করা যায় না। সময়কে আড়াল করা যায় না। ইতিহাস সব সময় আপন মহিমায় একই তালে ঘুরে-ফিরে আসে না। অনেক সময় উল্টো স্রোতেও ভেসে যায়। চিরদিন ভোট একই কায়দা-কৌশলে হয় না। ১৯৭০ সালে যেভাবে হয়েছে ’৭৩ সালে একইভাবে হয়নি। আবার ’৭৯, ’৮৬, ’৮৮ ছিল আলাদা। ’৯১, ’৯৬, ২০০১ হয়েছিল ভিন্নমাত্রায়। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লোক দেখানো স্বল্প সময়ের একটি ভোট দেখেছে দেশবাসী। সে ভোটের কোনো আগামাথা ছিল না। বিএনপি একই ধরনের আরেকটি ভোট করতে চেয়েছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে। পারেনি। স্বপ্ন তছনছ হয়ে গিয়েছিল। ধরা পড়েছিল নিজেদের তৈরি ফাঁদে। বিএনপিকে এখনো কঠিন খেসারত দিয়ে যেতে হচ্ছে সেসব কান্ডের।

সাদা চোখে সবকিছু গতিশীল ও স্বাভাবিক মনে হয় ক্ষমতায় থাকলে। কিন্তু অতি ভালো অনেক সময় ভালো হয় না। এমপি-মন্ত্রী সাহেবরা এখনো ব্যস্ত ভাই লীগ, আত্মীয় লীগ, শ্যালক লীগে। দলের কর্মীদের মূল্যায়ন নেই। হাইব্রিডদের উৎপাতে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কর্মীরা অনেক এলাকায় এতিমের মতো দিন কাটান। মন্ত্রী-এমপিরা এলাকায় যান না ঠিকমতো। ভাবেন ভোট ও জনগণ কোনোটারই দরকার নেই। সবকিছু একতালে যাবে। তাই অনেকে রাজনীতিটা করেন শুধু পরিবার আর চামচা লীগ নিয়ে। বঞ্চিত হচ্ছেন কর্মীরা। সুবিধাবাদী লীগ ব্যস্ত বাণিজ্য নিয়ে। আওয়ামী লীগের সত্যিকারের মাঠের কর্মীরা আছেন আগের মতোই। আবার দুঃসময় এলে এরাই থাকবেন। সুবিধাভোগীরা খারাপ সময়ে থাকে না। কেউ একবার সুবিধা পেলে বারবার চান। আক্ষেপ করেন একটি ব্যবসা পেয়েছেন আরও কেন পাননি। যিনি একবার মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন তার দুঃখ- বারবার কেন হন না। প্রেষণে দেশে-বিদেশে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদেরও কষ্টের শেষ নেই। তাদের দুঃখ- বারবার কেন পান না। কেউ বুঝতে চান না এই দলে নেতা-কর্মীর অভাব নেই। সবারই চাওয়া-পাওয়ার হিসাব আছে। দুঃসময়ের অনেক কর্মীই সরে গেছেন, সরে আছেন। অভিমানী মনে অন্ধকার মেঘ জমেছে। আলো-আঁধারির খেলার দিনেও কুমিল্লা-৭ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত। ভালো মানুষ। ভদ্রলোক। এই কঠিনতম সময়ে একজন প্রাণ গোপালের মূল্যায়ন দেখে ভালো লাগছে। প্রয়াত এমপিদের শূন্য আসনে মনোনয়ন নিয়ে শেখ হাসিনার সঠিক একটি অবস্থান প্রশংসিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বেরিয়ে আসছে প্রয়াত এমপি পরিবার থেকে। দুঃসময়ের মানুষদেরও চাওয়া-পাওয়া আছে। রাজনীতি জমিদারতন্ত্র নয়। কোনো আসনই কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। ভালো-মন্দ কাজের হোক মূল্যায়ন। দুঃসময়ে অবদানের স্বীকৃতি পাক সবাই। আওয়ামী লীগ বেরিয়ে আসুক রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রয়াতদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের মনোনয়নের ধারাবাহিকতা থেকে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, শেখ হাসিনার স্বাপ্নিক যাত্রা এগিয়ে চলুক বাস্তবতার নিরিখে। চলার পথে কখনো কখনো সংসারের হিসাবের খাতায়ও পরিবর্তন আনতে হয়। চিরদিন এক হিসাবের খাতায় চলতে পারে না। সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকার তিনটিসহ বিভিন্ন আসনে এমপি পরিবারের বাইরে মনোনয়ন প্রদান ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা। শেখ হাসিনার আরেকটি শুভ উদ্যোগ। এ উদ্যোগ নেত্রীর প্রতি আস্থা আরও বাড়াবে কর্মীদের। কারণ এখনো তাদের বিশ্বাস-আস্থার ঠিকানা একজনই। এটাই কঠিন বাস্তবতা। এ বাস্তবতা নিয়েই টিকে আছে আওয়ামী লীগ। আগামী দিনেও টিকে থাকবে। যদিও এখন পাড়ায় আপনি মোড়ল-মার্কা লোকেরও অভাব নেই। হামবড়া ভাবসাবের হাইব্রিডরা নানামুখী দোকান খুলে বসেছে। খারাপ সময় এলে বানের পানির মতো ওরা ভেসে যাবে। চারদিকের কথার রাজারা হারিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন


সূরা বাকারা: আয়াত ৮০-৮৪, ইহুদীদের ধারণাকে আল্লাহর মিথ্যা ঘোষণা

বিদ্যুৎ উৎপাদনের মেগা হাব হচ্ছে মহেশখালীর মাতারবাড়ী

ইভ্যালীর এমডিকে জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ঢাবির হল খুলছে ৫ অক্টোবর


নিজেকে ভাবেন বিশাল লেখক কেউ কেউ, তাদের লেখা কেউ পড়ে না। বিশাল রাজনীতিবিদ ভাবেন অথচ কোথাও কোনো অনুসারী নেই। মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই। কথায় আছে- অতি ঘরনি ঘর পায় না। অতি সুন্দরী বর পায় না। বড় বড় কথা বলা সহজ। বড় কাজ করা কঠিন। সবকিছুতে খুঁত ধরলে চলে না। বাস্তবতায় থাকতে হয়। নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা বলে লাভ নেই। জোর করে রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রতিক্রিয়া ভালো হয় না। ষাটের দশকের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নেতৃত্ব আর প্রত্যাশা করি না। সাহস সবার নেই। রাজনীতিতে সাহস, সততা দুটোই দরকার। ষাটের দশক ইতিহাস হয়েছে। এ কারণে হয়তো মতিয়া চৌধুরী একজনই। বারবার ঘুরে-ফিরে আসেন না। এ যুগে, নষ্ট সমাজে প্রত্যাশাও করা যায় না। আমার ভাতিজিদের নিয়ে বাবা বলতেন, নাতনিরা বড় হয়ে মতিয়া চৌধুরীর মতো অগ্নিকন্যা হবে। দুঃসাহস নিয়ে চলবে। কাউকে তোয়াক্কা করবে না। ইতিহাসের সবাই সাহসী হয় না। সবাই পথ দেখায় না। এখন উপমা দেওয়ার মতো নেতা-নেত্রী নেই রাজনৈতিক দলে। সারা দেশের মানুষ চেনে এমন ছাত্র নেতৃত্ব নেই। সুস্থধারার সংস্কৃতি এগিয়ে নেওয়া মানুষও চলে গেছেন। নতুন করে চেতনার কেতন জাগিয়ে তোলার সংস্কৃতিসেবী তৈরি হয়নি। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। মানুষ এখন আর জটিলতা চায় না। চায় না বলেই সিনেমা হল নয়, ঘরে বসে নেটফ্লেক্স দেখছে। প্রাণবন্ত সংসদ নেই, ইউটিউবে অন্যের কুৎসা দেখে বিকৃত আনন্দ নিচ্ছে। আলাপ-আলোচনা করছে কুৎসা রটনাকারী বিকৃতদের নিয়ে। ছোটকালে শুনেছি কলিকালে জগৎ-সংসারে ভালো মানুষগুলো চুপসে যাবে। খারাপদের উল্লাস চলবে। হৃদয়ের আকুলতা নিয়ে ভালো কাজে মানুষ মনোনিবেশ করবে না। খারাপ দেখবে, শুনবে প্রতিবাদী হবে না। পথচলার মানুষগুলোকেও চেনা যাবে না। ভালো-মন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। আলাদা করে সামনে আসবে না।

কঠিন এক সময় অতিক্রম করছি। কেউ বলছে না দেশকে এগিয়ে নিতে সাহসী মানুষের দরকার। সুস্থধারার সংস্কৃতি দরকার। মানুষ ধরেই নিয়েছে কোনো ধরনের সুস্থতা আর আসবে না, অসুস্থতাই টিকে থাকবে সবখানে। কেউ বুঝতে চাইছে না মানুষের মধ্যে আছে শয়তান, আছে ফেরেশতা। হিসাব-নিকাশ দিন-দুনিয়াতেই হয়ে যায়। পরকালের অপেক্ষা করতে হয় না।  ইহকালের বিচারটা অন্যভাবে হয়। অনেক সময় সাদা চোখে তা ধরা পড়ে না। আবার কখনো কখনো শেষ পরিণতিটা সবাই দেখে যায়।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

রক্ত দিয়ে এরশাদকে লেখা প্রেমিকার চিঠি

নঈম নিজাম

রক্ত দিয়ে এরশাদকে লেখা প্রেমিকার চিঠি

রাজনীতির মোকাবিলা করতে হয় রাজনীতি দিয়ে। দীর্ঘমেয়াদে অপরাজনীতি ভর করলে সর্বনাশ হয়ে যায় সুস্থধারার। ক্ষমতা ঘিরে নষ্ট-ভন্ডদের উত্থান হয়। আগাছা-পরগাছা ভর করে বটবৃক্ষে। জঙ্গলে ঢেকে যায় চারপাশটা। খাঁটিরা নীরব অভিমানে দূরে সরে যায়। শুরু হয় নকলদের সুসময়। চকচকে ভাবের কারণে আসল-নকল আলাদা করা যায় না। উইপোকা মাটির ঢিবি বানায় সুন্দর করে,  কিন্তু সে মাটি কোনো কাজে লাগে না। কোনো কিছু উৎপাদনও হয় না।  ঝুরঝুরে মাটিতে পা রাখলেই শেষ। ঘুণপোকার খেয়ে ফেলা কাঠ দেখতে শৈল্পিক মনে হয়। কিন্তু মানুষের বসতঘর শেষ হয়ে যায়। ইতিহাসের অনেক ক্ষণ থাকে। আড়াল থাকে। আমরা ছোটবেলায় পড়েছি ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি মাত্র ১৭ জন লোক নিয়ে বাংলা দখল করেছিলেন। লক্ষণ সেন পালিয়েছিলেন পেছনের দরজা দিয়ে। বাংলা দখল করলেন খিলজি। ইতিহাসের লেখনীও তাঁর পক্ষে!

