নারী বন্দনা, নারী নিয়ে সাতকাহন
নারী বন্দনা, নারী নিয়ে সাতকাহন

নারী বন্দনা, নারী নিয়ে সাতকাহন

Other

আমার প্রতি নারীদের পক্ষপাতের অনেক গল্পই আমি করি। এই গল্পের কোনো শেষ নাই আসলে। ছোট ছোট অনেক গল্প। হয়ত এগুলোর বিশেষ কোনো মূল্য নেই অন্যের কাছে।

কিন্তু আমার কাছে প্রতিটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য, প্রতিটা ঘটনা  অনুপ্রেরণাদায়ক। পক্ষান্তরে আমারও নারীদের প্রতি রয়েছে আজন্ম দুবলতা। আমার জন্ম থেকে বেড়ে উঠা পযন্ত সবকিছুর সাথে জড়িয়ে আছেন একজন শ্রেষ্ট নারী, একজন ফিলোসফার। তিনি হলেন আমার মা, আমার বোন সাজু আছে। পরবতীকালে আমার কঠোর জীবন সংগ্রামের সময় আমি অনেক নারীর আনুকল্য পেয়েছি। ভালবাসায়, প্রেমে, আশ্লেষে, মমতায়, স্নেহে তারা আমার পাশে থেকেছে, সাহস দিয়েছে, অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। সবশেষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল জেসমিন নামে এক নারী।  

এখনও সেই ধারা চলমান আছে। কিছুদিন আগে আমার খুব প্রিয় ফোনটা হারিয়ে গেছিল। তারপর তড়িঘড়ি করে একটা ফোন কিনলাম। সেটা পছন্দ হচ্ছিল আমার। একদিন অরিত্রির সামনে বললাম, উহু ফোনটা একটু স্লো মনে হচ্ছে! অমনি অরিত্রি বলল, ওকে বাবা তোমাকে ভাল ফোন কিনে দিচ্ছি। ফেসবুকে পোষ্ট দেওয়ায় একজন বন্ধু বলল, তোমাকে আইফোন লেটেষ্টটা গিফট করতে চাই। যেদিন আমি ফেসবুকে আমার লাইব্রেরির কথা লিখলাম, সেদিনই এই বন্ধু বলল, তোমার লাইব্রেরির জন্য পাঁচ লাখ টাকার চেক দিচ্ছি।  

কিন্তু গতকালকের ঘটনাটা একটু ভিন্ন। কাকতলীয় কিনা জানিনা। ১৯ জুলাই, সকাল। পৌনে নয়টায় জেসমিনের ডাক্তার এপয়মেন্ট। ২১০ ডানকানমিলস রোড। আমার বাসা থেকে সাকুল্যে সতেরো মিনিটের ড্রাইভ। এদিন ঘুম থেকে উঠতেই দেরি হয়ে গেছে। আমি যদিও আলি রাইজার। জেসমিন ঘুমিয়ে ছিল। আমি তাকে ডেকে বললাম, তোমার না ডাক্তার এপয়নমেন্ট! আমরা তড়িঘড়ি করে রওয়ানা হয়েছি। হাতে আছে বারো মিনিট। পৌঁছতে একটু দেরি হবে। সমস্যা নাই। ডাক্তারকে বুঝিয়ে বললেই হবে। এতো সকালে পেশেন্ট বেশি থাকার কথাও না। তাও একটু স্পীডেই যাচ্ছিলাম। সাত সকালে রাস্তাও ফাঁকা ফাঁকা। ডনমিলস রোড ধরে অল দ্য ওয়ে গেলেই ডানকান মিলস রোড পড়বে। ডনওয়ে ওয়েষ্ট ইন্টার সেকশনে একটা সিগনাল আছে। দূর থেকেই দেখতে পেয়েছি গ্রীন  লাইট। সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই এক…হলুদ বাতি আসতেই একটু স্পীড দিয়ে পার হয়ে গেলাম। যখন ইন্টারসেকশনটা পার হচ্ছি তখন স্পীড উঠে গেছে পঁয়ষট্টি, সিগনালও লাল পড়ে গেছে। ডনমিলস রোড পঞ্চাশ কিলোমিটার জোন।

আর যায় কোথায়! পিছনে রিয়ার ভিউ দিয়ে দেখি সাঁ সাঁ করে  লাল নীল বাতি জ্বালিয়ে ফোড কোম্পানীর একটা পুলিশের এসইউভি আমার পিছন পিছন আসছে। যেনো মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে এসেছে জমদূত! বুকটা ছ্যাতঁ করে উঠল! আমাকেই ফলো করছে যে! নিরাপদ দূরত্বে আছে যম। এদেশে পুলিশ মানে বিশেষকিছু। সবাই পুলিশকে সমীহ করে। ঘুষঘাস চলে না। আর গাড়ি চালাতে কত যে সাবধাণতা লাগে তার কোনো লেখাযোখা নাই। এদেশের পুলিশ সহজে কাউকে খাতির করে না। মন্ত্রীকে না, নেতাকে না, বড় সাহেবকেও না।
আমি নিয়মানুযায়ী গাড়ি পুলওভার করলাম। গ্লাস খুলে অপেক্ষা করছি। নড়া চড়া করা যাবে না। পুরিশের এক হাত থাকে পিস্তলের বাটে। পাশে বসে জেসমিন রাগে গজ গজ করছে। সবসময় স্পীডিং করো তুমি..কেনো তুমি রেডলাইটে আসলা, কেনো স্টপ করো নাই..! গাড়ি চালাতে জানেনা..!! রিয়ারভিউ দিয়ে দেখছি একজন নারী পুলিশ আসছে আমার দিকে। আমি সতেরো বছর গাড়ি চালাই টরন্টোতে কখনও নারী পুলিশের খপ্পরে পরিনি। এই প্রথম। অতি রুপসী একজন অফিসার কাছে এসে বলল, গুড মর্। রুপে মুগ্ধ হয়ে আমিও মোলায়েম কন্ঠে বললাম গুড মনিং।

তারপর আমি কি ভুল করেছি সেটা বুঝিয়ে বলল। নভোচরিদের মতো ইকুইপ্ট অফিসারটি বলল, এই দেখো ক্যামেরা আমার সাথেই… দেখতে চাইলে দেখাতে পারি, তুমি রেডলাইটে থামতে পারতে, থামো নাই। ড্রাইভিং লাইসেন্স, ইন্সুরেন্স এবং  ওনারশীপ পোপড় দাও।  
জানি নিঘাত তিনশ ডলার টিকিট দেবে, প্লাস এরসাথে তিন পয়েন্টে জড়িত এবং ইন্সুরেন্সেও ইফেক্ট করবে। কোটে যাওয়ার যাওয়ার হ্যাসেল।  
তবুও বললাম দেখো, আমার ওয়াইফের ডাক্তার এপয়নমেন্ট আছে ২১০ ডানকান মিলসে, পোৗনে নয়টায়। অলরেডি লেট তাই একটু..একদম সত্য বলেছি।  
অফিসার গম্ভীর হয়ে বলল, পেপারস! 
আমি আবারও আগু করতে যাচ্ছিলাম অফিসার সেকেন্ড টাইম বলল, পেপারস।  
পাশ থেকে জেসমিন ধমক দিয়ে বলছে পেপারস দাও, কথা বলো না! 
ডকুমেন্টস নিয়ে অফিসার তার গাড়িতে গেলো। আমার সব রেকড চেক করছে তার কম্পিউটারে। আমার ড্রাইভিং রেকড ভাল। অতি ভাল। আমি গম্ভীর হয়ে বসে আছি। মনে মনে ভাবছি অফিসার সব পেপারস ফেরত দিয়ে আমাকে থ্যাংক ইউ বলবে, সেভ ড্রাইভ এসব বলবে, কিন্তু আমি কিছুই বলব না। তার দিকে ফিরেও তাকাবোনা। ওই সুন্দর মুখ আমি দেখতে চাই না।  

পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে একটা সাদা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল, তোমারে কোনো টিকিট দেই নাই, বোঝজ মনু! জাষ্ট ওয়ানিং। হেইয়া ভবিষ্যতে সাবধানে গাড়ি চালাইবা কিন্তু কইলাম..!
আমি খুশী হয়ে বললাম, থ্যাংকইউ মনু! ঈদের আনন্দটা দ্বিগুন হয়ে গেলো।

টরন্টো ২০ জুলাই ২০২১।

লেখাটি জসিম মল্লিক-এর ফেসবুক থেকে নেওয়া। (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv/আলী