গ্যারান্টি দিতে পারবেন মোশতাকরা এখন নেই আওয়ামী লীগে

নঈম নিজাম

গ্যারান্টি দিতে পারবেন মোশতাকরা এখন নেই আওয়ামী লীগে

ছোটবেলায় হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে গিয়েছিলাম। লাকসাম থেকে রাতে ট্রেনে সিলেট। সকালে ঘুম ভাঙা চোখে পৌঁছলাম। সুরমা নদী পার হয়েছি নৌকায়। তারপর রিকশায় মাজারে। তখন সুরমায় তীব্র স্রোত ছিল। যাত্রী বেশি উঠলে নৌকা ডুবো ডুবো করত। বেশির ভাগ নৌকা দেখলাম ডুবো ডুবোভাবে যাত্রী নিয়ে নদী পার হচ্ছে। মাঝিরা নিয়ম-কানুন মানত না। যাত্রী নিত বেশি। আমরা সংখ্যায় ছিলাম অনেক। এক নৌকায় পুরো পরিবার। নদী পার হতে গিয়ে আমার ভয় ধরে গিয়েছিল। সে ভয়ের রেশ এখনো কাটেনি। কানের পাশ দিয়ে বিপদ গিয়েছিল। সেই বিপদ আমাদের নৌকার ছিল না। পাশের নৌকার। মাঝনদীর তীব্র স্রোতে নৌকাটি ডুবতে বসেছিল। যাত্রীরা ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করছিল। মাঝি ঠান্ডা মাথায় বৈঠা ধরে বসে আছেন। তার চেহারা ছিল নির্বিকার। আমাদের মাঝি কথা না বলে থাকতে পারেন না। বললেন, লোভে হয় সর্বনাশ। এত যাত্রী তোলার কী দরকার ছিল? এখন কোনোভাবে তীরের দিকে যাও। যাত্রীরা যেন নড়াচড়া না করে। নড়াচড়া করলেই সর্বনাশ। টানটান উত্তেজনা নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। মনের মাঝে ঢুকে পড়া সেই ভয়ের স্মৃতি এখনো আছে। খেয়ানৌকায় যাত্রী বেশি হলেই দুর্ঘটনা ঘটে। সবকিছু জেনেও মাঝিরা নৌকায় যাত্রী ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি তোলে। ঈদ, পূজা-পার্বণে লঞ্চের অবস্থাও একই। প্রতি বছরই লঞ্চ ডুবে যাত্রী মরে। কিন্তু বেসামাল ভাব কমে না। বরং দুর্ঘটনার পর আরও অপতৎপরতা বাড়ে। পুরনো লঞ্চে লাগানো হয় নতুন রং।

দেশে এখন নৌকার যাত্রীর অভাব নেই। চারদিকে নৌকাভর্তি উপচে পড়া মানুষ। তবে এ নৌকা নদীর নয়, আওয়ামী লীগের। গাছের পাতাও এখন আওয়ামী লীগ করে। সরকারি কর্মকর্তারাও বাদ নেই। প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে থাকতে রাজি নন। তাই তারা মিছিল-সমাবেশ করেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা দেন। ক্ষমতাবানরাও নিজের সুবিধার জন্য এসব বিষয়ে আশকারা দেন। দিন দিন এ আশকারা বাড়ছে। আর বাড়ছে বলেই বিএনপি নেতা হয়ে যান তাঁতী লীগের সভাপতি। পৌর জামায়াত সভাপতি হয়ে যান পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি। কী চমৎকার বোঝাপড়া! মন্ত্রী-এমপি সাহেবরা শুধু নিজের পরিবার-পরিজনকে ঘাটে ঘাটে বসিয়ে খুশি নন। তারা আরও চান। আর চান বলেই অন্য দল থেকে যাত্রী এনে নৌকার মাঝি বানান। ভাই লীগ তৈরি করেন আলাদা করে। নিজের দলের খবর নেই। কর্মীদের ভালো-মন্দের খবর নেই। অথচ খেয়াল-খুশিমতো যা খুশি তা করে চলছেন। জবাবদিহি নেই। দলের প্রার্থীকে ডোবাতে রাখঢাক নেই। চক্রান্তে গোপনীয়তার বালাই নেই। অতীত থেকে কেউই শেখেন না। ভাবেন চিরদিন এমনই যাবে। আসমানি তারারা বারবার সহায়তা করবেন। বাস্তবতা অনেক কঠিন। বিশ্ববাস্তবতা সব সময় এক রকম নাও থাকতে পারে। জোয়ারের পর ভাটা আসতে পারে। সরকারি আমলাদের মতিগতি আবহাওয়া দেখে বদলে যেতে পারে। পশ্চিমা দেশে নারী, আবহাওয়া আর চাকরির ঠিকঠিকানা নেই। আমাদের আমলাদেরও একই হাল। এখন ঠিক আছে, কাল নাও থাকতে পারে।

২০০১ সালের কথা অনেকের হয়তো মনে নেই। সে সময় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পরই সবকিছু বদলে যায়। চোখের ভাষায় পরিবর্তন আসে নির্বাচন কমিশনের। আমাদের কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে এক রাতেই দেখলাম দারোগা, ওসি বদলে গেছেন। ফেনী, নারায়ণগঞ্জের চিত্র ছিল দেখার মতো। দাপুটে এমপিরা পালিয়ে যান এলাকা থেকে। সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় আরেক গ্রুপ। চারদিকে তৈরি হয় গুমোটভাব। সে সময় একদিন অফিসে বসে আছি। আমি তখন এটিএন বাংলার বার্তা সম্পাদক। একদিন ফোন করলেন মির্জা আজম। বললেন অবস্থা ভালো বুঝছেন না। সবকিছু বদলে গেছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ অবস্থানে নেই। বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলাম সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর এপিএস ইব্রাহিম হোসেন খানের সঙ্গে (কিছু দিন আগে সচিব হিসেবে অবসরে গেছেন)। মির্জা আজম তাকে বললেন জনগণ তার পক্ষে। নিরপেক্ষ ভোট চান। প্রশাসন যাতে ভোট চুরির সহযোগী না হয়, তার লোকজনকে হয়রানি না করে সেই সহযোগিতাটুকু করলেই চলে। ইব্রাহিম ভাই বললেন, আজম ভাই চিন্তা করবেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলেন ময়মনসিংহের জিওসিকে। তখন জিওসি হয়েছেন মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম। তিনি দুই দিন আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর এসএসএফের প্রধান। তারা একসঙ্গে কাজ করতেন। ফোন পেয়ে জেনারেল সাহেব এপিএস সাহেবকে বললেন চিন্তা নেই। জামালপুর যাব। বৈঠক করব। নিরপেক্ষ ভোট অবশ্যই হবে। সব শুনে মির্জা আজম খুশি। বন্ধুর প্রতি একটু দায়িত্ব পালন করতে পেরে আমিও খুশি। জেনারেল রফিক কথা রাখলেন। তিনি জামালপুর গেলেন। প্রশাসনকে নিয়ে প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করলেন। কানে কানে মির্জা আজমকে বললেন, অবশ্যই নিরপেক্ষ ভোট করতে কাজ করব। চিন্তা করবেন না। আপনি প্রতি ভোট কেন্দ্রে একজন কর্মীকে সাইকেল দিয়ে রাখবেন। কোথাও সমস্যা হলে তারা সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী সেনাক্যাম্পে অভিযোগ করবে। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন। ভোটে ডিস্টার্ব হলে সহ্য করা হবে না।

পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেন মির্জা আজম। তার আসন দুটো উপজেলা নিয়ে। একটি উপজেলায় সকালেই সংঘাত শুরু হয়। তার নির্দেশপ্রাপ্ত কর্মীরা ঘটনা জানাতে সাইকেলে ছুটে যান সেনাক্যাম্পে। আর যাওয়ামাত্রই সেনা সদস্যরা তাদের নিয়ে যান ভিতরে। এরপর দুই হাতে দুটি ইট দিয়ে সূর্যের দিকে মাথা রেখে দাঁড় করিয়ে রাখেন লাইন ধরে। দূর থেকে এ দৃশ্য দেখে অভিযোগ করতে আসা বাকি সাইকেলধারী কর্মীরা পালিয়ে যান। পালানোর সময় অনেকে সাইকেলও ফেলে রেখে দৌড় দেন খেতের আইল ধরে। কোনো সহায়তাই কেউ পাননি। এমনও দিন আবার আসবে না ভোটের মাঠে কোনো গ্যারান্টি কি আছে? জোয়ার-ভাটার এই দেশে কখন কী হবে কেউ জানি না। মানবচরিত্র বড় জটিল। খারাপ সময়ে আপনজনরা দ্রুত পাশ থেকে সরে যায়। সামান্য একটা নিরপেক্ষ ভোট হলেই টের পাওয়া যায় কঠিন বাস্তবতা। আপনি যাকে আপন ভাবছেন তিনি কাল নাও থাকতে পারেন। আপনার পাশে নাও দাঁড়াতে পারেন।

১৫ আগস্ট মানবসভ্যতার ইতিহাসের ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার আগে এ দেশে সবাই বাকশাল হয়ে গিয়েছিলেন। পেশাজীবীরা বেশি যোগ দিয়েছিলেন দলে দলে। সারা দেশে আগাছা-পরগাছার শেষ ছিল না। ১৫ আগস্টের পর সেই আগাছারা কেটে পড়ে। তাদের হারিকেন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। যিনি যত বেশি সুবিধাভোগী ছিলেন তিনি আগে পালিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নাম নেওয়া যেত না। ’৭০ সালের আওয়ামী লীগের অনেক এমএনএ ’৭৯ সালে ভোট করেন বাঘ মার্কা নিয়ে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে সবকিছু স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন। ঘরে-বাইরে সবকিছু কঠিনভাবে সামাল দেন। তিনি শুরু করেন নতুনভাবে। সেই শেখ হাসিনাকে কাছ থেকে দেখেছি। তিল তিল শ্রম-ঘাম, মেধা-মননে নিজের মতো করে ধীরে ধীরে একটা অবস্থান তৈরি করেন। সব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবিলা করেন। লড়ে যান বঙ্গবন্ধুর আসন পুনরায় জনমনে ফিরিয়ে আনতে। সফল হন।


আরও পড়ুন: 