এ বয়সে দেখছি আফগানিস্তানে আড়াই লাখ প্রশিক্ষিত সেনা আত্মসমর্পণ করেছে, অথবা সব ছেড়ে পালিয়েছে তালেবান আসছে শুনে। আড়াই লাখের বিপরীতে তালেবান ৭০ হাজার মাত্র। ঘুমপাড়ানি ইতিহাস দেশে দেশে আছে। একদল ইংরেজ বেনিয়া নিজের দেশে সুবিধা করতে না পেরে এ দেশে এসেছিল বাণিজ্যে। তাদের বাংলা-বিহার-ওড়িশার ক্ষমতা দিল মীরজাফররা। বাংলা দিয়ে শুরু। এরপর গোটা ভারতবর্ষের মালিকানা ধীরে ধীরে নিয়ে নিল ইংরেজ বেনিয়ারা। শেষ মুঘল সম্রাটকে বন্দী করে পাঠাল রেঙ্গুনে (ইয়াঙ্গুন) নির্বাসনে। তাঁর সন্তানদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে রাখল দিল্লির পুরান বাজারে। দিল্লির শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সেই ফকির যার কাছে তিনি নিরাপদ মনে করে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ ভূখন্ডের মানুষের ভিতরে-বাইরে দুই রকম চরিত্র। নিজের সুখ অন্যের মাঝে বিলিয়ে আনন্দ নেয় সবাই। বোঝার চেষ্টাও করে না এ আনন্দ ক্ষণস্থায়ী। বেইমানি আর বিশ্বাসঘাতকতা করা সব যুগে থাকে। ক্ষমতার চারপাশটায় মোশতাকদের দেখা যায়। তাজউদ্দীনরা থাকেন না অথবা থাকতে পারেন না। ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে তাদের সরে পড়তে হয় নীরব অভিমানে। দুঃসময়ের মানুষ সুসময়ে ঠাঁই পান না। এক ধরনের নীরব অভিমান নিয়েই চলতে হয় তাদের।

মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন করে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। দেশ-বিদেশে সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ, মিথ্যাচার, কুৎসা রটানো হচ্ছে। সাইবার সন্ত্রাসীদের ভাড়া করেছে চক্রান্তকারীরা। ব্যাপক অর্থ ব্যয় করছে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। কাজগুলো করছে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে। বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের ছাড় দিচ্ছে না। সরকারকে অসহায় মনে হয়। ভাবখানা এমন, কারও কিছু করার নেই। মন্ত্রী সাহেবদের অসহায়ত্ব দেখলে মনটা বিষাদে ছেয়ে যায়। তারা পারছেন না সাইবার সন্ত্রাস দমন করতে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সমালোচনা অবশ্যই করতে পারে যে কেউ। ক্ষমতাসীন সরকারের ভুল তুলে ধরতেও পারে। কিন্তু জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে নোংরামি দেখে সংশ্লিষ্ট মাননীয়রা ঘুমান কেমন করে? কেন কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেন না? রাষ্ট্র কখনো দুর্বল হতে পারে না। ক্ষমতাবান একজন ব্যক্তি হতে পারেন। রাষ্ট্রের দায়িত্বপূর্ণ অবস্থান ও পদে থেকে দয়া করে অসহায়ত্ব প্রকাশ করবেন না। ঘোষণা দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতার কথা জানাবেন না জাতিকে। না পারলে নিজ থেকে সরে পড়ুন দায়িত্ব থেকে। সাইবার সন্ত্রাস নিয়ে কঠোর হোন। আগামী নির্বাচন সামনে রেখেই টার্গেট করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী পরিবারকে। বসে থাকার সুযোগ নেই। ঘুমপাড়ানি গান শোনার সময় নেই। বিষফোঁড়া নিয়ে চলা যায় না। বেলা বয়ে গেলে অন্ধকার নেমে আসে। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। না হলে পরে খেসারত দিতে হয়।

শরীরের ক্ষত দূর করা যায় চিকিৎসা করে। মনের ক্ষত কোনোভাবে সারানো যায় না। একবার মনের অসুখ ভর করলে কোনো ডাক্তার-কবিরাজ কাজে লাগে না। এক জীবনে মানুষের কত ধরনের দুঃখ লুকিয়ে থাকে। সব কথা বলা যায় না কাউকেই। অনেক কিছুই লুকিয়ে রাখতে হয় বুকের ভিতরে। করোনাকালে অনেক বন্ধু, প্রিয়জন, শুভানুধ্যায়ীকে হারিয়েছি। চলে গেছেন হুট করে। মৃত্যু এখন স্বাভাবিক বিষয়। মৃত্যুর খবর কাউকে ব্যথিত করে না। প্রিয়জনের মৃত্যু কাউকে আঘাত করে না। এমনও দেখেছি, সন্তানের মৃত্যুশোক না কাটতেই ব্যস্ত হয়েছেন অন্যের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মিথ্যা কুৎসা রটাতে। নাজিম হিকমত ঠিকই লিখেছেন, বিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর। বাস্তবে এখন এক দিনও না। জানাজা পড়তে গিয়ে ভালো খাওয়া-দাওয়ার গল্প হয়। শোক কাটাতে চেহলামে গরু জবাই করে খাওয়ার উৎসব হয়। মৃত মানুষের আত্মার শান্তি কামনা এবং শোক শেষ হয়ে যায় উৎসবী পরিবেশে। জগৎ সংসার বড় অদ্ভুত। মানুষের মন বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি কেড়ে নিচ্ছে আবেগ। যতক্ষণ ক্ষমতা ততক্ষণ পূজা। ক্ষমতাহারা বন্ধুর পাশে কেউ দাঁড়ায় না। কেউ থাকে না। অসহায় মানুষকে উপেক্ষা করে সবাই। পোশাক দেখে আদর আপ্যায়নের বর্ণনা শেখ সাদি দিয়ে গেছেন। এখনো ক্ষমতা ও অবস্থান দেখে হয় মূল্যায়ন। নোংরামি, হিংসা, মিথ্যাচার ভর করেছে সবখানে। ঈর্ষাকাতর মুখগুলো ব্যস্ত থাকে অন্যের সর্বনাশা চিন্তায়। পুত্রশোক না করে কুৎসা রটায়। অসুস্থ সমাজে কীভাবে বাস করবে স্বাভাবিক মানুষ? নিজের ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ওপর চাপিয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা যায় না। টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুর পরিণামই ভালো হয় না। হাশরের ময়দানে কেউ কারও নয়। ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি। যার যার হিসাব তাকেই দিতে হবে। ধর্ম তা-ই বলে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ক্ষমতা হারানোর পর মানুষের চেহারা মুহুর্তে বদলে যায়। আনুকূল্য নিতে যারা বেশি তোষামোদী করে তারা বদলায় সবার আগে। ক্ষমতার আপনজনরা আপন হন না। দুঃসময়ের মানুষ আলাদা। ২০১০ সালের পর এরশাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আড্ডা দিয়েছি। গল্পগুজবে রাজনীতি, ক্ষমতায় থাকা, সবকিছু হারানো, কারাজীবনসহ ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও তাঁর কথা শুনতাম। এরশাদ সাহেব অনেক সুখ-দুঃখও শেয়ার করতেন। বাদ থাকত না রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত অন্দরমহলের কথা। সেনাপ্রধান থেকে সামরিক আইন প্রশাসক, প্রেসিডেন্ট থেকে ক্ষমতার পতন, কারাগারের দুঃসহ জীবন- অনেক কিছুই বলেছেন। একবার তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম তাঁর আমলে ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের নিয়ে কোনো দুঃখবোধ জাগে কি না? তিনি বললেন, ‘অবশ্যই জাগে। তবে আমার নয় বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে কতজন মানুষ মারা গেছে হিসাব-নিকাশ কর। পরবর্তী সরকারগুলোর মেয়াদের ঘটনাগুলোরও তালিকা কর। তারপর বিচার-বিশ্লেষণে আস। একতরফা মূল্যায়নে দেখা হয়েছে আমাকে। বিশেষ করে তোমরা সাংবাদিকরা আমাকে সব সময় খুনি বলেছ। মনে রেখ, আমার হাতে রক্তের দাগ নেই। আর দাগ নেই বলেই তোমার সামনে বসে আছি। আড্ডা দিচ্ছি। বিশে^ আমি একমাত্র সামরিক স্বৈরশাসক ক্ষমতা ছাড়ার পর স্বাভাবিক জীবনে আছি। টানা ভোটে জয়ী হয়েছি। মানুষ ভোট দিয়েছে। এমনকি ১৯৯১ সালে ক্ষমতা থেকে বিদায়ের পরও কারাগারে থেকে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছি। এর চেয়ে বেশি আসনে ভোট করার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছিল আইন করে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এক হয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরেছে শুধু রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার থাকলে ভোট হলে জয়ী হতাম বলে। ছাত্রদের আন্দোলনে নয়, ক্ষমতা ছেড়েছি সেনাপ্রধান বিট্রে করার কারণে। আতিককে আরও এক বছর রাখলে ইতিহাস ভিন্ন হতো।’

আরও পড়ুন


জলাবদ্ধতা, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর যানজটে নাকাল পূর্ব বাসাবোর বাসিন্দারা

চিড়িয়াখানায় বাড়তি আয়োজন হাতির ফুটবল খেলা

যে কারণে স্ট্যাপলার পিন মুক্ত হচ্ছে না টাকার বান্ডিল

স্বাভাবিক হয়ে আসছে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ভ্রমণ যোগাযোগ


