সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৫১-৫৮, কিয়ামতের দিন কী হবে
সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৫১-৫৮, কিয়ামতের দিন কী হবে

সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৫১-৫৮, কিয়ামতের দিন কী হবে

অনলাইন ডেস্ক

সূরা ইয়াসিন পবিত্র কুরআনের মর্যাদাপূর্ণ একটি সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ। এই সূরার প্রথমে বর্ণিত দুই মুকাত্তায়াত হরফের নামে এটির নামকরণ করা হয়েছে। এই সূরায় রয়েছে ৮৩টি আয়াত।

আজ এই সূরার ৫১ থেকে ৫৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৫১ ও ৫৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُمْ مِنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُونَ (51) قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَرْقَدِنَا هَذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ (52) إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَا هُمْ جَمِيعٌ لَدَيْنَا مُحْضَرُونَ (53)

“এবং (যখনই) শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে দ্রুতগতিতে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে চলবে। ” (৩৬:৫১)

“তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভোগ! কে আমাদেরকে নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল? রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন। ” (৩৬:৫২)

“হ্যাঁ, এটা কেবল এক মহানাদ ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং সেই মুহূর্তে তাদের সবাইকে আমার সামনে উপস্থিত করা হবে। ” (৩৬:৫৩)

গত কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমরা বলেছি, এই নশ্বর বিশ্বজগতের সবকিছুই একদিন আল্লাহর ইচ্ছায় ধ্বংস  হয়ে যাবে এবং বিকট ঐশী শব্দে মানুষসহ সব প্রাণীর মৃত্যু হবে। এরপর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: পরবর্তী আরেকটি মহাশব্দে সব মানুষ প্রাণ ফিরে পাবে এবং কবরে থাকা মানুষগুলো মাটি ভেদ করে উপরে উঠে আসবে। ভূপৃষ্ঠ গর্ভবর্তী মায়ের মতো নিজের পেট থেকে নবজাতকদের মতো করে সব মানুষকে বের করে দেবে। মায়ের গর্ভে যেমন এক বিন্দু পানি ধীরে ধীরে রক্তমাংসের শরীরে পরিণত হয় তেমনি মাটির গর্ভে পড়ে থাকা মানবদেহের পঁচে-গলে যাওয়া রক্ত-মাংস ও হাড় ধীরে ধীরে জোড়া লেগে আবার পূর্ণ মানুষে পরিণত হবে। এরপর এসব মানুষ কিয়ামতের ময়দানে সমবেত হবে এবং নিজেদের চোখে আল্লাহর তায়ালার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে পাবে। সেদিন তারা সবাই একবাক্যে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি স্বীকার করবে এবং মুখে বলে উঠবে। তারা মৃতকে জীবিত করার ব্যাপারে মহান আল্লাহর ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হবে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কিয়ামত দিবস হবে সশরীরে এবং মানুষ পার্থিব জীবনের দেহ নিয়েই শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে।

২. কিয়ামতের দিন হবে অনুতাপের। সেদিন কাফেররা আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসের কারণে অনুতপ্ত হবে এবং মুমিনরা নেক কাজ কম করার কারণে অনুতাপ করবে।

৩. ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় যতো মানুষ পৃথিবীতে এসেছিল অর্থাৎ হাজার হাজার বছর আগের মানুষ এবং হাজার হাজার বছর পরের মানুষ সবাই কিয়ামতের দিন একই সময়ে একই স্থানে সমবেত হবে।

সূরা ইয়াসিনের ৫৪ থেকে ৫৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  فَالْيَوْمَ لَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَلَا تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ (54) إِنَّ أَصْحَابَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَاكِهُونَ (55) هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِئُونَ (56) لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَا يَدَّعُونَ (57) سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبٍّ رَحِيمٍ (58)  

“আজকের দিনে কারও প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না এবং তোমরা যা করতে তাছাড়া অন্য কোনো প্রতিদান পাবে না। ” (৩৬:৫৪)

“এদিন জান্নাতীরা আনন্দে (ও উৎফুল্লচিত্তে) মশগুল থাকবে। ” (৩৬:৫৫)

“তারা এবং তাদের স্ত্রীরা উপবিষ্ট থাকবে ছায়াময় পরিবেশে আসনে হেলান দিয়ে। ” (৩৬:৫৬)

“সেখানে তাদের জন্যে থাকবে (সব ধরনের) ফল-মূল এবং তারা যা চাইবে তা-ই তাদের জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। ” (৩৬:৫৭)

“করুণাময় পালনকর্তার (পক্ষ) থেকে তাদেরকে যা বলা হবে তা হচ্ছে- সালাম। ” (৩৬:৫৮)

কিয়ামত দিবসে মানুষকে উপস্থিত করার উদ্দেশ্যই হবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আদালতে তাদেরকে হাজির করা। সেই আদালতে পার্থিব জীবনে মানুষের বিশ্বাস, চিন্তাধারা ও কৃতকর্মের ভিত্তিতে তাদেরকে শাস্তি অথবা পুরষ্কার দেয়া হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে: সেইদিনের বিচার হবে ঐশী মিজানের পাল্লায় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। কারো প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম বা অবিচার করা হবে না। নেককার বান্দারা তাদের সৎকর্মের পুরস্কার লাভ করবে এবং বদকার বান্দারা কঠোর শাস্তি পাবে।

পরের আয়াত থেকে জান্নাত লাভকারী মানুষদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। পার্থিব জীবনে আমরা যা কিছু দেখতে ও শুনতে পাই তার ভিত্তিতে আমাদের উপলব্ধি হওয়ার মতো কিছু পুরস্কারের কথা আল্লাহ তায়ালা এখানে জানিয়ে দিয়েছেন। সুখে ও শান্তিতে বসবাসের জন্য একজন মানুষের যা কিছু প্রয়োজন হয় অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও স্ত্রীদের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে বলা হয়েছে, জান্নাতবাসীর মনের ইচ্ছা অনুযায়ী তার জন্য সবকিছু উপস্থিত করা হবে। তারা ইচ্ছা করামাত্র তাদের সামনে কাঙ্ক্ষিত বস্তু হাজির হয়ে যাবে। আর এসব নেয়ামত খেতে বা উপভোগ করতে গিয়ে তারা ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হবে না।

অবশ্য বস্তুগত এসব নেয়ামতের পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আত্মিক অনুগ্রহও থাকবে।   জান্নাতীরা নানা ভোগের সামগ্রী পেয়ে যত আনন্দই লাভ করুক না কেন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে দেয়া সালাম তাদের জন্য এমন প্রশান্তি এনে দেবে যা অন্য কোনো ভোগের সামগ্রীর পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ এই সালাম দেয়ার মাধ্যমে জান্নাতীদের প্রতি নিজের বিশেষ অনুগ্রহ প্রকাশ করবেন।

আরও পড়ুন


সৌদিগামী কর্মীদের কোয়ারেন্টাইন খরচ দেবে সৌদি নিয়োগকারীই: সৌদি রাষ্ট্রদূত

‘অকারণে চেকপোস্ট পার হয়ে কেউ যেতে পারবে না’

লকডাউন : পোশাক কারখানা নিয়ে যা বলছে মালিকপক্ষ

কঠোর লকডাউনে যা বন্ধ ও খোলা থাকবে


এই পাঁচ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালার ন্যায়বিচারের চরম প্রকাশ ঘটবে। সেদিন পার্থিব জীবনের সব ধরনের সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বন্ধনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক ব্যক্তিকে শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত কৃতকর্মের ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে।

২. জান্নাত হচ্ছে অনাবিল সুখ ও শান্তির স্থান এবং সেখানে মানুষকে কোনো ধরনের দুঃখ বা মর্মবেদনা স্পর্শ করবে না।

৩. জান্নাতে মানুষ পারিবারিক জীবন লাভ করবে এবং সেখানেও স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের কাছ থেকে সুখ ও শান্তি লাভ করবে।

৪. জান্নাতে খাওয়া-পরা ও উপভোগের ক্ষেত্রে মানুষের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না। পার্থিব জীবনে মানুষ একসঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারের বেশি খেতে পারে না এবং অন্যান্য সুখ ও ভোগের সামগ্রীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।   কিন্তু জান্নাতীদেরকে কোনো জরা বা ক্লান্তি স্পর্শ করবে না।

news24bd.tv এসএম