বাদশাহ আমানুল্লাহ, আফগানিস্তান, বাচ্চায়ে সকাও এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে
বাদশাহ আমানুল্লাহ, আফগানিস্তান, বাচ্চায়ে সকাও এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে

গুলজার হোসাইন উজ্জ্বল

বাদশাহ আমানুল্লাহ, আফগানিস্তান, বাচ্চায়ে সকাও এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে

Other

১৯২৭ সালে আফগানিস্তানের বাদশাহ ছিলেন আমানুল্লাহ খান। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আফগানদের নেতৃত্ব দেন  আমানুল্লাহ খান। স্বাধীনতার পর বাদশাহ মনোনিবেশ করেন দেশ গঠনে। বাদশাহ আমানুল্লাহ প্রগ্রেসিভ থিংকার।

তুরস্কের মোস্তফা কামাল পাশার বিশেষ অনুরাগী এই বাদশাহ তুরস্কের আদলে এক আধুনিক মুসলমানদের দেশ হিসেবে গড়তে চেয়েছিলেন আফগানিস্তানকে।

মেয়েদের পর্দার কড়াকড়ি তুলে দিয়েছিলেন। মেয়েদের জন্য স্কুল কলেজ বানিয়ে দিয়েছিলেন। দেশ বিদেশ থেকে ডেকে এনেছিলেন জ্ঞানী-গুণী, পন্ডিতদের। তার আমন্ত্রণেই আফগানিস্তানে অধ্যাপনা করতে যান সৈয়দ মুজতবা আলী। মুজতবা আলী তখন শান্তিনিকেতনে ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একান্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথই তাঁর নাম সুপারিশ করেন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে।

বাদশাহ আমানুল্লাহর স্বপ্ন ছিল আফগানিস্তান জ্ঞানে বিদ্যায় পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেবে। কিন্তু বাদশাহর সেই স্বপ্ন সুখের দিন বেশিদিন টিকলো না। বাদশাহ খুব দ্রুত "কাফির" উপাধি পেয়ে গেলেন। আগেই বলেছি আমান উল্লাহ একজন ইউরোপ প্রেমী শাসক ছিলেন। ইউরোপের কোন কিছু তার ভালো লাগলে তা নিজের দেশে প্রয়োগ করতেন। এরকম কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ফলে মোল্লারা তার উপর খেপে গিয়েছিল। তারা লেলিয়ে দিল উপজাতিদেরকে। উপজাতিগুলোর মধ্যে সারা বছরই মারামারি, খুনাখুনি লেগে থাকতো। কিন্তু মোল্লাদের যুক্তি তাদেরকে একত্রিত করে তুলল।

উত্তর আফগানিস্তান থেকে এই সময় আবির্ভাব হলো এক ধর্মান্ধ উগ্রপন্থী দস্যুর, যার নাম ছিল 'বাচ্চায়ে সকাও'। বাচ্চায়ে সকাও আক্ষরিক অর্থেই দস্যু ছিলেন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম। কাবুলের উত্তরে কালাকান গ্রামে। পৈত্রিক নাম ছিল হাবিবুল্লাহ, হাবিবুল্লাহ কালাকানি। তার বাবা ইংরেজ-আফগানিস্তান যুদ্ধে সৈন্যদের পানি খাওয়াতো। ভারতে যাকে বলতো ভিস্তিওয়ালা, পশতুন ভাষায় তাকে বলে সকাও। সেখান থেকে হাবিবুল্লাহর নাম হলো 'বাচ্চায়ে সকাও', যার অর্থ 'পানি বিতরণকারীর সন্তান। '

প্রথম জীবনে সে যোগ দিয়েছিল সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিক হিসেবে৷ সেখান থেকে সে পালিয়ে যায় রাইফেল সমেত। এরপর সে বড় রাস্তায় চা বিক্রির কাজ করত। পাশাপাশি নানারকম চুরিবিদ্যায় হাত পাকাতে থাকে। এক পর্যায়ে সে হয়ে ওঠে হাইওয়ের ডাকাত সর্দার। ধনী পথচারিদের খুন করে সর্বস্ব লুটে নিত। এভাবে সে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে লাগলো। আস্তে সে ক্ষমতা আরো বাড়তে শুরু করলো। নজর দিলে কাবুলের দিকে।

বাদশাহ আমানুল্লাহর বিরুদ্ধে ছোঁড়া 'কাফের কার্ড' বেশ ক্লিক করল। আমানুল্লাহ খান কাবুল থেকে কয়েকজন মেধাবী ছাত্রীকে বৃত্তি দিয়ে পাঠালো তুরস্কে, ডাক্তারি বিদ্যা শিখে আসার জন্য। কিন্তু বাজারে ছড়ালো কাফের বাদশাহ আমানুল্লাহ আফগান মেয়েদের তুলে দিচ্ছে তুরস্কের কামাল পাশার হারেমে। এভাবেই বাদশাহ বিরোধী প্রোপাগান্ডা সদ্য স্বাধীন আফগানিস্তানকে অস্থির আর অরাজক করে তুলল।  

বাচ্চায়ে সকাও এই সুযোগে তার বাহিনী নিয়ে এক এক করে আফগানিস্তানের  শহর দখল করতে করতে ক্রমশ কাবুলের দিকে এগোতে থাকলো। নৃশংস ও চরমপন্থী এই যুদ্ধবাজটিকে ঠেকাতে আমানুল্লাহ খান বাচ্চায়ের মাথার দাম ঘোষণা করলেন ৫০০ টাকা। বাচ্চায়ে সকাও সে ঘোষণা শুনে ঘোষণা করে দিলো বাদশাহ আমানুল্লাহ খানের মাথার দাম  ১০০০ টাকা !

‎'বাদশাহ আমানুল্লাহ ইসলামের শত্রু' - এই প্রচারণা এতটাই কার্যকর হলো যে এক পর্যায়ে আমানুল্লাহর সৈন্য বাহিনী তার পক্ষে লড়াই করতে অস্বীকার করলো। কাফেরের দলে থেকে কে কাফের হতে চায়?

তারা দলে দলে বাচ্চায়ের দলে যোগ দিতে লাগলো। আমানুল্লাহ বাচ্চায়েকে ঠেকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হলেন এবং সে রাজধানী কাবুলে ঢুকে পড়লো। আমানুল্লাহ খানের হয়ে লড়াই করার আর কেউ রইলো না। আমানুল্লাহ নিরূপায় হয়ে অস্ত্রাগার থেকে ঝকঝকে নতুন রাইফেলগুলো বের করে কাবুলবাসীর মধ্যে বিলি করে দিলেন। তার শেষ আশা, যদি কাবুলবাসী কোনোভাবে সে দস্যুকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে।  

তারপর যা হলো তার বর্ণনা দিতে গিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী দেশে বিদেশে বইয়ে লিখেছেন : "সবচেয়ে অবাক হলুম খাস কাবুল বাসিন্দাদের ব্যবহার দেখে। রাইফেল ঝুলিয়েছে কাঁধে, বুলেটের বেল্ট বেঁধেছে কোমরে, কেউ পরেছে আড়াআড়ি করে পৈতের মতো বুকের উপরে, কেউ বা বাজুবন্ধ বানিয়ে বানিয়ে বাহুতে, কেউ কাঁকন করে কব্জিতে, দু' একজন মল করে পায়ে ! যে অস্ত্র বিদ্রোহী, নরঘাতক দস্যুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য দীন আফগানিস্তান নিরন্ন থেকে ক্রয় করেছিল, তা আজ অলংকার রূপে ব্যবহৃত হলো !"

আরও পড়ুন


সূরা ইয়াসিন গোনাহ মাফের মাধ্যম

গ্রেনেড হামলা ছিল তৎকালীন সরকার ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার চক্রান্ত

অনেক ব্যস্ততায় প্রকৃতি দেখতে আমরা ভুলে গেছি


একজন কাবুলের বাসিন্দাও সে রাইফেল থেকে একটি গুলিও দস্যু বাচ্চায়ের দিকে ছোঁড়েনি। রাজা আমানুল্লাহ খান প্রাণ বাঁচাতে আফগানিস্তান ছেড়ে পালান এবং ইটালিতে আশ্রয় পান।   বাচ্চায়ে সকাও বিনা বাধায় কাবুল দখল করে ফেলে এবং যথেচ্ছ লুঠপাট চালায়। লাখ লাখ মানুষ প্রাণের ভয়ে কাবুল ছেড়ে পালতে থাকেন। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। মহিলাদের জন্য আবার চালু হয় কড়া পর্দাপ্রথা। মেয়েদের স্কুল কলেজ তুলে দেয়া হয়। আফগানিস্তান আবার ইসলামের পথে ফিরে আসে।

বাচ্চায়ে সকাও ওরফে হাবিবুল্লাহ কালাকানি হলো আফগানের নয়া বাদশাহ। তার নতুন নাম সে দিল হাবিবুল্লাহ- খাদেমে রাসুল এ দ্বীন। তবে এই খাদেমে রাসূলে দ্বীন বেশিদিন দ্বীনের খেদমত করার সুযোগ পায়নি। নয় মাস পর তাকে হত্যা করে ক্ষমতায় আসে নাদির খান।

লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত (সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। ) 

news24bd.tv রিমু