আলোচনা সিরিয়াস দিকে চলে যাচ্ছিল। পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বললাম, আপনি হলেন বিশে^র তাক লাগানো প্রেমিকপুরুষ। কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেননি। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে প্রেম করেছেন। বিরোধী দলে এসেও থেমে নেই। এখনো তরুণীরা আপনার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। তাদের নিয়ে ভালো আছেন। এরশাদ সাহেব হাসলেন। বাসার কাজের সহযোগী ওয়াবকে ডাকলেন। খাবার দিতে বললেন। বিদিশাপুত্র এরিক ছিল বাসায়। একটু পর এসে বলল, সাথী আপা কি চলে যাবে? আমি বললাম, সাথীটা কে? এরশাদ সাহেব কিছু বললেন না। এরিককে সরানোর চেষ্টা করলেন। এরিক আবার প্রশ্ন করল। ওয়াব এসে চা-নাশতা রাখল। এরশাদ সাহেব ভিতরে গেলেন। ফিরে এলেন। বুঝলাম কাউকে বিদায় করে এসেছেন। আমি আবার বললাম, আপনি প্রেমিক হিসেবে কতটা সফল? তিনি বললেন, ‘তুমি সব সময় দুষ্টুমি কর।’ তারপর বললেন, ‘আমার হাতে গোলাপ আছে। মানুষকে ভালোবেসেছি। ভালোবাসায় কোনো অন্যায় নেই। আমাকেও মানুষ ভালোবাসে।’ তিনি রংপুরের মানুষের প্রশংসা করেন। বললেন, ‘তাদের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রংপুরের সন্তান হিসেবে দুঃসময়ে তাদের ভালোবাসা পেয়েছি।’ তিনি হঠাৎ করেই রওশন এরশাদের অনেক প্রশংসা করলেন। বললেন, ‘এই নারী সব সুখে-দুঃখে ছিলেন, আছেন। তাঁর বিষয়টি আমার কাছে সম্পূর্ণ আলাদা।’ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। বললেন ভাই জি এম কাদেরের কথা। বললেন, ‘আমার ভাইটা ভালো মানুষ।’ ক্ষমতায় থাকাকালে জি এম কাদের উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। নিজের ভাইয়ের বদনাম হয় এমন কিছু করেননি। জি এম কাদেরের প্রতি এরশাদের স্নেহটা ছিল আলাদা রকম। নানামুখী আলোচনায় বললাম, এক মেয়ে নাকি আপনাকে রক্ত দিয়ে চিঠি লিখেছে? এটা কি রক্ত না লাল রং। তিনি আবার হাসলেন। তারপর বললেন, ‘তুমি এত খবর কই পাও? অন্দরমহলের খবরও বাদ থাকে না তোমার কাছে!’ তারপর লাইব্রেরি রুমে গেলেন। অনেক চিঠি নিয়ে ফিরলেন। একটি চিঠির কালি লাল। চিঠিটি হাতে নিলাম। তিনি বললেন, ‘দেখ। আবেগাপ্লুত কোনো তরুণীর লেখা চিঠি।’ বুঝলাম ঢাকার বাইরে থেকে পাঠানো। রক্ত না রং নিজেই কনফিউজড হলাম। বললাম, বুঝতে পারছি না কী দিয়ে লেখা চিঠি। রক্ত শুধু মানুষের হয় না। প্রাণীর রক্তের রংও লাল হয়। তিনি কথা বাড়ালেন না। হাসলেন। তারপর চিঠিগুলো নিয়ে আবার ভিতরে গেলেন। যত্ন করে রেখে এলেন।

প্রেমপত্রের যুগ শেষ হয়ে গেছে। এখন হোয়াটস অ্যাপ, মেসেঞ্জারের যুগ। প্রেমিক-প্রেমিকরা সরাসরি কথা বলেন। কোনো রাখঢাক নেই। কষ্ট করে আবেগ নিয়ে গল্পে, কবিতায় চিঠি লেখারও দরকার নেই। পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথনের মতো বই এখনকার প্রজন্ম পড়ে না। সুনীলের ‘নীরা’ তাদের আলোড়িত করে না। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ পড়ার প্রয়োজন মনে করে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এখন অনেক সহজ ব্যবস্থা দিয়েছে যোগাযোগের। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি সচিত্র প্রেমপত্র, স্বামী-স্ত্রীর চিঠি চালাচালির বই বিক্রি হতো রেলস্টেশনের বইয়ের স্টলে। আবার ফুটপাথের দোকানেও পাওয়া যেত। এখন সেসব দিন নেই।  প্রযুক্তি বিশ্বকে মুহুর্তে কাছে টানছে। কিন্তু মানুষের আবেগকে সৃষ্টিশীলতার রূপ দিতে পারছে না। আর পারছে না বলেই চিন্তার প্রখরতা কমে যাচ্ছে। মানুষ খুব সহজে বিশ্বাস করছে অসুস্থতা, মিথ্যাচার, নোংরামি আর গুজব। মানুষ এখন আবেগশূন্য। সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ একটা সময় চলছে।  আজকাল মানুষের সঙ্গে মিশতে ভয় লাগে। ছোট্ট একটা জীবন। এত জটিলতা ভালো লাগে না। স্বপ্নের মোহময় ভুবনে কখনো কখনো একাকিত্বই ভালো।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

এত মোশতাক কোথায় রাখব

নঈম নিজাম

এত মোশতাক কোথায় রাখব

এত বছর পরও বিতর্ক হয় নেতাজি সুভাষ বসু জীবিত না মৃত। তিনি প্লেন দুর্ঘটনায় জাপানে মারা গেছেন না সন্ন্যাস - বেশে ভারতে এসেছিলেন? নেতাজিকে সর্বশেষ কোথায় দেখা গেছে তা নিয়েও গবেষণার শেষ নেই। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সুভাষ বসুর জার্মানিকে সমর্থন, হিটলারের সঙ্গে যোগাযোগ, জাপানে অবস্থান ঠিক না ভুল তা নিয়েও অনেক বিতর্ক। নেতাজি সুভাষ বসু বাঙালির জন্য এক রহস্যময় চরিত্র। বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ক্ষমতা, মন্ত্রমুগ্ধের মতো গণমানুষের আস্থা অর্জন খুব কম নেতার ভাগ্যে জোটে। সুভাষ বসু আলাদা ছিলেন। ব্যতিক্রম ছিল তাঁর পথচলা। রাজনৈতিক দর্শন আর ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নিয়ে কংগ্রেসের বেশির ভাগ নেতার সঙ্গে মত ও পথের ভিন্নতা ছিল শেষ দিকে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল আলাদা। গান্ধী বুঝতেন, সুভাষ দেশকে স্বাধীন করতে চান যে কোনো মূল্যে। যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে ছিলেন সুভাষ বোস। বুঝতেন ব্রিটিশরা সহজে স্বাধীনতা দেবে না। তাই কংগ্রেসের সঙ্গে হিসাব-নিকাশ না মেলাতে পেরে দল ছাড়লেন। নিলেন আলাদা অবস্থান। আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করলেন। প্রশিক্ষণ দিলেন অনুসারীদের। সফল হলেন না। তাই ব্যর্থতার গ্লানি আড়াল করতে সরে পড়লেন দৃশ্যপট থেকে। সে হিসাব এখনো চলছে। ইতিহাসের অনেক হিসাব-নিকাশ থাকে। অনেক অমীমাংসিত ইস্যু থাকে। ইতিহাস চলে আপন মহিমায়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নিজের লেখা বইয়ের একটা অংশ প্রকাশ করার নির্দেশ দেন মৃত্যুর ৩০ বছর পর। ভারতের অখন্ডতা বজায় রাখা, কংগ্রেসের সভাপতি পদ নেহরুকে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে শেষ কথাগুলো লিখে গেছেন মাওলানা আজাদ। গান্ধী চাননি মাওলানা আজাদ কংগ্রেসের সভাপতি পদ ছাড়ুন। চাননি ভারতের বিভক্তি। টানা ১০ বছর পার্টির দায়িত্বে থাকার পর মাওলানা আজাদ কংগ্রেসের সভাপতি পদ ছেড়ে দেন। ইতিহাসে সবাই এভাবে পারে না। আর পারে না বলেই সবাই ইতিহাস তৈরি করে না।

ভারতবর্ষের আরেকজন বাঙালি বিপ্লবীর কাজকারবারও ছিল রহস্যঘেরা। তাঁর নাম মানবেন্দ্রনাথ রায়। তিনি ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। শুধু ভারত কেন, তিনি আরও অনেক দেশে কমিউনিস্ট রাজনীতির বিকাশে ভূমিকা রাখেন। মেক্সিকো থেকে রাশিয়া ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়। তিনি এম এন রায় নামেই বেশি পরিচিত। মেক্সিকো, আমেরিকা, রাশিয়া, চীনে কমিউনিস্ট রাজনীতির বিকাশ ঘটান। দেশের টানে ফিরে আসেন। দেশে বিপ্লবী রাজনীতি করতে গিয়ে প্রথম জীবনে বারবার বিপদে পড়েন। এ কারণে দেশও ছাড়েন বারবার। জাপানে ছিলেন কিছুদিন। তারপর যান যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোয়। সেখানেই মানবেন্দ্র নামটি নেন। আসল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। আমেরিকায় থেকে মার্কসবাদকে এগিয়ে নেন। মেক্সিকো গিয়ে যোগ দেন সোশ্যালিস্ট পার্টিতে। মেধা-মননে ছিলেন উচ্চমাত্রায়। তক্কে-বিতর্কে পরিচিত হন লেনিনের সঙ্গে। লেনিনের ঔপনিবেশিক থিসিসের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে আলাদা প্রস্তাব আনেন। লেনিন বিস্ময় নিয়ে দেখেন এই বিপ্লবী নেতাকে। তাঁকে তিনি কাছে টেনে নেন। রাশিয়ায় সামনের সারিতে চলে আসেন বিপ্লবী এম এন রায়। নীতিনির্ধারক পর্যায়ে হয় অবস্থান। লেনিনের মৃত্যুর পর তাঁকে পাঠানো হয় চীনে। পরে তিনি ফিরে আসেন ভারতবর্ষে। সারা জীবনের অর্জন কমিউনিস্ট পার্টি ত্যাগ করেন। যোগ দেন কংগ্রেসে। বহিষ্কার হন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে। ১৯৪০ সালে কংগ্রেসের সভাপতি পদে প্রার্থী হয়ে চমক আনেন। কিন্তু পরাজিত হন। নেতাজি সুভাষ বোসের সঙ্গেও কাজ করেন এম এন রায়। সুভাষ বোস চাইতেন স্বাধীনতা। আর এম এন রায়ের টার্গেট অর্থনৈতিক মুক্তি। সুভাষ বোস বলতেন, দেশ স্বাধীন হলে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবেই। কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।