সৈয়দ আশরাফ কাদের মির্জা ও এখনকার আওয়ামী লীগ

সরকার কারা ডুবায় কীভাবে ডুবায়


সর্বশেষ ১২ বছরে দেশের অনেক কিছুর বদল হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বে নতুন মর্যাদার আসন পেয়েছে। কিন্তু ষড়যন্ত্র চক্রান্ত কি থেমে গেছে? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশটা স্বাধীন করেছেন। শেখ হাসিনা এ দেশের উন্নয়নে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন। আর কিছু মানুষ এ দলটিকে নিয়ে যা খুশি তা করে চলছে। যিনি যত বেশি পেয়েছেন তিনি তত বেশি নৌকাডুবির কাজ করছেন। ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর। ভুলে গেলে চলবে না, খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগই করতেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। বিশ্বাস আর আস্থার সম্পর্ক নিয়েই ছিলেন মুজিব পরিবারে। তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মাহবুবুল আলম চাষীদের শক্ত অবস্থান ছিল আওয়ামী লীগে। নিম্মির সঙ্গে বিয়ের পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যান মেজর ডালিম। বেগম মুজিব তাকে সন্তান  স্নেহে দেখতেন। খুনিদের সবাই আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ছিল। বঙ্গবন্ধু পরিবার জুলিয়াস সিজারের কাহিনি জানত। তার পরও কেউ সতর্ক হননি। এ দেশে জহুরুল কাইউম বাচ্চু মিয়ারা আওয়ামী লীগ করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাননি। আবার মোশতাক, ডালিমরাও ছিলেন নিষ্ঠুরতার চোখ নিয়ে। সে চোখ ধরা পড়েনি। ব্রুটাসও ধরা পড়েননি সিজারের কাছে। প্রাচীন রোমে দাপটশালী শাসক ছিলেন জুলিয়াস সিজার। তাঁর প্রথম জীবনের বন্ধু ছিলেন ব্রুটাস। উইলিয়াম শেকসপিয়রের নাটক জুলিয়াস সিজারের সেই সংলাপ মনে গেঁথে আছে। সিজারকে হত্যার সময় খুনিদের হাতে ছিল তরবারি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মুহূর্তে সিজার দেখলেন প্রিয় বন্ধু ব্রুটাসকে। সিজার ভেবেছিলেন তাঁকে রক্ষা করতে এসেছে বন্ধু। একটু পর বুঝলেন হত্যায় অংশ নিতেই ব্রুটাস এসেছে। তখন সিজার ল্যাটিন ভাষায় বলেছিলেন, অ্যাট টু ব্রুটি?!! ও তুমিও ব্রুটাস! বঙ্গবন্ধুও বলেছিলেন, পাকিস্তান আর্মি আমাকে হত্যার সাহস পায়নি। তোরা কারা? জবাব মেলেনি। তারা খুন করে জাতির পিতাকে। রেহাই দেয়নি শিশু ও নারীকে। কেউ কি বলতে পারেন মোশতাকরা এখন নেই? অবশ্যই তারা আছে নতুন নামে। মীর জাফর তো এ বাংলারই সন্তান। আমাদের চারপাশে মোশতাকরাই ঘুরে বেড়ায়। নানামুখী ষড়যন্ত্র করে। তার পরও তাদের কিছু বলা যায় না। বিষ খেয়ে হজম করে নিতে হয়। আওয়ামী লীগ ’৯১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি ষড়যন্ত্রের কারণে। ২০০১ সালের পরের ইতিহাস এখন সবাই ভুলে গেছে। অনেক মন্ত্রী-এমপির কান্ডকীর্তি মাঝেমধ্যে মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। এ যুগেও নিজের এলাকায় অনেকে নৌকা ডুবিয়ে দেন। পছন্দের প্রার্থী না পেলে দাঁড় করিয়ে দেন নিজের আপন ভাই থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন অথবা ভাই লীগের সদস্যকে। অনেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাত্তাও দেন না। অবশ্য কেন্দ্রে জাতীয় পর্যায়ের খ্যাতিমান নেতার সংখ্যাও কমে গেছে। মাঠের কর্মীরা অনেক কেন্দ্রীয় নেতাকে চেনেন না। মন্ত্রী-এমপিরা সে সুযোগ নেন। আরে ভাই! এতে খুশির কিছু নেই। শেখ হাসিনা হিমালয়সমান ইমেজ নিয়ে আছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শেষ ঠিকানা। সবকিছু সামাল দিয়ে চলেন। ম্যানেজ করে নেন। দেশের সাফল্যে মন্ত্রী, এমপি আর নেতাদের ভাব দেখানোর কিছু নেই। নিরপেক্ষ ভোট এলে অনেকের অস্তিত্ব থাকবে না। অর্থকড়ি কামাইকারী অনেকে ভাগবেন। থাকবেন না। আবার অনেকে এলাকায়ও যেতে পারবেন না। নিজে এমপি হয়েছেন। মন্ত্রী হয়েছেন। ভাই, ছেলে, স্ত্রীকে এলাকায় প্রতিষ্ঠিত করতে নৌকা ডোবাচ্ছেন কেন? আপনি এমপি আপনার ভাইকে কেন বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী করতে হবে? কত চান আপনারা? এ দলে কি অন্য কেউ আর নেই? অনেক হয়েছে।  এবার নিজেদের লাগাম টানুন।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

গিয়েছিলাম আলজাজিরা অফিসে, বলেছিলাম কথা

নঈম নিজাম

গিয়েছিলাম আলজাজিরা অফিসে, বলেছিলাম কথা

সময়টা ২০০৬ সালের মাঝামাঝি। আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলাম। দক্ষিণ এশিয়ার সাতজন সাংবাদিক ছিলাম একসঙ্গে। টিমটা ছিল দারুণ। আফগানিস্তানের একরাম কাজ করতেন ভয়েস অব আমেরিকায়। দারুণ আড্ডাবাজ। তাঁর চলাফেরায় বোঝা যেত না কী কঠিন সময় অতিক্রম করছে কাবুল। সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। ঢাকা থেকে ছিলাম আমি আর হাসনাইন খুরশিদ। কলকাতার মেয়ে মধুমিতা দত্ত তখন ‘আজকাল’ পত্রিকার চিফ রিপোর্টার। এখন কাজ করছেন আনন্দবাজার পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে। নেপাল থেকে ছিলেন একজন। নামটা মনে করতে পারছি না। ভারতের আরেকজন সাংবাদিক ছিলেন রাজেশ বাদল। তিনি ‘আজতক’-এ কাজ করতেন। বড় মাপের সাংবাদিক। পাকিস্তান থেকে আসেন পশতুন টিভির হেড অব নিউজ হাসান এবং এআরওয়াইয়ের মহসিন রাজা।

ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটরস প্রোগ্রামের আওতায় এ সফর। বিষয়বস্তু ছিল ‘দি অ্যাভালিং রোল অব ব্রডকাস্ট মিডিয়া’। শুরুটা হয়েছিল স্টেট ডিপার্টমেন্টের ব্রিফিং দিয়ে। পেন্টাগনেও আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। মার্কিন বিচার বিভাগ, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে কোনো কিছু বাদ ছিল না। এ সফরের আওতায় একদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ওয়াশিংটন আলজাজিরা অফিসে। বিশাল অফিস। আলজাজিরার সঙ্গে তখন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিদারুণ খারাপ সম্পর্ক। আমেরিকান সরকার ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিল আলজাজিরার ওপর। একদিন তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইসের সামনে আলজাজিরার বুম এগিয়ে দিয়ে একটি বিষয়ে মতামত জানতে চেয়েছিলেন রিপোর্টার। জবাবে রাইস বললেন, অ্যাই হেইট আলজাজিরা। এমন নানামুখী কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে আলজাজিরাকে কাজ করতে হতো।

আলজাজিরা অফিসে আমাদের স্বাগত জানালেন কর্মকর্তারা। রিজ খান সিএনএন ছেড়ে মাত্র যোগ দিয়েছেন আলজাজিরায়। পরিচয় হলো তাঁর সঙ্গে। কথা বললাম বিভিন্ন বিষয়ে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতাসহ অনেক বিষয়ই ছিল। রিজ খান নিজের নামে শো করে তখন বিখ্যাত। আলজাজিরার পলিসি নিয়েও কথা হয়। আমেরিকাকে সারা দিন গালাগাল দিয়েও কী করে এ দেশে এত বড় অফিস নিয়ে বসে আছেন? কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বললেন, কাজ করতে কোনো বাধাবিপত্তি নেই। ইরাক ও আফগানিস্তানে আমেরিকার বাড়াবাড়ি তুলে ধরছি। তাদের নিষ্ঠুরতার কথা বিশ্বকে জানাচ্ছি।

পরে এ বিষয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, আলজাজিরা অনেক অসত্য তথ্য প্রকাশ করছে। অনেক কিছু নিয়ে আমেরিকান সরকার বিব্রত ও বিরক্ত। এ নিয়ে আমেরিকান সরকার আলজাজিরাকে মাঝেমধ্যে প্রতিবাদ জানানো ছাড়া কিছু বলছে না। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বলে কথা। তবে আলজাজিরার সব প্রচারণার জবাব কঠোরভাবে দেওয়া হয় পয়েন্ট টু পয়েন্টে। এ বিষয়ে আমাদের মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা কাজ করেন। তারা প্রতিদিনই সতর্কতার সঙ্গে সবকিছু পর্যবেক্ষণে রাখেন। আমি রিজ খানের সঙ্গেও কথা বলি। সিএনএনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার গল্প শেয়ার করেন তিনি। আমেরিকান মিডিয়ায় মুসলমানদের কাজের পরিবেশ নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন। আলজাজিরার কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, কাতারভিত্তিক চ্যানেলটির পথচলা হবে দীর্ঘমেয়াদি। আফগান ও ইরাক যুদ্ধ তাদের সামনে এনেছে চমক নিয়ে। এ চমক তারা ধরে রাখবেন।

মিডিয়ার চমক ও চ্যালেঞ্জটা সারা দুনিয়ায় দুটি আলাদা বিষয়। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। আলজাজিরার শুরুটা চমক দিয়ে। তারা চমক ধরে রাখতে অনেক কিছু করছে বিশ্বব্যাপী। এ কারণে জন্ম দিচ্ছে অনেক বিতর্কের। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের মিডিয়ায় নানা স্তর আছে। লোকবলের অভাব নেই। দেশের সব সংস্থার মিডিয়া উইং আছে। প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে প্রেস সেক্রেটারির নেতৃত্বে মিডিয়া টিম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি শক্তিশালী মিডিয়া সেল আছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে অনেক দফতর-অধিদফতর। সরকারের বেশির ভাগ মন্ত্রীই মিডিয়া বিশেষজ্ঞ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে দেখি মিডিয়া কীভাবে চলা উচিত তা নিয়ে নিয়মিত ফেসবুকে জ্ঞান দিতে। মিডিয়া নিয়ে জ্ঞানী মানুষ স্তরে স্তরে। এত জ্ঞানী মানুষের ভিড়ে মিডিয়া নিয়ে চিন্তার কী আছে? এর বাইরে কাতারসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সব দেশেই রয়েছে বাংলাদেশের দূতাবাস। সবাই সব বোঝেন। সব জানেন। তার পরও সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো সমন্বয়ের। আর দরকার তথ্য মন্ত্রণালয়কে আরও অধিক শক্তিশালী করা। তাহলে অনেক কিছুর সমাধান হয়। এসব না করে কিছু লোক শুধু নিজের দেশে, নিজের লোকদের ক্ষমতা দেখাতে পারে। কোনো কিছু দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে না। বিদেশের কোনো কিছুর বাস্তবসম্মত জবাব দিতে পারে না। ঠেকাতে পারে না কোনো জটিল পরিস্থিতি। শরীর আর ক্ষমতার জোরে সবকিছু হয় না। বাস্তবতা মেনে পদক্ষেপ নিতে হয়।

আলজাজিরার ঘটনার পর দরকার ছিল সরকারের বারোমুখী বক্তব্য না রাখা। প্রতিটি অসত্যের কঠোর ভাষায় জবাব দেওয়া। প্রতিবাদ আলজাজিরার কাছে পাঠানোর পাশাপাশি দেশি মিডিয়ায় তুলে ধরা। এতে দেশবাসীর বিভ্রান্তি পূর্ণাঙ্গভাবে দূর হতো। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে জবাব প্রথম দিয়েছিল এটা কিছু হলো? যুক্তির খন্ডন কোথায়? ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা রিপোর্টে আনলে কি সবকিছু সঠিক হয়ে যেত? আজব মানুষের একটা যুগ চলছে। বলার কিছু নেই। বিভ্রান্তি মানে বিভ্রান্তি। এখানে কী দিলে ভালো হতো, কী দিলে মন্দ সে বিষয় মুখ্য নয়। মুখ্য বিষয় নিউজটি বিভ্রান্তিকর হলে পয়েন্টে পয়েন্টে ধরে জবাব দিতে হয়। হালকা কথার সুযোগ নেই। আজাইরা প্যাঁচালেরও দরকার নেই। টু দ্য পয়েন্ট কথা বলুন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে আরও পড়তে হতে পারে। আরও আসতে পারে। আগে থেকে পরিকল্পনা থাকা দরকার। জ্ঞানী ভাষণ আর বাস্তবমুখী কর্মযজ্ঞ সম্পূর্ণ আলাদা। একটার সঙ্গে আরেকটা মেলালে হবে না।

সেদিন এক শুভাকাক্সক্ষী বললেন, আপনার এত কথা বলার কী দরকার? কথা বলি অসহ্যরকম কিছু দেখলে বাধ্য হয়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর লন্ডনের সানডে পত্রিকায় খুনি ফারুকের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। খুনের পক্ষে একজন খুনির লেখা প্রকাশ মিডিয়াকে কলঙ্কিত করেছে। একই সময় কলকাতার এক জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক ডালিম ও তার স্ত্রী তাসনিম নিম্মির ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেগুলো সাংবাদিকতা ছিল না। খুনিদের পক্ষে সাফাই ছিল। এখন সে যুগ নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। তার পরও পারছে না কেন? সরকার ও দলের এত ম্যাকানিজমের কাজটা কী?

আসলে খোদাই খাসির মতো সবাই যার যার মতো চলছে। যার যা মনে আসছে তাই করছে। কোনো জবাবদিহি আর সমন্বয় আছে বলে মনে হয় না। সেদিন এক নেতাকে ফোন করে জানতে চাইলাম উপকমিটির সদস্যসংখ্যা কত হবে সর্বাধিক? জবাবে বললেন, কতজন হবে তা নির্দিষ্ট নেই। তবে সবকিছুর একটা মানানসই অবস্থান আছে। বললাম সে মানানসই অবস্থানটা কি সব উপকমিটি রক্ষা করছে? জবাবে সেই নেতা বললেন, এ নিয়ে কথা বলতে চাই না। বুঝতে পারছেন, অনেক কিছু নিয়ে কথা বলা যায় না। তার পরও বলতে হয়।

মরহুম রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লেখালেখি হয়েছে এ দেশের পত্রপত্রিকায়। তিনি তেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন না। সবকিছু সয়ে নিয়েছিলেন। এভাবে সবাই সয়ে নিতে পারেন না। সরকারের বাজেট আছে। লোকবলেরও অভাব নেই। কাজ করতে দরকার বাস্তবমুখী মেধা-মনন-চিন্তার প্রখরতা। আগে সমস্যাটা চিহ্নিত করতে হবে। তারপর সমাধানের দিকে মনোনিবেশ। আজব ভাবনা থেকে যা খুশি তা করা যায় না। অন্যের ওপর দোষ চাপানো সহজ, কাজ করা কঠিন। বাংলাদেশ এখন উন্নতি-সমৃদ্ধিতে বিশ্বে নতুন একটা জায়গা করে নিয়েছে। অনেকের কাছে বাংলাদেশের উন্নতি ঈর্ষণীয় একটি অবস্থানে। এ সমৃদ্ধির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হবেই। দেশে হবে, বিদেশে হবে। এসব চক্রান্তের জবাব উঁহু-আহা করে দিলে চলবে না। বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাগুলো তৈরি থাকতে হবে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একটা সমন্বয় থাকতে হবে। যে যার মতো করলে হবে না। সময়টা খারাপ। অনেক কিছুই বলতে চাই না। সুবিধাবাদীদের রাজত্বে বাস করে সত্য বলা কঠিন।

‘হু কিলড মুজিব’ এ এল খতিবের লেখা বইটি আবারও পড়ছিলাম। বইয়ের শুরুতে তিনি ১৯৭৪ ও ’৭৫ সালের কিছু চিত্র তুলে ধরেন। এ বইতে খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মাহবুবুল আলম চাষী ও খুনিচক্রের অনেক ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ১৫ আগস্টের আগেও তারা ছিলেন আওয়ামী লীগার। মোশতাক থাকতেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। ডালিম নিয়মিত যেতেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে। বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে ৩২ নম্বরে যাওয়া নিয়ে একদিন শেখ রেহানা ডালিমকে প্রশ্নও করেন। সেদিন ডালিম বলেছিলেন, একদিন প্রমাণ হবে কে আপন কে পর। ইতিহাসের এটাই নিষ্ঠুর সত্য। তাহের উদ্দিন ঠাকুরের দায়িত্বে ছিল তথ্য মন্ত্রণালয়। দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় যা খুশি তা লেখা হতো। সেসব চক্রান্তের জবাব কি তাহের উদ্দিন ঠাকুর ঠিকভাবে দিয়েছিলেন? অনেক প্রশ্নের জবাব এখনো মেলে না। সে সময়ের আরেকটি বিষয়, সবার সরকারি দল হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও খতিব তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন:


কোন ওয়াক্তের নামাজ কত রাকাআত?

রক্তে রাঙানো একুশ আজ

ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ আজ


বাকশাল গঠনের পর সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সবাই দল বেঁধে সরকারি দলে যোগ দেন। সাংবাদিক, শিক্ষকরাও বাদ ছিলেন না। সবাই সরকারি দলে। দেশে বিরোধী দল ছিল না। তবে জাসদ ও চীনপন্থি বামদের গোপন চক্রান্ত ছিল। এর বাইরে গাছের পাতাও সরকারি দল। বঙ্গবন্ধু এ উৎকণ্ঠা থেকে গভর্নরদের শক্তিশালী করার ব্যবস্থা নেন সব জেলায়। রাজনীতিটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা ছিল বঙ্গবন্ধুর মাঝে। বিষয়টি আমলারা ভালোভাবে নেননি।

ইতিহাসের এ কঠিনতম সময়ে দেশে এখন আমরা আবার সবাই আওয়ামী লীগ।  সুবিধাবাদীদের ভয়াবহ শাখা-প্রশাখার বিকাশ হয়েছে। গাছের পাতাও আওয়ামী লীগ করে। মন্ত্রী আর এমপি সাহেবরা ভাইলীগ বানিয়ে পরিবার লীগের বিকাশ ঘটিয়েছেন। ভাইলীগে যুক্ত করেছেন জামায়াত, বিএনপি। তারা ভুলে গেছেন অতীত। ২০০৯ সালের আগের কর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষায় এ দল ক্ষমতায়। শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ইতিহাস তৈরি করেছে। কোনো হাইব্রিড, আগাছা-পরগাছার দরকার হয়নি। এখন ক্ষমতার তুঙ্গে থাকার সময় এত লোকের কী দরকার? আর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দলের স্থানীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হতে হবে কেন? মাঠের নেতা-কর্মীদের দলটি করতে দিন। কারও দয়া-দাক্ষিণ্যের কিছু নেই। আপনারা যারা ভাবছেন ২০১৯ সালে আপনাদের সহায়তায় এ দল ক্ষমতায়, এ যুক্তি মানতে রাজি নই।

২০১৯ সালে বিএনপির সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল। দলের চেয়ারপারসন কারাগারে। কো-চেয়ারম্যান বিদেশে। সারা দেশে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার শেষ ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীর বড় অংশ হয় কারাগারে, নয় পলাতক ছিলেন। অনেক প্রার্থী এলাকায় যেতে পারেননি। এর বিপরীতে শেখ হাসিনার উন্নয়ন-সাফল্যের জোয়ার ছিল। ব্যবসায়ীরা সমাবেশ করে সরকারি দলকে শতভাগ সমর্থন দিয়েছিলেন। ৯৯ শতাংশ মিডিয়া ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে। ২০১৪ থেকে ২০১৮-এর অনেক মন্ত্রীরও সাফল্য ছিল। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ছিলেন চাঙা। মাঠ-ঘাট ছিল আওয়ামী লীগ কর্মীদের দখলে। শতভাগ নিরপেক্ষ ভোট হলে বিএনপি ৪০ থেকে ৫০টি আসন পেত। সে ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন অতি উৎসাহী কর্মকর্তারা। এ দায় তারা এড়াতে পারবেন না। এ জটিলতাও ঠান্ডা মাথায় সামাল দিচ্ছেন একজনই। তিনি শেখ হাসিনা।

সব কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দেশের সমৃৃদ্ধি ধরে রাখতে শেখ হাসিনা নিরলস কাজ করে চলেছেন। রাতদিন পরিশ্রম করছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শেষ ঠিকানা। শেষ আশ্রয়স্থল। তাই তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত হবে। তাঁর কাজের বিরুদ্ধে অনেক কথা আসবে। দেশ-বিদেশে ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর থাকবে। শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন থেকে জানি। তিনি অন্যায়ের কাছে কোনো দিন আপস করেননি। করবেনও না। বিশ্বাস করি তিনি সবকিছু অতিক্রম করতে পারবেন। তিনি জানেন কী করে খারাপ সময়ের সবকিছু সামাল দিতে হয়। তাই এক আলজাজিরা নিয়ে ঘুম হারামের কিছু নেই। সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে অতি উৎসাহী আমলা-কামলা-হাইব্রিড-নবাগত আর বহিরাগতদের নিয়ে। কারণ চাইলেই এখন আর কাউয়াদের বের করে দেওয়া সম্ভব নয়।  তারা কঠিন ভিত গেড়ে বসেছে। দিন দিন অবস্থান আরও শক্ত করছে।  ভয় শুধু তাদের নিয়েই।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

হায় মৃত্যু! তুমিই সত্য আর কিছু না

নঈম নিজাম

হায় মৃত্যু! তুমিই সত্য আর কিছু না

হারুনের সঙ্গে দেখা উত্তরা ক্লাবে। একটা কাজে গিয়েছিলাম বিকালের দিকে। হারুন লং টেনিস খেলে বেরিয়েছেন। শরীর থেকে ঝরঝর ঘাম ঝরছে। পরনে শর্ট প্যান্ট, পায়ে কেডস। দেখে মনে হলো না কোনো অসুখ-বিসুখ আছে। অভ্যর্থনা কক্ষে বসে কথা বলছেন তার ভাগ্নের সঙ্গে। আমাকে দেখেই বললেন, ‘ভাইছা কোত্থেকে আইলেন এই অসময়ে। এক কাপ কফি খাইয়া যান।’ হারুনের কাছে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসলাম। আমার মুখে মাস্ক। কফি এলো। দুজন একসঙ্গে বসে কফি শেষ করলাম। হারুন উচ্ছল ছিলেন। চলাফেরায় একটা ভাব ছিল। বললেন, আমাদের বন্ধু ইব্রাহিম (এমপি চাটখিল) ঘরে ঢুকে গেছেন। বিশাল হুজুর হয়ে গেছেন। দাড়ি রেখে নামাজ কালেমা ধরেছেন। দুনিয়া নিয়ে ভাবনা বদলে গেছে। আমি বললাম, অনেক দিন দেখা হয় না। ফোন করেন মাঝেমধ্যে। হারুন আবার বললেন, দেখলে চিনবেন না। করোনা সব বদলিয়ে দিয়েছে। আপনার শরীর কেমন এখন? করোনা হওয়ার পর অনেকের শরীর দীর্ঘদিন দুর্বল থাকে। বললাম, শরীর এখন ভালো। অফিস করি পুরো সময়। বাসায় যাই। এই তো আছি। তবে আমারও অনেক ভাবনায় পরিবর্তন এসে গেছে। দুই দিনের দুনিয়া। ভালো লাগে না অনেক কিছু। মনে হয় আজ আছি কাল নেই। হারুন বললেন, ভাই, একটা কথা বলি। হাঁটাচলা করবেন। বেঁচে থাকতে হবে আপনাদের। দেখেন না আমি টেনিস খেলে এলাম। শরীর পুরো ফিট। আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। গ্রামেও যাই। বললাম, সাবধানে থাকবেন। বিদায় নিয়ে চলে এলাম। কিছু দিন পরই শুনলাম হারুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। ফোনে কথা হলো। বললেন, এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আড়াই মাস চিকিৎসা নিলেন হারুন। না, ফিরলেন না আর। চলে গেলেন চিরতরে না-ফেরার দেশে। আর আসবেন না। দেখা হলে বলবেন না, ভাইছা কেমন আছেন?

হারুনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে। ব্যবসা করতেন। বিয়ে করেছিলেন কর্নেল (অব.) সরোয়ার হোসেন মোল্লার মেয়েকে। সরোয়ার ভাই রক্ষীবাহিনীর তিন শীর্ষ কর্মকর্তার একজন ছিলেন। পরবর্তী জীবনে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। দারুণ মানুষ। বাংলাদেশ প্রতিদিনে রক্ষীবাহিনীর সেই দিনগুলো নিয়ে লিখেছেন। টেনে এনেছেন বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতার কথা। সরোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক আড্ডা হতো আগে। এ কারণে হারুনকে মজা করে জামাইও ডাকতাম। হারুন হাসতেন। বলতেন, কী আর করব, শ্বশুর-জামাই দুজনের সঙ্গেই আপনি চলেন। আহারে হারুনের সেই হাসিমাখা মুখ আর দেখব না। মানুষের এই জীবন এত ছোট কেন হয়? একটা কচ্ছপও সাড়ে তিন শ বছর বাঁচে। আর মানুষ চলে যায় বড় আগে। কিছুই করার থাকে না। করোনায় আরও কঠিন বার্তা পেয়েছে মানব জাতি। আজ আছি কাল নেই। দুনিয়ার কোনো হাসপাতালই এখন আর শেষ ভরসা নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রশ্নের বাইরে নয়। ডাক এলেই চলে যেতে হয়। চলে যেতে হবে। এক মুহূর্তও থাকার সুযোগ নেই। করোনাকাল আমাদের অনেক কিছু জানিয়ে দিয়ে গেছে।

সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মনিরুজ্জামান ভাই আমাকে স্নেহ করতেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনে কলাম প্রকাশের পরই ফোন করতেন। বলতেন, তোমার লেখাটা এইমাত্র পড়ে শেষ করলাম। দারুণ লিখেছ। সাহস করে এখন কেউ আর সত্য বলতে চায় না। লিখতেও চায় না। আপনজনদের ভালোর জন্যই সত্যটা বলতে হবে কাউকে না কাউকে। সত্যিকারের কাউকে পছন্দ করলে তার ভুলটা অবশ্যই ধরিয়ে দিতে হবে। এখন সবাইকে খুশি করার কথা বলি আমরা। ক্ষমতা দেখলে নতজানু হয়ে কদমবুচি করি। আত্মমর্যাদার জায়গাটুকু আর নেই। সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা ভেঙে দিতে হবে। মনির ভাইয়ের ফোন ভালো লাগত। তিনি পরামর্শ দিতেন। উৎসাহ জোগাতেন অনেকটা বড় ভাইয়ের মতো। এভাবে পরামর্শও সবাই দিতে পারেন না। এ পেশায় বড় জটিল সবকিছু। মনির ভাই আলাদা ছিলেন। সেই মানুষটা হুট করেই চলে গেলেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন মুগদা জেনারেল হাসপাতালে। প্রথম দিকে কিছুটা জটিলতা ছিল। শেষ দিকে অবস্থার উন্নতি হয়। মাহফুজ আনাম ভাই ফোন করেন তাঁকে। তাঁরা দুজনই বন্ধু ছিলেন। আমিও খোঁজ নিলাম। আমাদের বললেন, ভালো আছেন। হাসপাতালে কিছু দিন আরাম-আয়েশে থেকে বেরিয়ে আসবেন। কথার মাঝে রসিকতা, মজা ছিল। তারপর বললেন, চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। কয়েক দিন থাকতে হবে হাসপাতালে। চিন্তা আসলে করিনি। ভাবলাম ঠিক হয়ে যাবে। মনির ভাই আবার ফিরে আসবেন আগের মতো করে। বাস্তবে কিছুই ঠিক ছিল না। হুট করে চলে গেলেন মনির ভাই। খবরটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ। কিন্তু সত্যিকারের শুভানুধ্যায়ী নেই। সমাজের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় চারদিকে মোশতাক আর মীরজাফর দেখি। মানুষ দেখি না। আপন-পর চেনা বড় কঠিন। এ কঠিনতম সময়ে একজন প্রিয় মানুষকে হারানো যে কতটা কষ্টের কাউকে বোঝানো যাবে না। মনির ভাই যেখানে থাকুন, ভালো থাকুন। মন থেকে আপনার জন্য প্রার্থনা করছি।
মিজানুর রহমান খানের কথা এবার বলছি। একজন পেশাদার সাংবাদিক। মন দিয়ে সাংবাদিকতাই করেছেন অন্য কিছু করেননি। দলবাজির এ যুগে পেশা অনেক আগে হারিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর সাংবাদিকরা এখন দলই করেন। অন্য কিছু করার সময় পান না। দলদাস আর দলকানাদের যুগে মিজান আলাদা ছিলেন। সাতেপাঁচে জড়াতেন না। কাজ করতেন মন খুলে। মাঝেমধ্যে টেলিভিশন টকশোয় আসতেন। কথা বলতেন বিশ্বাস থেকে। লিখতেন আইন-আদালত, বিচার বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। সংবিধানকে সহজভাবে তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে। এক দিনে মিজান এ জায়গাটুকু তৈরি করেননি। দীর্ঘ সময় নিয়েছেন। তিল তিল করে একটা জায়গা তৈরি করেছিলেন এ পেশায়। সেই মিজান আক্রান্ত হলেন করোনায়। বয়স এমন আর কী হয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হলেন। চিকিৎসা শুরু হলো। শেষ দিকে অবস্থার অবনতি হয়। হাসপাতালও বদল হয়। কিন্তু তাতে লাভ হলো না। মিজান ফিরলেন না। চলে গেলেন। কথা বলার আরেকজন স্পষ্টবাদী মানুষ থাকলেন না। এ কঠিনতম সময়ে একজন মিজানকে দরকার ছিল সাংবাদিকতা পেশার জন্য। তাঁর মৃত্যু গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করল এ পেশাকে। এ ক্ষতি সহজে পূরণের নয়।

আরও পড়ুন:


নামাজে প্রতিটি সূরার আগে কি বিসমিল্লাহ পড়তে হবে?

আজ থেকে দেশব্যাপী করোনার টিকা প্রয়োগ কর্মসূচি শুরু

রাজধানীর যেসব হাসপাতালে দেওয়া হবে করোনার টিকা

করোনাকালে অস্বাভাবিক বেপরোয়া মানুষ; প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন


করোনাকালে আমরা আরও অনেক সাংবাদিক হারিয়েছি। শুরুর দিকে চলে যান এ পেশার সামনের সারিতে কাজ করা অনেক যোদ্ধা। আবার অসুখ-বিসুখেও অনেকে চলে গেছেন। কবি মাশুক চৌধুরীসহ অনেক সহকর্মীকে হারিয়েছি। হুমায়ূন কবীর খোকনকে স্নেহ করতাম ভাইয়ের মতো। খোকন মানত বড় ভাই হিসেবে। শুরুর দিকেই খোকন চলে যান। খোকনের মৃত্যু একটা ধাক্কা ছিল আমার জন্য। তখন হাসপাতাল ছিল না। ডাক্তার ছিল না। সবখানে একটা কঠিন পরিবেশ। সে পরিবেশ কীভাবে মানুষ সামলাবে সেই টেনশন ছিল। নিজেও অসুস্থ হয়ে টেনশন নিয়ে হাসপাতাল খুঁজতে থাকি। একটা জটিল অবস্থা। এখনকার সঙ্গে মেলালে চলবে না। হাসপাতাল পাই না। কী যে একটা অবস্থা ছিল। কোনো বাড়িতে করোনা রোগী আছে শুনলেই লাল পতাকা টানিয়ে দেওয়া হতো। মানবিকতা হারিয়েছিল মানুষ। আপন-পর চেনার একটা সুযোগ ছিল। কষ্টের একটা সময় গেছে। প্রায় রাতে মনে হতো কালকের দিন বাঁচব তো? শ্বাসনালি, ফুসফুস ভাইরাস শেষ করে দেয়নি তো? ভয়ংকর একটা আতঙ্ক। নিঃশ্বাস কমে এলে ধরেই নিতাম চলে যাচ্ছি। আর ফিরে আসব না। ভোররাতে পাখির ডাকের শব্দ আর কোনো দিন শুনব না। আজানের ধ্বনিও কানে আর বাজবে না। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ফেরত এসে বাসায় চিকিৎসা নিয়েছি। পরিবার-পরিজন পাশে ছিল। বন্ধুরা খোঁজ নিত। সেই কঠিন সময়টুকু পার করেছি। করোনা থেকে ভালো হওয়ার পর পীর হাবিব, নুর মোহাম্মদ আর শাম্মী সিদ্ধান্ত নিলাম প্রতি শনিবার দুপুরে একসঙ্গে খাব। মাঝেমধ্যে অন্য বন্ধুদেরও ডেকে আনব। চলছিল ভালোই। কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। একদিন পীর হাবিব অসুস্থ হলেন। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য চলে গেলেন মুম্বাই। আমরা থমকে গেলাম। শনিবার আর দেখা হয় না আমাদের।

ছোট্ট একটা জীবন। এ জীবনে কোনো কিছুরই হিসাব মেলে না। মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী সৈয়দ লুৎফুল হকের সঙ্গে করোনাকালে বারবার দেখা হতো প্রেস ক্লাবে। কথা হতো। এক বিকালে চায়ের আড্ডায় তিনি আমাকে বললেন, ভোট নিয়ে বেশি টেনশন কোরো না। ফরিদা জিতবে। সেই লুৎফুল হক চলে গেলেন হুট করে। বড় অদ্ভুত একটা সময় যাচ্ছে। ঘুম ভাঙে ভয় নিয়ে। প্রতিদিনই চেনাজানা মানুষের চলে যাওয়ার খবর পাই। এ দুনিয়ায় তারা ছিলেন, আজ নেই। এ সময়টা কবে শেষ হবে জানি না। অনেকে মনে করেন ভ্যাকসিন সবকিছু বদলে দেবে। আমার তা মনে হয় না। সময় লাগবে। সাবধানে থাকতে হবে। দুুনিয়ার সব মহামারী ঠিক হতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। মানুষের বেঁচে থাকতে একটা বিশ্বাসের দরকার হয়। আমরাও একটা বিশ্বাসের মাঝে বেঁচে আছি। না, কোনো আক্ষেপ নেই। জানি মানুষের মৃত্যু অবধারিত। মৃত্যুকে এড়ানো যায় না। তার পরও আশার আলোটুকু সবাই জ্বালিয়ে রাখে।

সেদিন গ্রামে গিয়েছিলাম। মানুষ হাঁটছে, ঘুরছে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে। কোনো চিন্তা নেই। ভাবনা নেই। কারও মুখে মাস্ক নেই। করোনার অস্তিত্ব নিয়ে উৎকণ্ঠা নেই। সবকিছুই যেন স্বাভাবিক। কুমিল্লা শহরের চিত্রও একই মনে হলো। গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তারা বললেন, গ্রামে কোনো করোনা নেই। কোথাও সমস্যা নেই। কৃষক ভোরে খেতে যাচ্ছেন। চিন্তা করছেন নতুন ফসল নিয়ে। করোনা নিয়ে ভাবনার সময়টুকু কোথায়? জীবন ও মৃত্যু দুই সহোদর। কেউ কাউকে দূরে সরিয়ে দিতে পারছে না। একসঙ্গে হাঁটছে হাত ধরে।  আমরা বেদনায় সিক্ত হয়ে তাদের অনুসরণ করছি। আর কিছু না।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

পাপুলের এমপিকান্ডে জড়িতদের বিচার চাই

নঈম নিজাম

পাপুলের এমপিকান্ডে জড়িতদের বিচার চাই

‘বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা। হরেক রকম পাগল দিয়া মিলাইছো মেলা।’ এক বন্ধু রাজনীতিবিদ গানটি পাঠালেন। বললেন, গানটি শোনেন। জানতে চাইলাম, এ গানে বিশেষ কোনো মাহাত্ম্য আছে কি? বন্ধু বললেন, এ গানের অর্থগুলো মন দিয়ে শুনলে জগৎ-সংসার, রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে অনেক হিসাব-নিকাশ মিলে যাবে। কোনো কিছুতে আর বিস্মিত হবেন না। হতাশা আসবে না মনের ভিতরে। লেখালেখিতে আরও মন বসাতে পারবেন। সব ধরনের গান শুনি। সিনেমা দেখি। বই, পত্রপত্রিকা পড়ি। কোরআন পড়াও বাদ যায় না। গানটি মনে হয় মাইজভান্ডারীর। আশির দশকে এ ধরনের গানগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আগে গ্রামে গান হতো। এমনকি মহররম মাসেও একদল মানুষ এসে গান করত বাড়ি বাড়ি ঘুরে। এখন আর কোনো কিছু হয় না। মাঝে রাজনীতি নিয়ে চায়ের দোকানে ঝড় উঠত। এখন তাও হয় না। সব কেমন যেন বদলে গেছে। হিংসুটে, ঈর্ষাকাতর নষ্টদের একটা যুগ চলছে। বড় মন আর উদারতা হারিয়ে গেছে। ভালো-মন্দের বিশ্লেষণে এখন আর কেউ যায় না। বাস্তবতার ধারেকাছে কেউ ঘেঁষতে চায় না। শিক্ষক, সাংবাদিক, আমলা, কামলা সবাই দলীয় রাজনীতি করে। রাজনীতি নিয়ে একতরফা কথা বলে মনের মাধুরী মিশিয়ে। সংসদে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি। এভাবে কিছু দিন গেলে সত্যিকারের রাজনীতিবিদদের দুরবিন দিয়ে খুঁজে বের করতে হবে। সবকিছু চলে যাবে অপরাজনীতিবিদদের দখলে। আত্মীয়করণ আর পরিবারতন্ত্র ভয়াবহ রূপ নেবে। কেন এমন হচ্ছে? একজন বললেন, ভাই সবকিছু ক্ষমতার লড়াই। সবাই ক্ষমতাবান হতে চায়। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে থাকতে চায়।

পুরনো দিনের একটি গল্প মনে পড়ল। এক এলিয়েনের ক্ষমতার পূজা নিয়ে একটা গল্প শুনেছিলাম। পৃথিবীর ক্ষমতার পূজা দেখতে এসেছিল এলিয়েন। আমেরিকা দীর্ঘদিন থেকে এলিয়েন নিয়ে গবেষণা করে চলেছে। তারা এখন বলছে, এলিয়েন আছে। তারা দুনিয়ায়ও আসা-যাওয়া করছে। আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতাদের দুনিয়ায় আসা-যাওয়ার কথা আমরা ধর্মে পড়েছি। ব্যাখ্যা অনেক রকম থাকলেও বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বাস করে কিছু একটা অবশ্যই আছে। বিজ্ঞানের ব্যাখ্যার দিকে যাচ্ছি না। এলিয়েনের গল্পটা শোনাচ্ছি আপাতত। বিশেষ বাহনে এলিয়েন নামলেন বাংলাদেশের সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে। তাকে পাঠানো হয়েছিল দুনিয়াদারির ক্ষমতাবানদের গবেষণা রিপোর্ট তৈরি করতে। এলিয়েন বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন বিশেষ কারণে। কারণটা হলো এলিয়েন শুনেছেন, বাংলাদেশের নিরীহ মানুষ ক্ষমতাবানদের পূজা করে। টিকে থাকতে তাদের সবকিছু মেনে নেয়। এলিয়েন সিদ্ধান্ত নিলেন সুযোগ পেলে দুনিয়ার ক্ষমতাবানদেরও পূজা দেবেন। ক্ষমতার পূজা দিয়েই কাজ শুরু করবেন। এসব কাজের জন্য বাংলাদেশ হচ্ছে মোক্ষম একটা জায়গা। এলিয়েন জঙ্গলে নেমেই দেখলেন একটি ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে ইঁদুরকে ধরাশায়ী করে খেয়ে ফেলল একটি বিড়াল। শিকারে ছিল ভয়াবহ ক্ষিপ্রতা। এলিয়েন ভাবলেন দুনিয়ায় বিড়ালই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী। তাই বিড়ালের পূজা দিলেন তখনই। কাগজ-কলম বের করে লিখলেন ক্ষমতাবান বিড়াল ও বাংলাদেশে আগমন কাহিনি।

এলিয়েনের এ ভাবনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলেন আরেক কারবার। বনের এক শিকারি কুকুর এসে মেরে ফেলল ক্ষিপ্রগতির সে বিড়ালকে। এলিয়েন এবার কুকুরের পূজা দিলেন। কুকুরের ক্ষমতা তাকে বিস্মিত করল। এলিয়েন ভাবলেন কুকুরই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী। কিন্তু কিছু দূর হাঁটতেই দেখলেন একটি বাঘ দাঁড়িয়ে আছে। বাঘটি ছিল ক্ষুধার্ত। শিকারের আশায় দাঁড়িয়ে থাকা। কুকুরটিকে দেখেই আক্রমণ করল বাঘটি। তারপর খেয়ে ফেলল। এলিয়েন তাজ্জব বনে গেলেন। কুকুরের চেয়ে শক্তিশালী প্রাণী আছে মানুষের দুনিয়ায়। বিলম্ব করলেন না এলিয়েন। বাঘকে পূজা দিলেন। ভাবলেন তার পূজা দেওয়া শেষ। এবার নোট লিখতে হবে বাঘের ক্ষমতা ও অন্যান্য অভিজ্ঞতা নিয়ে। কিন্তু না, একটু পর ধারণা আবার বদল হলো। এবার এক হাতি এসে শুঁড় দিয়ে বাঘকে ছুড়ে ফেলল দূরে। বাঘের মৃত্যু হয় মুহূর্তে। এলিয়েন দেরি করলেন না। হাতির সামনে নতজানু হয়ে পূজা করলেন। ভাবলেন বাঘের চেয়ে শক্তিশালী প্রাণী দেখলাম। জীবন সার্থক। ফিরে যাব নিজ দেশে এ অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে। আমার জন্য দোয়া কর প্রভু। ঠিক সে মুহূর্তে বনে প্রবেশ করলেন এক শিকারি। হাতে বন্দুক। চোখে-মুখে শিকারের নেশা। দূরে দাঁড়িয়ে গুলি করলেন হাতিকে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল হাতিটি। শিকারি ছুরি চালিয়ে হাতির দাঁত কেটে গলায় ঝুলিয়ে গাড়িতে উঠলেন। এলিয়েন অবাক বিস্ময় নিয়ে সব দেখলেন আর মুগ্ধ হলেন। বিলম্ব করলেন না। নতজানু হয়ে শিকারির পূজা দিলেন। তারপর এতক্ষণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শিকারির পিছু নিলেন। ভাবলেন দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। বাড়ি গেলেন শিকারি। খাবার নিয়ে দিনভর অপেক্ষায় ছিলেন শিকারির স্ত্রী। শিকারে যাওয়ার সময় স্ত্রীর অনুমতি নেননি। জানাননি দুপুরে ফিরবেন না। সকালে বলেছিলেন দুপুরে এসে খাবেন। স্ত্রী দুপুর থেকে অপেক্ষায় ছিলেন স্বামীর। দিন শেষে রাতে ফেরায় তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। ব্যথিত মনে লঙ্কাকান্ড শুরু করলেন। স্বামীকে দেখে ছুড়ে মারলেন প্লেট, বাটি আর খাবার। ব্যাপক হইচই শুরু করলেন। স্বামী বেচারা শুধু বললেন, আস্তে। বাচ্চারা উঠে যাবে। স্ত্রী আবার ধমক দিলেন। শিকারি চুপ মেরে গেলেন। পরিস্থিতি দেখে মজা এলো এলিয়েনের মনে। ক্ষমতাবানের চেয়েও ক্ষমতাবান আছে আল্লাহর দুনিয়ার বাংলাদেশে। এলিয়েন বুঝলেন আর ক্ষমতাবান দেখার দরকার নেই। অনেক হয়েছে। পূজাও কম দেননি। এবার ফিরে যাওয়াই ভালো। এলিয়েন শিকারি ভদ্রলোকের স্ত্রীকে শেষ পূজাটি দেন। তারপর চলে যান নিজের দেশে। দুনিয়ায় যা দেখলেন সে অভিজ্ঞতা তার কাছে অনেক বড়।

ক্ষমতাবানদের এই বাংলাদেশের একজন এমপি আছেন শহিদ ইসলাম পাপুল। তিনি এখন কুয়েতের কারাগারে বন্দী। ক্ষমতার পেছনে ছুটেছেন। অর্থের পেছনে দৌড়েছেন। সে অর্থ ব্যয় করেছেন এমপি হতে। জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থী ছিলেন তার এলাকায়। হঠাৎ দেখলাম জাতীয় পার্টির এমপি প্রার্থী সরে গেছেন ভোট থেকে। কোন জাদুবলে সরে গিয়েছিলেন জানি না। এ জগৎ বড়ই রহস্যময়। জাতীয় পার্টির দোষ দিয়ে কী হবে? কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি চিঠি দিল স্থানীয় কমিটিকে। জানাল কাজ করতে হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী পাপুলের পক্ষে। যেই বলা সেই কাজ। কারও উৎসাহের কমতি ছিল না। পাপুল ফ্যাক্টর হয়ে গেলেন ভোটের মাঠে। শুনেছি অনেক লেনদেন হয়েছিল ঘাটে ঘাটে। প্রশাসন আরও উৎসাহ নিয়ে কাজ করল। পাপুল সাহেব সবাইকে ম্যানেজ করেছেন। রাজনীতিবিদদের ঘোলা জল খাইয়ে তিনি এমপি হলেন। রাজনীতিবিদরাও ঘোলা জলকে শরবত মনে করলেন। খেয়ে আনন্দিত হলেন। খাওয়াতে প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও বাদ যাননি। সবার অবস্থা হলো চট্টগ্রামের শওকত ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা ‘হাসি-খুশি’র সেই গল্পের মতো। লক্ষ্মীপুরের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা পাপুলের পক্ষে কাজ করলেন। ঘাঁটি থেকে মাঠছাড়া করল বিএনপিকে। সবাই মিলেমিশে এমপি বানালেন পাপুলকে। এ আনন্দে পাপুল সাহেব মহা-আনন্দিত হলেন। দেখলেন সবই হয়। কোথাও কোনো সমস্যা নেই। তাই সংসদে গিয়ে স্ত্রীকেও নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। যেই ভাবনা সেই কাজ। হয়ে গেল। পানির মতো সবকিছু পরিষ্কার। একবার সংবাদ সম্মেলনে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘সবকিছুর দাম বেড়েছে। মদের দাম বেড়েছে কিনা যাদু মিয়া (মশিউর রহমান) জানেন।’ পাপুলের স্ত্রীকে এমপি করাতে লেনদেন কী হলো জানি না। তবে দেখলাম পাপুলের স্ত্রী সেলিনাও এমপি হলেন। সংসদে স্বতন্ত্র মহিলা কোটা পূর্ণ হলো। স্বামী-স্ত্রী সংসদে গেলেন।

আরও পড়ুন:


যে আমল করলে বিশ্বনবী হাত ধরে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন

ইউএস বাংলা এখন আতঙ্কের বাহন!

কক্সবাজারে সিএনজি অটোরিকশা মালিককে কুপিয়ে হত্যা

পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে: ইসি সচিব


‘বাবা তোমার দরবারে পাগলের খেলা’ গানটি শেষ হতেই ইউটিউবে নতুন গান বাজল ‘কত রঙ্গ জানো রে মানুষ কত রঙ্গ...।’ পাপুল চাইলে তার শ্যালক, শ্যালিকা, কাজের লোককে এমপি করতে পারতেন। দয়া করে তিনি করেননি। পাপুল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য শিক্ষা। এখান থেকে রাজনীতিবিদরা না শিখলে কিছুই করার থাকবে না। সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। ক্ষমতার এ দুনিয়ায় চট্টগ্রামের ভোটের ফলাফল দেখলাম। ভোট নিয়ে বলার বেশি কিছু নেই। সবাই সবকিছু জানেন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা কেউ নেয় না। ভালো-মন্দের বিচার করে না। বোঝে না ক্ষমতা আর ভোটের রাজনীতি চিরদিন এক রকম থাকে না। লাউ আর শিমের বিচি এক করে দেখার কিছু নেই। বাস্তবতায় ফিরে আসতে হবে। ব্যবস্থা নিতে হবে পাপুলের এমপিকান্ডে জড়িত সবার বিরুদ্ধে। পাপুলের সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল বিমানে। আগে থেকে চেনাজানা ছিল না। নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা ফিরছিলাম। এমিরেটসে দুবাই থেকে ঢাকার ফ্লাইটে উঠলাম। কাছাকাছি সামনের আসনে ছিলেন পাপুল। তিনি উঠে এলেন আমার সামনে। নিজের বিজনেস কার্ড এগিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আমি এমপি পাপুল। কুয়েতে ব্যবসা করি। এমপি হয়েছি লক্ষ্মীপুর থেকে। আপনার পত্রিকায় শুধু আমার বিরুদ্ধে লেখে। কিছু স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী বিভ্রান্ত করছে আপনার রিপোর্টারকে।’ জবাবে বললাম, স্থানীয় আওয়ামী লীগ তো গত নির্বাচনে আপনাকে সহায়তা করেছে। এখন আবার কী নিয়ে সমস্যা? বললেন, ‘কেন্দ্র থেকে নির্দেশ পেয়েছে তাই ভোটে সহায়তা করেছে।’ কথার মাঝে কেন্দ্রের সঙ্গে তার যোগাযোগের সূত্র আছে। তাই বললাম, এমপি হতে নাকি অনেক টাকা ব্যয় করেছেন? জাতীয় পার্টিকে বসাতে কত দিতে হয়েছিল? শুনেছি ১৩ কোটি টাকা। পাপুল আমার কথায় বিব্রত হলেন না। বললেন, ‘না, এত টাকা না। আরও অনেক কম।’ এবার বললাম, স্থানীয় আওয়ামী লীগের কাছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চিঠির জন্য কত দিতে হয়েছিল? কাকে দিলেন? পাপুল বললেন, ‘ভাই, এগুলো নিয়ে আরেক সময় কথা হবে।’ বুঝলাম প্রসঙ্গ থেকে কেটে পড়তে চান। আবার চেপে ধরলাম। বললাম, প্রশাসনের কথা বলুন। পাপুল দেখলেন আমার সঙ্গে কথা বলার মানে নেই। বললেন, ঘুম পাচ্ছে। পরে একসময় আপনার সঙ্গে কথা হবে। পাপুল চলে গেলেন তার আসনে। একই ফ্লাইটে সামনের আসনে বসা ছিলেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এগিয়ে গেলাম তাঁর দিকে। দাঁড়িয়ে গল্প করলাম তাঁর সঙ্গে। তিনি ইউরোপ থেকে ফিরছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কের সামনে সামাজিক ব্যবসা বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁদের সামনে তুলে ধরেছেন দারিদ্র্যকে কীভাবে জয় করতে হয়। রাষ্ট্রনায়করা তাঁর স্বপ্নজয়ের কাহিনি শুনেছেন মন দিয়ে। বিদেশের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি এসব বিষয়ে বক্তৃতা করছেন। প্রাণবন্ত মানুষটি আমাকে দেখে হাসিমুখে কথা বললেন। ছবি তুললাম। ফিরে এলাম নিজের আসনে। সে ছবি পরে ফেসবুকে দিয়েছিলাম।

একটা কথা শেষে বলে রাখি, লক্ষ্মীপুর বিএনপি জোন। আচ্ছা পাপুল সাহেব এমপি না হলে বিএনপির কেউ জিতলে কী এমন অশুদ্ধ হতো? এক পাপুলে আজ দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। পাপুল শুধু মানব পাচারকারী হিসেবে জেলে গেলে কিছু যেত-আসত না। তার নামের শেষে ‘এমপি’ পদ বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। এ কান্ড দেখার জন্য আমার ভাই মুক্তিযুদ্ধে যাননি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশটা স্বাধীন করেননি। শেখ হাসিনা ভোট ও ভাতের আন্দোলন করেননি। পাপুলের স্রষ্টাদের বিচার দাবি করছি। পাপুলকে বিজয়ী করতে নষ্ট ভূমিকায় যারা ছিলেন তাদের কাঠগড়ায় আনতে হবে। বিচার করতে হবে লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগের কাছে চিঠি প্রেরণকারী নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের সেই নেতাদের।  ব্যবস্থা নিতে হবে রাতে সহায়তাকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।  অবশ্যই পাপুলকে অবৈধভাবে এমপি বানানোর প্রক্রিয়ায় জড়িত সবাই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের জন্য দায়ী।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

সৈয়দ আশরাফ কাদের মির্জা ও এখনকার আওয়ামী লীগ

নঈম নিজাম

সৈয়দ আশরাফ কাদের মির্জা ও এখনকার আওয়ামী লীগ

সৈয়দ আশরাফের কথা কারও মনে আছে কি মানুষটি চলে যাওয়ার দুই বছর পার হলো। দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। থেমে থাকে না কারও জন্য কিছু। সৈয়দ আশরাফের জন্যও কিছু থেমে নেই। শুধু সমস্যা বাধালেন টিভি সাংবাদিকরা। তারা আশরাফের মৃত্যুবার্ষিকীর দিন বনানী কবরস্থানে গিয়ে হাজির। ধারণা ছিল আওয়ামী লীগের কেউ না কেউ আসবেন। ফুল দেবেন। শ্রদ্ধা জানাবেন প্রয়াত এই নেতার প্রতি। আওয়ামী লীগ সময় না পেলে সমস্যা নেই। যুবলীগ, ছাত্রলীগ আছে। তাদের সময় না হলে আরও অনেক লীগ আছে। দেশে তো এখন আওয়ামী লীগের অভাব নেই। সংগঠনের শেষ নেই। যেদিকে তাকাই শুধুই আওয়ামী লীগ। আকাশে-বাতাসে অন্য কেউ তো নেই। তারা নিশ্চয়ই আসবেন। না, কেউই যাননি। বিকালের দিকে দু-একজন আসেন। ততক্ষণে সাংবাদিকরা চলে যান কবরস্থান থেকে। কারা যেন সাংবাদিকদের অপেক্ষার ছবিটি ছেড়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ব্যস, শুরু হয় তুমুল আলোচনা। এসব আলোচনা দেখে বিস্মিত হইনি। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম খারাপ সময়ে দলের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণে কর্মীদের অগাধ ভালোবাসা তাঁর প্রতি। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতি বড় কঠিন। প্রয়াত আবদুল মালেক উকিল, সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, আবদুস সামাদ আজাদ, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল জলিল, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ছিলেন। আজ তাঁরা নেই। সেই নেতাদের শ্রদ্ধা জানানো হয় কি বছর বছর জানি আওয়ামী লীগের রাজনীতি যারা বোঝেন তারা এ নিয়ে কথা বলবেন না। আজ ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক। কাল তিনি এ দায়িত্বে না থাকলে কতজন খবর রাখবেন তাঁর নেতাদের একটু খারাপ সময় দেখলে অনুসারীরা কেটে পড়ে। ধারে-কাছে ভেড়ে না। ডিজিটাল যুগের কথা আরও আলাদা। এখন মানুষের হাতে এত সময় কোথায় দুনিয়ার সবকিছু নিয়ে সবাই ব্যস্ত, নিজের কাজটুকু ছাড়া।

সৈয়দ আশরাফ একজন সজ্জন মানুষ ছিলেন। দল ও দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল। আলগা লোক দেখানো কোনো ভাব ছিল না। অনেক আড্ডার আসরে তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি। সোজাসাপ্টা কথা বলতেন। ভিতরে কোনো রাখঢাক ছিল না। প্রথম জীবনের পরিচয় লন্ডনে। সানু মিয়া পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর অনেকবার দেখা, কথা আড্ডা হয়। সাদামাটা জীবনযাপন। ঢাকার রাজনীতিতে নিজেকে বদল করেননি। বিচ্ছিন্ন করেননি স্বকীয়তা থেকে। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ মেয়াদে তিনি বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের পর নেত্রীর পাশে দাঁড়ান গভীর মমতা নিয়ে। সে সময় আমাদের দেখা হতো। রাজিউদ্দিন রাজু ভাই দুপুর হলেই তলব করতেন। বলতেন, আস। দুপুরে লাঞ্চ কর ঢাকা ক্লাবে আমার সঙ্গে। আশরাফ ভাইও আসতেন মাঝেমধ্যে। মধ্যদুপুরের আড্ডা গড়াত রাতদুপুর অবধি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এ আড্ডার দ্বিতীয় অধ্যায় ক্যাপ্টেন (অব.) তাজ ভাইয়ের বাসায় হতো। এক রাতে আড্ডা জমে উঠলে বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছিল। একটু পরপর ফোনে ফরিদা ইয়াসমিন তাগাদা দিচ্ছিলেন। আশরাফ ভাই অবস্থা বুঝতে পেরে আমার হাত থেকে ফোন নিলেন। বললেন ভাবি, আমি সৈয়দ আশরাফ। আজ একটু রাখলাম নঈমকে। পাঠিয়ে দেব একটু পর। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে অবস্থান ছিল সরাসরি ওবায়দুল কাদেরের পক্ষে। কাউন্সিল শেষ হলো। ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক হলেন। এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আশরাফ ভাইয়ের কার্ডটা নিয়ে গেলেন সহকর্মী জাহাঙ্গীর আলম। ফিরে এসে জানালেন, আশরাফ ভাই আসবেন। বিশ্বাস হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি এলেন। অনেকক্ষণ থাকলেন। উপস্থিত বিভিন্ন দলের নেতার সঙ্গে কথা বললেন। আমাকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, এ পত্রিকাটি মানুষের কথা বলে। শুভ কামনা থাকল। বললাম, আশরাফ ভাই, আপনি এসেছেন কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ কীভাবে দেব বুঝতে পারছি না। অস্বস্তি খেয়াল করে হাসতে হাসতে বললেন, রাজনীতি করতে এসেছি। কোনো নেতিবাচক অবস্থান চোখে পড়লে তুলে ধরাই সংবাদপত্রের কাজ। কত টকশোয় আশরাফ ভাইয়ের সমালোচনা করেছি। বলেছি তিনি কেন পার্টি অফিস ও মন্ত্রণালয়ে সময় দেন না এ নিয়ে কোনো দিন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাননি। বরং দেখা হলে আরও কাছে টেনে কথা বলেছেন। শুধু একবার বলেছিলেন, বেশি সময় দিলে বেশি সমস্যা। তখন আবার অন্য কথা বলবেন।

আশরাফ ভাইকে নিয়ে আরেকটি ঘটনা মনে পড়ছে। একটি দূতাবাসের অনুষ্ঠানে বসে আছি। তিনি তখন মন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক। হঠাৎ নিজের আসন ছেড়ে উঠে আমার কাছে এলেন। তারপর আমার হাত ধরে বেরিয়ে এলেন। বললেন, আমাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সংকট সমাধানের খবর নেই। শুধু বক্তৃতা আর কথা। আগে সব সংকটের সমাধান করুন। একটু এগিয়ে বললেন, আমি চললাম। উঠে আসতে একটা অসিলা লাগে তাই আপনাকে টেনে আনলাম। দেশপ্রেমিক একজন নেতা ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। ছিল অনেক বড় উচ্চতা। আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয় একটি অনুভূতির নাম।’ রাজনীতি থেকে সৈয়দ আশরাফদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এখন রাজনীতি মানে সুবিধাবাদ। নেতারা কর্মীদের সময় দেন না। এমপি সাহেবরা এলাকায় যান না। আর গেলেও আত্মীয়-পরিজন নিয়ে থাকেন। দল ও সরকারে পরিবারের লোকদের বসান। মন্ত্রী-এমপিদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ভাইবোন, পাড়াপড়শির প্রতিই দরদ। কর্মীদের কথা কারও মনে নেই। আবার অনেকে চলেন বিএনপি-জামায়াতের লোকজন নিয়ে। কেউ কেউ জামায়াত নেতাদের দিয়েছেন দলীয় পদ। গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। কিছু দিন পরপর ঘোষণা শুনি অন্য দল থেকে কাউকে নেওয়া হবে না। বাস্তবে দেখি বিপরীত। আওয়ামী লীগের এ বারোমুখী রাজনীতির খেসারত মাঝেমধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কঠিনভাবেই দিতে হয়।

আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায়। টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে এ দলে বারো রকমের মানুষের ভিড় এখন। ১২ বছর আগের বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতা এখন মাঠপর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা। সুযোগটা আওয়ামী লীগই করে দিয়েছে। বিশেষ করে মন্ত্রী-এমপিরা নিজস্ব লীগ করতে গিয়েই ঝামেলা বাধিয়েছেন। নবাগতদের আবেগ নেই, ভালোবাসা নেই। স্বার্থের কারণে তারা আওয়ামী লীগার। স্বার্থ কেটে গেলে আবার কই চলে যাবেন জানি না। মাঠেঘাটের দুঃসময়ের কর্মীদের হিসাব-নিকাশ মিলছে না। তবু তারা আছেন। মাঝেমধ্যে কথা বলেন। মুখ খোলেন। কর্মীদের আশার আলো একজনকে ঘিরে। তারা জানেন আজ হোক কাল হোক তিনি তাদের দেখবেন। সংকট ছিল, আছে, থাকবে। নতুন মেয়াদের সরকারের সামনে আর তিন বছর। কিন্তু সব সময় ভোট এক রকম হয় না। কাদের মির্জার বক্তব্যগুলো হালকাভাবে না নেওয়া ভালো। তিনি অনেক কথা বলেছেন বাস্তবতা ঘিরে।

বিশ্বরাজনীতিতে নানামুখী পালাবদল চলছে। আমেরিকার মতো দেশে কত কিছু ঘটে চলেছে হিসাব মেলানো যায় না। ভোটের পর বস্টনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আমার মেয়ে হাসতে হাসতে বলেছিল, ট্রাম্প বিদায়ের আগে অনেক যন্ত্রণা দেবে। সেনা নামাতেও হতে পারে। তা-ই হচ্ছে। আমেরিকার কংগ্রেসে হামলার পর বিশ্ব চমকে উঠেছে। হচ্ছেটা কী মনে পড়ে ২০১৪ সালে একজন নারী গাড়ি ঘোরাতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করেন কংগ্রেসের সীমানা রেলিংয়ের সঙ্গে। সঙ্গে সঙ্গে কালো সেই নারীকে হত্যা করা হয়েছিল। নিরাপত্তা হুমকির কারণে হত্যালীলা চালায় নিরাপত্তারক্ষীরা। এবার কোথায় ছিল সেই নিরাপত্তা ক্যাপিটল হিল ভবন কয়েক ঘণ্টা দখলে ছিল হামলাকারীদের। এর পরই জরুরি অবস্থা কারফিউ জারি করেন সিটি কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তায় নামানো হয় সেনা।

আমেরিকা থেকে এক বন্ধু ফোন করলেন। বললেন, এ নিয়ে এত ভাবনার কিছু নেই। এর আগেও মার্কিন কংগ্রেসে বোমা হামলা, পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। সমুদ্র বাণিজ্য নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমেরিকা ১৮১২ সালে। দুই বছর পর ব্রিটিশরা ক্যাপিটল হিল ভবন, হোয়াইট হাউসসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সব ভবন পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। ক্যাপিটল হিল ভবনের একটি টেবিল রক্ষা পেয়েছিল আগুনের কবল থেকে। সেই টেবিল এখনো সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। ১৯১৫ সালের ২ জুলাই সিনেট অভ্যর্থনা চেম্বারে বোমা বিস্ফোরিত হয়। সে বিস্ফোরণ ঘটান এক প্রফেসর। তার নাম অধ্যাপক এরিখ মেনটার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর ভাষা হিসেবে তিনি এ কা- ঘটান বলে প্রচার করেন। পরে কারাগারে এরিখ আত্মহত্যা করেন। ১৯৫৪ সালেও হামলা করেছিল একটি গ্রুপ। আমেরিকার এ সময়ের ঘটনাবলিও বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। উসকানির দায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। পশ্চিমা মিডিয়া কোনো ছাড় দিচ্ছে না বিদায়ী প্রেসিডেন্টকে। আমেরিকার সংসদও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এমনকি ট্রাম্পের দলের লোকজনও তাঁর বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। এরই নাম গণতন্ত্র।


আরও পড়ুন: সরকার কারা ডুবায় কীভাবে ডুবায়


ট্রাম্প নিয়ে আলোচনার সময় আমেরিকাপ্রবাসী পুরনো বন্ধু ভ্যাকসিন পরিস্থিতি, ওয়াশিংটনের নিরাপত্তায় সেনা নামানো, বাংলাদেশের হালহকিকত নিয়েও কথা বলেন। একপর্যায়ে বললেন, মির্জা কাদের শুনছেন ভাবখানা এমন গুলাম আলীর গজল শোনার মতো। বললাম, শুনছি। বন্ধু এবার বললেন, আপনারা যা বলুন না কেন তিনি কথা খারাপ বলছেন না। আর দেশ-বিদেশে জমিয়েছেনও ভালো। ইউটিউব দেখুন কী পরিমাণ ভিউ। মানুষ তাঁর কথা শুনছে। কিন্তু এ নিয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এত প্রতিক্রিয়া না দেখালেও পারতেন। মাঠপর্যায়ের একজন নেতা নিরপেক্ষ ভোট দাবি করছেন। তা তিনি করতেই পারেন। জবাবে বললাম, মির্জা সাহেবের বক্তব্য শুধু ভোট নিয়ে নয়, দলের বিপক্ষেও আছে। তিনি দলের প্রার্থী। দল করলে দলের শৃঙ্খলার ভিতরে থাকতে হয়। আর পুরো বিষয়টি বিব্রত করছে তাঁর ভাই ওবায়দুল কাদেরকে। বন্ধু আবার বললেন, পশ্চিমা দেশে এসব সমালোচনা স্বাভাবিক হিসেবে নেওয়া হয়। মনে করা হয় দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বিষয় হিসেবে। আর একজন প্রার্থী হিসেবে তিনি ভোটাধিকারের কথা বলছেন। আইনশৃঙ্খলার কথা বলছেন। এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভিতরে লুকিয়ে থাকা দুঃখবোধও আসছে। সাধারণ মানুষ কিন্তু এ বক্তব্য নিয়ে নেতিবাচক অবস্থানে নেই। বরং ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। এমনকি আওয়ামী লীগের মাঠের কর্মীরাও অখুশি নন। বললাম, সব সংকটের সমাধান আছে। কিন্তু এভাবে মির্জা ভাই নেতাদের বিব্রত না করলেই পারতেন। এবার বন্ধু বললেন, সত্য কথা বেরিয়ে এলে বিব্রত সবাই হবে। ফোন রাখার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু আমার বন্ধু থামলেন না। বললেন, সাঈদ খোকন আর তাপস বিতর্কও খারাপ হয়নি। তাপস আগ বাড়িয়ে এত কথা না বলে এখন উচিত মানুষকে কাজ দেখানো। অতীত টেনে কী হবে একজন আনিসুল হক দেখিয়ে গেছেন কথা নয়, কীভাবে কাজ করতে হয়। বুঝতে হবে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ হয় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে না হয় দেয়াল ভেঙে সামনে এগিয়ে যায়। আবার অনেক সময় ঘুরেও দাঁড়ায়, প্রতিবাদ করে। কথা বাড়ালাম না। প্রবাসী বন্ধুকে দোষ দিয়ে কী হবে বেচারা বিদেশে আছেন। বাংলাদেশ নিয়ে অনেক ভাবনা। দেশে এখন কোনো কার্যকর বিরোধী দল নেই। আর নেই বলেই সরকারি দল নিজেদের ভিতরে অনেক সংকটে জড়িয়েছে। এ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। দেখতে দেখতে বেলা বয়ে যায়। অপ্রিয় কথা শুনতে খারাপ। কিন্তু অনেক সময় শুনতে হয়। উইলিয়াম শেকসপিয়রের একটি কথা আছে। শেকসপিয়র লিখেছেন, ‘পুরো দুনিয়াটাই একটি রঙ্গমঞ্চ, আর প্রতিটি নারী ও পুরুষ সে মঞ্চের অভিনেতা; এ মঞ্চে প্রবেশপথও আছে আবার বহির্গমন পথও আছে, জীবনে একজন মানুষ এ মঞ্চে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন।’

পাদটিকা : মির্জা কাদের জয়ী হয়েছেন শতভাগ নিরপেক্ষ একটি ভোটে। এ বিজয় গৌরবের। অবাধ, সুষ্ঠু ভোটের দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। সফলও হয়েছেন। দেশবাসী একটি নিরপেক্ষ ভোট দেখল বসুরহাটে। অভিনন্দন মির্জা কাদেরকে। আপনাকে কোন নেতা কী বললেন কিছু যায় আসে না। তথাপি নিরপেক্ষ ভোট আদায় করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

সরকার কারা ডুবায় কীভাবে ডুবায়

নঈম নিজাম

সরকার কারা ডুবায় কীভাবে ডুবায়

দেখতে দেখতে জীবন থেকে চলে গেল আরও একটি বছর। ইংরেজি সালের আরেকটি বছর শুরু হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম গেল বছর। আল্লাহর রহমতে সেরে উঠেছি। শরীরের দুর্বলতা ছিল অনেক দিন। এখন ভালো আছি। জীবন থেমে থাকে না। চলতে থাকে। এগিয়ে যায় সবকিছু। কিন্তু করোনাকালে ঝরা পাতার মতো অনেক প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু তাতেও থামছে না জীবনের স্বাভাবিকতা।  কবরে একজন মানুষকে শোয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সব শেষ হয়ে যায়। মৃত্যু ঘোষণার পর ডেথ সার্টিফিকেটের জন্যও অপেক্ষা করে না প্রিয়জনরা। আলোচনা শুরু হয় কবর দেবেন কীভাবে। সবাই জানে এ মানুষটি আর ঘরে ফিরবেন না। তাঁর নতুন ঠিকানা অন্ধকার কবর। সাময়িক কান্নাকাটি হয়। তারপর বসে হিসাব-নিকাশে। পরিবারে চাওয়া-পাওয়ার নতুন হিসাব শুরু হয়। করোনাকাল অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। মানুষ জানতে পারছে, কঠিন অসুখে পড়ার পর কেউ থাকে না পাশে। আসলে বিপদে পড়লে টের পাওয়া যায় আপন-পর। সেই দিন এক বন্ধু বললেন, অসুস্থ হলে, কারাগারে গেলেও টের পাওয়া যায়। আরেকজন বললেন, ভোটে দাঁড়ালে খবর হয়ে যায়। আপন-পর চেনা বড় কঠিন। যে মানুষটিকে আপন ভাবছেন তিনিই আপনার সর্বনাশ করে ছাড়ছেন। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব বড় বিচিত্র। যিনি যত বেশি সুবিধাভোগী তিনি তত বেশি সর্বনাশা খেলায় মত্ত। একবার উপকার পেলে মনে করেন এটা তার বাপ-দাদার আমলের চাওয়া-পাওয়া। কোনো কারণে একবার পাশে না থাকলে দেখিয়ে দেবে তিনি কতটা বিশাল।

২০০৫ সালের ৯ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর অফিসে ডেকে নেন মেজর জেনারেল মইন উ আহমেদকে। মাত্র মিশন থেকে ফিরেছেন মইন। তিনি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ এস্কান্দারের বন্ধু। সাঈদ এস্কান্দার প্রিয় বন্ধুকে সেনাপ্রধান করার উদ্যোগ নেন সাতজনকে ডিঙিয়ে। খালেদা জিয়ারও আপত্তি নেই। তাই জেনারেল মইনকে ডেকে নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কক্ষে প্রবেশ করেই স্যালুট করেন। বেগম জিয়া তাকে বসতে বললেন। তারপর বললেন, একটু আগে তোমার ফাইলে স্বাক্ষর করেছি। মইন তার বইতে লিখেছেন, বেগম জিয়া তাকে আপনি বলে সম্বোধন করেছেন। এই গল্পের আরেকটু অংশ আছে। এই ফাইল স্বাক্ষরের পর বেগম জিয়া চলে যান দেশের বাইরে। ১৫ জুন জেনারেল মইন সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন। ১৭ জুন দেশে ফিরে আসেন প্রধানমন্ত্রী। কথা ছিল ১৮ জুন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল চিহ্ন পরিধান করবেন প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে। কিন্তু বেগম জিয়া দেশে ফিরে ১৭ তারিখে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি চলে আসেন সশস্ত্র বাহিনী দফতরে। এমন ঘটনা নজিরবিহীন। এই নিয়ে মইন তার বইতে লিখেন, ‘দীর্ঘ ভ্রমণজনিত ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী দফতরে এসে আমার মেজর জেনারেল থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেলের পদবিতে উন্নীত করার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্ণধারের এরকম নিষ্ঠা ও একান্ত অনুভূতি সেদিন আমাকে অভিভূত করেছিল।’ এ নিয়ে কিছু বলার নেই। তবে আওয়ামী লীগ আমলে একজন সুবিধাভোগী কর্মকর্তার নাম লে. জেনারেল হাসান সোহরাওয়ার্দী। তিনি কম পাননি আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে। নবম পদাতিক ডিভিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন বিশ্বস্ত হিসেবে। লে. জেনারেল পদে পদোন্নতি পেয়েছেন সরকারের আন্তরিক আনুকূল্য নিয়ে। তারপরও চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। তার সাম্প্রতিক তৎপরতা, কর্মকান্ড হতাশ ও বিস্মিত করেছে। মানুষ এতটা নামতে পারে কী করে?

আজকাল অনেক কিছু দেখে বিস্মিত হই না। এই সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের মাঝে সবাই কি সাচ্চা? জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা সবাই বলেন। সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হলে অথবা মনের মতো না হলে কোনো কিছু মনে থাকে না। তখন সরকারকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে তারাই নামেন যারা বেশি পেয়েছেন। বঞ্চিতদের চক্রান্তে দেখি না। খন্দকার মোশতাক ছিলেন শেখ কামালের উকিল বাপ। বঙ্গবন্ধুর মায়ের মৃত্যুর পর মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছিলেন মোশতাক। ১৫ আগস্ট দুপুরেও টিফিন ক্যারিয়ারে করে বঙ্গবন্ধুর জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই মোশতাক বঙ্গবন্ধু পরিবারকে খুন করে ইতিহাসের কালো অধ্যায় রচনা করেন। শুরুতে মীরজাফরও ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বস্ত। চারদিকে অনেক কিছু দেখে মাঝে মাঝে ভয় লাগে। একটি সঠিক সুস্থধারার নির্বাচন এলে আওয়ামী লীগ টের পাবে এক কঠিন বাস্তবতা। এই বিশাল সমর্থক গোষ্ঠীর নতুন চেহারা বেরিয়ে আসবে। সুবিধাভোগীদের নষ্টামি দুনিয়াদারি আন্ধার করে দেবে। অনেক এমপি সাহেবের নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তারা মনে করছেন, আগামী দিনের ভোটও প্রধানমন্ত্রী করে দেবেন। বাস্তবতা সব সময় একরকম থাকে না। কবি নজরুলের ভাষ্য অনুযায়ী চিরদিন কাহারো সমান যায় না। এই কথাটি কেউ বুঝতে চায় না।

অবশ্যই আওয়ামী লীগ একটা ভালো অবস্থানে আছে। সেই দিন এক আড্ডায় জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় তিনি বললেন, বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। ঢাকা বদলে যাবে মেট্রোরেলে। মাতারবাড়ী হবে আরেক সিঙ্গাপুর। বড় বড় অনেক বিনিয়োগ নিয়ে আসছে জাপানিরা। আরও বললেন, উন্নয়ন কাজে এক বিস্ময়কর নাম শেখ হাসিনা। তিনি বিশ্বের দরবারে নতুন মর্যাদা দিয়েছেন বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তাঁর কারণে। আমি সব সময় বলি শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শেষ ঠিকানা। তিনি না থাকলে টের পাবেন চেতনাবাজরা। বুঝতে পারবেন কত ধানে কত চাল। আওয়ামী লীগের ছায়ার তলায় থেকে বামরা চলেন। আবার স্বার্থ ক্ষুণœ হলে কেটে পড়েন। বঞ্চনা দেখলে সরকারবিরোধী হয়ে যান। স্বার্থের প্রশ্নে হয়ে যান কেউ বাম, কেউ জাসদ। আওয়ামী লীগ থাকেন না। জাসদের সর্বনাশা কান্ডের খেসারত আওয়ামী লীগকে দিতে হয়েছিল ১৫ আগস্টে। এখন একদল অতি উৎসাহী আমলার কর্মকান্ড উৎকণ্ঠিত করছে। আওয়ামী লীগ ওই দলের নেতা-কর্মীরা করুক না। আপনাদের জড়ানোর এত কী দরকার? কোনো পরামর্শ থাকলে গোপন প্রতিবেদনের মাধ্যমে দিন। আমলাদের রাজনীতিতে জড়াতে হবে কেন?

রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে পদবি নিয়ে যে কেউ শক্তিশালী হতে পারে। বিরোধী দলের রাজনীতি করলে টের পাওয়া যায় দুনিয়াদারি কত কঠিন। আমলারা সব সময় সরকারি দলের সঙ্গেই থাকে। এই সরকারি দল বিরোধী দল হলে জীবন হারাম করে দেয়। এখন চারদিকে একটা অস্বস্তি কাজ করছে। এই অস্বস্তি আর কেউ নন আমলারা তৈরি করেছেন। তারা সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্ষমতার বিশাল বলয় তৈরি করেছেন। গণতান্ত্রিক কাঠামোতে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের বিকল্প নেই। ভোটের সংস্কৃতি থেকে দূরে গিয়ে রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিণতি ভালো হয় না। আর সরকার বদল হলে কোনো খারাপ কাজের দায় আমলারা নেন না। সব দায় রাজনৈতিক দলকে নিতে হয়। ক্ষমতার কালো গ্লাসে সবকিছু রঙিন মনে হয়। আমলারা সর্বকালের সুবিধাভোগী। অবসরের পরও বড় আমলারা নতুন কোনো নিয়োগ চান। না পেলে চুপসে যান। অথবা বিদেশে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আরাম-আয়েশে বাকি জীবনটা কাটান। রাজনীতিবিদদের অবসর নেই। এরশাদ আমলে আমলাদের জি সেভেন গ্রুপের কথা শুনতাম। শেষ বিদায়ের দিন কেউই দায় নেননি। সবাই বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে নালিশ করলেন এরশাদের বিরুদ্ধেই। বললেন, তাঁর চেয়ে বড় স্বৈরাচার দুনিয়াতে আর নেই। দুর্নীতির মামলা করা কোনো বিষয় নয়। অনেকে পথ বাতলে দিলেন তাঁকে সেনাকুঞ্জ থেকে কীভাবে গুলশানের সাব-জেলে নেওয়া যায়। আবার অনেকে বলে দিলেন, গুলশানের সাব-জেলে কেন থাকবেন? তাঁকে নিন কেন্দ্রীয় কারাগারে। পাঁচ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন রংপুরের মানুষগুলো অবুঝ বলেই। মানুষের ভালোবাসার মূল্য তারা বোঝার চেষ্টা করলেন না।

আমলাদের সবচেয়ে বড় চেষ্টা থাকে ডিভাইড অ্যান্ড রুল। তারা এ কাজটি সব আমলেই করেন। পেয়েছেন ব্রিটিশদের কাছ থেকে। ’৯১ সালে খালেদা জিয়ার সময়ে এরশাদ ও তাঁর মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা সাজিয়ে দিয়ে বাহাবা নিয়েছিলেন আমলারাই। একই ধারাবাহিকতা ২০০১ সালের পর দেখেছি। এমনকি নির্বাচনের আগেই সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তারা চলে গেলেন। অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অতি উৎসাহী আমলার কর্মকান্ড ছিল দেখার মতো। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর আটক হওয়ার পর তাঁকে কারাগারে ডিভিশন দেওয়ার বিরোধিতাও আমলারাই করেছিলেন। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আর শিক্ষা নেয় না বলেই খেসারত রাজনীতিবিদদের দিতে হয়। সেই দিন দেখলাম, এক সিনেমা পরিচালককে আটক করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো কারাগারে। অভিযোগ তিনি সিনেমাতে দেখিয়েছেন পুলিশ মাদক দিয়ে হয়রানি করছে মানুষকে। এতে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। হতাশ হলাম। হিন্দি বা ইংরেজি ছবিগুলো কি কেউ দেখেন না? চোখের আঙুল সরান। আপনাদের রক্ষণশীলতায় এখন গ্রামবাংলার যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, সার্কাস সব বন্ধ। সংস্কৃতি শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা কোথায় যাচ্ছি কেউ জানি না।

আমলাতন্ত্র শুধু সিভিল ব্যুরোক্রেসিতে আছে, তা নয়। সব ক্যাডারই সুযোগ পেলে নিরীহ জনগণকে সাপের পাঁচ পা দেখিয়ে দেন। ২০০৪ সালের দিকে বেইজিং গিয়েছিলাম এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে। ফ্লাইট ছিল থাইল্যান্ড হয়ে। যাওয়ার পথে ২৪ ঘণ্টা থাকতে হয়েছিল ব্যাংকক বিমানবন্দরে। আসার পথেও তাই। এ কারণে এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান বললেন, থাই ভিসা নিয়ে নিন বেইজিং থেকে। আমাদের সঙ্গে থাইল্যান্ডের একজন প্রকৌশলী ছিলেন। তাকে নিয়ে মাহফুজ ভাইসহ গেলাম থাই দূতাবাসে। তারা বললেন, ভিসা দেব সমস্যা নেই। থার্ড কান্ট্রি থেকে ভিসা পেতে তোমার দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট দেখিয়ে লিখে আনো, তুমি বাংলাদেশের নাগরিক। রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি সাপের পাঁচ নয় সাত পা দেখাতে পাঠালেন মাসুদ মান্নান নামের এক বিশাল কর্মকর্তার কাছে। এই ভদ্রলোক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থাকাকালে পরিচয় হয়েছিল। তাকে দেখে খুশি হলাম। তিনি মুখ গম্ভীর করে কথা শুরু করলেন। ভাবখানা এমন রাজার সামনে দুজন প্রজা বসে আছে। তিনি সিংহাসনের মালিক। বললেন, দুঃখিত আমরা আপনাদের কোনো সহায়তা করতে পারব না। মাহফুজুর রহমান বললেন, আমার থাই ভিসা আছে। আমি বাংলাদেশে রপ্তানি খাতে আটবার শ্রেষ্ঠ রপ্তানিকারকের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছি। উনি এটিএন বাংলা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক। আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আপনারা কী করেন? আমরা চেয়েছি, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে শনাক্তকরণপত্র। আমাদের পাসপোর্ট ঠিক আছে, ফেরত যাওয়ার টিকিট ঠিক আছে। বিমানবন্দরে ২৪ ঘণ্টা কষ্ট না করে ভিতরে হোটেলে থাকতে উনি থাই ভিসার আবেদন করছেন। তাই বাংলাদেশের নাগরিক এই কথাগুলো লিখে দেবেন। এতে সমস্যা কী? মাসুদ মান্নান সাহেব এবার ভাবগাম্ভীর্য আরেক ধাপ বাড়িয়ে আসমানের দেবদূত চেহারা বানালেন। এমন ভাব আরেকবার দেখেছিলাম ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের লাইসেন্স নিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উপসচিবের দফতরে গিয়ে। পরে তিনি সেই মন্ত্রণালয়ের সচিবও হয়েছিলেন। মাসুদ মান্নানের সঙ্গে কথা বাড়ালাম না। মন খারাপ করে বেরিয়ে এলাম। থাই ভদ্রলোক আমাদের চেহারার অসহায়ত্ব দেখে বললেন, চল আমাদের দূতাবাসে। আরেকবার চেষ্টা করে দেখি কী করা যায়। থাই দূতাবাসের কর্মকর্তারা হাসলেন। বললেন, দেখ তোমাদের দূতাবাস তোমাকে এই চিঠি কেন দিল না বুঝতে পারছি না? সাধারণ একটি কাজ। অথচ তারা কেন করল না? শনাক্তকরণপত্র ছাড়া তৃতীয় দেশ থেকে তুমি ভিসা পাবে না। এরপর থেকে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস দেখলে আমার শরীরে জ¦র আসে। বাংলাদেশ দূতাবাস সড়ক দিয়ে আমি হাঁটাচলাও করি না। নিজের পাসপোর্ট আগলে রাখি কোনো কারণে যাতে ওদের কাছে যেতে না হয়।

কিছু দিন আগে আফ্রিকা থেকে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশির ফোন পেলাম। তারা কিছু ভিডিও ক্লিপ পাঠালেন দূতাবাসের সামনে প্রতিবাদের। অনুরোধ করলেন সংবাদ প্রকাশ করার জন্য। আমাদের রিপোর্টারদের বললাম খোঁজ নাও। তারা খোঁজ নিলেন। বললেন, কর্মক্ষেত্রের জন্য জরুরি কিছু কাগজপত্র অ্যাটাস্টেট করতে গিয়ে ওরা ৬-৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করেন দূতাবাসের সামনে। কিন্তু দূতাবাসের সাহেবদের সাক্ষাৎ পায়নি কেউ। তাই বিক্ষোভ করেছে। হতাশ হলাম। এভাবে হয়রানির শিকার হয় বাংলাদেশি প্রবাসীরা। কুয়েতে এক বাংলাদেশি নাগরিক দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে দূতাবাসের ভিতরে পানি খেতে গিয়েছিলেন। তাকে নিষ্ঠুরভাবে পেটানোর ছবি ভাইরাল হয়ে যায়। এসব ঘটনা কষ্ট দেয়। হতাশ করে। এখনকার সরকারি কর্মকর্তারা জনসেবার পরিবর্তে আওয়ামী লীগ করতে বেশি পছন্দ করেন। তারা ভুলে যান জনগণের করের টাকায় তাদের বেতন হয়। কেউই এখানে ব্লু ব্লাডের অধিকারী সাদা নন। একই চেহারার মানুষ। তাই হয়রানির এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলকে শক্তিশালী রাখতে হবে। টিএনও, ওসি, ডিসি, এসপি সাহেবরা উপজেলা বা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের মতো কাজ করতে চাইবেন কেন? অশুভ এই নষ্ট কান্ড থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ক্ষমতার চেয়ার ও কারাগার পাশাপাশি। শতভাগ সত্য কথা। ক্ষমতার চেয়ার বদল হলে আমলারা জেলে যান না। জেলে যান রাজনীতিবিদরা। দুর্ভোগ পোহান রাজনৈতিক কর্মীরা। রাজনীতির নেতৃত্ব রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দিতে দিন। বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। আপনারা সেই এগিয়ে চলার পথকে গতিশীল করুন।  কোনো বাড়াবাড়িই ভালো কিছু বয়ে আনে না।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর