সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৮১-৮৩, শিক্ষণীয় দিক
সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৮১-৮৩, শিক্ষণীয় দিক

সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৮১-৮৩, শিক্ষণীয় দিক

অনলাইন ডেস্ক

আজ সূরা ইয়াসিনের শেষ তিন আয়াত ৮১ থেকে ৮৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৮১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَوَلَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ بَلَى وَهُوَ الْخَلَّاقُ الْعَلِيمُ (81)

“যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কি (কিয়ামতের দিন) তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ (সক্ষম) তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। ” (৩৬:৮১)

গত আসরে সামান্য শুক্রবিন্দু থেকে মানুষ এবং সবুজ গাছ থেকে আগুন সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমতা বর্ণিত হয়েছে। সূরা ইয়াসিনের শেষদিকের আজকের এই আয়াতে আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে মহান আল্লাহর ক্ষমতা বর্ণনা করে বলা হচ্ছে: যদি মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে তোমাদের সংশয় থেকে থাকে তাহলে এই বিশাল আসমানের দিকে তাকিয়ে দেখো, সেটিকে কত সুবিন্যস্ত করে তৈরি করা করা হয়েছে এবং বিস্ময়কর এক ব্যবস্থার আওতায় সৌরজগতের সব গ্রহ-নক্ষত্র নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে।

আমাদের দৃষ্টিতে এই পৃথিবী অনেক বড় মনে হলেও বিশাল গ্যালাক্সির ভেতরে তার অবস্থান বিশাল মরুভূমির মধ্যে  একটি বালুকণার সমতুল্য। এই পৃথিবীতেও আবার রয়েছে হাজারো রকমের প্রাণী, উদ্ভিদ, জীবজন্তু, পাহাড়, সাগর, নদী, মরুভূমি ও খনিজ সম্পদ। এতসব প্রাণী ও সম্পদের হিসাব রাখা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

এই আয়াতের মাধ্যমে প্রশ্ন করা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির এত বৈচিত্র ও বিশালত্ব দেখার পরও কি তোমাদের মনে কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে সংশয় জাগে? পার্থিব জীবনে এক বিন্দু শুক্রাণু মায়ের গর্ভের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মানুষে রূপান্তরিত হয়। এরপর নবজাতক পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সে ধীরে ধীরে বড় হয় এবং শক্তিসামর্থ্যবান মানুষ হয়ে ওঠে। কিন্তু কিয়ামতের দিন মানুষের জন্ম এরকম হবে না। সেদিন মাটির মধ্যে পচে গলে যাওয়া দেহাবশেষ থেকে একজন মানুষকে দুনিয়ার জীবনে যেমন ছিল তেমন করেই আবার পূর্ণবয়স্ক মানুষ হিসেবেই পুনরুজ্জীবিত করা হবে।

যদি কেউ একথা বলে তর্ক করতে চায় যে, মানুষের দেহাবশেষ তো এক স্থানে না থেকে নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পারে। তখন তাকে একত্রিত করা হবে কিভাবে? এই অনর্থক  প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, পৃথিবীর প্রতিটি ক্ষুদ্রতম বস্তুর ওপর আল্লাহ তায়ালার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তার ক্ষমতার বাইরে থাকা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই মানুষের দেহাবশেষ যেখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকুক না কেন তা জড়ো করে তাকে আবার পূর্ণাঙ্গ মানুষে রূপ দেয়া মহান আল্লাহর জন্য মোটেই কঠিন কাজ নয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. খোদাদ্রোহীদের বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তাকে যুক্তিপূর্ণ পাল্টা প্রশ্ন করা যেতে পারে। এমন প্রশ্ন করতে হবে যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে সত্যকে খুঁজে পায়। পবিত্র কুরআনে এরকম অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে।

২. কোনো কিছুকে অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্বে আনার জন্য প্রজ্ঞা, শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োজন যা অসীম ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তায়ালার রয়েছে।

৩. যে আল্লাহ এত সুশৃঙ্খল বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন তার পক্ষে কিয়ামতের দিন মানুষকে আবার জীবন দান করা কষ্টসাধ্য কোনো ব্যাপার হবে না।

সূরা ইয়াসিনের ৮২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (82)