সুকান্ত লিখেছেন, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।’ নেতাজি সুভাষ বসু ও বিপ্লবী এম এন রায় বাঙালির নেতৃত্বকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সে যুগে বাংলা থেকে বিশ্বময় কী করে এ দুই নেতা ছড়িয়ে পড়েছিলেন ভাবতেই বিস্ময় লাগে। এ উপমহাদেশকে নতুন মাত্রায় নিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু পূর্ণতা দিতে পারেননি, সফল হননি। সফল হয়েছিলেন একজন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালের আগে কলকাতায় যাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ব্রিটিশ শাসনকালে এক ধারার রাজনীতি করেছিলেন। ব্রিটিশের কবল থেকে মুক্তির পর আরেক ধরনের। কবি নজরুলের জয় বাংলা, রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলাকে বুকে ধারণ করে তিনি যাত্রা করেন। নেতা মানতেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে আকাশটা ছুঁয়ে দেখেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল একবার। আলাপে আড্ডায় সেই সংগঠক বললেন, তাঁরা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন বঙ্গবন্ধুর চোখের আলোয়। বঙ্গবন্ধুর আদেশ-নির্দেশ বাস্তবায়ন করতেন। মাঝামাঝি কিছু ছিল না। ষাট দশকের সব ছাত্রনেতা একজনের আদর্শ লালন করতেন। সে আদর্শ ছড়িয়ে দিতেন মানুষের মধ্যে। তখন শিক্ষিত জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার কথা বলত না। তারা বামধারার নানামুখী রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাত। সচেতন বুদ্ধিজীবীদের ছিল একই হাল। শহর ও মফস্বলের বিত্তশালী পরিবারগুলো করত মুসলিম লীগ। শুধু খেটে খাওয়া মানুষ বঙ্গবন্ধুর ভাষা বুঝত। বঙ্গবন্ধু খেটে খাওয়া মানুষের রাজনীতি করতেন। তাদের সংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ করেন। তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন- দেশ স্বাধীন হলেই অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। বাংলাদেশ বিশ্বে মর্যাদার আসনে বসবে। সাধারণ মানুষ মুজিবের আদর্শের পথে হাঁটতে শুরু করে। মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, নেতাজি সুভাষ বসুর নেতৃত্বের উত্তরাধিকার হয়ে যান একজন শেখ মুজিব। মানুষের হৃদয় জয় করে ২৩ বছরের টানা আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা কোনোভাবেই এক দিনের কোনো অর্জন নয়। দীর্ঘ পথ পরিক্রমার ফসল।

অনেক সময় প্রশ্ন জাগে কী করে মাত্র সাড়ে তিন বছরে সবকিছু শেষ হয়ে গেল? সদ্যস্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের জন্য সাড়ে তিন বছর কোনো সময়ই নয়। দেখতে দেখতে চলে যায়। বিধ্বস্ত দেশটাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রথম দিনই শুরু হয়ে যায় ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত। ঘরের অভ্যন্তরে ছিল খন্দকার মোশতাক। বাইরে ছিল ঘষেটি বেগমরা। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলগুলোও বসে ছিল না। তারা মদদ জোগাতে থাকে। ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত আর মিথ্যার বেসাতি ছড়িয়ে দিতে থাকে দেশ-বিদেশে গণকণ্ঠ, হক কথা, ইত্তেহাদ, হলিডেসহ কিছু পত্রিকার ভাষা, রাজনৈতিক দলের লিফলেট আর পল্টনের সভা-সমাবেশের মাধ্যমে। সাংবাদিকতার কোনো এথিকস ছিল না। রাজনৈতিক দলের ভাষা আর চরমপন্থি, উগ্রপন্থিদের বক্তব্য এক হয় না। কিন্তু সদ্যস্বাধীন দেশে সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ছাত্রলীগের ভাঙন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্ষমতাসীন দলকে। সরকারি দলের ভিতরে-বাইরে ছিল নানামুখী বিভক্তি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো গড়ে তুলতে বিলম্ব হচ্ছিল। অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বন্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠন করা হয় রক্ষীবাহিনী। এ বাহিনীর প্রধান ছিলেন সেনা কর্মকর্তা কর্নেল নুরুজ্জামান। এর বাইরে আরও মেজর হাসানসহ অনেক সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। রক্ষীবাহিনীর জন্ম বিডিআর সদর দফতরে। কাজ ছিল এখনকার র‌্যাবের মতো। প্রথম দুই ব্যাচে মুক্তিযোদ্ধাদের নেওয়া হয়। কারণ ছিল যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে সাহসী ভূমিকা রাখা। রক্ষীবাহিনীর দুই কর্মকর্তা কর্নেল আনোয়ারুল আলম শহীদ ও সরোয়ার মোল্লা তাঁদের লেখনী ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সবকিছু পরিষ্কার করেছেন। সে বাহিনীকে নিয়ে প্রথম থেকে মিথ্যাচারের শেষ ছিল না। রক্ষীবাহিনীর অস্ত্র রাতে রাখা হতো বিডিআর সদর দফতরে। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা টিমে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য রাখা হলেও রক্ষীবাহিনী ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের বাইরে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ছিল রক্ষীবাহিনী।

আরও পড়ুন


বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের ওপর ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল ফিলিপাইন

আগামী সপ্তাহে নতুন সরকার ঘোষণা করবে আফগানিস্তান

ইস্টওয়েস্ট মিডিয়ার ৪ সম্পাদকসহ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারে মানববন্ধন

ডেঙ্গুতে একদিনে মৃত্যু ২, হাসপাতালে ভর্তি ২৬৫


বঙ্গবন্ধু সরকারের করা সব ভালো কাজের বিরুদ্ধে সমানে অসত্য প্রচারণা ছিল। আওয়ামী লীগ সেসব মিথ্যাচারের পাল্টা জবাব ঠিকভাবে দিতে পারেনি। আর দিতে না পারার কারণ ছিল ঘরে-বাইরে মোশতাকরাই ছিল সামনের সারিতে। ক্ষমতায় তারাই ছিল। চাইলেও বঙ্গবন্ধু মোশতাকদের এড়িয়ে যেতে পারতেন না। বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল কেন সব আমলেই মোশতাকদের একটা অবস্থান থাকে। পলাশীর আম্রকাননে মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজের পতন হয়েছিল। এ পতন শুধু বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাবের ছিল না। এ ছিল ভারতের স্বাধীনতার পতন। পলাশী দিয়েই ভারতবর্ষের দখলদারি নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে যায় ইংরেজ বেনিয়ারা। পলাশী থেকে ধানমন্ডি, মীরজাফর থেকে মোশতাক ইতিহাসের সব কালো অধ্যায় বিশেষ সূত্রে গাঁথা। ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত বলেকয়ে আসে না। হুট করে যুক্ত হয়। পরিবেশ, পরিস্থিতি তৈরি করতে ছোট ছোট ঘটনাই বড় হয়ে যায়। বুঝে না বুঝে অনেকে জড়িয়ে পড়ে। মাত্র সাড়ে তিন বছরে আমরা জাতির পিতাকে হারিয়েছি। জয়ী হয়েছিল চক্রান্তকারীরা। ৩ নভেম্বর ক্যু বঙ্গবন্ধুর পক্ষে হলে আওয়ামী লীগ কেন ক্ষমতায় বসল না? শুধু জেলহত্যার কারণেই কি সবকিছু থমকে গিয়েছিল? নাকি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর কোনো পরিকল্পনাই ছিল না? থাকলে কোনো আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কেন খালেদ মোশাররফদের বৈঠক হলো না? মাত্র তিন দিন পর জাসদের গণবাহিনী কী করে ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান করে বসে? কর্নেল তাহেরের প্রস্তুতি কি আগে থেকে ছিল না? জাসদের ক্যু কী করে জিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গেল? খালেদ মোশাররফ, হুদা, হায়দারকে কারা হত্যা করল? অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, এল এ খতিবসহ অনেক বিদেশি সাংবাদিক কিছু ইতিহাস লিখে গেছেন। সবকিছু তাঁরা তাঁদের লেখায় আনেননি বা আনতে পারেননি। হয়তো আগামী দিনে আমরা আরও অনেক কিছু জানব। অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। অনেক ইতিহাসের মীমাংসা এখনো হয়নি।

শেষ কথা

রাজনীতির সময়টা এখন অনেক বেশি জটিল। দুনিয়ার সব হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। তার পরও রাজনীতি ও রাজনীতিবিদ ছাড়া দেশ চলতে পারে না। যত বড় আমলা হোন না কেন বুঝতে হবে রাজনীতিবিদরাই আপনাকে চেয়ারে বসিয়েছেন। রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা অবশ্যই আছে। আর আছে বলেই আপনি চোখে চোখ রেখে কথা বলছেন। তাদের দুর্বৃত্ত বলছেন। এই দিন না-ও থাকতে পারে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আপনার জুনিয়র অন্য সার্ভিসের কর্মকর্তাকে স্যার ডাকতে হয়েছিল সিভিল আমলাদের। দয়া করে রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করতে দিন। তাদের সঙ্গে অকারণে লড়ে অস্থিরতা তৈরির সুযোগ নেই। জনগণের সেবক হিসেবে প্রশাসন চালান। দলবাজি আর নিজে রাজনীতিবিদ, দলীয় কর্মী সাজার চেষ্টা করবেন না। সমস্যাটা দলীয় কর্মী সাজার চেষ্টা থেকে উৎপত্তি হচ্ছে। আপনি বড় নেতা না এমপি-মন্ত্রী বড় নেতা- সে হিসাব থেকে ঝামেলা বাধছে। আপনারা ভাবেন দল বা দলীয় নেতা-কর্মীর কী দরকার? আপনারাই চালিয়ে নেবেন সবকিছু। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক সরকার বিপদে পড়লে, সরকার বদল হলে আমলাদের চেহারা বদলে যায়। দলের বিপদ রাজনীতিবিদরা সামাল দেন। -সংগ্রাম করে, জেল-জুলুম সয়ে দলকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের খাটো করে কারও বড় হওয়ার কিছু নেই। সবকিছু চলে টিম দিয়ে, বিচ্ছিন্নভাবে নয়।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

উন্নয়নের প্রতীক একজন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক

নঈম নিজাম

উন্নয়নের প্রতীক একজন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক

সময়টা ১৯৯৯ সালের মে মাস। আমি থাকি লালমাটিয়াতে। হঠাৎ সকাল সকাল ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে। ঘুমচোখে ফোন ধরতেই অপরপ্রান্ত থেকে বললেন, আমি কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। আপনি তৈরি হোন। এলজিইডির বিদায়ী প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে এমনই সম্পর্ক ছিল। তিনি পিডিবির নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন। এলজিইডি থেকে বিদায় নিয়ে মন ভালো নেই। আসলে নিজের হাতে গড়া একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিতে কার ভালো লাগে? কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের অবস্থানও তাই। দেশের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী তাকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে পাঠিয়েছেন। সাহসী মানুষটি মন খারাপ হলেও পিছু হঠেননি। নতুন দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। পিডিবি অফিসে তার প্রথম দিনে আমি গেলাম সঙ্গে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দাঁড়িয়ে আছে ফুল নিয়ে। সবার সামনে সিবিএ’র প্রভাবশালী নেতারা। সবার পেছনে বড় কর্মকর্তারা। সামনে দাঁড়ানো সিবিএ নেতারা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন বড় বড় শ্রমিক নেতা হিসেবে। বিরক্ত হলেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। বললেন, এ প্রতিষ্ঠানে কার কি পরিচয় তা দিন। সিবিএ নেতা, শ্রমিক নেতা আমার কাছে বিবেচ্য নয়। এরপর বেরিয়ে এলো সবার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়। এক পর্যায়ে সদস্য, প্রধান প্রকৌশলী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বললেন, আপনারা পেছনে কেন? সামনে আসুন। পিছু হঠলেন সিবিএ নেতারা। 

পিডিবিতে তিনি দীর্ঘ সময় ছিলেন না। অতি অল্প সময়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। পিডিবির অভ্যন্তরীণ সংস্কারও করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে পিডিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি হতো না। যে যেখানে ছিলেন সেখানেই থাকতেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ছিল ট্রেড ইউনিয়নের দখলে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি এ ধারা ভেঙে দেন। সারা দেশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণবদলি করেন এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। এ ব্যাপারে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা, নেতাদের কোনো তদবিরই তিনি আমলে নেননি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে তিনি এমন করেন। কাজ না করলে নিয়োগ-বদলি স্বাভাবিক ঘটনা, এ দৃষ্টান্ত তিনি শুরু করেন। এ ব্যাপারে সিবিএ’র আধিপত্য, রক্তচক্ষুকে মূল্য দেননি। তিনি যোগদানের আগে পিডিবির কর্মকর্তারা ভয়ে থাকতেন। ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা সব কিছু চালাতেন। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক কর্মকর্তাদের অধিকার ফিরিয়ে এনে কাজের গতি সৃষ্টি করেন।

আমাকে একবার নিয়ে যান আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট দেখাতে। তখন মোবাইল টেলিফোনের যাত্রা মাত্র শুরু হয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল যোগাযোগ থেকে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট পিছিয়ে। ফ্যাক্স ও টেলিফোন তারা ব্যবহার করত না। আমার হাতে থাকা মোবাইল ফোন দেখিয়ে তিনি বললেন, তোমরা মোবাইল কিনো। ফ্যাক্স চালু কর। এরপর চালু করবে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট। অনুমোদনের জন্য ঢাকায় ফাইল পাঠানোর দরকার নেই। টাইপরাইটার বদল করে কম্পিউটার কেনারও নির্দেশ দেন। পিডিবির হেড অফিসেও কম্পিউটার যুগের সূচনা কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের আমলে। বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটও তিনি কমিয়ে আনেন। এ খাতের মাফিয়া ব্যবসায়ীদের তিনি লাঘাম টেনে ধরেন। এ মাফিয়াদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি মাঝে মাঝে আমাকে বলতেন।

আজ এতদিন পর একটি কথা বলছি, বিদ্যুৎ খাতের মাফিয়ারা কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। তাই তারাই উদ্যোগ নেয় কামরুল ইসলাম সিদ্দিককে সরিয়ে দিতে। তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে বদল হন তিনি। কাজের লোক থেমে থাকেন না। আজীবনের মুক্তিযোদ্ধাও বসে থাকেন না। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক পূর্ত মন্ত্রণালয়েও ভূমিকা রাখেন। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনিয়মের ভেড়াজাল ভাঙতে থাকেন। অসাধারণ দক্ষতার মধ্য দিয়ে রাজউকে মানুষের হয়রানি কমিয়ে আনেন। একবার আমি তাকে বললাম, লালমাটিয়া মাঠটি অবৈধভাবে বরাদ্দ দিয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। ব্যথিত হলেন। বললেন, বাচ্চাদের খেলার মাঠও রেহাই দেবে না? কাল সকালে আমার বাসায় আসুন। কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের ধানমণ্ডির বাসায় গেলাম। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকলেন লালমাটিয়া মাঠের সামনে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দখলদারদের দেওয়া দেয়াল ভাঙালেন। অফিসে গিয়ে বরাদ্দ বাতিল করলেন। এভাবে রক্ষা পায় লালমাটিয়ার মাঠ।

কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের সঙ্গে আমার হাজারও স্মৃতি। কোনটা আগে বলি, কোনটা পরে বলি, বুঝতে পারছি না। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী থাকার সময়ের কথা। সময়টা ’৯১ সালের শুরুর দিকে। আমি মাত্র বিয়ে করেছি। শ্বশুরবাড়ির প্রকৌশলী আত্মীয়ের বদলির জন্য একদিন অনুরোধ জানাই তখনকার জনশক্তি প্রতিমন্ত্রী (পরে পূর্তমন্ত্রী) ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে। তিনি বললেন, ওরে বাবা কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের কাছে কাজ? কারও কথা শোনে না। আমারও কাজ আছে তার কাছে। দাঁড়াও, এলজিআরডি সচিব মুশফিকুর রহমান আমার বন্ধু, তাকে বলছি। এতে কাজ হলো। রফিকুল ইসলাম মিয়া আমাকে বললেন, তুমি অপেক্ষায় থাক। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক মন্ত্রণালয়ে আছে। আমার রুমে মুশফিক তাকে পাঠাচ্ছে। তখন তোমার পরিচয় দিয়ে সমস্যা বলবে। ঘণ্টা দুই পর তিনি এলেন। রফিকুল ইসলাম মিয়া নিজের এলাকার উন্নয়নের কথা বলার আগে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমি কাজ করি দৈনিক আজকের কাগজে। পরিচয় পেয়ে তিনি বললেন, আপনাদের সাপ্তাহিক খবরের কাগজ এরশাদের সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে কিছু অসত্য সংবাদ পরিবেশন করছে। নিউজটা ঠিক নয়। আমি বললাম, সমস্যা নেই। আমি কথা বলব নাঈম ভাইর সঙ্গে। যাই হোক দুপুরে কথা বলে সন্ধ্যায় অফিসে গেলাম। অবাক বিস্মিত হলাম। আমার সেই আত্মীয়ের বদলির অর্ডারের কপি টেবিলে। বাংলাদেশে কোনো সরকারি অফিসে এত দ্রুত কাজ হতে পারে? এই ছিলেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। ম্যান অব অ্যাকশন।

এলজিইডির অফিস তখন লালমাটিয়াতে। প্রকৌশলী সেলিম ও ইফতেখার তার সঙ্গে কাজ করতেন। এরপর মাঝে মাঝে ফোন করতাম। যেতাম কম। তবে মানুষটার কর্মদক্ষতার খবর রাখতাম। এরই মধ্যে একদিন কুষ্টিয়ার এক বন্ধু আমাকে নিয়ে গেলেন তার লালমাটিয়ার অফিসে। প্রাণবন্ত মানুষ। তার বিরুদ্ধে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা নানামুখী প্রচারণায় লিপ্ত। কর্মপাগল মানুষটি বিরক্ত। আমি আমার অবস্থান থেকে তার পাশে দাঁড়ালাম। এভাবে আমাদের সম্পর্ক শুরু। এরপর যখন খুশি আমি যেতাম। তিনিও ফোন করতেন। লালমাটিয়ার অফিসটির কাছেই ছিল আমার বাসা। সন্ধ্যার পর অনেক সময় হেঁটে যেতাম। আবার শুক্রবার, শনিবার তিনি অফিস করতেন। সুবিধা ছিল। দক্ষ, মেধাবী মানুষটি কাজই বুঝতেন। সচিবালয়ের ছোট দুটি কক্ষে যে এলজিইডির শুরু তার বিস্তার ঘটান লালমাটিয়ার ভাড়া বাড়ি থেকে। এরপর আগারগাঁওয়ে স্থাপন করেন প্রধান কার্যালয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অফিসটি উদ্বোধন করেন। মনে আছে, উদ্বোধনের আগে প্রতিদিন তিনি আগারগাঁও যেতেন। মাঝে মাঝে আমাকেও নিতেন। প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, আতাউল্লা ভুঁইয়া, শহীদুল হাসানসহ সবাই থাকতেন। কোথায় কোন অফিস হবে তিনি দেখে দেখে সিদ্ধান্ত দিতেন। শুধু তাই নয়, নিজে গাছ লাগানো পর্যন্ত সরেজমিন দেখতেন। সারা দেশের প্রতিটি অফিস ছিল তার নখদর্পণে। সব নির্বাহী প্রকৌশলী তটস্থ থাকতেন। সবাই তাকে বাঘের মতো যেমন ভয় পেতেন, তেমনি সম্মানও দিতেন। বলিষ্ঠ হাতে তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাকে বেশি সহায়তা করতেন শহীদুল হাসান। কাজে গাফিলতি তিনি বরদাশত করতেন না। প্রকৌশলীদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে দেশ-বিদেশে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নিতেন। এমন কাজপাগল মানুষ আমি আর দ্বিতীয় কাউকে দেখিনি। সততা, নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা ছিল তার ভূষণ। বুকভরা সাহস নিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা কাজ করতেন। কোনো অন্যায় চাপের কাছে কখনো আত্মসমর্পণ করতেন না। আমার প্রতি তার স্নেহের শেষ ছিল না। এলজিইডির উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। আমি তার রুমে বসে আছি। মিটিং দেখে চলে যেতে তৈরি হতাম। তিনি থামাতেন। বলতেন বসুন। দেখুন আমাদের কর্মকাণ্ড। আমি বসে থাকতাম চুপচাপ। তিনি প্রতিটি কাজের মনিটরিং করতেন। অদক্ষতা, অযোগ্যতা তার ডিকশনারিতে ছিল না। কাজ করার ক্ষেত্রে সময় বেঁধে দিতেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই খোঁজখবর নিতেন। এই যুগে এমন সরকারি কর্মকর্তা বিরল। শুধু সরকারি কাজ নয়, সামাজিক কাজেও অংশ নিতেন অবসরে। ছুটে যেতেন কুষ্টিয়া ও খুলনায় পারিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো দেখতে।

একবার কুষ্টিয়া গেলাম তার সঙ্গে। যশোর থেকে যোগ হলেন সাংবাদিক ফখরে আলম। আমাদের নিয়ে গেলেন নিজের গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখাতে। এ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে। বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠান। অতিথি ছিলেন প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। যশোর থেকে প্রতিমন্ত্রী এক গাড়িতে। আমি আর ফখরে আলম উঠলাম সিদ্দিক সাহেবের গাড়িতে। স্কুলের অনুষ্ঠান শেষ হলো। তিনি বাড়ির পাশের মাজার জিয়ারত করেন। এরপর যান নিজের বাড়িতে। বাবার সঙ্গে দেখা করেন। কুষ্টিয়ার উন্নয়নে তার অনেক অবদান। কুষ্টিয়ার বিষয়ে তিনি ছিলেন খাজা বাবা। কেউ এলে অনেক সময় পছন্দ না হলে হৈচৈ করতেন। কিন্তু কাজটা করে দিতেন। এলজিইডিতে এখনো কুষ্টিয়ার অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু কুষ্টিয়াতে নয়, খুলনায়ও করেছেন। কুষ্টিয়া সফরকালে একটি ঘটনা আমাকে এখনো নাড়া দেয়। ফখরে আলম এবং আমাকে নিয়ে সার্কিট হাউসে যান তিনি। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকাল। ২০ মিনিট সার্কিট হাউসে অবস্থান শেষে যশোর ফেরার কথা। এক মহাঝামেলা তৈরি করে আওয়ামী লীগের কিছু লোক। তারা হুট করে কামরুল ইসলাম সিদ্দিককে ঘেরাও করে। তাদের দাবির শেষ নেই। কথার শেষ নেই। এমনকি অভিযোগেরও শেষ নেই। মূল অভিযোগ, আওয়ামী লীগের আরেকটি গ্রুপকে তিনি প্রশ্রয় দেন। আমি আর ফখরে আলম কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বুঝতে পারি বিকালের ফ্লাইটে বোধহয় ঢাকায় ফেরা হবে না। যে ঝামেলায় পড়েছি তা শেষ হতে সময় নেবে। ১০ মিনিট তিনি সবার হৈচৈ শোরগোল শোনলেন। তারপর আমাকে কাছে ডাকলেন। সবার সামনে আমার পরিচয় দিলেন। আমি হতবাক। কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে ধরে নিয়েছি পরিস্থিতির শিকার হলে সবাই মিলেঝিলে হব। কিন্তু কামরুল ইসলাম সিদ্দিক জানেন, কীভাবে ব্যক্তিত্ব দিয়ে সবকিছু সামাল দিতে হয়। তিনি ১০ মিনিটের মধ্যে সবকিছু সামাল দিলেন। সবাইকে শান্ত করলেন। এক পর্যায়ে আমার ডানহাত ধরলেন। আমরা গাড়িতে উঠলাম। পেছনের পরিস্থিতি ততক্ষণে শান্ত। আসলে তিনি সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারতেন।

আরেকটি ঘটনা। এলজিইডি অফিসে গেলাম এক বিকালে। আমার সঙ্গে সংসদ সদস্য মীর্জা আজম। রংপুরের দুজন এমপি এলেন। তারা প্রধান প্রকৌশলীর সামনের চেয়ারে বসা। আমি আর আজম ভাই বসলাম সোফাতে। হঠাৎ রংপুরের এক এমপি চেঁচামেচি শুরু করলেন। বললেন, এলজিআরডি মন্ত্রী রংপুরে যে অঙ্গীকার করে এসেছেন সেগুলো হয়নি। আপনি নিজেকে কি মনে করেন? এমপির বক্তব্যে শালীনতা ছিল না। আমরা দুজন হতবাক। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ইংরেজিতে বললেন, এটা আমার অফিস। আপনি এখানে চিল্লাচিল্লি করতে পারেন না। এখনই বের হন। আর আপনি ভবিষ্যতে আসার আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসবেন। হৈচৈ শুনে ছুটে আসেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল হাসান। তিনি দুই এমপিকে নিয়ে বেরিয়ে যান। মীর্জা আজম আমাকে বললেন, চলুন। আজ যে কারণে আপনাকে নিয়ে এলাম বলব না। আমি বললাম, কামরুল ভাই আজ চলে যাই। তিনি হাসলেন। বললেন, বসুন। কফি দিতে বললেন আমাদের। কিছুক্ষণ গল্প-গুজবের পর আজম ভাইর সব কাজ করে দেন। হুমকি-ধমকি তিনি প্রশ্রয় দিতেন না। আরেকবার এক মন্ত্রী ফোন করেন অবৈধভাবে ঠিকাদারির এক তদবিরে। তিনি মন্ত্রীর ফোন ধরলেন না। এতে প্রভাবশালী সেই মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। আমার সামনেই সবকিছু ঘটে। আরেকটি ঘটনা না বলে পারছি না। আওয়ামী লীগের তখনকার এক প্রতিমন্ত্রীর ফোন না ধরাতে তিনি ছুটে আসেন আগারগাঁও এলজিইডি অফিসে। আমি বসা ছিলাম তার সঙ্গে। তিনি আমাকে নিয়ে বের হওয়ার মুহূর্তে লিফটের সামনে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা। সোজা বললেন, আমি জরুরি কাজে বেরিয়ে যাচ্ছি। প্রতিমন্ত্রী বললেন, আমি আপনার কাছে এসেছি। তিনি থামলেন না। সোজা এসে আমাকে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন।

একবার আমার সঙ্গে ঘুরতে চলে গেলেন গাজীপুরে আমার বন্ধু মেজর (অব.) জাহাঙ্গীরের বাগানবাড়িতে। আমরা পুকুর থেকে মাছ তুললাম। তাজা মাছের ফ্রাই খেলাম। ফিরলাম রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে। তবে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ গেলেন এলজিইডির জেলা অফিসে। অফিসের চারপাশে গাছের সংখ্যা কম দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন। তিনি ছিলেন পরিবেশবান্ধব মানুষ। কুষ্টিয়ায় তার গড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গাছ লাগিয়েছেন। আমি তার সঙ্গে দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি নিয়ে কথা বলেছি। আলোচনায় নাটক, থিয়েটার, চলচ্চিত্র সব প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

কেন জানি তিনি আমাকে ভীষণ পছন্দ করতেন। রাত-বিরাতে আমরা আড্ডা জমাতাম। দেশ-জাতি-সমাজ কোনো কিছু বাদ থাকত না। শিল্প-সাহিত্য জগতের প্রতি তার সমীহ ছিল। নড়াইল ছুটে যেতেন এস এম সুলতানের খবর নিতে। নির্জনে পড়ে থাকা শিল্পীর জন্য সড়ক নির্মাণ করে দেন। ব্যক্তিগতভাবেও ফোন করে এস এম সুলতানের খবর নিতেন। এলজিইডির জেলা প্রকৌশলীর ওপর নির্দেশ ছিল এস এম সুলতানের খোঁজ রাখা। হুমায়ূন আহমেদের অনুরোধে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেন। অনুরোধ রেখেছেন বেলাল বেগ, কবি নির্মলেন্দু গুণসহ আরও অনেকের। একদিন আমাকে বললেন, আমি দুজন সাংবাদিকের রিপোর্ট মনোযোগ দিয়ে পড়ি। একজন মোনাজাত উদ্দিন, আরেকজন ফখরে আলম। এ দুই সাংবাদিক গ্রামীণ উন্নয়নের কথা লিখেন। মানুষের অবহেলা-বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। সমস্যা আর সম্ভাবনার কথা জানান। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক তাদের রিপোর্ট পড়ে ব্যবস্থা নিতেন। শুধু তাই নয়, কথা বলতেন তাদের সঙ্গেও। পত্র-পত্রিকার চিঠিপত্রের কলামও তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্টের সমস্যার কথা লিখতেন। পত্রিকার কাটিং নিয়ে অফিসে যেতেন। শহীদুল হাসানকে ডাকতেন। বলতেন, এখনই খোঁজ নাও। সমস্যার সমাধান কর।

শেষ জীবনে দেখা কম হতো। কথা হতো বেশি ফোনে। মাঝে মাঝে নিজেই ফোন দিতেন। আমিও ফোন করতাম। একদিন সোনারগাঁও হোটেলে এলেন কয়েকজন বিদেশিকে নিয়ে। আমাকে ফোন করলেন। বললেন, আমার সঙ্গে লাঞ্চ করুন। আমি গেলাম। একটি চিঠি দেখালেন। পানি নিয়ে তার কাজের প্রশংসা করে চিঠিটি পাঠিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী। আমি বললাম, আজ আপনি সরকারি কোনো দায়িত্বে নেই। তারপরও নীরবে কাজ করে চলেছেন। দেশ ও মানুষের জন্য আপনার এই দরদ বিদেশিদের কাছে লুকিয়ে নেই। তারা আপনার কাজকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। আমরা না-ই দিলাম। আসলে নিজের স্বীকৃতির বিষয়ে তিনি ছিলেন লাজুক। কখনো নিজের প্রচার করতেন না। আমি এটিএন বাংলার বার্তা বিভাগের টকশোতে মাঝে মাঝে ডাকতাম। একবার এক টকশোতে আমি ছিলাম উপস্থাপক। এক পর্যায়ে তার প্রশংসা করে আমি কথা বলার পর দেখলাম, তিনি লাজুক হয়ে উঠছেন। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক এমনই ছিলেন। বিএনপির শেষ জমানায় তিনি ঢাকা আরবান প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকার আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এ সময় ড. কামাল সিদ্দিক তাকে সহায়তা করেন। কিন্তু দুর্নীতিবাজ দুই রাজনীতিবিদের বিপক্ষে তার অবস্থানকে তারা ভালোভাবে নেননি। এক পর্যায়ে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় ঢাকাকে বদলে দেওয়ার প্রকল্প থেকে। ঢাকা সিটির উন্নয়ন সেখানেই থেমে যায়। আর গতি পায়নি।

কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ছিলেন স্বাপ্নিক মানুষ। তিনি জানতেন, স্বপ্নকে কিভাবে জয় করতে হয়। কাজ করতেন জনগণের জন্য। দেশের কল্যাণের জন্য। অর্থনীতিকে বদলে দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে যাওয়ার আধুনিক রূপকার তিনি। তার এই বিশালত্বকে স্বীকার করতেই হবে। যারা তা স্বীকার করেন না তাদের মানসিকতাই ছোট। এলজিইডির বর্তমান নেতৃত্ব এই ছোট মন নিয়েই চলছেন। এলজিইডি থেকে তার ছবি অপসারণে আমি কষ্ট পাইনি। কারণ আমি প্রয়াত কামরুল ইসলাম সিদ্দিককে চিনতাম-জানতাম। এলজিইডিতে কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের কোনো স্মৃতিচিহ্ন থাকলে তার আত্মা আজ কষ্ট পেত। কারণ এলজিইডি এখন লুটেরাদের প্রতিষ্ঠান। জীবিত থাকলে এসব দেখে দুঃখ পেতেন। মৃত্যুর পর তার ছবি এলজিইডিতে থাকলে তার ভেসে বেড়ানো আত্মা আর্তনাদ করত। তাই ভালোই হয়েছে এলজিইডিতে তার কোনো স্মৃতিচিহ্ন না রেখে।

আরও পড়ুন


প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল জজ হলেন নূসরাত

কাশ্মির ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করবে না তালেবান, দাবি ভারতীয় গণমাধ্যমের

পরীমণির মুক্তিতে জায়েদ খানের প্রতিক্রিয়া

পরীমণি কোথায় মেহেদি লাগিয়েছিলেন জানা গেল!


এলজিইডির এখনকার দায়িত্ববানরা কামরুল ইসলাম সিদ্দিককে মনে করছেন না। তার ছবি বা কোনো স্মৃতিচিহ্ন রাখেননি এলজিইডি অফিসে। তাতে কিছু যায়-আসে না। তিনি বেঁচে থাকবেন তার কাজে। সচিবালয়ের দুই রুমের অফিস দিয়ে এলজিইডির যাত্রা শুরু করেন। এরপর লালমাটিয়ার ভাড়া বাড়ি। পরের বিশালত্বের ইতিহাস সবার জানা। একাত্তরে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। স্বাধীনতার পর প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। দক্ষ প্রশাসক। মধ্যরাতেও অফিস করতেন। শুক্র, শনিবারও ছুটি কাটাতেন না। কর্মপাগল মানুষটির ছেলেমেয়েরা বাবার স্নেহ পায়নি। স্ত্রী বঞ্চিত হয়েছেন স্বামীর সান্নিধ্য থেকে। বাংলাদেশটাই ছিল কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের বুকজুড়ে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। আর্তমানবতার সেবায় কাজ করতেন। সারা দেশ চষে বেড়াতেন। সব সময় চিন্তা-চেতনায় লুকিয়ে ছিল বাংলাদেশ। আমি এমন দেশপ্রেমিক মানুষ খুব একটা দেখিনি। তিনি আজীবন যোদ্ধা ছিলেন। একাত্তর সালে দেশের জন্য অস্ত্র তুলে নেন কাঁধে। এরপর স্বাধীন দেশে সংগ্রাম শুরু করেন উন্নয়নের। গ্রামীণ অবকাঠামোর আধুনিক রূপকার হিসেবে ভাবা হয় তাকে। তার তুলনা তিনি নিজেই। এমন দেশপ্রেমিক বার বার জন্ম নেয় না। একবারই নেয়।

পাদটীকা : মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি আমাকে ফোন করেন সুইডেন থেকে। বললেন, পানিবিষয়ক সেমিনার করে নিউইয়র্ক যাব। বেশ কিছুদিন থাকব। আমি জানতাম আমেরিকায় ছেলে-মেয়ে-বোন থাকেন। একবার ম্যানহাটনের রাস্তায় গাড়ি করে আমি ঘুরছি। কামরুল ভাই হাঁটছেন কন্যা ও বোনকে নিয়ে। গাড়ি থামিয়ে তার কাছে ছুটে গেলাম। তিনি আমাকে দেখে অভিভূত। আমারও ভালো লাগল। আসলে এই মানুষটিকে দেখলেই মন ভালো হয়ে যেত। সুইডেন থেকে নিউইয়র্ক গেলেন। উঠলেন ছেলের বাসায়। একদিন সকালে অফিসে এসে মেইল চেক করছি। আমাদের কয়েকজনকে একটি মেইল পাঠিয়েছেন কামরুল ভাই। তিনি নিউইয়র্কে ভালো আছেন। ফিরে আসবেন ঈদের পর। আমি মেইলটি পড়ছি। এমন সময় ফোন করেন এলজিইডির প্রকৌশলী ইফতেখার। তিনি বললেন, একটি শোক সংবাদ আছে। আমাদের স্যার নেই। তার গলা কান্নাজড়িত। আমি বুঝতে পারছি না কোন স্যার। তাই বোকার মতো প্রশ্ন করলাম, কোন স্যার। তিনি বললেন, কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। বিস্ময়ে হতবাক। বললাম, আপনার ভুল হচ্ছে। আমি মাত্র তার মেইল পড়ছি। তিনি ভালো আছেন। তিনি আবার বললেন, মেইলগুলো করার পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। ফোন রেখে দিলাম। অনেকক্ষণ বাকরুদ্ধ ছিলাম। কি করে সম্ভব? কামরুল ভাই আপনি এত তাড়াতাড়ি এভাবে চলে গেলেন?

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

দুঃসময়ে সবাই কেন পালায় নেতাকে ছেড়ে

আফগান যুদ্ধ, জাতির জনককে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা ও জ্যাকব জুমার প্রতিবাদ

নঈম নিজাম

দুঃসময়ে সবাই কেন পালায় নেতাকে ছেড়ে

জ্যাকব জুমা নামে আফ্রিকান একজন নেতা আছেন। তিনি দীর্ঘদিন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বড় ব্যবসায়ী গুপ্তা পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিবারের গভীর সম্পর্ক নিয়ে নানামুখী গুজব-গুঞ্জন ছিল। ক্ষমতা ছাড়ার পর গুজবের ডালপালা আরও বিকশিত হয়। জ্যাকব জুমার পুত্রও যোগ দিয়েছিলেন গুপ্তা গ্রুপে। এ গ্রুপ সরকারি অনেক বড় বড় কাজ করত। সবখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। এ নিয়ে বিতর্ক আমলে নেননি জ্যাকব জুমা। কিন্তু ক্ষমতা ছাড়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। নানামুখী তদন্তের মুখোমুখি হন জুমা। গুপ্তা গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আদালত তলব করে জ্যাকব জুমাকে। কিন্তু আদালতে উপস্থিত হননি তিনি। বরং বললেন ক্ষমতাসীনরা শেষ বয়সে তাঁকে হয়রানি করতে নানামুখী কাজ করছে। কর্মী-সমর্থকরা নেতার কথা বিশ্বাস করলেন। কিন্তু বসে থাকল না আদালত। উপস্থিত না হওয়াকে অবমাননা হিসেবে নিয়ে আদালত অবমাননার দায়ে রায় দিল জ্যাকব জুমার বিরুদ্ধে। ছোটখাটো কোনো রায় নয়, দুই বছর কারাভোগের নির্দেশ। এবার পরিস্থিতি অনুধাবন করে প্রবীণ এই সাবেক প্রেসিডেন্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করলেন। আদালত তাঁকে পাঠাল কারাগারে। ঘটনা এখানে থামলে কথা ছিল না। কিন্তু এভাবে একজন রাজনীতিবিদকে কারাগারে নেওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে নেননি তাঁর সমর্থকরা।  ক্ষোভে ফেটে পড়ল গোটা আফ্রিকা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, ভাঙচুর, লুটপাট চলতে থাকল। পুলিশ ব্যবস্থা নিল। তাতে মারা গেল ৭৯ জন। কিন্তু গুলি থামাতে পারল না কাউকে। থেমে থেমে প্রতিবাদ চলছেই। সাধারণ মানুষের এক কথা- অপরাধ প্রমাণের আগে এভাবে সাজা দেওয়া যায় না। আদালত দিতে পারে না। কারান্তরিন জুমা নিজের সমর্থকদের আবেগ-ভালোবাসায় বিমোহিত হলেন। তিনি হয়তো এতটা আশা করেননি। ভাবেননি তাঁর জন্য এত মানুষ আত্মাহুতি দেবেন।

নেতার প্রতি ভালোবাসা এমনই হওয়া উচিত। কিন্তু সব সময় তা হয় না। কাবুল দখলের পর বিবিসিতে দেখছিলাম আফগান ভদ্রমহিলা চোখের জল ফেলতে ফেলতে কথা বলছেন। সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন বিবিসিকে। দুই দিন আগে তিনি ছিলেন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী। সময়ের নিষ্ঠুরতায় এখন জীবন নিয়ে উৎণ্ঠায় আছেন। বিবিসিকে বলছেন, ‘একমাত্র মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সরকারে যোগ দেওয়ার খেসারত হয়তো দিতে হবে।’ এই নারী নেত্রী ভাবতে পারেননি প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি সবাইকে অসহায়ত্বের মুখে ঠেলে দিয়ে কাবুল ত্যাগ করবেন। তাঁর চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছাপ। বড় দ্রুত পতন হলো কাবুলের। সরকারি বাহিনী কোথাও বাধা দিল না। প্রতিরোধ করল না কেউ। শীর্ষ গোয়েন্দা ও সেনা কর্মকর্তারা পালালেন সবার আগে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করলেন সাদা পতাকা উড়িয়ে। অনেকে কদমবুচি করলের তালেবানদের। মাত্র ১১ দিনে পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ চলে গেল আফগানদের হাতে। এখন আমেরিকা ও ন্যাটো সমর্থকরা বিপাকে। তাদের বাড়ি বাড়ি অভিযান চালিয়ে খোঁজা হচ্ছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে পরিবারকে। সাংবাদিকদের অবস্থা কারও কাহিল। শীর্ষ ব্যক্তিরা সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে গেছেন। নিচের দিকের জন্য একটু সময় দরকার ছিল। সে সময় কেউ পাননি। একটি সেনাবাহিনী কেন ব্যর্থ হবে এভাবে? কী প্রশিক্ষণ তারা নিয়েছিলেন? অথচ এ বাহিনী তৈরি করতে আমেরিকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। সে অর্থও কোনো কাজে লাগল না। বিপদে পড়লে টের পাওয়া যায় আপনজনদের চেহারা। আফগানিস্তানের মানুষ বিদেশিদের খপ্পরে পড়ে এভাবে বারবার বিপদে পড়েছে। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ধোঁকা দিয়ে সেনা নিয়ে চলে গিয়েছিল। আফগানরা তাদের বিশ্বাস করে বিপদে পড়েছিল। সোভিয়েত মিত্র নজিবুল্লাহর পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ। ১৯৯৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর নজিবুল্লাকে আটক করে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলায় তালেবানরা। সারা বিশ্ব এখন উৎকণ্ঠিত কী হবে আফগানিস্তানে? উৎকণ্ঠা বেশি নারী ও শিশুদের নিয়ে।

আফগানিস্তানে এমন পরিস্থিতি আরেকবার হয়েছিল ১৯২৭ সালে। তখন বাদশাহ ছিলেন আমানুল্লাহ খান। সৈয়দ মুজতবা আলী কাবুল গিয়েছিলেন শিক্ষকতা করতে। মুজতবা আলীর লেখায় সে সময়ের চিত্র পাই। আমানুল্লাহ খান আধুনিক আফগান গড়তে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। হুট করে সব বদলে গেল। বাচ্চায়ে সকাও নামে এক উগ্রপন্থি কাবুল দখল করে নিলেন। আমানুল্লাহ খানকে বলা হলো কাফির। পরিস্থিতি বদলাতে শেষ চেষ্টা করা হলো। আমানুল্লাহর সেনা, পুলিশ সবাই উগ্রপন্থি ডাকাতের সঙ্গে যোগ দিল। হতাশা বিস্ময় নিয়ে আমানুল্লাহ পালালেন ইতালি। বর্তমান আফগান চিত্র দেখে পুরনো কথাগুলো মনে পড়ল। ইতিহাস ফিরে আসে বারবার।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়াই ইতিহাসের শিক্ষা। সারা দুনিয়ার রাজনীতিকে শেষ করে দেয় হিংসা, প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ। আমরা জাতির পিতাকে রক্ষা করতে পারিনি।  সেদিন রক্ষীবাহিনীর উপপরিচালক আনোয়ারুল আলম শহীদের একটি লেখা পড়ছিলাম। এ বাহিনীর পরিচালক কর্নেল নুরুজ্জামান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা। আনোয়ারুল আলম শহীদ ও সরোয়ার মোল্লা ছিলেন উপপরিচালক। পরে সেনাবাহিনী থেকে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন মেজর হাসান। একদিন পুলিশের আইজি ই এ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলেন আনোয়ারুল আলম শহীদ ও সরোয়ার মোল্লাকে নিয়ে। বললেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি রাষ্ট্রনায়কের বসবাসের জন্য নিরাপদ নয়। দেশ-বিদেশের নানামুখী ষড়যন্ত্র বাসা বেঁধেছে। বঙ্গবন্ধু তাদের কথা শুনলেন। ইতিহাসের রাখালরাজা বঙ্গভবনে থাকলেন না। জনগণ থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হতে চাননি। ধানমন্ডির দরজা খোলা থাকত সব মানুষের জন্য। যে কেউ প্রবেশ করতে পারত অনায়াসে। জাতির পিতা বলে কথা। শুধু পুলিশের আইজি নন, বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করতে ইন্দিরা গান্ধী গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রতিনিধি পাঠান। ইন্দিরার বান্ধবী পপলু জয়কর তাঁর বইতে লিখে গেছেন সব। ইন্দিরার বার্তা নিয়ে আসা ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সাধারণ মানুষের মতো বসবাস দেখে হতাশ হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে জানালেন ষড়যন্ত্র ও তাঁদের উৎকণ্ঠার কথা। বঙ্গবন্ধু সব শুনলেন। তারপর স্বভাবসুলভভাবে পাইপ ধরিয়ে বললেন, ‘তুমি অকারণে ঘোরাঘুরি করছ। খাওয়া-দাওয়া কর।’ জাতির পিতারা হয়তো এমনই হন। মানুষের ভালোবাসায় ভুলে যান পলাশীর সেই ষড়যন্ত্রের কথা। ভারতবর্ষের পতনের সূচনা কাশিমবাজারের কুঠিতে হয়েছিল। মীরজাফর, ঘষেটি বেগমরা সিরাজকে উচ্ছেদ নয়, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা তুলে দিয়েছিল ইংরেজ বেনিয়াদের হাতে।

বঙ্গবন্ধু জনগণের নেতা ছিলেন। মানুষের প্রতি ছিল কঠিন আস্থা। একটি দেশ তৈরি করেছেন তিনি। তাই মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকান্ডকে গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। কোনো নিরাপত্তাবলয়ে মহাত্মা গান্ধী থাকতেন না। মানুষই ছিল তাঁর ঠিকানা। বঙ্গবন্ধু তো মহাত্মা গান্ধীর উত্তরাধিকার। জীবনের পরোয়া কীভাবে করবেন? হয়তো ভাবতেও পারেননি কোনো বাঙালি তাঁর বুকে গুলি চালাতে পারে। তাঁর চোখের সামনে কথা বলতে পারে। কিন্তু মীরজাফরের দেশে তো সবই সম্ভব। জীবনের শেষ মুহুর্তে আক্রান্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু ফোন করলেন সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ, বিডিআর ও গোয়েন্দা প্রধানকে। কেউই রক্ষা করতে পারলেন না জাতির পিতাকে। কারও নাকি প্রস্তুতি ছিল না। কমান্ড ছিল না বাহিনীর প্রতি। বলে কী? রাষ্ট্রপতিকে রক্ষা করতে প্রস্তুতি থাকবে না একটি দেশের? ঘুম পাড়ানো ইতিহাস শুনে আমরা বড় হয়েছি। প্রশাসন ব্যর্থ হলো। রাজনীতিবিদরাও পরদিন হাওয়া হয়ে গেলেন। এত বড় দল, কোটি কোটি কর্মী-সমর্থক, জাতির পিতার লাশ পড়ে রইল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সিঁড়িতে। এগিয়ে যাননি কেউই। করেননি মিছিল সমাবেশ প্রতিবাদ। শেখ হাসিনার আক্ষেপটা বুঝি। আল্লাহ তাঁকে ধৈর্য দিয়েছেন বলে সহ্য করছেন। বড় দুর্ভাগা জাতি আমরা। যিনি দেশ দিলেন তাঁকে রক্ষা করতে পারল না কেউ। প্রতিবাদও করল না। জীবনের ঝুঁকি নিল না কেউই। আজকাল অনেক বড় বড় বক্তৃতা শুনি। আলোচনা শুনি। বই প্রকাশের উৎসব চলে। কান্নায় ভেসে যান অনেকে। মাঝেমধ্যে ভাবী, দুঃসময় এলে এই মানুষগুলো থাকবেন তো? ’৮১ সালের পর শেখ হাসিনাকে নিয়ে প্রথম বই লেখেন আবদুল মতিন। এ বইটি আমাকে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নিজে। এখন দেশে আওয়ামী বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, পেশাজীবীর অভাব নেই। সংগঠনের অভাব নেই। তোষামোদকারী বক্তার শেষ নেই।

বেশি দিন আগের কথা নয়। ওয়ান-ইলেভেনের পর আমাদের দুই নেত্রী আটক হলেন। সারা দেশ উত্তাল করতে পারেনি জ্যাকব জুমার সমর্থকদের মতো কেউই। আত্মাহুতি দেওয়ার জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। কেন এমন হয়? হোলি আর্টিজানে হামলার রাতে প্রত্যাশা ছিল আওয়ামী লীগ কর্মীরা ঢাকার রাজপথ সয়লাব করে দেবেন জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে। না, সে রাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন নির্দেশ নিতে গণভবনে প্রবেশের মুহুর্তে তিন নেতাকে দেখলেন। আর কারও খবর ছিল না। কথামালার লোকের অভাব নেই এ দেশে। কাজের মানুষের বড় অভাব। সরকারের বিরুদ্ধে সাইবারযুদ্ধ করছে কিছু মানুষ এখন দেশ -বিদেশ থেকে। জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে যা খুশি তা-ই বলছে, করছে। অথচ এ সাইবার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নাকি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। সরকারে নাকি সক্ষমতার অভাব। বড় অদ্ভুত সবকিছু। এত বিশাল সরকারের আইটি খাতের কাজ কী? একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন। ক্ষমতায় থেকে না পারলে আপনারা কখন পারবেন? ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা অনেকে ভুলে গেছে। সেদিন টার্গেট ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। খুনিরা চেয়েছিল তাঁকে শেষ করে দিতে। কারণ ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যাকে শেষ করতে পারলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শেষ ঠিকানা স্তব্ধ হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন


সূরা বাকারা: আয়াত ৩৪-৩৫, আদমের প্রতি ফেরেশতাদের সিজদা

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সম্পাদকের গ্রেপ্তার দাবি মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের

আগস্ট মাসে কোনো বিশৃঙ্খলা চাই না: বরিশাল মেয়র

সাভারে তুরাগ নদে নেমে দুই কিশোর নিখোঁজ


২১ আগস্টের সময় কাজ করতাম এটিএন বাংলায়। ১৫ আগস্টের মতোই আরেকটি ভয়াবহ দিন এ জাতির জন্য। আল্লাহ অল্পের জন্য রক্ষা করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে। হয়তো আল্লাহ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এ দেশের উন্নতি-সমৃদ্ধির কাজগুলো তাঁর হাত দিয়ে করানোর জন্য। ২২ আগস্ট একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা মেজর লিয়াকত এলেন এটিএন অফিসে। তিনি আগের দিন ধারণ করা সব ভিডিও ফুটেজের কপি চাইলেন। চ্যানেল আই, এনটিভি অফিসেও তাদের একই দাবি। সন্দেহ হলো, মনে হলো তারা আলামত নষ্ট করতে চান। আমি তাকে বললাম ডকুমেন্টস দিতে পারব না। তিনি হুমকি দিলেন। বিষয়টি ফোনে জানালাম নেত্রীকে। তিনি বললেন, তোমার সন্দেহ সঠিক। ওরা আলামত নষ্ট করে দিতে চায়। আমি লোক পাঠাচ্ছি। ফুটেজের অনেক কপি করে ফেল। নেত্রী পাঠালেন তাঁর প্রেস সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ ও দলীয় নেতা অসীম কুমার উকিলকে। তাঁরা একটি চিঠি নিয়ে এলেন, ২১ আগস্টের ধারণ করা সব ফুটেজের কপি চেয়ে লেখা ছিল সেই চিঠি। লিখলেন, মামলার কাজে লাগবে এ ফুটেজ। আমরা ফুটেজের কপি দিয়ে দিলাম। পরে সেই গোয়েন্দাও কপি নিলেন। কিন্তু ততক্ষণে দেশ-বিদেশে চলে গেছে ২১ আগস্টের ফুটেজের সব কপি। সময়টা বড় নিষ্ঠুর ছিল। পরিষ্কার করে বলছি, ২১ আগস্ট বাঙালির জন্য আরেক বিভীষিকার দিন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব বিরোধী দলের নেতার নিরাপত্তা বিধান করার। কিন্তু রাষ্ট্র যখন নিজেই ষড়যন্ত্র করে তখন বলার কিছু থাকে না। শুকরিয়া- শেখ হাসিনা সে চক্রান্ত মোকাবিলা করে আজকের অবস্থানে।

ক্ষমতার ধারাবাহিকতা নিয়ে কারও তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার কিছু নেই। ক্ষমতার জোয়ার-ভাটা থাকে। নেতার সঙ্গে কথায় নয়, জীবন বাজি রেখে কর্মীদের থাকতে হয়। কিন্তু কতজন কর্মী, কটি দেশের মানুষ তা পারে? দক্ষিণ আফ্রিকায় জ্যাকব জুমার সমর্থকরা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছেন কীভাবে নেতাকে ভালোবাসতে হয়। ক্ষমতার কথামালার সঙ্গে দুঃসময়ের কোনো মিল থাকে না। ক্ষমতায় থাকাকালে সুবিধাবাদীর ভিড়ে সত্যিকার কর্মীরা বঞ্চিত হন। নীরব অভিমানে অনেকে দূরে সরে যান। আর উল্লাস চলে সুবিধাবাদীদের। ক্ষমতার উল্লাসকারীরা দুঃসময়ে থাকে না। তারা নিজের অর্থসম্পদ রক্ষা করতে কেটে পড়ে। অথচ ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের কথা শুনলে চোখে জল আসে। আর বঞ্চিতদের কথাবার্তা তিতা মনে হয়। এ তিতা করলার মানুষগুলোই দুঃসময়ে লড়ে যান। ইতিহাস তা-ই বলে। বাস্তবতাকে ধারণ করে একটি দল চললে সমস্যা থাকে না। দল করতে গিয়ে ক্ল্যাসিক প্রতিযোগিতা থাকবেই। কিন্তু খারাপ সময়ের আশঙ্কা থাকলে নষ্টদের উল্লাসকে পেছনে ঠেলে দিতে হয় কখনো কখনো। কাছে টেনে নিতে হয় দুঃসময়ের কর্মীদের। সামান্য এ কাজটুকুতেই তৈরি হয় জ্যাকব জুমার মতো কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী। যারা টিকে থাকে। খারাপ সময়ে নেতাকে ত্যাগ করে না।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর