আপা নেই, কে ধমক দেবে?
আপা নেই, কে ধমক দেবে?

মুম রহমান

আপা নেই, কে ধমক দেবে?

Other

ফরিদা আপার উপর আমি বিরক্ত ছিলাম, রাগও করেছিলাম। ফরিদা মজিদ এক অনন্য প্রতিভার নাম। কিন্তু প্রতিভার বড় সমস্যা হলো, সে এক ও অনন্য, অন্য কাউকে সে গ্রাহ্যই করতে চায় না। পোশাকে, চলনে, বলনে, কাজে যেখানেই ফরিদা আপা গেছেন সেখানেই তিনিই প্রধান।

অন্য কাউকে কথা বলার সুযোগ দিতেও তিনি নারাজ। এমনিতেই তার পাণ্ডিত্যের ধারে আমরা কুচি কাটা হয়ে যেতাম। সেখানে আবার তিনি যদি আমাদের দিয়ে কিছু করিয়ে নিতে চান তাহলেই তো বিপদ। এই বিপদে পড়েছিলাম ফরিদা আপার বই করতে গিয়ে। তিনি শুধু যে টেক্সট বোঝেন তা তো না, তিনি প্রকাশনাও বোঝেন।

এদিকে ক্রিয়েটিভ ঢাকা প্রকাশনীটা আমরা চালাই স্বৈরাচারী ভঙ্গিতে। মানে এখানে আজাদকেও আমি মানি না, আজাদও আমাকে মানে না। দুজনই যার যার ক্ষেত্রে আপোষহীন। ক্রিয়েটিভ ঢাকার সকল বইয়ের সকল ডিজাইন, ফটোগ্রাফি আজাদের দায়িত্ব আর টেক্সটের সব দায়িত্ব আমার। পাণ্ডুলিপি যোগাড় করা, লেখক পরিচিতি লেখা, বইয়ের প্রারম্ভিক লেখা এইসবই আমার কাজ। তো আমার কাজে আজাদ বাধা না-দিলেও আমি প্রায়শই আজাদের কাজে বাগড়া দেই। এই প্রচ্ছদ চলবে না, বইয়ের এই সাইজ ফালতু, এইটা কোনো ইলাস্ট্রেশন হইছে-- এইসব নখড়া আমি নিয়মিত করি। আজাদ পুরোটা্ই ঠাণ্ডা মাথার বলে আমার অত্যাচার মেনে নেয় আর আমি পুরোটা গরম মাথার বলে কারো অত্যাচার তো দূরের কথা, আব্দারও মানি না।

কিন্তু ফরিদা আপা তো অত্যাচার করে না, আব্দাও তো দূরের কথা, নেহাত আদেশ দেয়। এই করো, সেই করো, এইভাবে করো, আমি ইংল্যান্ডে এই করেছি, আমেরিকায় একবার এই হয়েছিলো, তার সব আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের রেফারেন্সের ঠেলায় আমি পেরেশান আর আজাদ কুপোকাত।

আপা নিজে এসে কম্পিউটার অপারেটরের সাথে বসে থাকে। বইয়ের ডিজাইন কি হবে তা নিয়ে কথা চালিয়ে যেতেই থাকে। ডিজাইন পাল্টে যায় বারবার। আজাদ অসহায়। প্রচ্ছদে হিরোশিমার পারমানবিক বোমার ধোঁয়া লাগবে, সেই ব্যাঙের ছাতার মতো ধোঁয়া আবার গাদা ফুলও লাগবে। আমরা গাদা ফুল কিনে আনি। ফটো শুট করি। ইলাস্ট্রেটরে ড্রয়িং করি। কিন্তু আপা’র মন পাই না। আমার মেজাজ খারাপ হতে থাকে। বলে বসি, ধুরু, ছাতার বই করুম না। আজাদ আমাকে থামায়। আপা আমাকে ধমকায়।

যা হোক নানা ঘটনার শেষে বই আলোর মুখ দেখে। আমরা বই প্রকাশনা উৎসব করি। ফরিদা মজিদের বই ‘গাদা ফুলের প্রয়াণ ও যারা বেঁচে থাকবে’। সেই প্রকাশনা উৎসব নিয়েও আপার আদেশের শেষ নাই। অতিথিদের রাতের খাবারে কী দেব? তার বই কতো কপি ছাপছি? বইয়ের প্রচারের কী ব্যবস্থা? কারা কারা আসবে? কে তার বই নিয়ে আলোচনা করবে? এতো এতো প্রশ্নের ভিড় ঠেলে প্রকাশনা উৎসবও হয়ে গেলো। আমি খুশি। আপা খুশি। আজাদও খুশি।

কিন্তু প্রায় মাঝরাতে আজাদের ফোন। ও গিয়েছিলো আপাকে গাড়ি করে বাড়ি পৌঁছে দিতে। পথে আপার প্রশ্ন, আমার বই কতো কপি ছেপেছো? আজাদ বাধ্য হয়ে মিথ্যা বলেছে। বলেছে, আপা হাজের খানেক। অমনি আপা তেড়ে উঠলেন? হাজার খানেক! আমার বই মাত্র হাজার খানেক! পাঁচ হাজার কপি তো চোখের পলকে বিক্রি হয়ে যাবে। করেছো কী তোমরা? যাহোক, আজাদ কোনোভাবে ফরিদা আপাকে বোঝাতে পারলো, ছাপাখানা তো আমাদের নিজের, চাইলে যে কোনো সময় ছাপা যাবে। দুদিনেই পাঁচ হাজার কপি করা যাবে। আজাদের প্রশ্ন হলো, বই কি আরো ছাপবো। আমি বলি, চেপে যা।

কিন্তু চেপে যাওয়া গেলো না। এক অনুষ্ঠানে গেছি। কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান। সেখানে আমিও বক্তা, ফরিদা আপা বক্তা, মানে দুজনেই আমন্ত্রিত অতিথি। সবার মধ্যে আপা আমাকে দেখেই ছুটে এসে বললেন, আমার বই এনেছো?
- বই কিসের বই?

- সে কি! এখানে এতো এতো লোক, আমার বই তো দুয়েকশ বিক্রি হয়ে যাবে এখানেই।

আমি বললাম, আপা আমি তো এখানে একটা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে এসেছি। আপনার বই নিয়ে তো আসিনি।
- নাহ, তোমাদের দিয়ে কিসসু হবে না।

আমার উঠে গেলো রাগ। আমি ফোন দিলাম আজাদকে। বললাম, বই পাঠাও, এক্ষুণি।  
সেই বই আসতেও দেরি, আজাদেরও আসতে দেরি।  
যতো দেরি আপা ততো রেগে যায়।  

আমার উপর আপা রাগ করে আমি সেই রাগ আজাদের উপর ট্রান্সফার করে দেই। সেই ট্রান্সফার এক সময় এতো ভারী হয়ে গেলো যে আজাদের মতো বরফ ঠান্ডা লোকও গরম হয়ে উঠলো। সে রাগ করে অনুষ্ঠানেই আসলো না। আমার ফোনও ধরলো না। বই অবশ্য পাঠিয়ে দিলো। সে বই কয় কপি বিক্রি হয়েছে সেটা বলাবাহুল্য মনে করছি।

যা হোক, টুকটাক রাগারাগি আমার আর আজাদের মধ্যে হয়েই থাকে। কিন্তু এইবার রাগের মেয়াদ দীর্ঘ  হলো। প্রায় তিনমাস আমরা কথা বলিনি। এর মধ্যে ফরিদা আপার সঙ্গে আরেক অনুষ্ঠানে দেখা।
-এই আমার বই এনেছো?
- আপা, চুপ করেন তো, আপনার বইয়ের যন্ত্রণায় আমরা ব্যতিব্যস্ত। আজাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নাই। আপনার কারণেই ঝগড়া হইছে।

- দিস ইজ আনফেয়ার মুম, আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারো না তুমি! ইউ নো...
আমি আস্তে করে আপার সামনে থেকে সরে গেলাম।

 

আরও পড়ুন: 


 চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট শ্রমিক

বাবা-মাকে ঘরে আটকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ফাঁস, সুইসাইড নোট উদ্ধার

আপা নেই, কে ধমক দেবে?

আজ গ্যাস নেই যেসব এলাকায়

 


তারপর সচেতনভাবেই যোগাযোগটা কম রেখেছি। সাকিরার কাছে ‍শুনলাম আপার ক্যান্সারের কথা। আপা এমনিতেই খুব শুকনা ছিলেন। ক্যান্সারে আরো ওজন হারালেন। গলার ক্যান্সার, কথাও তেমন বলা কষ্টকর। আমি সাহস পেলাম না তাকে দেখতে যাওয়ার। প্রাণবন্ত, তীক্ষ্ণ, তীব্র মানুষটাকে নিস্তেজ হয়ে বিছানায় শোয়া দেখে কি লাভ হবে!

তারপর জাগতিক সব লাভ ক্ষতির ঊর্ধ্বে আপা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। আমাদের মান-অভিমানটাও ভাঙলো না। আপাকে জানানোও হলো না, আমি আর আজাদ পরিকল্পনা করছিলাম ফরিদা মজিদ রচনাবলী করবো। দুজনেই জানতাম সেটা করতে গেলে, প্রচুর বকা খেতে হবে, আপার ঘনঘন আদেশ বাধ্যতামূলক হজম করতে হবে। ভেবেছিলাম, করবো। ভালো কিছুর জন্য না হয় ধমক, ঝারি, প্যারা খেলামই।

কিন্তু এখন তো আপাই নেই। কে ধমক দেবে? কার রাগ দেখবো? কার উপরই বা অভিমান করবো?

লেখাটি মুম রহমান-এর ফেসবুক থেকে নেওয়া।  (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

news24bd.tv তৌহিদ

সম্পর্কিত খবর