“তিনি যখন কোন কিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাকে কেবল বলে দেন, ‘হও’ তখনই তা হয়ে যায়। ” (৩৬:৮২)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি-ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করতে গিয়ে বলা হচ্ছে: যেকোনো কিছু সৃষ্টি করা তাঁর জন্য অতি সহজ। বিষয়টা এমন নয় যে, আসমান সৃষ্টি আল্লাহর জন্য কঠিন এবং একটি পিপড়া তৈরি করা তাঁর জন্য সহজ। বরং প্রতিটা বস্তু তা যত বড় বা ছোট হোক না কেন তা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে সমান। তিনি ইচ্ছা করলেই যেকোনো জীব বা জড় বস্তু সৃষ্টি করতে পারেন। অন্য কথায় আল্লাহর ইচ্ছা এবং জড় বস্তু বা জীব সৃষ্টি করার মধ্যে কোনো সময়ের প্রয়োজন হয় না। চোখের পলক পড়ার আগেই সৃষ্টি হয়ে যায়।

মানুষ হিসেবে আমরাও যখন মনের কল্পনায় কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চাই তখনই তা কল্পনার জগতে সৃষ্টি হয়ে যায়। সময় লাগে না। কিন্তু আমরা সেই কল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে পারি না। কিন্তু মহান আল্লাহ যখনই যা কিছু ইচ্ছা করেন সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবে পরিণত হয়।

এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. ছোট-বড় যেকোনো ধরনের বস্তু বা জীব সৃষ্টিতে আল্লাহর ক্ষমতা সমান।

২. আল্লাহ তায়ালা অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে যেকোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনতে পারেন। কিন্তু মানুষ বিদ্যমান বস্তুর আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে মাত্র।

আরও পড়ুন


করোনার দুই ডোজ টিকায় মৃত্যুঝুঁকি কমে ৯৮ শতাংশ: গবেষণা

যখন যেখানে দেখবেন আর্জেন্টিনার সেমিতে ওঠার লড়াই

প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করতে পরীমণি অভিনয় করেছে : নাসির

ডেনিশ রূপকথা চলছেই


সূরা ইয়াসিনের শেষ আয়াত বা ৮৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

فَسُبْحَانَ الَّذِي بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (83)

“অতএব পবিত্র তিনি, যাঁর হাতে সবকিছুর রাজত্ব ও শাসন এবং তাঁরই দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। ” (৩৬:৮৩)

সূরা ইয়াসিনের এই শেষ আয়াতে সার্বিকভাবে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতাকে তুলে ধরে বলা হচ্ছে: এই বিশ্বজগতের একচ্ছত্র মালিকানা ও শাসন মহান আল্লাহর হাতে রয়েছে। তিনি সব ধরনের দুর্বলতা ও অক্ষমতার ঊর্ধ্বে। কাজেই কিয়ামতের দিন মানুষের পুনরুজ্জীবনের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন তাতে যেন কেউ সন্দেহ পোষণ না করে। সবাইকে অবশ্যই তার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।  

যদি আমরা তর্কের খাতিরে একথা বলতে পারতাম যে, মানুষ নিজেই তার মালিক; তাহলে হয়তো বা সে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনের বিরোধিতা করতে পারত। কিন্তু বাস্তবে নিজের মালিকানাই তো মানুষের হাতে নেই। বিশ্বজগতের সবকিছুর মতো মানুষের মালিকানাও আল্লাহর হাতে। এই পৃথিবীতে আসা যেমন মানুষের ইচ্ছায় হয় না তেমনি দুনিয়া থেকে চলে যাওয়াতেও তার কোনো হাত নেই। কাজেই কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করা উচিত নয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:

১. আল্লাহ তায়ালা যখন সবকিছু করতে সক্ষম তখন কিয়ামতের দিন মানুষের পুনরুজ্জীবনের ব্যাপারে সংশয় থাকা উচিত নয়।

২. এই সৃষ্টিজগতের শুরু এবং পরিচালনা আল্লাহর হাতে রয়েছে। আমরা সবাই তার কাছ থেকে এসেছি এবং অবশ্যই তার কাছে ফিরে যেতে হবে।

news24bd.tv এসএম